ষাট-সত্তরের দশক ও বাংলা সাহিত্য জগতের কিছু দলিল

সাহিত্যের পাশাপাশি, কখনও-কখনও সময়ের সূচক হয়ে ওঠে সাহিত্যজগত-কেন্দ্রিক দলিলগুলিও। আপাতদৃষ্টিতে সেগুলির ভূমিকা কেজো, তাৎক্ষণিক— কিন্তু উপযুক্ত সময় পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেইসব দলিল হতে পারে পোস্টকার্ড, লিফলেট বা নিমন্ত্রণপত্র, হতে পারে অন্য-কিছুও। কিন্তু সময়কে চিনতে সেগুলির ভূমিকা অপরিসীম। কে বলতে পারে, বর্তমানের যেসব দলিল অবহেলায় ছড়িয়ে আছে চারপাশে, ভবিষ্যতে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না! (বাংলা সাহিত্যের অপ্রকাশিত দলিল)

গদ্যকার ও অনুবাদক সুবিমল বসাকের (১৯৩৯-২০২৫) প্রয়াণের পর, তাঁর বাড়ি থেকে খুঁজে পেয়েছি তেমনই প্রচুর দলিল— ষাট-সত্তর দশকের। সেগুলির থেকেই কয়েকটি বেছে এই লেখার নির্মাণ। আপাতভাবে দলিলগুলি পাঠকের সামনে তুলে ধরা ছাড়া, এই লেখার কোনও গুরুত্বই নেই। দলিলগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ; সহযোগী কাঠামো হিসেবে যেটুকু ভূমিকা, তার বেশি কিছু দাবিও করতে পারে না লেখাটি। তবু, রইল। সঙ্গে রইল মূল ও জরুরি বয়ানগুলিও। (বাংলা সাহিত্যের অপ্রকাশিত দলিল)

১। কৃত্তিবাস পুরস্কারের কার্ড, ১৯৬৭

সবিনয় নিবেদন,
আগামী শনিবার ২১ জানুয়ারী সন্ধ্যা পাঁচটায় কলেজ স্ট্রীট ওয়াই, এম, সি, এ. ওভারটুন হলে তরুণ কবি সামশের আনোয়ারকে ১৯৬৬ সালের কৃত্তিবাস পুরস্কার দেওয়া হবে। কৃত্তিবাসের বাৎসরিক কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটিও এই সঙ্গেই হবে।
এই অনুষ্ঠানের সভানেত্রী শ্রীমতী দীপ্তি ত্রিপাঠী। শ্রীমতী কবিতা সিংহ সভা পরিচালনা করবেন।
বাংলা কবিতার এই অসম্ভব উৎসবের আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না। আপনার উপস্থিতি প্রার্থনীয়। ইতি—
বিনীত
তারাপদ রায়
আহ্বায়ক

২। তারাপদ রায় সম্পাদিত ‘কয়েকজন’ পত্রিকার প্রচ্ছদ, ১৯৬৯

সবিনয় নিবেদন,
সামনের ১২ এপ্রিল, শনিবার আবার কৃত্তিবাস উৎসব। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় সেই ওভারটুন হলে শ্রীমতী দেবারতি মিত্রকে বছরের শ্রেষ্ঠ নবীন কবির সম্মান কৃত্তিবাস পুরস্কার দেওয়া হবে। এই উপলক্ষে কৃত্তিবাসে কবিরা আরেক বার তাঁদের কবিতা পড়বেন। স্বজন-বান্ধব সহ আপনার উপস্থিতি প্রার্থনীয়। ইতি ১৫ই মার্চ ১৯৬৯।
তারাপদ রায়

৩। চলমান সাহিত্য আন্দোলনের লিফলেট, সাল অজ্ঞাত

মানুষ, এরই মধ্যে কানাঘুষো শুনতে পাচ্ছেন, আশা করি। কতিপয় বগল-কামানো তরুন লেখক একে বিখ্যাত হবার প্রচেষ্টা বলে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কাছে এটা অপ্রত্যাশিত নয়। আমাদের অপরাধ আমরা প্রায় সমসংখ্যক লেখকের সমসংখ্যক পাঠকে সন্তুষ্ট নই।

একজন লেখক প্রথমে মানুষ। এবং তাহলে তাঁর যা-কিছু রচনা অটোমেটিক্যালি মানুষের জন্য সৃষ্টি— এই শুভবোধ থেকেই সম্ভবতঃ তাঁকে মিশে যেতে হয় মানুষের গভীরে। যেমন একজন প্রকৃত নেতাকে ‘মাস’-এর মধ্যে থেকেই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে হয়। এই স্বাভাবিক সত্য আমাদের প্ররোচিত করেছে দীর্ঘকালের সুপরিকল্পিত লেখক/পাঠক/মানুষ-এর ব্যবহার চৌচির করতে। আশা করি মানুষ, এবারে বুঝতে পারছেন কেন আমরা দেয়ালে পদ্য লিখছি, গল্প ও গদ্য রচনায় কেন কর্পূর হচ্ছে আটাশ বছরের নোনাধরা পুরনো স্বদেশীয় রাজনৈতিক শ্লোগান। আমরা বিশ্বাস করি মানুষের কথা কেবলমাত্র একজন লেখক, শিল্পীই সঠিক বলতে পারেন। চলমান সাহিত্য আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য সেই মানুষকে কাছে টানা, রাস্তায় যেতে ২ দাঁড় করিয়ে দেয়া, তার চোখকে শিকার করা। আর এভাবেই একদিন অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন আপনি। প্রত্যহ দাঁত-মাজা, খবরের কাগজ পড়বার মতোই সাহিত্যপাঠ হয়ে উঠবে আপনার নিত্যনৈমিত্যিক অভ্যাস।
(চলমান সাহিত্য প্রকাশনীর সৌজন্যে— ধূর্জটি চন্দ ও সমরেন্দ্র দাস কর্তৃক প্রচারিত।)

৪। সাহিত্য মেলা ৭৪-এর নিমন্ত্রণপত্র

সবিনয় নিবেদন,
আগামী ১৭ই, ১৮ই, ১৯শে ডিসেম্বর ১৯৭৪ কলকাতা তথ্যকেন্দ্রে সাহিত্যমেলার আয়োজন করা হয়েছে। এই মেলার সামগ্রিক আনন্দে অংশ নিতে আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাই।
সমরেন্দ্র দাস
প্রিতম মুখোপাধ্যায়
সাধারণ সম্পাদক, সাহিত্যমেলা: ৭৪

সবিনয় নিবেদন
তরুণ কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালকে সম্মানিত করার উদ্দেশ্যে আগামী ২৮ জানুয়ারী, ১৯৭৭ শুক্রবার একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে
সভাপতি: কালিকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়
প্রধান অতিথি: শঙ্খ ঘোষ
বিশেষ অতিথি: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় নবনীতা দেবসেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়
নির্বাচিত তরুণ কবিদের কবিতাপাঠ
আপনাকে আমন্ত্রণ
বিনীত
সুনীল মিত্র  গৌতম চৌধুরী  রাধানাথ মণ্ডল
৯ই জানুয়ারী, ১৯৭৭

৬। কমিটি ফর দি একজিবিশন অফ আনডারগ্রাউণ্ড লিটারেচার-এর লিফলেট, ১৯৭৭

সুধী,
আগামী ৩ থেকে ৯ অক্টোবর, ’৭৭ কলকাতা তথ্য কেন্দ্রে জরুরী অবস্থা জারির বিরুদ্ধে রচিত ও প্রকাশিত নিষিদ্ধ প্রচারপত্র, পুস্তিকা, চিঠিপত্র, কার্টুন, ইত্যাদির এক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী শ্রীজর্জফার্নাণ্ডেজ ৩রা অক্টোবর এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন। রাজনৈতিক কারণে নিষিদ্ধ সাহিত্য ছাড়াও ঐ সময়ে নিষিদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের ও সেনসর করা পত্রিকা প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা করা হবে। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের অবদান ও প্রতিরোধ আন্দোলনের স্বরূপ তুলে ধরার জন্যই এই প্রদর্শনী। সক্রিয়ভাবে যোগদান করে আমাদের এই অনুষ্ঠান সাফল্যমণ্ডিত করে তুলবেন এই আশা রাখি। নমস্কারান্তে,
১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৭         ইতি—
সজল বসু
গোপা সর্বাধিকারী
যুগ্ম সম্পাদক

_____________________
*এই প্রতিবেদন বঙ্গদর্শন.কম-এর এক্সক্লুসিভ ও ওরিজিনাল। লেখা থেকে কোনোরকম উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে অথবা লেখাটি কপি-পেস্ট করে অন্যত্র প্রকাশ করলে এবং প্রতিবেদনে প্রকাশিত ছবিগুলি অন্যত্র ব্যবহার করলে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বয়ানের প্রত্যেকটির বানান অপরিবর্তিত।

Written by