
বাংলার টেরাকোটার আলোচনায় প্রথমেই থাকে বিষ্ণুপুর। মল্লরাজাদের সেই নগরী আজও জোড়বাংলা, শ্যামরায় কিংবা মদনমোহন মন্দিরের পোড়ামাটির কারুকাজের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত। তবে, বিষ্ণুপুর ছাড়া বাংলায় আর কোথাও টেরাকোটা শিল্প-নিদর্শন নেই, তা নয়। এর মধ্যে অন্যতম বাঁকুড়া জেলার সোনামুখি, উত্তর দিনাজপুর জেলার কুনোর। এই দুই অঞ্চলের মৃৎশিল্পে চোখ রাখলে উঠে আসে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন শিল্পভাবনা, যা আলোচনার বাইরে থেকে গেছে।
বাঁকুড়া জেলার ব্যস্ত জনপদ সোনামুখি একসময় ছিল তাঁতিদের গ্রাম, রেশম, তুলো ও নীলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। জানা যায়, এখানকার সমৃদ্ধ বণিক ও তাঁতি সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য মন্দির। আজ বেশিরভাগ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও, কিছু কিছু এখনও টিকে আছে। সেসব মন্দিরের স্থাপত্য দেখবার মতো, যাদের গায়ে এখনও লেগে আছে পোড়ামাটির সূক্ষ্ম শিল্পকর্মের ছাপ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শ্রীধর মন্দির, যা পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত পঁচিশটি চূড়া বিশিষ্ট মন্দিরের মধ্যে একটি। মন্দিরের স্তম্ভ, খিলান, ভীত এবং সম্মুখভাগ জুড়ে যে টেরাকোটা কাজ দেখা যায়, তা বাংলার কারিগরদের দক্ষতার সূচক।
বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা শিল্পের একটি স্বতন্ত্র ধারাই সোনামুখিতে বিকশিত হয়েছিল। তবে এখানে টেরাকোটা-শিল্প শুধু মন্দিরের দেওয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোড়ামাটি প্রাণ পেয়েছে পুতুলে—ঘোড়া, হাতি, দেবদেবী ও লোকজ প্রতীকের ভাস্কর্যে।

অনেক গবেষক মনে করেন, বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা শিল্পের একটি স্বতন্ত্র ধারাই সোনামুখিতে বিকশিত হয়েছিল। তবে এখানে টেরাকোটা-শিল্প শুধু মন্দিরের দেওয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোড়ামাটি প্রাণ পেয়েছে পুতুলে—ঘোড়া, হাতি, দেবদেবী ও লোকজ প্রতীকের ভাস্কর্যে। বিশেষ করে দীর্ঘ গলা, খাড়াকান যুক্ত বিখ্যাত বাঁকুড়ার ঘোড়া আজ বাংলার হস্তশিল্পের অন্যতম নজির। এই ঘোড়া বাস্তবের ঘোড়ার অনুকরণ নয়, বরং এটি বিশ্বাস, প্রতীক এবং শিল্পীর কল্পনার এক বিমূর্ত প্রকাশ।
আরও পড়ুন: বাংলার পুতুল সাম্রাজ্য
এই সোনামুখি অঞ্চলের পটুয়া পাড়ার দক্ষ শিল্পীদের হাতে বানানো ভাগ্যমণি পুতুলটির কথা না বললেই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক সামাজিক আখ্যান। এই পুতুলের মা পুতুলটি কখনও বসে আবার কখনও দাঁড়িয়ে থাকে, কোলে থাকে চার পুত্র সন্তান। খানিক মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনা থেকেই এই পুতুলের ধারণা। সে সময় মনে করা হতো, এক মায়ের সকল সন্তানই পুত্র হলে তিনি খুবই ভাগ্যবতী অর্থাৎ, পুত্র সন্তানে মায়ের ভাগ্য নির্মিত হতো। সেখান থেকেই ভাগ্যমণি পুতুলের প্রচলন।

সোনামুখির শিল্পের সবচেয়ে বড়ো শক্তি সম্ভবত এখানেই। সেখানে পোড়ামাটি কেবল সাজসজ্জার বস্তু নয়, একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি। মাটির শরীরে সেখানে লুকিয়ে থাকে মল্লভূমের ইতিহাস, বৈষ্ণব ঐতিহ্য এবং বাংলার গ্রামীণ জীবনের অনুরণন। এখানকার টেরাকোটা প্রতীকী শিল্পের ওপর জোর দেয় যা দীর্ঘ বছরের বাঙালি ঐতিহ্য এবং হস্তশিল্পকলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।
অন্যদিকে, উত্তর দিনাজপুরের কুনোরের গল্প অনেকটাই আলাদা। কুনোরের টেরাকোটা শিল্পের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন। তথ্য অনুযায়ী, এখানকার কারিগরেরা বহু প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কুনোরে টেরাকোটার বর্তমান কেন্দ্র হিসেবে বিকাশ সাম্প্রতিক।

সোনামুখির শিল্প যেখানে প্রতীক ধর্মী ও ভাস্কর্য কেন্দ্রিক, কুনোরের শিল্প সেখানে অনেক বেশি ব্যবহারিক। এক অর্থে, কুনোরের টেরাকোটা শিল্প দেখায় কীভাবে একটি প্রাচীন শিল্প আধুনিক জীবনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
এই কারণেই কুনোরের শিল্পে ঐতিহ্যের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে আধুনিকতার ছাপ। এখানে তৈরি হয় নানা আকারের মাটির পাত্র, টব, প্ল্যান্টার, ল্যাম্পশেড, টাইলস, টেলিফোন স্ট্যান্ড এবং নানাধরনের গৃহসজ্জার সামগ্রী। নকশার ক্ষেত্রেও দেখা যায় ভিন্নতা। আদিবাসী নারী ও শিশুর অবয়ব, গণেশ, তালগাছ, লতা, কলকা ইত্যাদি মোটিফ মূলত জায়গা পায় এখানকার শিল্পকলায়।
সোনামুখির শিল্প যেখানে প্রতীক ধর্মী ও ভাস্কর্য কেন্দ্রিক, কুনোরের শিল্প সেখানে অনেক বেশি ব্যবহারিক। এক অর্থে, কুনোরের টেরাকোটা শিল্প দেখায় কীভাবে একটি প্রাচীন শিল্প আধুনিক জীবনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ঘরের কোণে রাখা একটি টেরাকোটা প্ল্যান্টার কিংবা দেওয়ালে ঝোলানো একটি পোড়ামাটির অলংকরণ আজও সেই শতাব্দী প্রাচীন শিল্পধারাকেই বহন করে চলেছে, শুধু তার ভাষা বদলেছে।
এই দুই কেন্দ্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়, টেরাকোটা আসলে কোনও স্থির শিল্প নয়। সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলায়, ব্যবহার বদলায়, কিন্তু মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বদলাই না। সোনামুখির মন্দিরের দেয়াল থেকে কুনোরের আধুনিক গৃহসজ্জা, দুই ক্ষেত্রেই সেই সম্পর্কের প্রকাশ ঘটে ভিন্ন ভিন্ন আকারে।
আজ যখন যন্ত্রনির্ভর উৎপাদনের যুগে হাতেগড়া শিল্প ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে, তখন বাংলার টেরাকোটা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় শিকড়ের কাছে। একটি পোড়ামাটির ঘোড়া, একটি টেরাকোটা ফুলদানি কিংবা একটি অলংকরণ শুধু ঘর সাজায় না, এরসঙ্গে মিশে থাকে প্রজন্মান্তরের সুদক্ষ শিল্পবোধ।

বাংলার এই ঐতিহ্যকে আরও কাছ থেকে দেখতে চাইলে চলে যেতে পারেন কলকাতার যোধপুর পার্কে অবস্থিত দ্য বেঙ্গল স্টোর-এ। এখানে দেখা মিলবে এমনই নানা খাঁটি টেরাকোটা শিল্পকর্মের। বাঁকুড়ার টেরাকোটার ঘোড়া, টেরাকোটা রথ কিংবা টেরাকোটা দুর্গার মতো শিল্প-নিদর্শন শুধু ঘরের শোভাই বাড়ায় না, বহন করে বাংলার কারুশিল্পের অনবদ্য দক্ষতা। নিজের প্রিয় কোণটিকে একটু অন্যভাবে সাজানোর পাশাপাশি এই শিল্পকর্মগুলি হয়ে উঠতে পারে বাংলার শিল্পঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব প্রচেষ্টা।
বলা যায়, টেরাকোটার কোনও শিল্পকলা হয়তো শুধু একটি পণ্য নয়। এ হল বাংলার পোড়ামাটির গন্ধে মোড়া কারুশিল্পীদের পরিশ্রমে তৈরি শতাব্দী প্রাচীন শিল্পস্মৃতির এক জীবন্ত বাহক।
__________________
তথ্যসূত্র:
1.https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/bengal-s-craft-terracotta-mesmerizes-whole-world
2.https://amitabhagupta.wordpress.com/2013/01/08/brick-temple-towns-of-bankura-part-iii-sonamukhi-2/
3.https://en.wikipedia.org/wiki/Bankura_horse?utm_source=chatgpt.com
4.https://uttardinajpur.gov.in/tourist-place/kunore/?utm_source=chatgpt.com

