
নোয়াম চমস্কি চ্যাট জিপিটিকে অত্যাধুনিক চৌর্যবৃত্তি বলে কটাক্ষ করেছেন
ইতিমধ্যেই গোটা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্মার্টফোনে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে চ্যাট জিপিটি (ChatGPT)। মানুষ মুগ্ধ তার কর্মক্ষমতা দেখে। যা জিজ্ঞেস করবেন, তারই উত্তর পাবেন। কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত মুন্সিয়ানা দেখিয়েও সে উত্তর দেবে। একটি চ্যাট বট মানুষের মতো উত্তর দিচ্ছে এবং মানুষ হইহই করে ব্যবহার করছেন সেটি। কিন্তু লক্ষ্য করেছেন কি, এই চ্যাটবট নির্ভরতার কারণে ধীরে ধীরে আমাদের ভাবনা চিন্তা করার শক্তি লোপ পাচ্ছে। আমাদের সময়ে বিভিন্ন রেফারেন্স অংক বই পাওয়া যেত, যেখানে টেক্সট বইয়ের সমস্ত অংকের সমাধান করা থাকতো। আমাদের জন্য তো দারুণ ব্যাপার ছিল সেই বই। কী সুন্দর কিছু চিন্তাই করতে হচ্ছে না, হাতের কাছে রেডিমেড অংক পেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু স্যারদের কাছে সেই বই ছিল চক্ষুশুল। আমাদের কারোর হাতে কিংবা ব্যাগে সেই বই দেখলে বকুনি ছিল অবধারিত। স্যারেরা বকুনি দিয়ে বলতেন, এই বইগুলো আমরা যত ব্যবহার করব আমাদের চিন্তা-ক্ষমতা তত লোপ পাবে। পরবর্তীকালে বুঝেছি কেন কেন স্যাররা এরকম বলতেন। আর আজকের এই যে চ্যাট জিপিটি শুধুমাত্র অংকই নয়, পৃথিবীর যেকোনো বিষয় সম্বন্ধে আপনাকে গড় গড়িয়ে বলে দিতে পারে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের চিন্তা ক্ষমতা কমাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে এই কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক বিকাশ এবং চিন্তন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তাই নিউইয়র্ক ও সিয়াটলের কিছু পাবলিক স্কুল চ্যাট জিপিটি ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করেছে। একটি ফরাসি বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিয়েছে, তারা যদি এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তবে বহিষ্কার করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে শিক্ষাক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে চ্যাট জিপিটি। মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক, শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি চ্যাট জিপিটিকে অত্যাধুনিক চৌর্যবৃত্তি বলে কটাক্ষ করেছেন (Noam Chomsky has called the ChatGPT chatbot ‘basically high-tech plagiarism’)। তাঁর মতে, চুরি করা এখন আরও সহজ হয়ে গেছে। ধরা যাক, কোনো ছাত্র বা ছাত্রী জানতে চাইছে নেপোলিয়নের পতনের কারণ কী? তাকে দুটো বই উল্টেও দেখতে হবে না, কেন না চ্যাট জিপিটি নিজেই সুন্দর করে সেই সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ লিখে দিয়ে দেবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় বই ঘেঁটে দেখলে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন জিনিস সম্বন্ধে যে জ্ঞান হয়, তা চ্যাট জিপিটি কতটা প্রদান করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই যায়। যে কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক তথ্যও তুলে ধরে। এর কারণে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই স্কুল-কলেজের হোমওয়ার্ক করে ফেলছে। গুগলে তাও উত্তর নিজেকে খুঁজতে হত, কিন্তু চ্যাট জিপিটির কারণে সেই কষ্টটুকুও নিজেকে করতে হয় না। ফলত চ্যাট জিপিটি শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত সুবিধার একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে শিক্ষার্থীর পড়ালেখা করে নিজে থেকে চিন্তাভাবনা করে উত্তর লেখার ক্ষমতা লোপ পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে এই কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক বিকাশ এবং চিন্তন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তাই নিউইয়র্ক ও সিয়াটলের কিছু পাবলিক স্কুল চ্যাট জিপিটি ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করেছে। একটি ফরাসি বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিয়েছে, তারা যদি এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তবে বহিষ্কার করা হতে পারে। শোনা যাচ্ছে ব্যাঙ্গালোরের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে শীঘ্রই।

মানুষের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞদের মতে শিক্ষাক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে চ্যাট জিপিটি। মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক, শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি চ্যাট জিপিটিকে অত্যাধুনিক চৌর্যবৃত্তি বলে কটাক্ষ করেছেন (Noam Chomsky has called the ChatGPT chatbot ‘basically high-tech plagiarism’)। তাঁর মতে, চুরি করা এখন আরও সহজ হয়ে গেছে। ধরা যাক, কোনো ছাত্র বা ছাত্রী জানতে চাইছে নেপোলিয়নের পতনের কারণ কী? তাকে দুটো বই উল্টেও দেখতে হবে না, কেন না চ্যাট জিপিটি নিজেই সুন্দর করে সেই সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ লিখে দিয়ে দেবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় বই ঘেঁটে দেখলে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন জিনিস সম্বন্ধে যে জ্ঞান হয়, তা চ্যাট জিপিটি কতটা প্রদান করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই যায়। যে কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক তথ্যও তুলে ধরে।
ইতিমধ্যেই মানুষের বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স এবং এআই (AI) অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence)-এর একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আসলে মানব সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাবো যে মানুষ নিজের জীবন-যাপনকে আরো সহজতর করে তোলার পথে অগ্রণী হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে তাই চ্যাট জিপিটির জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে। চ্যাট জিপিটি (Chat Generative Pre-trained Transformer) আসলে এক বৃহৎ পরিমাণ জ্ঞানকে নিজের মধ্যে ‘স্টোর’ করছে। পৃথিবীতে বলা ভালো ইন্টারনেটে যত রকমের ডিজিটাল বই, ওয়েবসাইট লিখিত অবস্থায় রয়েছে তার সবটাই প্রায় চ্যাট জিপিটির ডেটাবেসে ফিট হয়ে রয়েছে। ফলস্বরূপ সামান্য কয়েকটি শব্দ টাইপ করেই আমরা আমাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতে পারি। এই একইভাবে অনেক বড়ো বড়ো কোম্পানিতে কোডিংয়ের কাজ চলছে। বড়ো বড়ো ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ এই চ্যাট জিপিটি এবং তার সমগোত্রীয় অন্যান্য এআই-রা কয়েক লহমায় করে ফেলছে। এ তো শঙ্কিত হওয়ার কারণ বটেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চ্যাটজিপিটি মানুষের চেয়ে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর চাকরি, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, অ্যাকাউন্টিং, কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস ইত্যাদি কাজগুলো করতে পারবে। ফলে কর্মীর চাহিদা কমে যাবে এবং চাকরি নিয়ে টান পড়বে গোটা বিশ্বে। ইতিমধ্যেই বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান এই ধরনের এআই ব্যবহার করে কাজ করাচ্ছে। ফলত, অনেক কম খরচে, অনেক কম সময়ে, অনেকটা বেশি কাজ উৎপাদন হচ্ছে।
কিন্তু এখানেই রয়েছে সমস্যা। চ্যাট জিপিটি কিংবা অন্যান্য সমগোত্রীয় এআই মানুষের চেয়ে দ্রুত কাজ করতে পারে। কিন্তু যা পারে না, তা হল নির্ভুলভাবে কাজ করতে। এই চ্যাটবটগুলির মধ্যে একটি হ্যালুসিনেশনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ চ্যাট জিপিটি আপনাকে এমন একটি আউটপুট তৈরি করে দেবে যা দেখে আপনার নির্ভুল মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাবে সেই আউটপুটটি আসলে আদ্যোপান্ত ভুল। ধরা যাক, আপনি চ্যাট জিপিটিকে বললেন একটি রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখো। সে হয়তো ব্যাকরণগতভাবে এবং রবীন্দ্রনাথের লেখনশৈলীর মতো করে একটি কবিতা আপনাকে লিখে দেবে। আপাতভাবে দেখে মনে হবে কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা, কিন্তু আসলে কবিতাটি চ্যাট জিপিটির নিজের তৈরি করা। আর এখানেই এআই-এর সীমাবদ্ধতা। এআই আসলে কিছু কোডেড প্যাটার্ন-এর ওপর চলে এবং ইন্টারনেটে উপলব্ধ জিনিস থেকে নিজেদের ডেটাবেসকে আরো সমৃদ্ধ করে। ফলত মাঝেমধ্যেই দেখা যায় সে তথ্য উপস্থাপন করতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলছে।

ভারতের প্রথম এআই সঞ্চালক
আরো একটি সমস্যা রয়েছে চ্যাট জিপিটি-র। অধিকাংশ সময়েই দেখা যায় চ্যাট জিপিটি কপিরাইট কিংবা প্লেজিয়ারিজমের নিয়ম মানে না। কারণ এই ধরনের বট সফটওয়্যার কোড, প্রবন্ধ, ছবি এবং ভিডিও-সহ বিপুল পরিমাণে সর্বজনীনভাবে উপলব্ধ ডেটাতে প্রশিক্ষিত। তাই অনেক সময়ই দেখা গিয়েছে চ্যাট জিপিটি কপিরাইটযুক্ত মেটেরিয়াল অবলীলায় ব্যবহার করে ফেলছে নিজের কাজে। অনেকে হয়তো সেই কপিরাইটওয়ালা আউটপুট ব্যবহার করে উপার্জনও করছেন। এক্ষেত্রে যিনি এমন করছেন তার সমূহ বিপদ। অর্থাৎ আপনি চ্যাট জিপিটিকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারবেন না। আসলে চ্যাট জিপিটি বা সমগোত্রীয় যুক্ত বট আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ভিত্তিক। আসলে এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে কোনোরকম ‘ইন্টেলিজেন্স’-ই নেই। এআই নিজের কোডেড প্যাটার্ন এবং ডাটাবেসের মাধ্যমে চলে। স্বাভাবিকভাবেই তার নিজের ঠিক-ভুল বিচার করার কিংবা তথ্য যাচাই করে নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আর এখানেই মানুষের বুদ্ধিমত্তার কাছে পরাস্ত কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা।
তবে এটা ঠিক যে, যুগের চাহিদা যেদিকে যাচ্ছে, মানুষকে তার মেধা দিয়ে বারবার প্রমাণ করতে হবে তার বুদ্ধিই শ্রেষ্ঠ। কাজের পিছনে শ্রম, শিক্ষা, সময়, ধৈর্য সবটাই তাকে আরও আরও বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পরাস্ত করতে এটাই হবে সাধারণ মানুষের একমাত্র লক্ষ্য।