ছোটোদের কাঁথা : ডায়াপার বা ন্যাপির বদলে সাশ্রয়ী ও সচেতন নির্বাচন

বাঙালির আপসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের ঐতিহ্য

ঠাকুমা-দিদিমাদের পুরনো শাড়ি সম্পত্তির মতো আগলে রাখার রেওয়াজ এখন বেশ ফিকে। খান কয়েক আটপৌঢ়ে পুরনো শাড়ি, কয়েক হাত সুতো, আর একটা বেশ বড়ো নালাওয়ালা সূঁচ নিয়ে সারা দুপুর জুড়ে চলত কুশলী বুনন, সঙ্গে রাজ্যের গল্প। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, পুরুত্ব অনুযায়ী সম্পূর্ণ হত এক একটা কাঁথা। কখনও এক মাস, তো কখনও ছয় মাস। শীতকে টেক্কা দিতেই শুধু নয়, পুজোর আসন কিংবা জায়নামাজ হিসাবে, এছাড়া সদ্যজাত শিশুর জন্য আজও কাঁথা-ব্যবহারের জুড়ি মেলা ভার। 

গ্রামবাংলার নারীদের জীবনযাপনের প্রতিফলন ছিল এই কাঁথা। বাংলায় কাঁথা তৈরির প্রবণতা শুধু অবসর সময় কাটানো বা বুননের শখ থেকে উঠে আসেনি, এসেছে স্বতঃস্ফূর্ত শৈল্পিক প্রকাশের তাগিদ থেকে, কখনও ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকে। দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এমন সব বস্তু এবং উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত থেকে তুলে আনা হত কাঁথার নকশা। বড়ো কাঁথায় সবসময় নকশা থাকতো তা নয়, দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য রান সেলাই দেওয়া সহজ সরল কাঁথার বেশ চল ছিল; সাধারণত, বাচ্চাদের জন্য বানানো কাঁথাগুলো এরকমই হতো।

বাংলার ঘরে ঘরে, জাত-ধর্ম-শ্রেণি নির্বিশেষে পরিবারের কোনও মহিলা গর্ভবতী হলে, শিশু জন্মানোর অনেক আগে থেকেই কাঁথা তৈরির ধুম পড়ে যেত। অসচেতনভাবেই জীবনচর্চায় জুড়ে যেত আপসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের ঐতিহ্য।

আগে সদ্যজাত শিশু বা ছোটো বাচ্চাদের জন্য কাঁথা ছিল কাজের জিনিস। বাংলার ঘরে ঘরে, জাত-ধর্ম-শ্রেণি নির্বিশেষে পরিবারের কোনও মহিলা গর্ভবতী হলে, শিশু জন্মানোর অনেক আগে থেকেই কাঁথা তৈরির ধুম পড়ে যেত। অসচেতনভাবেই জীবনচর্চায় জুড়ে যেত আপসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের ঐতিহ্য। হবু মা নিজে অথবা বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা তৎপর হয়ে বসে যেতেন কাঁথা সেলাই করতে। সদ্যজাত শিশুকে পুরনো হয়ে যাওয়া, নরম সুতির কাপড়ে বোনা কাঁথায় জড়িয়ে রাখা হতো, যাতে মায়ের কোমল স্পর্শ ও উষ্ণতা পায়। এছাড়া, বিছানার উপর কাঁথা পেতে শোয়ানো হত শিশুকে। এখনও গ্রামীণ এলাকাগুলিতে কম-বেশি এই রেওয়াজ রয়ে গেছে। কাঁথা টেকসই, বারবার ব্যবহার করা যায়। যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনই শিশুর নরম ত্বকের যত্ন নিতে উপযোগী। তাই, ডায়াপার বা ন্যাপির বদলে কাঁথার ব্যবহার সাশ্রয়ী ও সচেতন নির্বাচন।

কিন্তু বর্তমানে, শহর থেকে গ্রাম নাগরিক জীবনে কাঁথার ব্যবহার প্রায় নেই বলাই চলে। কেউ কেউ গৃহসজ্জা বা ঐতিহ্য-সংরক্ষণের জন্য সংগ্রহে রাখলেও, শিশুদের ব্যবহারের জন্য বা ঠান্ডা নিবারণের প্রয়োজনে কাঁথার ব্যবহার উঠে গেছে। বিশেষত, শহুরে জীবনে না আছে কাঁথা সেলাইয়ের সময়, না আছে ধৈর্য। তাই, এখন কাঁথার বিকল্প হয়ে উঠেছে নানারকম ফ্যান্সি ‘কুইল্ট’। ভালো মানের আসল সুতির কাপড়ে বোনা কাঁথা তৈরিতে যা খরচ হয়, সিন্থেটিক-পলিয়েস্টার কাপড়ের মেশিনে সেলাই করা কুইল্ট/ব্ল্যাঙ্কেট তুলনামূলক সস্তা ও সহজলভ্য। এই সুবিধা পেতে গিয়ে আমরা হারিয়ে ফেলছি—নারীর সৃষ্টি কুটিরশিল্পের ঐতিহ্য, হাতে বোনা সুচিশিল্পের ভবিষ্যৎ, পরিবেশবান্ধব মন।

ভালো মানের আসল সুতির কাপড়ে বোনা কাঁথা তৈরিতে যা খরচ হয়, সিন্থেটিক-পলিয়েস্টার কাপড়ের মেশিনে সেলাই করা কুইল্ট/ব্ল্যাঙ্কেট তুলনামূলক সস্তা ও সহজলভ্য। এই সুবিধা পেতে গিয়ে আমরা হারিয়ে ফেলছি—নারীর সৃষ্টি কুটিরশিল্পের ঐতিহ্য, হাতে বোনা সুচিশিল্পের ভবিষ্যৎ, পরিবেশবান্ধব মন।

তবে, একসময় যে সুচিশিল্প ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নারীশিল্প হিসেবে অবহেলিত ছিল, পরবর্তীতে তা-ই মহিলাদের স্বনির্ভরতার সিঁড়ি হয়ে উঠেছে। কলকাতার খুব কম জায়গাতেই খোঁজ মেলে হাতে বোনা কাঁথার। দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কের ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ (১২৭, গড়িয়াহাট রোড, যোধপুর পার্ক, কলকাতা ৭০০০৬৮) অন্যতম ঠিকানা। এই বিপণির সংগ্রহে রয়েছে ছোটোদের কাঁথা। বিপণির এক কর্মীর কথায়, উত্তর চব্বিশ পরগনার একটি মহিলা-স্বনির্ভর সংস্থা তাঁদের জন্য ছোটোদের কাঁথা তৈরি করে। এক একটি কাঁথার দৈর্ঘ্য দু/আড়াই ফুট। কাঁথার জন্য বিপণি থেকেই সরবরাহ করা হয় ১০০% খাঁটি, ধবধবে মখমল সুতির কাপড়। কাপড়ে স্কেচ করে নিয়ে, রঙিন সুতো দিয়ে আঁকা হয় ফুল, পাখি। ছোটোদের কাঁথা হিসেবে ব্যবহার করতে না চাইলে, আসন অথবা ওয়াল হ্যাংগিং হিসেবে রুচির পরিচয় দেবে এই কাঁথা। পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলার ঐতিহ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতে উপহার হিসেবেও এর বিকল্প নেই।
__________
কাঁথা ও ছবি সৌজন্যে: দ্য বেঙ্গল স্টোর

যোগাযোগ: ১২৭, যোধপুর পার্ক, কলকাতা-৬৮। দূরভাষ: ০৮৫৮৫৮ ৪০৭২৫

Developed by DXDasia