
সময়টা ২০০৫ সাল, আর্ট আর আর্টিস্ট নিয়ে প্রথাগত চিন্তাভাবনা তখনও খুব একটা জাঁকিয়ে বসেনি। কলকাতা কেন্দ্রিক কিছু আলোচনা ছাড়া এই শিল্প বাঙালির ঘরে তখনও বেশ খানিকটা ব্রাত্য বলা চলে। ঠিক এরকম সময় কলকাতা থেকে খানিকটা সরে এসে খোদ মফস্সলের একটা ছোটো শহর কোন্নগরে কয়েকটা তরুণ মুখ রং তুলি নিয়ে বেহিসেবী স্বপ্ন বুনতে শুরু করে। আর তারা তাদের এই স্বপ্নের নাম দেয় ‘পঞ্চরথী’। সপ্তর্ষি রাহা, বিনোদ সরোজ, শান্তনু হাজরা, সায়ক মিত্র, সঞ্জীব দাস, সুব্রত পোড়েল এদের হাত ধরেই পঞ্চরথীর যাত্রা শুরু হয়। আর এঁদের মাথার ওপর ছিলেন শ্রী বীরেন গৌতম, যিনি হলেন সকলের মাস্টারমশাই। বর্তমানে বয়স ৯০ ছুঁইছুঁই এই মানুষটির তত্ত্বাবধানেই কিছু রঙিন ছবি আর আরো নতুন কিছু মুখ তৈরির উদ্দেশ্যে পঞ্চরথী যাত্রা শুরু করে। মূলত আঁকা শেখানো দিয়েই এই কাজ শুরু করেন তাঁরা। স্বপ্নের বয়স একটু বাড়লে যেভাবে নতুন ইচ্ছেরা যোগ দেয় এখানেও তাই হয়। ছোটো শহরের এই অভিনব উদ্যোগ সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। ফলে কাজের উৎসাহ আরও বাড়তে থাকে।
শুরুর সময়ের উপদেষ্টা সপ্তর্ষি রাহা বলেন, “প্রথমে মূলত নিজেদের কিছু আঁকা এবং ছাত্রছাত্রীদের কিছু আঁকা নিয়ে প্রদর্শনী করা হতো। পরে ২০১৩ সালে, ট্রেসি লি স্টাম-এর সহায়তায় প্রথম বড়ো ক্যানভাসে লাইভ পেইন্টিং-এর ভাবনা শুরু হয় এখানে। পাশাপাশি চলতে থাকে বার্ষিক প্রদর্শনী।” জানা যায়, এই লাইভ ক্যানভাসে ছবি আঁকার যে উদ্যোগ সেই থেকেই এখানে চলে আসছে। মূলত দুদিন ধরে চলে এই পেইন্টিং। কোনো একজন শিল্পী নয়, একাধিক শিল্পীর মিলিত প্রয়াসে সেজে ওঠে এই ক্যানভাস।
সপ্তর্ষিবাবু আরও বলেন, “২০১৬ সাল থেকে আমরা ওয়ার্কশপ শুরু করি এখানে। কলকাতার কাটুন দল এখানে এসেছে ওয়ার্কশপ করতে। চালচিত্র একাডেমি, বাবু পুতুলের ওয়ার্কশপ করে গেছে। এমনকি নাটকও দেখানো হয়েছে। ফলে, গতানুগতিক এক্সিবিশনের ধারা থেকে সময়ের সঙ্গে এইভাবেই আমরা নিজেদের খানিকটা পাল্টে নিয়েছি।”

যেকোনো কাজই বেঁচে থাকে প্রজন্মের হাতে, পঞ্চরথীও তার ব্যতিক্রম নয়। সময়ের সঙ্গে আরও অনেক নতুন ছাত্রছাত্রী এই কাজ পরিচালনার দায়িত্বে যোগ দেয়। নতুন মানুষ আর নতুন ভাবনায় সমৃদ্ধ হতে থাকে এই উদ্যোগ। সপ্তর্ষি রাহা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, “নতুন কিছু ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে এসে নিজে থেকে অনেক দায়িত্ব সামলাচ্ছে দেখে এখন খুবই ভালো লাগে আমাদের।”
২০০৫ সালের সেই স্বপ্নের বয়স এখন ১৭ পেরিয়ে তরতরিয়ে প্রবেশ করেছে যৌবনের দোরগোড়ায়, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন সাজে সে এখন অভ্যস্ত। প্রতিবছরই কিছু না কিছু অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বার্ষিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় এখানে। এবছরও অর্থাৎ ২৬ থেকে ২৮ ডিসেম্বর তিনদিন ব্যাপী বার্ষিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পঞ্চরথী। পঞ্চরথীর এই সময়ের মুখ উষ্ণীষ-এর কথায়, “এবছর পরিচিত অভ্যেস এর অনেকটাই বদল ঘটেছে অনুষ্ঠানে। কোন্নগরে খোদ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগান বাড়িতে শীতাংশু মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি ‘কাটুম কুটুম’-এর ওয়ার্কশপ। এছাড়াও বিশিষ্ট শিল্পী কৌশিক রাহা আসেন ওয়াটার কালারের ওয়ার্কশপ করাতে।” আর তার সঙ্গে থাকে দুদিন ব্যাপী লাইভ পেইন্টিংও। সপ্তর্ষিবাবু জানান, এবছর বিপিন রাওয়াত-কে শ্রদ্ধা জানিয়েই বার্ষিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে ‘পঞ্চরথী’।
“২০০৫ থেকে ২০২১ এই দীর্ঘ সময়ে অনেকেই এসেছেন, আবার অনেকেই চলে গেছেন কিন্তু এই উদ্যোগ থেকে গেছে। আমাদের অনেকেই কাজের সুত্রে বাইরে আছেন কিন্তু যোগাযোগে থেকে গেছেন পঞ্চরথীর সঙ্গে।” এই উদ্যোগ আজ যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, মানুষের ভালোবাসা পেয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে তা তার কথায় লেগে থাকা আনন্দের রেশ থেকে সহজেই বোঝা যায়।
‘পঞ্চরথী’, কয়েকটা অচেনা মুখের স্বপ্নের নাম ছিল একদিন, যারা আঁকার নেশাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সেদিন। পথ হয় তো খুব মসৃণ ছিল না কোনোদিনই, কিন্তু ভালোবাসা আর জেদ সম্বল করে পা ফেলেছিলেন। চেয়েছিলেন নতুন আগামী গড়তে, যে আগামী চেনা ছক ভেঙে বেরোতে ভয় পাবে না। ভালোবাসাকে পেশা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে, এটুকুই চাওয়া ছিল তাদের প্রজন্মের কাছে। আজ সেই স্বপ্ন বেশ পরিপাটি, গোছানো হয়েছে। আজ আর দীর্ঘ পথের দিকে ফিরে তাকালে চড়াই উৎরাই চোখে পড়ে না, বরং একরাশ উচ্ছ্বাস, আবেগ আর ভালোলাগা চোখে পড়ে যা আবার আগামীকে তৈরি করতে ভরপুর উৎসাহ দেয়।
ছবি সৌজন্যে – পঞ্চরথী