ফাল্গুনীর রবীন্দ্রনাথ – অবনীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথ
যে রবীন্দ্রনাথকে চিরকাল আমি ছুঁতে চেয়েছি, সে সংবেদনশীল, সহিষ্ণু ও সুপারফ্লুইড। অবনীন্দ্রনাথ সেই রবীন্দ্রনাথের শরীরী স্পর্শ তো পেয়েছেনই, একইসঙ্গে ওঁর মনের অনেকটা ঘুরে দেখতে পেরেছেন। অখণ্ড, অধরা ও অদেখা রবীন্দ্রনাথকে খুঁজবে মানুষ চিরকাল। পাবে না। অবনীন্দ্রনাথ কি পেয়েছিলেন? এর উত্তর হবে অনেকটা।
‘ফাল্গুনী’ নাটকটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথ লেখেন, কারণ তারুণ্যের চেতনার উন্মেষ ঘটানো ছাড়া আর কোনো আশা দেখতে পাননি। জোড়াসাঁকোতে নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ এতে কয়েকটি দৃশ্য যোগ করেন, যার ফলে গগনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ এবং সমরেন্দ্রনাথ এতে অংশ নিতে পেরেছিলেন। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওঁর স্মৃতিকথায় স্মরণ করেছেন যে, ‘ধীরে বন্ধু ধীরে’ গান গাইতে গাইতে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলা অন্ধ বাউলের চরিত্রের রবীন্দ্রনাথকে দেখে দর্শকরা গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। সম্ভবত এটি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও ভাবিয়েছিল, যা তাঁকে এই অভিনয়ের উপর ভিত্তি করে জলরঙের সিরিজটি আঁকতে অনুপ্রাণিত করে। এই ‘ফাল্গুনী’ নাটক সিরিজের জলরঙের ওয়াশের ছবিগুলোতে রবীন্দ্রনাথ একটি চরিত্রই হয়ে উঠছেন। আবার ওই একই রবীন্দ্রনাথ হয়েছেন আলাদা।
রবীন্দ্রনাথ সময়কে ছাপিয়ে যেমন শ্রেষ্ঠ পুরুষ, শ্রেষ্ঠ নারীও। অবনীন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথ দুজনই অ্যান্ড্রোজিনাস বলে আমি মনে করি। নইলে রবীন্দ্রনাথ ওঁর সৃষ্ট পুরুষ চরিত্রগুলোকে বুঝতেন না। আর অবনীন্দ্রনাথও রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে বুঝতেন না। আর এই ছবিগুলো ফাল্গুনীর প্লট ছাড়িয়ে আজকের আলোচনার বিষয় হতো না।

ত্রিশের কোঠায় রবীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথের আঁকা প্যাস্টেল ছবি। বসু বিজ্ঞান মন্দির সংগ্রহ।
প্রথম ছবিতে কবিশেখরের চরিত্র দেখলে বোঝা যায়, বয়স রবীন্দ্রনাথকে কখনও ছুঁতে পারেনি। মন তো তরুণের, শরীরও যুবকের। নরম রঙের প্রলেপে এ রবীন্দ্রনাথ আমার স্বপ্নের। ১৯১৬-তে আঁকা এই ছবি। তখন ওঁর ৫৫। অবনীন্দ্রনাথ ওঁকে আঁকলেন একেবারে যুবকের বেশে। ফ্লেশ টোন তৈরিতে অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন জাদুকর, এ ছবিতেও সে প্রমাণ মেলে। পেলব যুবকের যেমন নরম ত্বক হতে পারে সেরমই। পোশাকের ট্রান্সলুসেনসির জন্য ওঁর ত্বক দেখা যাচ্ছে। ডান হাত নামিয়ে রেখে বই ধরা। বাঁ হাত খুবই আলতো ভাবে উঠেছে যেন আঙুলের ডগায় ঘাসফড়িং বসেছিল। সবে উড়ে গিয়েছে। এখনও তার পাখনার রেনু লেগে রয়েছে। বিষাদ ওঁর চোখে। আগেই বলেছি এ সংবেদনশীল রবীন্দ্রনাথের প্রতি আলাদা আকর্ষণ অনুভব করি।

'ফাল্গুনী' নাটকে কবিশেখরের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৬, রবীন্দ্রভারতী সোসাইটি সংগ্রহ।
দ্বিতীয় ছবিতে রবীন্দ্রনাথ পৃথু হাতে তুলে ধরে বাজাচ্ছেন একটি যন্ত্র, যার নাম বলা কঠিন। অবনীন্দ্রনাথ যেমন এঁকেছেন তাতে যন্ত্রটি তারের, কিন্তু মিশেল ঘটেছে ফর্মে। বাজানো হচ্ছে একতারার মতো করে, কিন্তু যন্ত্রের গঠন ডাম্বুরা বা ‘ডোমবরা’র মতো। এ ছবিতে পোর্ট্রেট-এর আলোই আধ্যাত্মিক রবীন্দ্রনাথকে ঐশ্বরিক করে। গেরুয়া রঙের জোব্বার ওজনদার কাপড় ধীর নাচের সঙ্গে অস্থির হয়েছে, কিন্তু হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে না। মৃদু গতি রয়েছে তাই নাচ বললাম। পায়ের অবস্থান দেখলেই তা বোঝা যায়। সর্বোপরি খুব সামান্য রং, তাতেই সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব ধরে ফেলেছেন অবনীন্দ্রনাথ। খুব কাছ থেকে না চিনলে, পর্যবেক্ষণ না করলে এ অসম্ভব।

'ফাল্গুনী' সিরিজের কাগজে জলরঙে আঁকা ছবিতে অন্ধ গায়কের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল, ১৯১৬।
তৃতীয় ছবিতে রবীন্দ্রনাথ ঐ একইরকম যন্ত্র পা ভাঁজ করে বসে বাজাচ্ছেন। কাপড়ের ভাঁজ জরুরি নয় এ ছবিতে তাই অস্পষ্ট ওয়াশে আঁকা। এ ছবিতে যন্ত্রটি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা করা যায়। যদি এ ডাম্বুরা হয় তবে এ রাশিয়া, মধ্য এশিয়া বা হয়তো কাজাখস্তানি। প্রদেশ বিভেদে কখনও দুই তারের, কখনও বেশি তার দেখা যায়। যন্ত্রের আওয়াজ রবাবের কাছাকাছি হলেও আরও হালকা ধরনের। ভারতীয় রাগদারি সংগীতে এর ব্যবহার না থাকলেও, বিভিন্ন লোকসংগীতে আছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া গিয়েছেন ১৯৩০ সালে। সেখান থেকে এ যন্ত্রের আগমন কিনা জানা যায় না। অবনীন্দ্রনাথ ছবিতে যে আসনে রবীন্দ্রনাথকে রেখেছেন, সে দেহভঙ্গি একেবারেই ঐ ডোমবরা বাজানোর কায়দায়। যদিও এ যন্ত্রের নিচের অংশ বাংলার সারিন্দা বা এসরাজের মত খাঁজ বিশিষ্ট। সারিন্দা আবার তিন- চার তারের হয়। তবে দণ্ড এতো লম্বা আর সরু হয় না। সে কালের বাংলায় সারিন্দা বাজিয়ে ঘুরতেন বহু ফকির। মিশে যাওয়া আশ্চর্য না। এমন হতে পারে এই যন্ত্রের ডিসাইন রবীন্দ্রনাথই অবনীন্দ্রনাথকে দিয়ে করিয়েছিলেন ফাল্গুনীর সেটের জন্য। কিংবা অবনীন্দ্রনাথই ডোমবরার সঙ্গে সারিন্দার মিশেল ঘটিয়েছেন কম্পোজিশনের দাবিতে। দুই-ই সম্ভব। তবে পরে এ যন্ত্রের ব্যবহার অবনীন্দ্রনাথ বা রবীন্দ্রনাথ আর করেননি।

'ফাল্গুনী'-তে রবীন্দ্রনাথ, ১৯১৩। কাগজে জলরং। কলা ভবন সংগ্রহ।
চতুর্থ ছবিটিও ফাল্গুনী সিরিজের, ১৯১৩ সালে আঁকা। রবীন্দ্রনাথ তখন মোটে ৫২। সে সময়ের রবীন্দ্রনাথের আলোকচিত্র যা পাওয়া যায়, তার সঙ্গে নাটকের এই ছবির বৈসাদৃশ্য আছে। বয়স আরও বেশি লাগছে। কাজেই ধরে নেওয়া যায় এ দৃশ্যে উপকেশ ও কৃত্রিম দাড়ি ব্যবহার হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ পরে আছেন বেশি লালচে গেরুয়া জোব্বা। খুব কাছাকাছি রং ভারতমাতায় ব্যবহার করেছেন। এছাড়া বহু ছবিতে এই রং দিয়েছেন অবনীন্দ্রনাথ। মেদহীন, দৃঢ়, উদ্দণ্ড তাঁর শরীর। ঐ একই যন্ত্র ধরে দাঁড়িয়ে আছেন নাচের ভঙ্গিতে। এবার এ যন্ত্র দাঁড়িয়ে বাজাচ্ছেন ফাল্গুনীর অন্ধ গায়কের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ। ওঁর হাতদুটো যন্ত্রের সঠিক জায়গায় আছে, আঙুল অস্থির। যেকোনো পশ্চিমি গিটারিস্টের চেয়ে এই অঙ্গবিন্যাস কম আকর্ষণীয় নয়। অন্যভাবে দেখলে সেতারের মতো ‘পকড়’। ওই ইন্ডিয়ান রেড গোছের গেরুয়া রঙই এই ছবির ভাবকে আরো পারমার্থিক করেছে। যেন জীবনের গান গেয়ে যাওয়াই ওঁর ধ্যানমন্ত্র।

'ফাল্গুনী' সিরিজের কাগজে জলরঙে আঁকা ছবিতে মন্দির বাজানোররত রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৭। রবীন্দ্র ভবন সংগ্রহ।
পঞ্চম ছবিতে রবীন্দ্রনাথ মাটিতে বসে মন্দিরা বাজাচ্ছেন। সাদা উত্তরীয়তে আলো ঠিকরে পড়ছে। ওঁকে আরও সৌম্য, আরও রূপবান লাগছে। ওঁর স্থির কনীনিকায় অবিচল রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়। যেকোনো কঠিন সময়কে এই রবীন্দ্রনাথ অতিক্রম করতে জানেন। এ ছবিতে অবনীন্দ্রনাথ এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথের মন্দিরা ধরা হাত। যে হাতের আঙুলের প্রশংসা রবীন্দ্রনাথের বিজয়া, ওরফে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো পর্যন্ত করেছেন। সাল-তারিখ বলছে, এর অনেক আগেই অবনীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের আঙুলের সৌন্দর্যের সচিত্র প্রমাণ দিয়েছেন এ ছবিতে। খুব ভালো করে দেখলে বোঝা যায় ছবিতে রবীন্দ্রনাথের পিছনে রয়েছে তিনটে সাদা শেফালি বা ঘাসফুল। এই সিরিজ দেখলে মনে হতে পারে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কীইবা আছে ছবিগুলোয়! ফাল্গুনী নাটকের এতো চরিত্র সেসব ছেড়ে অবনীন্দ্রনাথ আঁকলেন শুধুই রবীন্দ্রনাথ। বাহ্যিক সৌন্দর্যায়নে অবনীন্দ্রনাথ কোনো বাড়াবাড়ি করেননি। নিসর্গকে খুবই ন্যূনতম, এমনকি রবীন্দ্রনাথের জোব্বার ভাঁজ পর্যন্ত যৎসামান্য ধরেছেন। যেন রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি নাটকের সেট ছাড়িয়ে অন্তত হয়েছে।
অবনীন্দ্রনাথ থাকলে এই রবীন্দ্রনাথকে ছোঁয়া সহজ হয়। একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষ মনকে পড়তে চাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। কালে কালে এর ভাষাও বদলেছে। আজকে যেভাবে ছবিকে দেখছি, পূর্বে তা ভেবেই যে শিল্পী এঁকেছেন এরকম নয়। তবে ভাবনার জন্য ফাঁক রেখে গিয়েছেন।

'ফাল্গুনী' সিরিজের ছবিতে কবিশেখরের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংগ্রহ, ১৯১৬।
শেষ ছবিটি সবচেয়ে নাটকীয় এবং বিস্তৃত। নাটকের অন্ধ গায়ক চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথ উন্নীত করেছেন তো বটেই। ফাল্গুনী নাটকের প্লট ভুলে এই ছবি একেবারে স্বতন্ত্র। যেন অনন্ত রাত্রে নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ। এই ছবিতে সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়ে ছোঁয়া যায় রবীন্দ্রনাথকে। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে যে যার মতন পড়েছেন। তবে সবচেয়ে নিজের করে, ভালোবেসে পড়েছেন অবনীন্দ্রনাথ। সচেতনভাবে ‘ভালোবেসে’ শব্দটা ব্যবহার করলাম। অবনীন্দ্রনাথ ওঁকে মান্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথ পথ দেখিয়েছেন চিরকাল। রবীন্দ্রনাথ আর অবনীন্দ্রনাথ একে অপরকে ভালোবেসেছেন। আত্মিক যোগ না থাকলে এরম ছবি আঁকা যায় না। জানি না সে সময়ে ‘জেন্ডার স্টাডিজ’ নিয়ে ওঁদের কীরকম সচেতনতা ছিল। কিন্তু শিল্পীর কোনো লিঙ্গ হয় না। রবীন্দ্রনাথ সময়কে ছাপিয়ে যেমন শ্রেষ্ঠ পুরুষ, শ্রেষ্ঠ নারীও। অবনীন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথ দুজনই অ্যান্ড্রোজিনাস বলে আমি মনে করি। নইলে রবীন্দ্রনাথ ওঁর সৃষ্ট পুরুষ চরিত্রগুলোকে বুঝতেন না। আর অবনীন্দ্রনাথও রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে বুঝতেন না। আর এই ছবিগুলো ফাল্গুনীর প্লট ছাড়িয়ে আজকের আলোচনার বিষয় হতো না।
ফিরে আসি গোড়ার কথায় যেখানে সংবেদনশীল তরল মনের রবীন্দ্রনাথকে আমি খুঁজেছি, অবনীন্দ্রনাথও। অবনীন্দ্রনাথ থাকলে এই রবীন্দ্রনাথকে ছোঁয়া সহজ হয়। একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষ মনকে পড়তে চাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। কালে কালে এর ভাষাও বদলেছে। আজকে যেভাবে ছবিকে দেখছি, পূর্বে তা ভেবেই যে শিল্পী এঁকেছেন এরকম নয়। তবে ভাবনার জন্য ফাঁক রেখে গিয়েছেন। আজকের সময়ের নিরিখে আজকের রবীন্দ্রনাথকে আমরা পড়বো, ছুঁয়ে দেখবো, হারিয়ে ফেলবো।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি। আনুমানিক ১৯১৩।