
তিনের দশক, ততদিনে হেমেন রায়ের কল্যাণে বাঙালির শিশু-কিশোর সাহিত্যে অ্যাডভেঞ্চার ঘরানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। টেনিদা, ঘনাদা, ফেলুদারা আসবেন আরও বছর দশ-কুড়ি-ত্রিশ পর! সুধীরচন্দ্র সরকার সম্পাদিত শিশু-কিশোরদের পত্রিকা ‘মৌচাক’-এর পাতায় ধারাবাহিকভাবে কিশোর উপন্যাস লিখতে শুরু করলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সময়টা ১৯৩৫। তারপর ১৯৩৭-এ সে উপন্যাস বেরোলো বই হয়ে। বইয়ের নাম— চাঁদের পাহাড়।
সপ্তাহান্তের শনি-রবিবার এখন ‘উইকএন্ড’। ওটস্ আর স্প্রাউটে নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছে বাঙালি। ছাদে উঠে অ্যান্টেনা ঠিক করার দিন ফুরিয়েছে। টেলিফোনে ক্রস কানেকশনের ঝক্কি নেই। ম্যাটেনি শো-র বদলে এসেছে ওটিটি! কিন্তু যে ম্যাজিক বিভূতিভূষণ তৈরি করেছিলেন, তার মাদকতায় এখনও বুঁদ বাঙালি পাঠক সমাজ। নব্বই বছর ছুঁইছুঁই, কিন্তু এক ইঞ্চিও ভাটা পড়েনি চাঁদের পাহাড়ের জনপ্রিয়তা।
গত শতকের প্রথমভাগে বাংলার নদী-মাঠ-ক্ষেতের ধারে লিখতে বসা এক লেখক, নিজের উপন্যাসের প্লট নিয়ে ফেলছেন সুদূর আফ্রিকায়! তখন ইন্টারনেট নেই, গুগল নেই। জীবনে কোনওদিন মাসাই-ভূমে পা না রেখে, কেবল ভ্রমণ কাহিনি পড়ে রহস্যে ঘেরা আফ্রিকার অবিকল বর্ণনা দিচ্ছেন লেখায়। জুলুদের কিংবদন্তি থেকে অস্তগামী সূর্যের আলোমাখা এক ফালি আফ্রিকা, জ্যোৎস্নার আলো-আঁধারি থেকে মাউন্টেন অফ দ্য মুন, রিখটার্সভেল্ড— এত নির্ভুল বর্ণনা। এ কী করে সম্ভব! বিস্ময় জাগে।
বিস্ময় জাগতে পারে আন্দাজ করেই উপন্যাসের গোড়ায় বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন— “চাঁদের পাহাড় কোনও ইংরেজি উপন্যাসের অনুবাদ নয় বা ঐ শ্রেণীর কোনও বিদেশী গল্পের ছায়াবলম্বনে লিখিত নয়। এই বই-এর গল্প ও চরিত্রগুলি আমার কল্পনা-প্রসূত। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক সংস্থান ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনাকে প্রকৃত অবস্থার অনুযায়ী করবার জন্য আমি এইচ. এইচ. জনস্টন, রোসিটা ফরবস প্রভৃতি কয়েকজন বিখ্যাত ভ্রমণকারীর পুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করেছি।”
গত শতকের প্রথমভাগে বাংলার নদী-মাঠ-ক্ষেতের ধারে লিখতে বসা এক লেখক, নিজের উপন্যাসের প্লট নিয়ে ফেলছেন সুদূর আফ্রিকায়! তখন ইন্টারনেট নেই, গুগল নেই। জীবনে কোনওদিন মাসাই-ভূমে পা না রেখে, কেবল ভ্রমণ কাহিনি পড়ে রহস্যে ঘেরা আফ্রিকার অবিকল বর্ণনা দিচ্ছেন লেখায়।
চাঁদের পাহাড় কি কেবল অ্যাডভেঞ্চার-অভিযানের গল্প? শঙ্কর কি কেবল একজন অভিযাত্রী? হ্যাঁ বললে অতি সরলীকরণ হয়ে যায়। ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসে বিভূতিভূষণ যে শঙ্করের কথা লিখেছিলেন, সেই শঙ্কর বাংলা মায়ের দামাল ছেলে, অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলে। বোহেমিয়ান, ডাকাবুকো, কুস্তি, সাঁতার সবেতেই সে পারদর্শী। অভিযাত্রী তো বটেই। শঙ্কর আদতে বাঙালির এক জোড়া ডানা। যে ডানায় ভর করে ভিতু, ঘরকুনো বাঙালি আদিম, হিংস্র, সুন্দরী আফ্রিকায় গিয়ে পড়ার স্বপ্ন লালন করে।
ঘরের কাছে নৈহাটির পাটকলের চাকরিতে যোগ দেয়নি শঙ্কর। প্রসাদদাস মুখোপাধ্যায়ের চিঠিকে সম্বল করে সে মোম্বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। বাড়িতে বসে পিদিমের আলোয় ওয়েস্টমার্কের ভূগোল বই পড়তে পড়তে এ স্বপ্নই সে বুনেছিল। ভেবেছিল হের হাউপ্টম্যানের মতো সেও একদিন ‘মাউন্টেন অব দ্য মুন’ জয় করতে যাবে। স্বপ্ন সার্থক ক’টা মধ্যবিত্ত বাঙালির হয়? শঙ্কর নিজের স্বপ্নে বাঁচতে পেরেছিল।
বাঙালি চাকরি পেতে হাপিত্যেশ করে লড়ে, আর চাকরি পেয়ে গেলেই ভাবে কবে বাঁধন মুক্ত হবে! শঙ্করের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। আফ্রিকার প্রান্তরে বাঙালি যুবকের পৌরুষ-যাপনের কাহিনিতে বিভূতিভূষণ শঙ্করকে বুনলেন খুব যত্নে। অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার অসীম সাহস দিলেন, সঙ্গে দিলেন মরমী মন, গড়লেন দায়িত্ববান। ঠিক যেমনটা বাঙালি চায়, মনে মনে আঁকে… ঠিক তেমনটা!
উগান্ডা রেলওয়ের কেরানি-স্টোরকিপার থেকে কিসুমুর স্টেশন মাস্টার, কী রোমাঞ্চকর জীবন! এই জীবনই সাহিত্য-পড়া বাঙালি আকাঙ্ক্ষা করে। শঙ্কর আফ্রিকার সিংহ আর ব্ল্যাক মাম্বাকে ডরায় না। চাকরি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে দুর্ধর্ষ অভিযানে, হীরের খনির খোঁজে। শুধু দিনফেরার আশায় নয়, বুকে থাকে আবিষ্কারের বাসনা।
অনাহারক্লিষ্ট আলভারেজকে উদ্ধার, তাঁর সেবাশুশ্রুষা করা, তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব, তারপর পিতা-পুত্রসম সম্পর্ক, হিরে পাওয়ার পর মায়ের কথা ভাবা, গ্রামের দরিদ্রদের কথা ভাবা, গ্রামে কুমারীদের পাত্রস্থ করার কথা ভাবা, দেশের বাড়ির জন্য মন কেমন, জন্মভূমির টান— কেবল নায়কসুলভ পৌরুষ নয়, এক আবেগপ্রবণ, সৎ মনেরও অধিকারী বিভূতিভূষণের শঙ্কর। হয়তো বিভূতিভূষণ নিজেই শঙ্কর। কারণ যখন প্রথম চাঁদের পাহাড়ের প্লট তিনি চিরকুটে লেখেন, তখন চরিত্রের কোনও নাম দেননি। প্রথম পুরুষে লেখা হয়েছিল কতগুলো লাইন। খসড়ার শেষের দিক বদলে যায় তৃতীয় পুরুষে…
বাঙালি যেমন আদৰ্শ মানুষ চায়, সেই সব গুণ শঙ্করকে দিয়েছেন লেখক। পাশাপাশি দেখিয়েছেন, তাঁকেও হতাশা গ্রাস করছে, ভয়-ভীতি বাসা বাঁধছে, মৃত্যু ফাঁদে আটকা পড়ে কুষ্ঠিতে ভরসা করে শঙ্কর বলছে এইভাবে সে মরতে পারে না, মনে দ্বন্দ্ব জন্মাচ্ছে তাঁর পরিণতিও কি জিম কার্টার, আত্তিলিও গাত্তি, ডিয়োগো আলভারেজের মতো হবে?
বাঙালি যেমন আদৰ্শ মানুষ চায়, সেই সব গুণ শঙ্করকে দিয়েছেন লেখক। পাশাপাশি দেখিয়েছেন, তাঁকেও হতাশা গ্রাস করছে, ভয়-ভীতি বাসা বাঁধছে, মৃত্যু ফাঁদে আটকা পড়ে কুষ্ঠিতে ভরসা করে শঙ্কর বলছে এইভাবে সে মরতে পারে না, মনে দ্বন্দ্ব জন্মাচ্ছে তাঁর পরিণতিও কি জিম কার্টার, আত্তিলিও গাত্তি, ডিয়োগো আলভারেজের মতো হবে? পরক্ষণেই মনে পড়ছে সে আলভারেজের শিষ্য… হারলে চলবে না। এই হার না মানা মনোভাবই চাঁদের পাহাড় উপন্যাসের শক্তি, একই সঙ্গে আলভারেজের মৃত্যু একে ঘোর বাস্তবের মাটিতে এনে ফেলেছে। কোনও অতিমানবীয়, অতিলৌকিক বা অবাস্তব কাহিনি হতে দেয়নি।
ফলে চাঁদের পাহাড় একা শঙ্করের অ্যাডভেঞ্চার নয়, গোটা বাঙালি সমাজের। বাঙালি ঘরের কিশোর আজও চাঁদের পাহাড়ের দেশে চাকরির স্বপ্ন দেখে। চোখ বুজে দেখে রিখটার্সভেল্ডের চুড়োগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে… সামনে দাঁড়িয়ে শঙ্কর। কেবল নব্বই বছর নয়, যতদিন বাংলা ভাষা ও বাঙালির কল্পনাশক্তি বেঁচে থাকবে ততদিন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্কর, আলভারেজ, চাঁদের পাহাড় বেঁচে থাকবে। পরীক্ষা শেষের ডিসেম্বরে বা গরমের ছুটিতে কোনও কিশোর-কিশোরী হাতে তুলে নেবে চাঁদের পাহাড়, আর মোম্বাসার সেই রেলপথ একেবেঁকে এসে থামবে তার বাড়ির দরজায়…

