আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বাঙালি কি পুতুল নাচের কথা ভুলেই গেল?

পুতুল নাচ সমাজের এক নিয়ন্ত্রণের গল্প বলে, ঠিক যেন সমাজের স্বচ্ছ এক আয়না

“পুতল বৈ তো নই আমরা, একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন” – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে পুতুল নাচের রূপকে উঠে এসেছে বাংলার গ্রামজীবনের কথা। এই জীবনে শৈশবের সঙ্গী ছিল পুতুলরাই। তাই এহেন পুতুলদের আদরের শেষ ছিল না কোনোদিনই। বেড়ে ওঠার পরতে পরতে ছিল পুতুল খেলার ঘর কিংবা পুতুলের বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজও। রং-বেরঙের জামা, পুঁতির হার দুল কিংবা বাহারী চুলের সাজ সব মিলিয়ে পরিপাটি হয়ে উঠতো তারা।

এই পুতুল খেলার পরিচিত অভ্যেস থেকেই বাংলায় জাঁকিয়ে বসেছিল পুতুল নাচ শিল্প মাধ্যমটি। শোনা যায়,  ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের বিপিন পালের হাত ধরে ভারতে যাত্রা শুরু হয় লোকনাট্যের এই প্রাচীন শিল্প মাধ্যম পুতুল নাচের। সামাজিক বিভিন্ন বিষয়, পালাগান, পৌরাণিক কাহিনি এসবই ছিল পুতুল নাচের ভিত্তি। ফলে তা সহজেই মানুষের মনকে ছুঁয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীকালে কৃষ্ণনগর গ্রামের গিরিশ আচার্য, তারু মিয়াঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেড্ডা এলাকার ধন মিয়াঁ, কালু মিয়াঁ, রাজ হোসেন ও পৌর শহরের কাজীপাড়া এলাকার শরীফ মালদার প্রমুখের হাত ধরে এই শিল্প নিজের চলার পথ খুঁজে নিয়েছিল।

আক্ষরিক অর্থেই প্রাণহীন এই পুতুল। তাকে খানিক নাচিয়ে না দিলে সে মোটেই চলতে পারে না। পুতুল নাচ সমাজের এক নিয়ন্ত্রণের গল্প বলে। তাই মানুষ যতই ‘হাতের পুতুল’ বানিয়ে রাখার চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুক না কেন, সময়ের হিসেবে দম দেওয়া পুতুল আমরা প্রত্যেকেই। পুতুল নাচও তাই হয়ে উঠেছে আমাদের সামাজিক দর্পণ।

মঞ্চ প্রস্তুত। বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুরে নাটক শুরু হল। চরিত্ররা সবাই সেজেগুজে প্রবেশ করলেন মঞ্চে। কিন্তু তারা না পারে নিজে থেকে কথা বলতে, না পারে চলতে ফিরতে। সব নিয়ন্ত্রণই অন্য করোর হাতে। একটি বাঁশের মাথায় চরিত্রদের বসিয়ে দেওয়া হতো। চরিত্র বলতে পুতুল আর কি! কাহিনির গল্প অনুযায়ী সাজানো হতো তাদের। আর নেপথ্যে থাকতেন আসল নায়কেরা, কালো কাপড়ের আড়ালে। পুতুল নাচিয়েরা বাঁশের টুকরো কোমরে বেঁধে পুতুলগুলিকে সুতোর টানে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

আমাদের দেশে মূলত চার ধরনের পুতুল নাচ দেখানো হয়। ডাং পুতুল, কাপড়ের তৈরি পুতুল, তারের পুতুল এবং বেণী পুতুল। এদের মধ্যে বেণী পুতুলের নাচ বাংলায় খুব একটা দেখা যায় না, সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল ডাং পুতুলের নাচই। পুতুল নাচ ছিল ছোটো যাত্রাপালার রূপান্তর। যিনি অভিনয় করতেন, তিনি একাধারে পাঁচ, ছয়টি চরিত্রে অভিনয় করতে পারতেন৷ তাঁকে ওই পালার মাস্টার ম্যান বলা হতো। পরবর্তীকালে কাহিনিকে ভরপুর করে তুলতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পালায় হারমোনিয়াম, ঢোল, বাঁশি ইত্যাদির ব্যবহার শুরু হয়।

পুতুল নাচ ছিল বাংলার নিজস্ব সম্পদ, বাংলার গ্রামাঞ্চলে মেলা থেকে উৎসব সবকিছুর এককালীন অঙ্গ ছিল এই শিল্প মাধ্যমটি। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বিনোদন এখন মানুষের হাতের মুঠোয়, ফলে আজকাল আর বাংলার পুতুলের কথা শুনতে চায় না কেউই। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে পুতুল নাচের শিল্পীরা।

“আগে কত মেলা হত বছরে, কাজও জুটে যেত। এখন আর সেভাবে ডাক পাই না আমরা। কিন্তু আর তো কোনো উপায় নেই, এই কাজই তো আমাদের শেষ সম্বল”, খানিক অভিমানের সুরে বলেন নদিয়া জেলার পুতুলনাচ শিল্পী আশিস দাস। তাঁর মতো কয়েকজন প্রবীণ শিল্পী এখনও পুতুল নাচকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছেন। কিন্তু নতুন প্রজন্ম রোজগারের আশায় চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। আশিসবাবুর কথায়, “আমাদের ছেলেরা আর কেউই ভরসা করে এই কাজে আসতে চাইছে না, বাধ্য হয়ে নিজের মতো কাজ খুঁজে নিচ্ছে সবাই।”

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলছে বাঙালির এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টাও। প্রতি বছর কলকাতার মধুসূদন মঞ্চে পালিত হয় বিশ্ব পুতুল নাচ দিবস। দুদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে জড়ো হন বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে টিকে থাকা পুতুল নাচের শিল্পীরা। অবশ্য এই বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বদল এসেছে পুতুল নাচের বিষয়বস্তুতেও। আগে যেমন পৌরাণিক কাহিনিই ছিল এই শিল্পের আধার, বর্তমানে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা সামাজিক বিষয়বস্তুও। কন্যাশ্রী, বাল্য বিবাহ, বিভিন্ন রাজনৈতিক তরজা ইত্যাদি নানা কিছুই উঠে আসছে পুতুল নাচের মঞ্চে। আবার পুতুল নাচ বলতে আজ শুধুই মাটির পুতুলের নাচ নয়, কোথাও ব্যবহার হচ্ছে কাঠের পুতুল, কোথাও আবার শোলার।

গ্রামবাংলার লোকশিল্পীদের একটাই আশা, পুরাতনী মাটির কিংবা কাঠের পুতুলেরা যেভাবে আবার জায়গা করে নিয়েছে বাঙালির ভাবনায়, সেভাবেই যেন বাংলার ঐতিহ্য পুতুল নাচের ধারাকেও বহন করে বাঙালি। কারণ এই ধরনের শিল্পের মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে জাতির শিকড়ের টান।

ছবিঃ সংগৃহীত

Developed by DXDasia