কলকাতার স্ট্রিট লাইব্রেরি : চলার পথে বই-বন্ধু

ঘুরে দেখুন শহরের চারটি স্ট্রিট লাইব্রেরি

হিংসায় উন্মত্ত এই পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্লভ দুটি শব্দ, বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব। কিন্তু দুই মলাটের মাঝের সাদা পৃষ্ঠার ওপর কালো হরফের সঙ্গে যাদের বন্ধুত্ব, তারা বোধহয় এই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী। কারণ, বইয়ের মতো বিশ্বস্ত বন্ধু আর কে আছে? তা সে হলদে হয়ে আসা পুরোনো বই হোক বা নতুন কাগজে ছাপার কালির গন্ধ মাখানো সদ্য কেনা বই। তবে, দুনিয়া জুড়ে প্রযুক্তির দখলদারিতে বইয়ের প্রতি মানুষের টান হয়তো কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু এমন বন্ধুকে কি হারিয়ে যেতে দেওয়া যায়? নতুন এবং আগামী পৃথিবীর সঙ্গে বইয়ের আলাপ করিয়ে দেওয়া আসলে মানুষকে খানিকটা থিতু হতে দেওয়া, ভাববার অবকাশ দেওয়া। (কলকাতার স্ট্রিট লাইব্রেরি)

কলকাতার মতো ব্যস্ত শহরে নাগরিক কোলাহল পথিকের জন্য ক্লান্তিকর। মন চায় একটু বিশ্রাম। চলার পথে এমনই কিছু বই ঘেরা বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা আছে শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে। উত্তর কলকাতার জগৎ মুখার্জি পার্ক, শ্যামবাজারের দেশবন্ধু পার্ক সংলগ্ন উত্তরের আড্ডা, দক্ষিণ প্রান্তের পাটুলিতে পাটুলি স্ট্রিট লাইব্রেরি ইত্যাদি ঠিকানা বইপ্রেমী মানুষের কাছে তপ্ত বৈশাখে যেন এক পশলা বৃষ্টি। শুধু বইপোকা মানুষের জন্য নয়, রাস্তার ধারের এই বিনামূল্যের গ্রন্থাগারগুলি সাধারণ মানুষকে বইয়ের কাছাকাছি আনে, বই-ভালোবাসতে শেখায়, শিশুদের সুস্থ মননের দিশারি করে তোলে। এখানে রইলো তেমনই কিছু মানুষের খোঁজ, যাঁদের উদ্যোগ এবং কর্মকাণ্ড জানান দেয়, কলকাতা যায়নি ম’রে আজো। (কলকাতার স্ট্রিট লাইব্রেরি)

শুধু বইপোকা মানুষের জন্য নয়, রাস্তার ধারের এই বিনামূল্যের গ্রন্থাগারগুলি সাধারণ মানুষকে বইয়ের কাছাকাছি আনে, বই-ভালোবাসতে শেখায়, শিশুদের সুস্থ মননের দিশারি করে তোলে। এখানে রইলো তেমনই কিছু মানুষের খোঁজ, যাঁদের উদ্যোগ এবং কর্মকাণ্ড জানান দেয়, কলকাতা যায়নি ম’রে আজো।

জগৎ মুখার্জি পার্ক লাইব্রেরি

জগৎ মুখার্জি পার্ক লাইব্রেরি
শহরের ব্যস্ততম এক রাস্তা চিত্তরঞ্জন এভিনিউ। এই রাস্তার সঙ্গে জুড়ে আছে নাট্যকার গিরিশ ঘোষ, শোভাবাজার রাজবাড়ি, নেতাজির মহানিষ্ক্রমণ, জগৎ মুখার্জি পার্কের কথা (Jagat Mukherjee Park Library)। ২০১০ থেকে ধীরে ধীরে এক ইতিহাস জুড়ে যায় জগৎ মুখার্জি পার্কের সঙ্গে। ওই বছর পার্কে নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্বে কাজে যোগ দেন সত্যরঞ্জন দলুই। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর হাত ধরেই কলকাতার একটি সাধারন পার্ক হয়ে ওঠে উদ্যান-গ্রন্থাগার। 

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সুন্দরবনের ভূমিপুত্র, সত্যরঞ্জনবাবুর বড়ো হয়ে ওঠা মাটিকে আঁকড়ে ধরেই। রুটিরুজির তাগিদ যখন তাকে নিয়ে এলো শহুরে কংক্রিটের দুনিয়ায়, তখন হয়তো কোথাও তিনি খুঁজে বেড়াতেন সেই গ্রাম্য কোমলতা। ভৌগলিক ভাবে গ্রাম এবং শহরের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও নাগরিক ব্যস্ততা যে কলকাতার প্রাণকে শুষ্ক করে দিতে পারেনি, তা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। সবুজকে ভালোবেসে নানা ধরনের গাছ দিয়ে সাজিয়ে তোলেন পার্কটি। বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। পাশ্ববর্তী স্কুলে ছেলেমেয়েদের পৌঁছে দিয়ে অভিভাবকরা গল্পগুজব করে সময় কাটাতে আসতেন জগৎ মুখার্জি পার্কে। ঠিক এই সময়ই একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন সত্যরঞ্জন। পার্কে আসা মানুষজন সময় কাটাতে পড়াশোনা করুন, মেতে উঠুন স্বাস্থ্যকর আড্ডায়, এই ছিল তার সব স্বপ্ন। সেই কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় নিজের বেতনে একটু একটু করে গড়ে তুললেন উদ্যান-গ্রন্থাগার। নিজের উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করলেন বই, সাজালেন তার সাধের বইঘর। পার্কে সময় কাটাতে আসা মানুষেরা এবার থেকে হাতে তুলে নিতে থাকলেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, বই। এভাবেই মানুষের সঙ্গে বইয়ের আত্মীয়তা গড়ে তুললেন সত্যরঞ্জন।

তারপর কেটে গেছে দেড় দশক, এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে হানা দিয়েছে কোভিড। তখনও স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই উদ্যান চলেছে নিজস্ব ছন্দে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মানুষকে বইমুখী করার পাশাপাশি কারো অসুস্থতায় তাকে সহায়তা করার ব্রতও গ্রহণ করেছেন সত্যরঞ্জন বাবু। বই ঘরের উঠোনে তাই জায়গা করে নিয়েছে স্ট্রেচার। শুধু তাই নয়, বাতিল পুরোনো টেলিফোন রিসিভার, টেপ-রেকর্ডার ইত্যাদি সবকিছুই তাদের নতুন ঠিকানা খুঁজে পায় এই পার্কে। চারপেয়েরাও এখানে বাস করে পরম নিশ্চিন্তে।
_______________ 
ঠিকানা: ১, যতীন্দ্র মোহন অ্যাভিনিউ, শোভাবাজার। সময়: সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা।

উত্তরের আড্ডা

উত্তরের আড্ডা
নির্ভেজাল আড্ডা উত্তর কলকাতার বৈশিষ্ট্য। ভালো ভালো কতকিছু উঠে এসেছে এইরকম আড্ডার আসর থেকে; যেমন, শ্যামবাজার সংলগ্ন উত্তরের আড্ডা (Uttorer Adda)। এলাকার প্রাতঃভ্রমণকারীরা চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে পরিকল্পনা করেন একটা লাইব্রেরি হলে কেমন হয়? ওই ভাবনা থেকেই প্রশাসনের সহায়তায় চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করেই দেশবন্ধু ক্লাবের কাছে ২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ শিক্ষক দিবসের দিন থেকে উত্তরের আড্ডা হয়ে উঠেছে স্ট্রিট লাইব্রেরি, যা  পাঠকদের জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। সংগঠনের অন্যতম সদস্য শম্ভু সাহা বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, মধ্য রাত পেরিয়ে রাত যখন প্রায় আড়াইটে তখনও কোনও কোনও বইপ্রেমী পাঠক বই পড়ায় মগ্ন থাকেন। ৮ থেকে ৮০ সকলেরই সুস্থ আড্ডার ঠেক এই উত্তরের আড্ডা।
_________ 
ঠিকানা: রাজা দিনেন্দ্র স্ট্রিট, শ্যামবাজার (দেশবন্ধু পার্কের বিপরীতে)। সময়: ২৪ ঘণ্টা খোলা।

জ্ঞান ও শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যারা সমকাল ও আগামীকে পথ দেখায়, তারাই প্রমাণ করে পৃথিবীটা এখনো স্বার্থপরের কুক্ষিগত হয়ে যায়নি। যাঁরা বইকে ভালোবাসতে শেখান, তাঁরা হিংস্র সভ্যতার চোখে চোখ রেখে নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে রক্ষা করেন সুস্থ সভ্যতাকে, পৃথিবীকে করে তোলেন আগামীর বাসযোগ্য।

পাটুলি স্ট্রিট লাইব্রেরি

পাটুলি স্ট্রিট লাইব্রেরি
নতুন প্রজন্ম নতুন করে পথ দেখায় প্রবীণদের। কিংশুক হালদার এইরকমই নতুন এক পথের দিশারী। বইপাগল এই কিশোরের সরল চিন্তা-ভাবনাই জন্ম দিয়েছে পাটুলি স্ট্রিট লাইব্রেরির (Patuli Street Library)। কিংশুকের মা কুমকুম হালদার কথা বলছিলেন বঙ্গদর্শন.কমের সঙ্গে, জানালেন কোভিড কালে কিংশুক লক্ষ্য করে তার বন্ধু-বান্ধবরা সকলেই বই থেকে দূরে সরে গিয়ে ক্রমশ মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। সেই সময়ই একদিন বাড়ির পুরোনো বইয়ের যত্ন-আত্তি করতে গিয়ে হঠাৎই প্রস্তাব দেয় বাড়ির বই দিয়ে যদি ছোটোখাটো লাইব্রেরি করা যায়, কেমন হয়? তার এই প্রস্তাবে পাশে দাঁড়ায় পরিবার। বাড়ির পুরোনো রেফ্রিজারেটর রূপান্তরিত হয় বইয়ের আলমারিতে, স্থানীয় দোকানের পাশে রাখা হয় সেই রেফ্রিজারেটর। তারপর পেরোতে হয়েছে বেশ কিছু ঝড়-জলের দিনও। হাল ছাড়েননি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেকে পাশে দাঁড়িয়েছেন, বই দিয়েছেন। মাতৃভাষা দিবসের দিন রেফ্রিজারেটরের মধ্যে দিয়ে যে গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি একটি ছাদ পায়। সাতশো বই নিয়ে শুরু হওয়া গ্রন্থাগারটিতে বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট হাজার। 

শুধু পাটুলিতে নয়, হালদার পরিবারের উদ্যোগে এবং স্থানীয় মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত এলাকা যেমন সুন্দরবন, কুলতলি প্রভৃতি অঞ্চলে প্রায় কুড়িটি এই ধরনের গ্রন্থাগার তৈরি হয়েছে। বোলপুরে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারও। কুমকুম জানালেন, এই ধরনের গ্রন্থাগার নির্মাণের শর্ত একটাই, পাঠকদের কাছে কোন আর্থিক মূল্যের বিনিময় চলবে না। এই গ্রন্থাগারগুলির সদস্য হওয়ার যায় শুধুই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, সমাজের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার মানসিকতার নিরিখে।
____________ 
ঠিকানা: আর/ ৫৩, যোজনগন্ধা কো-অপরাটেভি হাউজিং সোসাইটি, বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি। ফোন: 9830521006।

লিটল ফ্রি লাইব্রেরি

লিটল ফ্রি লাইব্রেরি
এই লাইব্রেরিটি পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে চলে। লেক মলের কাছে অবস্থিত লিটল ফ্রি লাইব্রেরি (Little Free Library) হলো একটি বিনামূল্যে বই আদান-প্রদানের স্থান, যা একটি সম্মানজনক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এখানে কোনো ফি বা সদস্যপদ ছাড়াই মানুষ একে অপরের সঙ্গে বই বিনিময় করতে পারেন।
____________ 
ঠিকানা: ৬এ, মহারাজা নন্দকুমার রায় রোড (লেক মলের পাশে)। সময়: ২৪ ঘণ্টা খোলা।

আঁধার থেকে আলোর পথে এগোনো মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য, কিন্তু বিভিন্ন কারণে দিকভ্রষ্ট হয় অনেকেই। কিন্তু জ্ঞান ও শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যারা সমকাল ও আগামীকে পথ দেখায় তারাই প্রমাণ করে, পৃথিবীটা এখনো স্বার্থপরের কুক্ষিগত হয়ে যায়নি। যাঁরা বইকে ভালোবাসতে শেখান তাঁরা হিংস্র সভ্যতার চোখে চোখ রেখে নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে রক্ষা করেন সুস্থ সভ্যতাকে, পৃথিবীকে করে তোলেন আগামীর বাসযোগ্য।
___________ 
উত্তরের আড্ডার ছবি: তর্পণজিৎ, বাকি ছবির সূত্র অন্যত্র

Post Tags
Developed by DXDasia