বলাগড়ের ডিঙি : ভারতবর্ষে এই প্রথম কোনো নৌকা পেল ভৌগোলিক স্বীকৃতি

এই স্বীকৃতি সমাজের প্রান্তজনের শ্রমের এক ঐতিহাসিক দলিল

দীমাতৃক বাংলার নাড়ির স্পন্দন লুকিয়ে রয়েছে তার জলপথে। আর সেই জলপথের পুরোনো সহচর হলো নৌকা। হুগলি জেলার বলাগড় অঞ্চলের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শান্ত গঙ্গা আর তার তীরে গড়ে ওঠা এক শতাব্দী প্রাচীন কুটির শিল্প: বলাগড়ের ডিঙি নৌকা। এখানকার রাজবংশীপাড়া, তেঁতুলিয়া, শ্রীপুর বাজার কিংবা চাঁদরা কলোনির মতো গ্রামগুলোর ঘরে ঘরে গেলেই শোনা যাবে কাঠ কাটার ছন্দোময় শব্দ আর হাতুড়ির ঠুকঠাক। বলাগড়ের একেকটি বাড়ির উঠোনই আসলে জীবন্ত কারখানা, যেখানে পুরুষানুক্রমে কারিগররা বুনে চলেন কাঠের স্বপ্ন। চাহিদার জোয়ার-ভাটায় এই উঠোন-কারখানার সংখ্যা কখনও বাড়ে, কখনও কমে। ভরা মরশুমে যেখানে ৩০ থেকে ৪০টি কারখানা সচল থাকে, মন্দার দিনে তা হয়তো নেমে আসে কুড়ি-পঁচিশে। কিন্তু অভাব আর অনটনের মেঘ ঘনালেও, বলাগড়ের মিস্ত্রিদের হাত বিশ্রাম নেয় না।

বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই তাঁরা ব্যস্ত থাকেন দক্ষিণবঙ্গের এক অনন্য লোকশিল্পকে সজীব রাখতে—যার নাম বলাগড়ের ডিঙি (Balagarh Dinghy Nouka)। এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা সম্প্রতি অর্জন করেছে ভৌগোলিক স্বীকৃতি বা জিআই ট্যাগ (GI Tag), যা বিশ্বমঞ্চে বাংলার প্রান্তিক মানুষের শ্রম ও মেধার এক ঐতিহাসিক জয়। উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে এই প্রথম কোনো একটি নৌকা তার আঞ্চলিক স্বীকৃতি আদায় করল।

ব্রিটিশরা এই ‘ডিঙি’ শব্দটি বাংলা থেকে ধার করে নিজেদের অভিধানে শামিল করে নিল এবং তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ‘ডিঙ্গি’ (Dinghy) নামে। আজ আমেরিকা বা ইউরোপের বিশাল সব জাহাজে আপৎকালীন সুরক্ষার জন্য যে লাইফবোট রাখা থাকে, তাকেও বিশ্ববাসী এই নামেই চেনে।

বলাগড়ের ডিঙি শুধু একটি জলযান নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির চলমান দলিল। অথচ ইতিহাসের এক আশ্চর্য বাঁকে এই দেশীয় ‘ডিঙি’ শব্দটিই আজ আন্তর্জাতিক জলসীমার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় বণিক ও ব্রিটিশ শাসকেরা বাংলার নদীতে প্রথম এই ছোটো নৌকাগুলোকে চলাচল করতে দেখলেন। নৌকাগুলোর সাবলীলতা দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হয়েছিলেন তাঁরা। ব্রিটিশরা এই ‘ডিঙি’ শব্দটি বাংলা থেকে ধার করে নিজেদের অভিধানে শামিল করে নিল এবং তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ‘ডিঙ্গি’ (Dinghy) নামে। আজ আমেরিকা বা ইউরোপের বিশাল সব জাহাজে আপৎকালীন সুরক্ষার জন্য যে লাইফবোট রাখা থাকে, তাকেও বিশ্ববাসী এই নামেই চেনে।

কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় এর শিকড় আরও গভীরে। এই শব্দের উৎস মূলত সাঁওতাল ও মুণ্ডাদের মতো অস্ট্রিক ভাষাভাষী প্রাচীন আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে। যদিও আধুনিক যুগে সাঁওতাল বা মুণ্ডা উপজাতিরা মূলত পুরুলিয়া বা মানভূমের মতো শুষ্ক, পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলে বসবাস করেন, তাও এই শব্দটির অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে সুদূর অতীতে কোনো এক যুগে তাঁরাও সমুদ্র বা বড়ো কোনো জলপথের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বাংলার মাটির সেই আদিম অস্ট্রিক শব্দ আজ বিশ্বজনীন, আর সেই শব্দের সার্থক রূপকার হয়ে টিকে রয়েছেন বলাগড়ের কারিগররা।

একটা সময় ছিল যখন রূপনারায়ণ আর ভাগীরথীর বুকে নৌকার আধিপত্য ছিল প্রশ্নহীন। তখন বাংলার জনমানসে একটি প্রবাদ খুব প্রচলিত ছিল, ‘বলাগড়ের ডিঙি আর ঝুমঝুমির ছোট্’। এখানে ‘ছোট্’ বলতে বোঝানো হতো এক বিশেষ ধরনের মাঝারি আকারের মালবাহী বা যাত্রীবাহী নৌকাকে, যা হাওড়া জেলার বাগনান থেকে ডিহিমণ্ডল ঘাটের দিকে যাওয়ার পথে ‘ঝুমঝুমি’ অঞ্চলে তৈরি হতো। ঝুমঝুমির কারিগররা যেমন তাঁদের নিখুঁত কাজের জন্য খ্যাত ছিলেন, ঠিক তেমনই বলাগড় পরিচিত ছিল তার সুঠাম, হালকা ও টেকসই ডিঙি নৌকার জন্য। যুগের পরিবর্তনে এবং সড়কপথের প্রসারে ঝুমঝুমির সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে, কিন্তু বলাগড় লড়াই করে টিকিয়ে রেখেছে তার ঘরোয়া শিল্পকে।

বলাগড়ের ডিঙি নৌকার এই জিআই ট্যাগ পাওয়া শুধুমাত্র একটা আইনি স্বীকৃতি নয়, এটা আসলে বাংলার নদী-সংস্কৃতি ও তার নেপথ্যে থাকা কারিগরদের হাজার বছরের পরম্পরার স্বীকৃতি।

এই দীর্ঘ লড়াই এবং শিল্পের গুরুত্ব নিয়ে বঙ্গদর্শন.কম কথা বলেছিল নৌকা গবেষক এবং বর্তমানে ন্যাশনাল মেরিটাইম হেরিটেজ কমপ্লেক্স (ভারত সরকারের উদ্যোগে গুজরাটের লোথালে তৈরি হওয়া বিশ্বের বৃহত্তম মেরিটাইম মিউজিয়ামের কিউরেটর হিসেবে তিনি বিগত দেড় বছর ধরে কর্মরত আছেন।)-এর কিউরেটর স্বরূপ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বলাগড়ের ডিঙি নৌকার এই জিআই ট্যাগ পাওয়া শুধুমাত্র একটা আইনি স্বীকৃতি নয়, এটা আসলে বাংলার নদী-সংস্কৃতি ও তার নেপথ্যে থাকা কারিগরদের হাজার বছরের পরম্পরার স্বীকৃতি। আমরা যখন লোথালের ন্যাশনাল মেরিটাইম হেরিটেজ কমপ্লেক্সে ভারতের নৌ-বাণিজ্যের ইতিহাস তুলে ধরছি, তখন বলাগড়ের মতো জীবন্ত ঐতিহ্যগুলোই আমাদের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে।”

জিআই ট্যাগ সাধারণত কোনো অঞ্চলের অনন্য পণ্যকে বিশ্ববাজারে একচেটিয়া মর্যাদা দেয়। জয়নগরের মোয়া, মুর্শিদাবাদের শাড়ি বা কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতি যেমন রাতারাতি বাণিজ্যিক চাহিদা ও দাম বাড়িয়ে দেয়, নৌকার ক্ষেত্রে সমীকরণটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রসগোল্লা বা শাড়ির খদ্দের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত সমাজ হলেও, নৌকার উপভোক্তা মূলত সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষ। নদী বা ভেড়ির মৎস্যজীবী কিংবা সুন্দরবন ও অন্যান্য নদী তীরবর্তী অঞ্চলের বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষই হলেন নৌকার মূল ক্রেতা। যাঁদের নিজেদের দৈনিক আয় অনিশ্চিত, তাঁদের পক্ষে লক্ষাধিক টাকা খরচ করে একটি শাল বা সেগুন কাঠের নৌকা কেনা অসম্ভব বিলাসিতা। ফলে কারিগররাও বাধ্য হন সস্তা কাঠের দিকে ঝুঁকতে। আগে যেখানে জাঁকজমকপূর্ণ শাল, সেগুন বা শিশু কাঠে নৌকা তৈরি হতো, এখন তার জায়গা নিয়েছে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য গাছাড়ি কাঠ—যেমন খিরিশ বা বাবলা কাঠ। এই কাঁচা কাঠের নৌকা জলে বড়োজোর দুই থেকে তিন বছর টেকে, কিন্তু সস্তা হওয়ার কারণে প্রান্তিক ক্রেতাদের এটাই একমাত্র ভরসা। অনেক সময় দেখা যায়, একটি নৌকার কাঠের দামই পড়েছে নয় হাজার টাকা, আর কারিগর সেটি মাত্র দশ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। মাত্র এক হাজার টাকার লভ্যাংশে একজন মিস্ত্রির কয়েকদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি বিক্রি হয়ে যায়।

এই চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বলাগড়ের কারিগরদের অবস্থা আজ অত্যন্ত শোচনীয়। এক দশক আগেও যেখানে প্রায় দুই শতাধিক দক্ষ মিস্ত্রি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আজ সেই সংখ্যাটা কমতে কমতে একশো বা সার্ধশতকে এসে ঠেকেছে। সারা বছর পর্যাপ্ত কাজ এবং ন্যায্য মজুরি না পেয়ে পেটের টানে অনেক বংশানুক্রমিক কারিগর বাধ্য হচ্ছেন ভিটেমাটি ছেড়ে দীঘা কিংবা উড়িষ্যার উপকূলবর্তী অঞ্চলে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে চলে যেতে। অনেকে আবার পেশা বদলে রাজমিস্ত্রি বা কারখানার শ্রমিকের কাজ বেছে নিচ্ছেন। এই বিপন্নতা প্রসঙ্গে স্বরূপ ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, “জিআই ট্যাগ হয়তো বলাগড়ের নৌকার দাম এক ধাক্কায় দ্বিগুণ করে দেবে না, কারণ এর বাজারটা প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই স্বীকৃতির আসল তাৎপর্য অন্য জায়গায়। এটি মূলত ভারতের সেই অন্ত্যজ, প্রান্তিক মানুষদের মেধার রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, যাঁরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই কেবল হাতের জাদুতে নিখুঁত জ্যামিতিকে নৌকা বানিয়ে চলেন। এতদিন যে কারিগররা অবহেলায় ভুগছিলেন, এই স্বীকৃতি তাঁদের কাজের প্রতি আত্মসম্মান ও গৌরববোধকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যা তাঁদের এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার মানসিক রসদ জোগাবে।”

সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি কাঠের ডিঙি নৌকাকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই ভৌগোলিক স্বীকৃতি হয়তো মিস্ত্রিদের ঘরের অভাব এক দিনে দূর করবে না, কিন্তু এর ফলে পর্যটন ও হেরিটেজ সংস্কৃতির আঙিনায় বলাগড়ের এক নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে।

বলাগড়ের ডিঙি নৌকার এই জিআই স্বীকৃতি আসলে সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষের শ্রমের এক ঐতিহাসিক দলিল। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যেখানে ফাইবার বা প্লাস্টিকের বোটের দাপট বাড়ছে, সেখানে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি কাঠের ডিঙি নৌকাকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই ভৌগোলিক স্বীকৃতি হয়তো মিস্ত্রিদের ঘরের অভাব এক দিনে দূর করবে না, কিন্তু এর ফলে পর্যটন ও হেরিটেজ সংস্কৃতির আঙিনায় বলাগড়ের এক নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যায়, তবে আগামী প্রজন্মও বাংলার এই গৌরবময় ইতিহাস জানতে পারবে। বলাগড়ের প্রতিটি উঠোনে আজ যে জিআই ট্যাগের আনন্দ উৎসবের আবহ, তা আসলে প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বের লড়াইয়ের এক পরম প্রাপ্তি। অভাবের অন্ধকারেও বলাগড়ের মিস্ত্রিরা আজ গর্ব করে বলতে পারেন, তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি যে ডিঙি একদিন বিশ্ব জয় করেছিল, আজ তা নিজের দেশের মাটিতেও মুকুট ফিরে পেয়েছে।

__________ 
ছবি সৌজন্যে | স্বরূপ ভট্টাচার্য

Developed by DXDasia