‘নাটক’ করলেই নাটক হয় না; নাট্যচিন্তার নিগূঢ় পাঠ এই দুই গ্রন্থে

জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেশট একবার বলেছিলেন, “Art is not a mirror held up to reality, but a hammer with which to shape it.” অর্থাৎ, শিল্পকে কেবল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিতে সীমাবদ্ধ নয়, সমাজ পরিবর্তনে এর ভূমিকা অনেক প্রশস্ত। বাংলা নাটকের ইতিহাসে এই বিশ্বাসকে যাঁরা সবচেয়ে গভীরভাবে ধারণ করেছেন, তাঁদের অন্যতম বাদল সরকার। আর সেই শিল্পভাবনাকে মঞ্চে রূপ দেওয়ার ভাষা খুঁজেছেন বহু অভিনেতা, নির্দেশক ও নাট্যচিন্তক। ফলে নাটককে সত্যিকারের অর্থে বুঝতে হলে শুধু নাটক দেখাই যথেষ্ট নয়; নাটক নিয়ে ভাবনাচিন্তার ভেতরেও প্রবেশ করতে হয়। সেই পথেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নাট্যবিষয়ক গ্রন্থ।

একজন অভিনেতা, নির্দেশক কিংবা নাট্যপ্রেমীর কাছে এই ধরনের বই তথ্যের উৎস তো বটেই, সঙ্গে নাটককে গভীরভাবে উপলব্ধি করার সহযাত্রী। মঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার পরেও যে চিন্তা, প্রশ্ন এবং শিল্পবোধ বেঁচে থাকে, তারই ধারক হয়ে ওঠে এই ধরনের গ্রন্থ।

এবং অধ্যায় প্রকাশনা-র দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ – দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ফিরে দেখা বাদল সরকার’ এবং সৌমিত্র বসুর ‘অভিনয়শৈলী নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ’ – নাটককে শুধু মঞ্চের শিল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি, পাশাপাশি সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের চেতনার সঙ্গে সংলাপের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতে শেখায়। প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার সীমানা অতিক্রম করে এই দুই গ্রন্থ থিয়েটারের নন্দনতত্ত্ব, শিল্পদর্শন এবং সমাজ-পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে গভীর বৌদ্ধিক আলোচনার মাধ্যমে উন্মোচিত করেছে।
________________

দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ফিরে দেখা বাদল সরকার’ কোনও প্রচলিত জীবনীগ্রন্থ নয়; এটি বাদল সরকারের নাট্যভাবনা, শিল্পদর্শন এবং সময়কে নতুন করে ফিরে দেখার এক মননশীল প্রয়াস। প্রথমে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এই লেখাগুলি পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ায় বইটির পাঠভঙ্গিতেও একটি স্বাভাবিক সংলাপধর্মী প্রবাহ লক্ষ করা যায়। বইটির অন্যতম শক্তি হল, বাদল সরকারকে নিছক কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে না রেখে তাঁর শিল্পভাবনার ভিতকে বিশ্লেষণ করা। তাঁর থার্ড থিয়েটারের ধারণা, প্রথাগত প্রসেনিয়াম মঞ্চের বাইরে নাটককে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা এবং সমাজমনস্ক শিল্পচিন্তা, সবই এই বইয়ের আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।

দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ফিরে দেখা বাদল সরকার’ কোনও প্রচলিত জীবনীগ্রন্থ নয়; এটি বাদল সরকারের নাট্যভাবনা, শিল্পদর্শন এবং সময়কে নতুন করে ফিরে দেখার এক মননশীল প্রয়াস।

বইটির অন্যতম শক্তি হল বাদল সরকারকে কোনও পৌরাণিক উচ্চতায় বসিয়ে না দেখে, তাঁর শিল্পবোধের ভিতটিকে বোঝার চেষ্টা। লেখক দেখিয়েছেন, দর্শকের করতালি বা তথাকথিত জনপ্রিয়তার চেয়ে একটি নাটকের অন্তর্নিহিত সত্য ও প্রয়োজনীয়তাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। কোন বিষয় নিয়ে লেখা জরুরি, কোন নাটক সময়কে প্রশ্ন করতে পারে, আর কোনটি ক্ষণস্থায়ী বিনোদনে সীমাবদ্ধ, এই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর আপসহীন মনোভাবই তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে।

এই বই পড়তে পড়তে আরও স্পষ্ট হয় যে, বাদল সরকারের নাট্যভাবনা কোনও নির্দিষ্ট মঞ্চপ্রযুক্তি বা অভিনয়রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কাছে থিয়েটারের সূচনা হয়েছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে, ‘আমি কী বলতে চাই?’ এরপর আসে ‘কাকে বলতে চাই?’ এবং ‘কীভাবে বলতে চাই?’। অর্থাৎ থিয়েটারের উৎস মানুষের মন; শরীর সেখানে কেবল প্রকাশের মাধ্যম। ফলে থার্ড থিয়েটারকে কেবল শরীরচর্চা বা বিকল্প মঞ্চরীতির অনুশীলন হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত দর্শন অধরাই থেকে যায়। এই বই সেই ভুল ধারণাকে ভেঙে দেয়।

লেখক আরও দেখিয়েছেন, বাদল সরকারের কাছে অভিনয় কখনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নায়কোচিত প্রদর্শন ছিল না, তাঁর চোখে নাটক একটি দলগত সৃজনপ্রক্রিয়া। একজন অভিনেতা এখানে একক চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করলেও, তাঁর মাধ্যমে বৃহত্তর এক সামাজিক অভিজ্ঞতা ও মানুষের সম্মিলিত সত্তাই প্রকাশিত হয়। তাই অভিনেতার শরীর, কণ্ঠ কিংবা উপস্থিতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার মানসিক অংশগ্রহণ।

বইটির সবচেয়ে ভাবনা উন্মোচক দিক সম্ভবত এই প্রশ্নটি, যে অনুভূতি থেকে একটি নাটক জন্ম নেয়, সেই অনুভূতি যদি নির্দেশক ও অভিনেতাদের মধ্যে সমানভাবে সঞ্চারিত না হয়, তবে কি সেই নাটক সত্যিই সফল? বাদল সরকারের এই প্রশ্ন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি অভিনয়ের কৌশল নয়, শিল্পের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বাদল সরকারের বিদেশে কর্মসূত্রে কাটানো সময়, ভিন্ন সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা এবং দেশে ফিরে নাট্যচর্চাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সংগ্রাম, এই প্রসঙ্গগুলিও বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। বইটি শেষ হওয়ার পরেও পাঠকের মনে নাটকের সামাজিক ভূমিকা এবং শিল্পের দায়বদ্ধতা নিয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন থেকে যায়।
_______________

অন্যদিকে সৌমিত্র বসুর ‘অভিনয়শৈলী নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ’ প্রচলিত অর্থে কেবল অভিনয়-বিষয়ক একটি গ্রন্থ নয়, এটি মূলত ‘কুমার রায় স্মারক বক্তৃতা ২০২৫’-এর গ্রন্থরূপ। এই প্রেক্ষাপটটি বইটির পাঠকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। কারণ শুরু থেকেই লেখক স্পষ্ট করে দেন, তিনি কোনও চূড়ান্ত অভিনয়তত্ত্ব নির্মাণ করতে আসেননি, বরং দীর্ঘ নাট্যজীবনের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষকের কাছ থেকে অর্জিত শিল্পবোধের আলোয় অভিনয় সম্পর্কে কিছু ভাবনা ভাগ করে নিতে চেয়েছেন। বইটির শিরোনামে থাকা ‘যৎকিঞ্চিৎ’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি লেখকের বিনয়ের প্রকাশের পাশাপাশি অভিনয়ের মতো বহুমাত্রিক শিল্পকে একটি মাত্র বক্তৃতা বা একটি বইয়ের পরিসরে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করা সম্ভব নয়, এই আত্মসচেতন স্বীকৃতিও বটে।

লেখক অভিনয়শিল্পকে কেবল সহজাত প্রতিভার গণ্ডিতে বেঁধে রাখেননি; নিয়মিত অনুশীলন, আত্মসচেতনতা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত এক শিল্পরূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কণ্ঠপ্রক্ষেপণ, শরীরী ভাষা, চরিত্র নির্মাণ, অভিব্যক্তি এবং মঞ্চে উপস্থিতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি তিনি সহজ, প্রাঞ্জল এবং ব্যবহারিক ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তবে বইটির শুধু অভিনয়ের কৌশল শেখানোর অনেক ঊর্ধ্বে। বাংলা অভিনয়ভাষার বিবর্তনকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখানোর ক্ষেত্রেও এই বইয়ের বিশেষত্ব অনেক।

লেখক স্মরণ করিয়ে দেন এমন এক সময়ের কথা, যখন মাইক্রোফোন বা আধুনিক আলোক-প্রযুক্তির সুবিধা ছিল না। ফলে উচ্চারণের স্বচ্ছতা, কণ্ঠের শক্তি এবং শরীরের স্পষ্ট প্রকাশই ছিল অভিনয়ের প্রধান ভরসা। সেই সময়ের অভিনয়শৈলী এবং বর্তমান সময়ের অভিনয়ভঙ্গির পার্থক্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি দেখান, প্রযুক্তি বদলালেও অভিনয়ের মূল ভিত্তি, পর্যবেক্ষণ, সংবেদনশীলতা এবং নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তি, অপরিবর্তিত থেকে যায়। এই আলোচনা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অভিনয়ের ভাষাও কীভাবে বদলেছে, তার একটি প্রাসঙ্গিক মূল্যায়ন।

বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বিশ্বনাট্যের দুই প্রভাবশালী ধারা, স্তানিস্লাভস্কির অনুভবনির্ভর অভিনয়পদ্ধতি এবং ব্রেশটের চিন্তানির্ভর নাট্যদর্শনের তুলনাও উঠে এসেছে। দর্শককে চরিত্রের আবেগে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করা হবে, নাকি এমন একটি দূরত্ব বজায় রাখা হবে যাতে সে সমালোচনামূলকভাবে ভাবতে পারে, এই প্রশ্নকে লেখক সরল অথচ গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

বাংলা নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বহুরূপীর অভিনয়-অনুশীলন, শম্ভু মিত্র, যোগেশ চৌধুরী, উৎপল দত্ত, বিজন ভট্টাচার্য এবং অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়-স্বাতন্ত্র্যের প্রসঙ্গও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে এসেছে। লেখক তাঁদের পৃথক অভিনয়দর্শনের বিশেষত্বকে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এই গ্রন্থে। এর ফলে পাঠক উপলব্ধি করতে পারেন যে কোনও একক অভিনয়পদ্ধতিই চূড়ান্ত নয়। সময়, সমাজ, মঞ্চপ্রযুক্তি এবং শিল্পভাবনার সঙ্গে অভিনয়ের ভাষাও ক্রমাগত পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে।

সৌমিত্র বসু অভিনয়শিল্পকে কেবল সহজাত প্রতিভার গণ্ডিতে বেঁধে রাখেননি; নিয়মিত অনুশীলন, আত্মসচেতনতা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত এক শিল্পরূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কণ্ঠপ্রক্ষেপণ, শরীরী ভাষা, চরিত্র নির্মাণ, অভিব্যক্তি এবং মঞ্চে উপস্থিতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি তিনি সহজ, প্রাঞ্জল এবং ব্যবহারিক ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।

বইটির মূল শক্তি এই যে, এখানে অভিনয়ের কোনও নির্দিষ্ট সূত্র মুখস্থ করায় না, বরং একজন অভিনেতাকে নিজের শিল্পচর্চা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। নতুন নাট্যশিক্ষার্থী যেমন এখান থেকে প্রাথমিক দিকনির্দেশনা পাবেন, তেমনই দীর্ঘদিনের অভিনেতা বা নির্দেশকও নিজের অভ্যাস, অভিনয়বোধ এবং মঞ্চ-দর্শনকে পুনর্বিবেচনা করার প্রেরণা খুঁজে পাবেন।

দুটি বই পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয় যে, বাংলা নাট্যচর্চার পরিসর কেবল নাটক রচনা বা মঞ্চায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর ভিত গড়ে ওঠে গভীর শিল্পদর্শন এবং নিরলস অভিনয়-অনুশীলনের সমন্বয়ে। ‘ফিরে দেখা বাদল সরকার’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় কেন নাটক সমাজের জন্য জরুরি, আর ‘অভিনয়শৈলী নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ’ শেখায় সেই ভাবনাকে মঞ্চে সার্থকভাবে রূপ দেওয়ার শিল্প। বাংলা নাট্যসাহিত্যে আগ্রহী পাঠক, গবেষক, নাট্যকর্মী কিংবা অভিনয়শিল্প, সকলের সংগ্রহেই এই দুটি গ্রন্থ নিঃসন্দেহে মূল্যবান সংযোজন।

_____________
প্রাপ্তিস্থান:
মুদ্রিত মূল্য: ফিরে দেখা বাদল সরকার/ ১৩০ টাকা এবং অভিনয় শৈলী নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ/ ১৩০ টাকা

Written by
Developed by DXDasia