
উনিশ শতকের কলকাতা বলা মাত্রই মনে পড়ে উত্তর কলকাতার ইউরোপীয় ধাঁচের বাড়ি, স্টেইনগ্লাস আর খড়খড়ির জানালা, গিলে করা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ফুলবাবু, রাত্রি নামলেই ‘মালভরা মোদাগাড়ি’র বহর, হাজার টাকার ঝাড়লণ্ঠন, শখের থ্যাটার থেকে ‘প্রো’ থিয়েটার, সমাজ সংস্কার, দিশি কৌলিন্য থেকে ভিক্টোরীয় শৌখিনতা… আরও কত কী! স্বাদের দিক থেকে বলতে গেলে এ যে রিজোটো নাকি ভোগের খিচুড়ি বলা খুব মুশকিল। যদি বাংলা সাহিত্য অনুরাগী হয়ে থাকেন, এসবের সূত্রে মনে পড়বে সেযুগের নকশা। মনে পড়বে সেই সময়েই রচিত হচ্ছে ‘মেঘনাদবধ’, ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য, ‘সীতার বনবাস’ কিংবা ‘শকুন্তলা’। পদ্যের ছাঁদ ছেড়ে গদ্যের তালগাছ তড়তড়িয়ে বেড়ে উঠছে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ হয়ে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ কিংবা ‘বিষবৃক্ষ’-এর দিকে। সঙ্গে ইউরোপ থেকে ভেসে আসছে সে দেশের বই, নতুন ভাবনা। তবে সেই আলোকপ্রাপ্তি সেকেলে সময়ের ‘এলিট’ ব্যাপার স্যাপার। সেই ‘লাইট-শো’তে কলকেতার নুন আনতে পান্তা ফুরোনো মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু জ্ঞানচর্চা না হোক, বিনোদনের জন্য বই পড়া চাই। আর চাই আখ্যান, চাই বিস্ময়। পুরাণ, লোককথা, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ তো ছিলই। তাছাড়া ‘গসিপ’ বাঙালির বরাবরই প্রিয়। তাই টিমটিমে ‘অক্ষর-আলোকপ্রাপ্ত’ বৃত্তিভোগী সমাজের কুলুঙ্গিতে ঠাঁই পেল সহস্র এক বাবু বৃত্তান্ত অর্থাৎ সমাজের উচ্চবিত্ত অন্দরমহলের রকমারি ‘কেচ্ছা’ সম্বলিত বটতলার ‘চটি’ (‘দুষ্টু’ বইয়ের সংখ্যাও নেহাৎ কম ছিল না), শীল যন্ত্রের পাঁজি, কৃত্তিবাসী রামায়ণ আরও কত কী!। সস্তা পাল্প কাগজে ছাপা, ফার্স্ট ক্লাস ‘যন্ত্র’-এর উচ্ছিষ্ঠ কিংবা সস্তায় বানানো মুদ্রণ সামগ্রী সম্বল করে ছাপা হতো সস্তা বই। সে বইয়ে ইলাস্ট্রেশনও খাসা। কালীঘাটের পটের আদলে বাঙালি কারিগররা দিব্বি তৈরি করে নিতেন কাঠ খোদাই ব্লক। কিন্তু সেসব সুদূর অতীত।
আরও পড়ুন: মানিদার কথা ও তাঁর শিল্পকাজ
ইদানীংকালে বটতলা দিয়ে জ্ঞানচর্চার দখিনা বাতাস বইতে শুরু করলেও সেযুগের সাধারণ মানুষের বিস্মৃত ছবি ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভবপর হবে তা সময়ই বলবে। প্রযুক্তি হিসেবে ‘মুভেবল টাইপ’, ‘লেটারপ্রেস’ নিজের পসার হারিয়েছে কিছু দশক আগেই। তবে বিস্মৃত হয়নি পুরোপুরি। ২০২৬-এ সেই দুই শতাব্দী পুরোনো পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে একটা গোটা ‘ফাইন প্রেস’ বই। যার ভিত্তি সেই সময়কার সাধারণ মানুষের সাহিত্য। কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’র মতো তার গদ্যের আদল। ইলাস্ট্রেশনে ঠাঁই পাওয়া যাবতীয় ছবি ছাপা হয়েছে সে সময়ের পদ্ধতি অবলম্বন করেই। বইটির নাম ‘জলগোধিকা’ অর্থাৎ তরলপ্রিয় কুমিরসদৃশ উচ্ছিষ্টভূক সরীসৃপ।

‘জলগোধিকা’ : নিবেদনে DAG
DAG-র ‘পয়েন্টস অফ ডিপার্চার’ (‘Points of Departure’) কমিশন প্রোগ্রামের প্রথম প্রকল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে সীমিত সংস্করণের আর্টিস্টস’ বুক ‘জলগোধিকা’। শিল্পী, প্রিন্টমেকার এবং গ্রন্থনির্মাণ গবেষক অরণ্য সেনগুপ্তের পরিকল্পনায় নির্মিত এই মৌলিক গ্রন্থটি রচনা করেছেন সৌম্যদীপ রায়। গ্রন্থের মুখপাঠ লিখেছেন অধ্যাপক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল পরিকল্পনার পাশাপাশি গ্রন্থনির্মাণ ও অলংকরণের দায়িত্ব সামলেছেন অরণ্য। সম্পাদনা করেছেন স্বর্ণালী দত্ত। অলংকরণের ব্লক খোদাই করেছেন ময়ূখ রায়। সম্পাদনায় উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেছেন বিজলীরাজ পাত্র। প্রুফ সংশোধন করেছেন রূপায়ণ ঘোষ। বইটি মুদ্রিত হয়েছে হাজরার জয়কালী প্রেসে। গ্রন্থ নির্মাতা জানাচ্ছেন, “উক্ত প্রেসটি ভিন্ন কলকাতার অন্য কোনও প্রেসে এখন আর মুভেবল টাইপ ব্যবহার করে লেটারপ্রেস পদ্ধতিতে বই ছাপানোর অবকাশ নেই। জয়কালী প্রেসের কম্পোজিটর মানিকবাবু একটি বিলুপ্তপ্রায় জীবিকার শেষ প্রজন্মের প্রতিনিধি।” বইটির গ্রন্থনা করেছে দত্ত বাইন্ডার্স।
প্রযুক্তি হিসেবে ‘মুভেবল টাইপ’, ‘লেটারপ্রেস’ নিজের পসার হারিয়েছে কিছু দশক আগেই। দুই শতাব্দী পুরোনো পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে একটা গোটা ‘ফাইন প্রেস’ বই। যার ভিত্তি সেই সময়কার সাধারণ মানুষের সাহিত্য। কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’র মতো তার গদ্যের আদল।

‘জলগোধিকা’ ঘিরে মানুষের আগ্রহ
‘জলগোধিকা’ গ্রন্থটি সর্বসাধারণের জন্য প্রদর্শিত হয়েছে ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। উনিশ শতকের আবহের জন্য প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে উদ্যোক্তারা বেছে নিয়েছিলেন উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটে অবস্থিত রামদুলাল নিবাস (ছাতু বাবু লাটু বাবু ঠাকুরবাড়ি)। ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটে নাগাদ শুরু হয় “বই, চিত্র ও বৈচিত্র্য”। প্রথমদিনটি বরাদ্দ ছিল মূল বইটির প্রদর্শনীর জন্যই। সঙ্গে অরণ্য সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ছিল আঠারো থেকে শুরু করে বিশ শতকে মুদ্রিত বিভিন্ন বই। আরও ছিল পুরোনো মুদ্রণ প্রযুক্তির খুঁটিনাটি সরঞ্জাম, ‘জলগোধিকা’র অলংকরণে ব্যবহৃত কাঠ ও ধাতব ব্লক। দর্শকদের সঙ্গে এক এক করে সেই সব কিছুর পরিচয় করালেন অরণ্য। প্রদর্শনীর মাঝামাঝি একটি টেবিলে রাখা ছিল দুটি কাঠ খোদাই ব্লক, কালি এবং কাগজ। সঙ্গে ছিল আরও কিছু উপকরণ। অধিকাংশ ভিড় ছিল সেই টেবিলটিকে কেন্দ্র করেই। প্রদর্শনীর স্যুভেনির হিসেবে প্রিন্ট নিতে পারেন দর্শকরা। DAG-র পক্ষ থেকে চৈতী নাথ সেই প্রক্রিয়ার একটি ডেমোন্সট্রেশন করলেন। তারপর, ডি.আই.ওয়াই পদ্ধতিতে নিজের প্রিন্ট নিজেই বানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রদর্শনীতে হাজির প্রত্যেকটি মানুষের শিশুসুলভ আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।


‘জলগোধিকা’ বই ঘিরে আলাপ-আলোচনা-অনুষ্ঠান
২৬ সেপ্টেম্বর ছিল প্রদর্শনীর দ্বিতীয় চরণ “কেতাব-ই-আলাপ”। এদিন প্রোজেক্টরে উনিশ শতকের নানাবিধ বইয়ের অলংকরণ, ছবি সহযোগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখেছিলেন অভিজিৎ গুপ্ত, তপতী গুহ-ঠাকুরতা এবং সুশান্ত চৌধুরী। দেড় ঘণ্টার আলোচনায় দর্শকরা পেয়েছেন দুই শতাব্দী প্রাচীন মুদ্রণ প্রযুক্তি ও অলংকরণের ক্রমবিকাশ, ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে পুরোনো মুদ্রণ শিল্পের নান্দনিকতা আজও কীভাবে প্রাসঙ্গিক সেই সম্পর্কিত বহু অজানা তথ্য। ২৭ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ প্রদর্শনীর শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় “শ্রুতি নকশা: জলগোধিকা”। অমিত কুমার দে-র সুরে এবং আয়ন্তন দাস, উৎস বিশ্বাস, চৈতী নাথ ও ভোলানাথ শিকদারের পরিবেশনায় এক গীতি-আখ্যানের সন্ধ্যা। যা ‘জলগোধিকা’-র কাহিনিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
DAG-র সিইও আশিস আনন্দ বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “‘পয়েন্টস অফ ডিপারচার’ (‘Points of Departure’) আমাদের আধুনিক ও প্রাগাধুনিক শিল্প-সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গবেষণা, প্রদর্শনী, প্রকাশনা, সর্বজনীন কর্মসূচি এবং শিক্ষামূলক উদ্যোগের প্রতি আমাদের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারকেই প্রতিফলিত করে। এই সংস্করণটি একটি ‘আর্টিস্টস বুক’ বা শিল্পীর বইয়ের আঙ্গিকে তৈরি হয়েছে; পাশাপাশি শ্রুতি নকশা পরিবেশনা, মূল প্রিন্টের সংগ্রহ প্রদর্শন, প্রিন্ট সংগ্রহের কিওস্ক এবং দুষ্প্রাপ্য ও প্রাচীন বইয়ের প্রদর্শনীর মাধ্যমে এর পরিসরকে আরও সর্বজনীন ও উন্মুক্ত করে তোলা হয়েছে। আমাদের সংগ্রহশালা বা আর্কাইভকে ঘিরে এমন গভীর ও সৃজনশীল উদ্যোগের আয়োজন করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।”

শিল্পী, প্রিন্টমেকার এবং গ্রন্থনির্মাণ গবেষক অরণ্য সেনগুপ্ত
DAG-র ‘পয়েন্টস অফ ডিপার্চার’ কমিশন প্রোগ্রামের প্রথম প্রকল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে সীমিত সংস্করণের আর্টিস্টস’ বুক ‘জলগোধিকা’। শিল্পী, প্রিন্টমেকার এবং গ্রন্থনির্মাণ গবেষক অরণ্য সেনগুপ্তের পরিকল্পনায় নির্মিত এই মৌলিক গ্রন্থটি রচনা করেছেন সৌম্যদীপ রায়।
DAG-র পক্ষ থেকে চৈতী নাথ ‘জলগোধিকা’ সম্পর্কে বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “বইটির আদল উনিশ শতকের হলেও আদতে এই আখ্যান সমসাময়িক। বইটা পড়তে গিয়ে হয়তো মানুষ নিজের পরিস্থিতির সঙ্গে বা নিজের পারিপার্শ্বিক কোনও চরিত্রের সঙ্গে একটা তুলনা বা রেলেভেন্স খুঁজে পাবে।” অরণ্য সেনগুপ্ত জানালেন বইটি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে তিনি এবং তাঁর টিম গিয়েছেন। তাঁর এই প্রকল্পটির পিছনে থাকা ভাবনার কথাও তিনি জানালেন, “লেটারপ্রেস এবং মুভেবল টাইপের ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। পশ্চিমবঙ্গের শেষ টাইপ ফাউন্ড্রি বন্ধ হয়েছে ২০১৯ সালে। এই অবস্থায় ইতিহাসকে কেবল অতীত বলে দূরে ঠেলে না রেখে আজকের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই সেই ইতিহাসকে নতুনভাবে অনুধাবন করতে চেয়েছি।”

কালীর বিবর্তন (উপরে), উনিশ শতকের উডকাট প্রিন্ট (নিচে) [DAG-র সংগ্রহ]
ডিজিটালের যুগে হারিয়ে যাওয়া মুদ্রণশিল্প আর উনিশ শতকের আবহকে এক সুতোয় বেঁধে ‘জলগোধিকা’ প্রমাণ করল, ইতিহাস শুধুই অতীতের পাতা নয়, বর্তমানের সৃজনশীলতার আলোয় তা হয়ে উঠতে পারে জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক। বিলুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার এমন উদ্যোগ বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
___________
ছবি: লেখক ও DAG
