বদলে যাওয়া শহরের শহরনামা : কুশল রায়ের একক প্রদর্শনী

হজ পাঠ মনে পড়ে? একদিন রাতে কবি স্বপ্ন দেখলেন, দেখলেন “চেয়ে দেখো, চেয়ে দেখো” বলছে বিনু। কবি চেয়ে দেখলেন ঢুকাঢুকি লেগে গেছে বরগা – কড়িতে, কারণ রবীন্দ্রনাথ স্বপ্নে দেখছেন “কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে”।

ধুর! এ তো স্বপ্ন। কলকাতা কি নড়তে পারে নাকি? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও স্বপ্নভঙ্গের পরে বলেছেন, “দেখি কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই”। কলকাতা শহরটা নড়তে পারে না বটে… কিংবা হয়তো পারে, হয়তো নড়তে পারে বলেই এই শহরের চারপাশটা দিনে দিনে কেমন বদলে চলেছে। দ্রুত গতিতে বদলে যাচ্ছে শহরটার অলিগলি, বিকেলের মাঠগুলো, মোড়ের আড্ডাগুলো। বদলে যাচ্ছে ট্রামের ডাক, ময়দানের মুখ, সিনেমাহলের পোস্টার।

আসলে ওদেরই বা কী দোষ! বদল যে চিরন্তন। বদলাতে হয় সকলকেই। বদলাই আমরা, বদলায় চারিপাশ। বদলায় আস্ত একটা শহর। সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে গল্পগুলো। হয়ে যায় কতগুলো স্মৃতি। আর স্মৃতির স্মরণী বেয়ে আমাদের মতো কিছু উজবুক হয়তো খুঁজে মরি সেই হারিয়ে যাওয়া আখ্যানগুলোকে।


যেমনটা খুঁজতে গিয়েছিলাম ইমামি আর্ট গ্যালারিতে (Emami Art Gallery) কিছুদিন আগে, কারণ সেখানে চলছে আলোকচিত্রী কুশল রায়ের একক প্রদর্শনী “শহরনামা”, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সালের এই মহানগরের বুকে তাঁর খুঁজে নেওয়া কিছু স্থিরচিত্রের মুহূর্ত। ইমামি আর্ট গ্যালারির তিন নম্বর গ্যালারিতে ঢুকলে মনে হবে সময় যেন হঠাৎ করে থমকে গেছে। একটা পুরোনো কলকাতা যেন জমাট বাঁধা মেঘের মতো মনের আকাশে ধরা দিচ্ছে। আসলে আলোকচিত্রের এই সম্মোহনী শক্তিই তাকে যুগে যুগে ম্যাজিক্যাল করে তোলে।


সেই সম্মোহনী শক্তির টানেই বোধহয় একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের সফল চাকুরিজীবন থেকে সন্ন্যাস নিয়ে পথে নামা। যে সরণি বেয়ে আজ আমরা খুঁজে পাচ্ছি সেই হারিয়ে যাওয়া কলকাতাকে। এটা সেই কলকাতা যেখানে কে জেন-জি আর কে মিলেনিয়াল তাই নিয়ে তর্ক ছিল না, বরং তর্কটা হয়তো ছিল সত্যজিৎ নাকি ঋত্বিক, নাকি দুজনেই! সব মিলিয়ে এই চিরন্তন অনুসন্ধিৎসা ধরা পড়ে গ্যালারির একটি ছবিতে যেখানে একদল মানুষ উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে একটি খবরের কাগজের পাতায়, কারণ সেখানে মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে কালজয়ী পরিচালকের। সালটা ১৯৯২।

সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ, তার সম্পৃক্ততা নিয়েও মনে ছিল প্রশ্ন, সে কারণেই হয়তো সেই জগৎ থেকে সরে এসে এই স্বতন্ত্র জীবনের পথ বাছা। উদ্দেশ্য একটাই – এই শহরটাকে দেখা, এই দেশটাকে দেখা, মানুষগুলোকে দেখা। বিভিন্ন ধরনের মানুষ।

সেই ইতিহাসকে চাক্ষুষ করার অনুভূতি খুঁজে পাওয়া গেল এই প্রদর্শনীতে। আলোকচিত্রের এই টাইমলেস বিউটি তাকে কোথাও গিয়ে আলাদা করে বটে! সেই অনুভূতি আসলেই চিরকালীন। তাই মায়াবী ক্যামেরাটুকু হাতে নিয়ে কুশল রায়ের কলকাতার পথে নামা। ১৯৬০ সালে এই মহানগরের বুকেই জন্ম আলোকচিত্রী কুশল রায়ের। দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি ছিলেন টেলিগ্রাফ পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক। পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে তার সঙ্গে পথচলা। লিখেছেন অসংখ্য রিপোর্ট। রেখেছেন নানান প্রশ্ন। কিন্তু বারবার নিজের মনেও প্রশ্ন জেগেছে তাঁর, যা লিখছেন তা কি সাহিত্যের মতো টাইমলেস হয়ে উঠতে পারবে? প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক। কুশলের বাবা প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক অসীম রায়। যিনি “গোপালদেব”, “রক্তের হাওয়া”-র মতো উপন্যাস কিংবা “ধোঁয়া ধুলো নক্ষত্র”-র মতো অপূর্ব সব ছোটোগল্প রেখে গেছেন, যে সৃষ্টির মধ্যেও আমরা খুঁজে পাই সেই কলকাতাকে, তার হারিয়ে যাওয়া গল্পকে।


সেই হারিয়ে যাওয়া গল্পকে কি দৈনিক কাগজের রিপোর্ট একটি উপন্যাস কিংবা একটি পেইন্টিং কিংবা একটা গানের মতো জনমানসের স্মৃতিতে চিরকালীন করতে পারে? বোধহয় না। তাই আলোকচিত্রী হেঁটেছিলেন তাঁর বাবার চলা পথেক, কিন্তু বেছেছিলেন স্বতন্ত্র মাধ্যম। তাঁর ছবি, তাঁর আলোকচিত্র। এছাড়াও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ, তার সম্পৃক্ততা নিয়েও মনে ছিল প্রশ্ন, সে কারণেই হয়তো সেই জগৎ থেকে সরে এসে এই স্বতন্ত্র জীবনের পথ বাছা। উদ্দেশ্য একটাই – এই শহরটাকে দেখা, এই দেশটাকে দেখা, মানুষগুলোকে দেখা। বিভিন্ন ধরনের মানুষ।

কুশল রায়ের এই স্বতন্ত্রতাই হয়তো তাঁকে বাকি আলোকচিত্রী-দের থেকে অনেকটা আলাদাও করে দেয়। ১৯৯৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত তিনি কলকাতা শহরের একটি পরিবারের ছবি তোলেন। দীর্ঘ ১৪ বছর। সেই পরিবারের জীবনগাঁথা যেন একটা মধ্যবিত্ত জীবনের দলিল হয়ে ওঠে, তৈরি হয় একটি আলোকচিত্রের বই – “Intimacy”। একইভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে করেছেন লাদাখের ওপরে একটি কাজ। কলকাতা শহর দু-চোখ ভরে দেখেছে সে সমস্ত কাজ। শুধু কলকাতা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সেসব কাজ প্রশংসিত হয়েছে।


এই শহর শুধু আলোকচিত্রী কুশল রায়ের নিজের শহর না, তাঁর মায়েরও শহর। তাঁর মায়ের জন্ম খোদ উত্তর কলকাতায়। তিনি নিজে যদিও উত্তর কিংবা দক্ষিণ কলকাতা এই বিভাজনে বিশ্বাস রাখেন না। শুধুই তাঁর শহর কলকাতা হিসেবে ধরা দিয়েছে বারবার। সাংবাদিক জীবনে থাকাকালীনই হাতে আসে প্রথম ক্যামেরা, একটি জেনিথ ক্যামেরা। ১৯৮৩ সাল। বছর দুয়েক পরে কেনেন একটি নিকনের ক্যামেরা। সে সময় থেকেই তিনি কাগজে লেখালেখির পাশাপাশি ভিন্নধর্মী ছবির অনুসন্ধান করে চলেছেন। তাই কাগজেও যখন বিশেষ কোনো ভিন্নধর্মী ছবির প্রয়োজন আসতো, ডাক পেতেন কুশল রায়। করেছেন নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে কাজ। তুলেছেন পণ্ডিত বিরজু মহারাজ, প্রতিমা বেদীদের ছবি।

কুশল রায় যে কলকাতার পথে ছবি তুলেছেন সে কলকাতায় ফেসবুক কিংবা ইন্সটাগ্রাম আসেনি। কলকাতা পথের কোণে কোণে এত ক্যামেরা দেখতেও অভ্যস্ত ছিল না। সেই অবাক করা দৃষ্টি (Gaze) তাই ছবিতে উঠে এসেছে বারবার এই এই শহরনামায়, যে দৃষ্টি হয়তো আজকের দৃষ্টির থেকে আলাদা।

আলোকচিত্রী জানিয়েছেন তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, আলোকচিত্রী জীবনেও সাহায্য করেছে। তিনি নিজেও সাহিত্যের অনুরাগী। করেছেন পেইন্টিংয়ের চর্চা, করেছেন বললে ভুল বলা হয় – এখনও করেন। ইম্প্রেশনিস্ট পেইন্টিংয়ের অনুরাগী তিনি। আর সেই সব অনুপ্রেরণা স্বকীয়ভাবে উঠে আসে তাঁর আলোকচিত্রের কাজে।

কলকাতা শহরকে অনেক নামে ডাকা যায়। তা কখনও সিটি অফ জয়, আবার কখনও তা মিছিল নগরী, কেউ তাকে বলে মহানগর, আবার কেউ বলে মায়ানগর। সেই মায়ার ছায়াকেই তিনি লেন্সে বন্দি করে আমাদের সামনে রেখেছেন “শহরনামা”-তে। এই সময়ে তিনি প্রায় হাজারের বেশি ছবি তুলেছেন। কথায় কথায়, জানা যায় এমন অনেক ছবি আছে যা এখনও তিনি দেখে উঠতে পারেননি সেভাবে। সেই ছবির ডালি থেকেই নির্বাচিত কিছু ছবি নিয়ে এই প্রদর্শনী আয়োজন করেছে ইমামি আর্ট।


এই প্রদর্শনী আসলেই সেই সময়ের গল্প যখন কলকাতা একটু করে বদলাতে শুরু করেছে। কলকাতা বারেবারে বদলেছে। আজও বদলাচ্ছে। এই শহর রোজ একটু করে বুড়ো হয়, আবার রোজ একটু করে তরুণও হয়। তেমনই এক বদল এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে, এই ‘শহরনামা’তে। খুঁজে পাওয়া যাবে একটি ছবি যেখানে পার্কে বসা একদল তরুণ বৃদ্ধ তাকিয়ে রয়েছে ‘আড্ডার মুডে’, সেখানে নেই কোনো বেড়াজাল, আছে শুধুই বন্ধুত্বের উষ্ণতা – বৃষ্টির ফোঁটাও যে উষ্ণতাকে সেদিন ম্লান করতে পারেনি।

আবার খুঁজে পাওয়া যাবে পথচলতি এক মহিলাকে যিনি একাকী স্বাক্ষ্যবহন করছেন সেই হারানো শহরকে যা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করে মশকরা করে দেওয়াল ভরিয়ে তুলেছে। খুঁজে পাওয়া যাবে নতুনের দূত হিসেবে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলকে, যাদের দিকে তাকিয়ে আছে এক প্রবীন। হয়তো নতুন যুগের দিকে অনুসন্ধিৎসু মনে চেয়ে এক হারাতে বসা সময়। যে সময়ের দলিল এই “শহরনামা”।

আজকের সমাজমাধ্যমের যুগে এই শহরটা বদলে ভিন্ন এক চেহারা নিয়েছে। হারিয়েছে অনেকখানি আকাশ। বেড়েছে হাইরাইজ। বদলেছে চরিত্রগুলো, বদলেছে গল্পগুলো। কুশল রায় যে কলকাতার পথে ছবি তুলেছেন সে কলকাতায় ফেসবুক কিংবা ইন্সটাগ্রাম আসেনি। কলকাতা পথের কোণে কোণে এত ক্যামেরা দেখতেও অভ্যস্ত ছিল না। সেই অবাক করা দৃষ্টি (Gaze) তাই ছবিতে উঠে এসেছে বারবার এই এই শহরনামায়, যে দৃষ্টি হয়তো আজকের দৃষ্টির থেকে আলাদা।

আলোকচিত্রের মধ্যে এক দ্ব্যর্থতা সবসময় বোধহয় থেকে যায়। এই দ্ব্যর্থতাই তাঁকে বাকি সকলের থেকে আলাদা করে। আবার, চিরাচরিত প্রামাণ্যশক্তির বাইরেও এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। তাই হয়তো একটি সাক্ষাৎকারে আলোকচিত্রী বলেছেন, “If a photograph could truly be explained in word, there would be no need for the image” এই কথায় তিনি বিশ্বাস করেন। তাঁর এই বিশ্বাসকে হাতিয়ার করেই এই প্রদর্শন কক্ষে অনায়াসে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসা যায়, একটা গোটা শহরের বদলে যাওয়ার আখ্যান খুঁজতে। শুধু আক্ষেপ একটাই – আরও কিছুটা ছবি হয়তো পেতে পারতাম আমরা, আরও কিছুটা… কিছুটা অপ্রাপ্তির রেশ নিয়েই বের হতে হয়, খানিক সোনার তরীতে যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হয়েও হইল না শেষ। অপেক্ষায় থাকলাম পরবর্তী কোনো শহরনামার।
____________
১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলকাতার ইমামি আর্ট গ্যালারিতে চলবে শহরনামা (১৯৯০ – ১৯৯৩)। অ্যানালগ ক্যামেরায় তোলা এই ছবিগুলিকে সুনিপুণ হাতে স্ক্যান করেছেন পার্থ সেনগুপ্ত ও শংকর সরকার। গ্যালারির সময় সকাল ১১টা থেকে সন্ধে ৭টা।

Written by
Developed by DXDasia