‘পথের পাঁচালি’ থেকে ‘চাঁদের পাহাড়’ –একটা ক্লিকেই মিলছে বিভূতিভূষণ সমগ্র

ডব্লিউবিআইডিএফসি-র পক্ষ থেকে সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি করা হয়েছে ওয়েবসাইট

পৃথিবীটা ছোটো হতে হতে ড্রয়িংরুমের বোকা বাক্সে বন্দি ছিল আগেই, এখন আবার সে যেন আরও ছোটো হয়ে মুঠোফোনে বন্দি। ঘুম ভাঙার অ্যালার্ম থেকে শুরু করে, রোজকার টু-ডু লিস্ট সবেতেই সঙ্গী আমাদের মোবাইল। আট থেকে আশি সকলেরই বেস্টফ্রেন্ড সে। বর্তমান সময়ে, ইন্টারনেট ছাড়া আমরা চোখে ধাঁধা দেখি। ছোটো-বড়ো যেকোনো সমস্যায় আমরা গুগলের ওপর চোখ বুজে ভরসা করি।

বিনোদনের সবটুকুই এখন আমরা চটজলদি পেতে অভ্যস্ত। ব্যস্ততার ফাঁকে বাঙালির বই পড়ার অভ্যেস প্রায় হারাতে বসেছে, কিন্তু ভালোবাসায় কমতি পড়েনি। তাই আজকাল ই-বুকের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore), শরৎচন্দ্র (Sharatchandra) নিয়ে অ্যাপ চালু হয়েছিল আগেই, এবার সেই তালিকায় যোগ দিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Bibhutibhushan bandyopadhyay)।

মাউসের এক ক্লিক তো বটেই, এখন মুঠো ফোনেও মুঠো বন্দি হচ্ছে ‘পথের পাঁচালী’-র অপু-দুর্গা থেকে ‘চাঁদের পাহাড়’-এর শঙ্কর, সকলেই। আঙুলের নিশানায় এখন পড়ে নেওয়া যাচ্ছে বিভূতিভষণের সারা জীবনের সব সাহিত্যকর্ম। একসঙ্গে এক জায়গায় তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস, ছোটোগল্প, ভ্রমণ কাহিনি, চিঠিপত্র – সব! আমরা ‘সমগ্র’ বলতে এতদিন বুঝতাম আস্ত মোটা একটা বই, আর এখন? এখন সেই বইয়ের সবকটা পাতাই মিলছে একটা এক লাইনের ইউ.আর.এল-এ। কম্পিউটার কিংবা মোবাইলে www.bibhutibhushan.in টাইপ করলেই নিমেষে পাওয়া যাচ্ছে বিভূতিভূষণের সাহিত্যসম্ভার।

১৯২২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ প্রকাশিত হয় বিভূতিভূষণের প্রথম গল্প ‘উপেক্ষিতা’। সেই হিসেব মেনে এবছরই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের ১০০ বছর অতিক্রান্ত। ফলে তাঁর লেখালিখি থেকে কপিরাইট উঠে যাওয়ায় ডব্লিউবিআইডিএফসি-র পক্ষ থেকে নেওয়া হয় অভিনব উদ্যোগ। সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি করা হয় একটি ওয়েবসাইট। আজকের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাতে সহজেই বাঙালির হাতের মুঠোয় সঙ্গী হতে পারেন বিভূতিভূষণ, সেই ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে বিনামূল্যে পড়ে ফেলা যাবে, ‘পথের পাঁচালী’ (Pather Panchali), ‘আরণ্যক’ (Aranyak), ‘ইছামতী’ (Ichhamati), ‘অপরাজিত’ (Aparajito)–র মতো কালজয়ী উপন্যাসগুলি।

তাঁর সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় (Annadashankar Roy) লিখেছিলেন, “এমন প্রকৃতি-পাগল সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে বিরল। প্রকৃতিকে চোখে দেখে ভালো লাগে না কার? কিন্তু তাকে ভালোবেসে তার গভীরে অবগাহন করা অন্য জিনিস। বিভূতিকে সেই জন্যে বছরে কয়েকমাস অরণ্যবাস করতে হতো। আর কয়েক মাস পল্লীর কোলে কাটাতে হতো। ইছামতী নদীর কূলে। তার জীবনের যুগল মেরু ছিল অরণ্য ও দক্ষিণায়ন। শহরে থাকলেও তিনি শহুরে ছিলেন না।  কোনোদিন হতে চাননি। নাগরিক সভ্যতা তাকে বশ করতে পারেনি। তার পোশাকে-আশাকে নাগরিকতার লেশ ছিল না। বৈঠকখানায় তিনি বেমানান। চিড়িয়াখানায় যেমন চিড়িয়া।”

নিভৃতচারী এই কথাসাহিত্যিকের সাহিত্যকর্মে প্রকাশিত হয়েছে পল্লীর জীবন ও নিসর্গ রূপায়ণে বাংলার আবহমানকালের চালচিত্র ও মানবজীবনের অন্তর্লীন সত্তা। তাঁর রচনায় প্রকৃতি কেবল প্রকৃতিরূপেই আবির্ভূত হয়নি, বরং প্রকৃতি ও মানবজীবন একীভূত হয়ে ধারণ করেছে অভিনব রসমূর্তি। মানুষ যে প্রকৃতিরই সন্তান- এই সত্য প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। প্রকৃতির লতাপাতা, ঘাস, পোকামাকড় সবকিছুই গুরুত্বের সঙ্গে আলাদা আলাদা ভাবে স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়। তাঁর রচনাসম্ভারের মধ্যে রয়েছে ১৫টি উপন্যাস, সাতটি কিশোর উপন্যাস, দুশো’র বেশি ছোটোগল্প। এসবের বাইরে ভ্রমণকাহিনি, ডায়েরি, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ব্যাকরণ বইও তিনি লিখেছেন। আর এই সবকিছুই রয়েছে www.bibhutibhushan.in–এ।

ওয়েবসাইট (Website) খুললেই প্রথমে রয়েছে সাহিত্যিকের সংক্ষিপ্ত জীবনী। তারপর একে একে তাঁর উপন্যাস, গল্প, কিশোর সমগ্র, ভ্রমণ কাহিনি, চিঠিপত্র – সবকিছু। শুধু তাই নয়, পাশাপাশি রয়েছে তাঁর অপ্রকাশিত এবং অগ্রন্থিত লেখাও। ওয়েবসাইটটির তরফে জানানো হয়েছে, পরবর্তীকালে কপিরাইট উঠে গেছে এমন আরও লেখক-সাহিত্যিককে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী তাঁরা।

সময় বদলেছে, ধরন বদলেছে, কিন্তু নেশা বদলায়নি বাঙালির। আজও চলার পথে গল্পের বইয়ের পাতায় চোখ রাখতে পছন্দ করে অনেকেই। অথচ জিনিসের ভারে যখন ব্যাগের কোণে বই নেওয়ার জায়গাটা কম পড়ে যায়, তখন আফসোস হয় বৈকি! তাই যুগের সঙ্গে পাল্লা দিতে আজ সবটুকই এসে জড়ো হয় আমাদের ওই মুঠোফোনে। বিভূতিভূষণের সাহিত্যও না হয় পাল্লা দিয়ে বাঙালির অভ্যেস হয়ে উঠলো খানিক!

Developed by DXDasia