শব্দলোক : কলকাতায় দেশের প্রথম ভাষা ও শব্দের জাদুঘর

দ্য পৃথিবীর আলো দেখা শিশুটি যখন প্রথম কেঁদে ওঠে সেই মুহূর্ত থেকেই সে সংযোগ স্থাপন করে দুনিয়ার সঙ্গে। আসলে খিদে, পিপাসার মতোই নিজের মনের ভাব অন্যকে বোঝানোর চেষ্টা যে কোনও প্রাণীর সহজাত স্বভাব। তাই সৃষ্টির আদিম সময় থেকে মানুষ নিরন্তর চেষ্টা করে গেছে কোনো না কোনো ভাবে তার মনের কথা পাশের মানুষটিকে বোঝাতে। এভাবেই জন্ম হয়েছিল আদিম গুহাচিত্র, লিপির। আর মৌখিকভাবে অর্থবহ মনের ভাব প্রকাশ করার চেষ্টা থেকে সৃষ্টি হয়েছে ভাষার।

নয়টি থিমভিত্তিক গ্যালারির মাধ্যমে আদি শব্দ, ভাষার বিবর্তন, মাতৃভাষা, বিভিন্ন ভাষায় ভারতীয় সাহিত্যে সাহিত্যিকদের অবদান, প্রচলিত মৌখিক ঐতিহ্য, পারফর্মিং আর্টস, সর্বজনীন সংলাপ, এবং সাধারণ গ্রন্থাগারের ইতিহাস উঠে এসেছে এই মিউজিয়ামে।

সেই সৃষ্টির যুগ থেকে পৃথিবী নামক ভূখণ্ডটি নানান ভৌগোলিক কারণে আরও খণ্ডিত-বিখণ্ডিত হয়ে সৃষ্টি করেছে সাতটি মহাদেশ এবং অসংখ্য দেশের। প্রতিটি দেশে বাস করেন নানান জাতি উপজাতির বহু মানুষ। তাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন। শুধু দেশ নয়, এই ভাষার, সংস্কৃতির ভিন্নতা একটি দেশের ভেতরের বিভিন্ন প্রদেশকেও দিয়েছে নিজস্ব পরিচয়। আমাদের মাতৃভূমি, এই উপমহাদেশই তার যথাযথ উদাহরণ। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী এই বিশাল ভূখণ্ডে পূর্ব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণ চারিদিকে বাস করেন নানা ভাষা নানা মতের মানুষ। ভাষাগত বৈচিত্র্য ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই বিভিন্ন ভাষার উৎসও বিভিন্ন।
এই বহুভাষিক দেশ ভারতবর্ষে ভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বহু সংস্কৃতি। আর এই ভাষাকেন্দ্রিক বৈচিত্র্য এবং তার মধ্যে ঐক্যের সুর খুঁজতে হলে পৌঁছে যেতে হবে কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি প্রাঙ্গনে অবস্থিত বেলভেডিয়ার হাউসে নবনির্মিত শব্দলোক মিউজিয়াম (Museum of Word)-এ। ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে থাকা ভারতের প্রথম ভাষা ও শব্দের জাদুঘর। শুধুমাত্র ভাষা ও শব্দের নীরস সংগ্রহশালা নয়, আধুনিক প্রযুক্তি এই জাদুঘরকে করে তুলেছে ভারতীয় ভাষাগুলির আদি মধ্য এবং আধুনিক যুগের টাইম মেশিন। সৃষ্টির শুরুতে শব্দের উৎস কীভাবে, কীভাবেই বা সদ্যোজাত শিশু কোনও কথা না বলেও দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, এমনকি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্য মানুষ কেমন করে বুঝে নেয় না বলা কথা, তা বুঝতে গেলে ঘুরে আসতেই পারেন এই সংগ্রহশালায়।

নয়টি থিমভিত্তিক গ্যালারির মাধ্যমে আদি শব্দ, ভাষার বিবর্তন, মাতৃভাষা, বিভিন্ন ভাষায় ভারতীয় সাহিত্যে সাহিত্যিকদের অবদান, প্রচলিত মৌখিক ঐতিহ্য, পারফর্মিং আর্টস, সর্বজনীন সংলাপ, এবং সাধারণ গ্রন্থাগারের ইতিহাস উঠে এসেছে এই মিউজিয়ামে। শুধু নীরস ভাবে জানা নয়, নিজের চোখে পরখ করা এবং কানে শুনে বুঝতে পারাই এখানকার মূল আকর্ষণ। ভারতের সংবিধান স্বীকৃত ২২টি ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক এবং রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, বিবর্তন জ্ঞানপিপাসুদের কাছে জীবন্ত করে তুলছে অডিও-ভিজুয়াল প্রযুক্তি। এছাড়াও দেশের ৩৮০টি ভাষা ও উপভাষার মৌখিক ও লিখিত রূপকে ডিজিটালি সংগ্রহ করে রেখেছে এই সংগ্রহশালা। হাতে অন্তত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে মিউজিয়ামটি ঘুরতে ঘুরতে আদিম পাথুরে লিপি, তাম্রলিপি থেকে আধুনিক সাহিত্যের পথচলার যাত্রাপথের সাক্ষী হতে পারবেন উৎসাহী যে কোনো ব্যক্তি।

তবে ভাষা মানে শুধুই মৌখিক বা লিখিত বাক্যবন্ধ নয়, মানুষের অন্তরের নয়টি স্থায়ী ভাবকে শারীরিক ভঙ্গিমার মাধ্যমে অন্যকে বোঝানোর নামও ভাষা। এই নয়টি ভাবের নান্দনিক প্রকাশের নাম নবরস। আর ভারতের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্যে শুধুমাত্র অঙ্গ সঞ্চালনার মাধ্যমে শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন নাচের ভাব; মনের ভাব। ভাষার জাদুঘরে একটি গ্যালারিতে বাদ পড়েনি এই ভাষাও। ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাম জেসচার সেন্সরের দ্বারা নৃত্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে নবরস।

কিন্তু এই অভিনব সংগ্রহ সংগ্রহশালাটির ধারণা এল কিভাবে? ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর দেশের বহুভাষিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের উদ্যোগে একটি সংগ্রহশালা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কলকাতার বিখ্যাত বেলভেডিয়ার হাউসকে নতুন রূপ দিয়ে গড়ে তোলা হয় শব্দলোক মিউজিয়াম।

ঐতিহাসিক ভাবে এই বেলভেডিয়ার হাউসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আলিপুরের এই সুদৃশ্য প্রাসাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই বিখ্যাত বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের নাম। পলাশির যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জয়লাভের পর বাংলার নতুন নবাব মীরজাফর কলকাতায় এসে থাকার জন্য এই প্রাসাদ নির্মাণ করান। তিনি এখানে থেকেছিলেন কি না ইতিহাস তার সঠিক খোঁজ না দিতে পারলেও এটা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য যে এই ভবন তিনি ওয়ারেন হেস্টিংসকে উপহার হিসাবে দেন, এবং হেস্টিংস এই বাড়িতে বাস করেছিলেন।

এরপরেও হয়েছে বহু হাতবদল। ১৯৩৮ সালে চার্লস প্রিন্সেপ প্রাসাদটি কিনে নিলেও ১৮৫৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার প্রাসাদটি কিনে নেয় তাদের ব্যবহারের জন্য। এই বছর থেকেই লেফট্যানেন্ট গর্ভনর অর্থাৎ ছোটোলাটের অফিসিয়াল বাসস্থান ছিল বেলভেডিয়ার হাউস।

ভারতের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্যে শুধুমাত্র অঙ্গ সঞ্চালনার মাধ্যমে শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন নাচের ভাব; মনের ভাব। ভাষার জাদুঘরে একটি গ্যালারিতে বাদ পড়েনি এই ভাষাও। ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাম জেসচার সেন্সরের দ্বারা নৃত্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে নবরস।

এরপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয়েছে ভারতবর্ষ। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আব্দুল কালাম আজাদের উদ্যোগে কলকাতার মেটকাফ হল থেকে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিকে স্থানান্তরিত করে বেলভেডিয়ার হাউসে আনা হয়। ১৯৫৩ সাল থেকে এখানেই আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় গ্রন্থাগার।

জাতীয় গ্রন্থাগারের অসংখ্য বই যাতে নষ্ট হয়ে না যায় সে কারণে ২০০৪ সাল থেকে নবনির্মিত ভাষাভবনে বইগুলো স্থানান্তরিত করা হয়। তারপর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র তত্ত্বাবধানে ভবনটির সংস্কারের কাজ শুরু হয়। নতুনভাবে সেজে উঠে এখন বেলভেডিয়ার হাউস হয়ে উঠেছে শব্দের জাদু নগরী।

বাংলার নবাবের বাসস্থান থেকে শব্দের জাদুঘর। এই জাদুঘর ইতিহাসকে ছুঁয়ে আধুনিকতার হাত ধরে এই জাদুঘর মানুষকে পৌঁছে দেয় সেই উদভ্রান্ত আদিম যুগে। সেখান থেকে আবার নিয়ে আসে একুশ শতকের বর্তমান দুনিয়ায়। সোমবার বাদ দিয়ে সপ্তাহের অন্যান্য দিনে সকাল ১১টা থেকে সন্ধে ৬টার মধ্যে, ভাষার আদি-অন্ত খোঁজার জন্য মাত্র ৭৫ টাকার (বড়োদের) টিকিটের বিনিময়ে প্রযুক্তির টাইম মেশিনের এই অভিযান কল্লোলিনীর মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছে তাতে সন্দেহ নেই।

Written by
Developed by DXDasia