পুরোনো ঠিকানার প্রত্যাবর্তন, ২২ বছর পর খুলে গেল ন্যাশনাল লাইব্রেরির রিডিং লাউঞ্জ

খুলেছে ন্যাশনাল লাইব্রেরির এসপ্ল্যানেড সেন্টার

লকাতা তথা ভারতের বৃহত্তর ন্যাশনাল লাইব্রেরি বলতেই মনে পড়ে আলিপুরের প্রাসাদোপম বেল্ভিডিয়র এস্টেট। তবে, এই ঠিকানাটি কিন্তু অপেক্ষাকৃত নতুন। ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরির আদি ঠিকানা ছিল – ৬, এসপ্ল্যানেড ইস্ট। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে লাইব্রেরির নতুন নাম হয়, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ইন্ডিয়া (ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার)। পুরোনো ঠিকানা এসপ্ল্যানেড থেকে জাতীয় গ্রন্থাগার স্থানান্তরকরণের কাজ শুরু হয় কিছু পরেই। নতুন ঠিকানা হয় আলিপুরের বেল্ভিডিয়র এস্টেট। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রয়ারি জনসাধারণের জন্য খুলে যায় লাইব্রেরি। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করছিলেন নতুন ঠিকানাটির।

২০০৪ সাল নাগাদ আধুনিকতর ভাষা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে দ্বিতীয়বারের জন্য স্থানান্তরিত হয় ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ততদিনে এসপ্ল্যানেডের রিডিং লাউঞ্জটির অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শোচনীয়। বেল্ভিডিয়র হাউসের মূল সংগ্রহের পাশাপাশি এসপ্ল্যানেডের মজুত যাবতীয় ইনভেন্টরি সেই সময়েই ভাষা ভবনের সংবাদপত্র বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, কলেজের ছাত্র, অফিসযাত্রীদের জন্য শহরের প্রাণকেন্দ্র এসপ্ল্যানেডের ঠিকানাটি থেকে যায় লাইব্রেরির ‘সিটি হাব’-এর ঐতিহ্যবাহী রিডিং লাউঞ্জ হিসেবে। এই ঠিকানার মূল আকর্ষণ ছিল দৈনিক ও সাময়িক পত্রের সংগ্রহ। শহর কলকাতার ছাত্র, গবেষক, বইপ্রেমী, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের নিত্য আনাগোনা ছিল এখানে। নিয়মিত আসতেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন প্রমুখ ব্যক্তিরা। ২০০৪ সাল নাগাদ আধুনিকতর ভাষা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে দ্বিতীয়বারের জন্য স্থানান্তরিত হয় ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ততদিনে এসপ্ল্যানেডের রিডিং লাউঞ্জটির অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শোচনীয়। বেল্ভিডিয়র হাউসের মূল সংগ্রহের পাশাপাশি এসপ্ল্যানেডের মজুত যাবতীয় ইনভেন্টরি সেই সময়েই ভাষা ভবনের সংবাদপত্র বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। তারপর থেকে এসপ্ল্যানেডের ঠিকানাটি কোনও প্রকার রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া কাঠামোগত অবক্ষয়ের কারণে প্রায় আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়। ঐতিহ্যবাহী ঠিকানাটির দিকে পুনরায় প্রশাসনের নজর ফেরে প্রায় দুই দশক পর। শুরু হয় রেস্টোরেশনের পরিকল্পনা। ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল অজয় প্রতাপ সিং ২০২১ সালে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পরই রিডিং লাউঞ্জটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলার তোড়জোড় শুরু করেন। পরিকল্পনা ছিল, আগের মতো দৈনিক ও সাময়িক পত্র তো থাকবেই। সঙ্গে থাকবে বাইশটি তালিকাভুক্ত ভাষার রিপোজিটরি। থাকবে নতুন প্রজন্মের তথ্য অনুসন্ধানকারী ও বইপ্রেমীদের জন্য তথ্য-প্রযুক্তিগত সহায়তা বা ভার্চুয়াল সাপোর্ট।

সেই পরিকল্পনা অবশেষে বাস্তবায়িত হল ২০২৬ সালের ৬ জুলাই। বাইশ বছর পর শহরের বইপ্রেমীদের জন্য আবার খুলেছে ন্যাশনাল লাইব্রেরির সিটি হাব। বিশেষ সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, সংস্কৃতি মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব (লাইব্রেরি) কে.কে. মিশ্র একটি বিশেষ মিটিংয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরির সিটি হাবটি সাধারণ মানুষের জন্য অবিলম্বে খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরুদ্বোধন করা হবে কিছুদিনের মধ্যেই।

বিগত দুইদশকের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে সমগ্র বিশ্বের পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটেছে দ্রুতবেগে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন করে সাজানো হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী ঠিকানা। এখন পেপারব্যাক, হার্ডকভারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিন্ডল। স্টাডি নোটসের জন্য হাতে লেখা নোটবইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে ট্যাব, ডিজিট্যাল নোটবুক। চরম ব্যস্ততার মাঝে অডিওবুক এখন বইপ্রেমীদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কাগজে ছাপা পত্রপত্রিকার পাশাপাশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ডিজিটাল জার্নাল। এই অবস্থায় নতুন, অত্যাধুনিক রূপে ন্যাশনাল লাইব্রেরির রিডিং লাউঞ্জটি পুনরায় অবারিত হওয়া বইপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত সুখকর এবং সুবিধাজনক হবে। প্রশাসনের পরিকল্পনামাফিক, পত্র-পত্রিকা সংগ্রহকে কেন্দ্রে রেখে নির্মিত হয়েছে একটি ডিজিটাল ডেটা সেন্টার। সব বয়সের পাঠকদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে উন্নতমানের আধুনিক পরিকাঠামো। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা একটি বিভাগ। রয়েছে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য একটি আলাদা এরিয়া এবং বিশেষভাবে সমর্থ মানুষদের পড়াশুনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। দ্রুত গতি ওয়াইফাই, চার্জিং স্টেশন এবং কম্পিউটার ডকের বন্দোবস্তও করা হয়েছে। রয়েছে স্মার্ট ফটোকপি মেশিন, যা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবে। খিদে ও তৃষ্ণা মেটাতে থাকছে একটি ছোটো চা-কফি-স্ন্যাক্সের বার। 

অত্যাধুনিক রূপে ন্যাশনাল লাইব্রেরির রিডিং লাউঞ্জটি পুনরায় অবারিত হওয়া বইপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত সুখকর এবং সুবিধাজনক হবে। প্রশাসনের পরিকল্পনামাফিক, পত্র-পত্রিকা সংগ্রহকে কেন্দ্রে রেখে নির্মিত হয়েছে একটি ডিজিটাল ডেটা সেন্টার। সব বয়সের পাঠকদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে উন্নতমানের আধুনিক পরিকাঠামো।

রিডিং লাউঞ্জটি পুনরায় খোলা বইপ্রেমীদের জন্য সুখকর তো বটেই। সঙ্গে আরও একটি কারণে এটি কলকাতা এবং তার সুবিশাল ঐতিহ্যের জন্য অত্যন্ত খুশির খবর। অনীক দত্তের চলচ্চিত্র, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলা যেতে পারে, কলকাতা শহরের ‘ভূত’ সত্যিই বর্তমানকালে অবহেলিত। অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলির নোনাধরা, প্লাস্টারচটা দেওয়ালে ধীরে ধীরে শিকড় ভরে দিচ্ছে বট-অশ্বথ। সেই ‘রুট’ ধরেই আমদানি প্রোমোটারদের কিংবা কোনও বহুজাতিক রিয়েল-এস্টেট সংস্থার। পুরোনো পরিকাঠামোকে ধূলিস্যাৎ করে তল্লাবাঁশের মতো উঠে দাঁড়াচ্ছে একাধিক ‘স্কাইস্ক্র্যাপার’। পুরোনো বাড়িগুলিতে গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির আস্তানা কিংবা সরকারি অফিসগুলির অবস্থাও খুব ভালো নয়। ভেতরে ঝাঁ চকচকে ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ে সাজানো হলেও সুবিশাল ইমারতগুলির বাইরের অংশে গঠনগত অবক্ষয় বেশ চোখে লাগে। এই অবস্থায় ৬, এসপ্ল্যানেড ইস্টের পুনর্নবীকরণ কলকাতা শহরের অবহেলিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যগুলির জন্যও নতুন পথের দিশা। ঐতিহ্যকে জিইয়ে রেখে নতুন সময়ের ছাঁচেই সংরক্ষণ করতে হবে কলকাতার স্থাপত্য।

বই নিয়ে কলকাতার উন্মাদনার মাত্রা ক্রমশ নিম্নগামী নাকি উর্দ্ধগামী সেই বিতর্ক আজকের প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। তবে, বদলাতে থাকা এই যুগে গতানুগতিক ‘বই পড়া’-র চল আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পড়াশুনা, কাজ কিংবা গবেষণার তাগিদে পড়ার বাইরে শুধু পড়ার জন্য পড়া বা সাহিত্যের রসাস্বাদন, বিনোদনের জন্য যে পড়া পড়ত সাধারণ মানুষ; সেই জায়গা দখল করেছে প্রথমে টেলিভিশন এবং পরে স্মার্টফোন। কিন্তু ঐতিহ্যের অবক্ষয়ের ভয়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকেও দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। তাছাড়া, শতকরা ভাগ কমলেও নতুন প্রজন্মের একাংশ এখনও নতুন বইয়ের গন্ধ ভালোবাসে। দেশ-বিদেশের একাধিক জনপ্রিয় লেখা তাদের নখদর্পণে। সঙ্গে কেরিয়ারে অগ্রগতির পড়া তো রয়েছেই। এই সময়ের নিরিখে, ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে নতুন করে সাজানো ন্যাশনাল লাইব্রেরির রিডিং লাউঞ্জ কতটা সফল হবে তা সময়ই বলবে।

__________ 
ছবি: প্রতীকী

Post Tags
Developed by DXDasia