চুপির মাটির পুতুল : অন্তঃপুরবাসিনীদের অন্তরস্পর্শী শিল্প

সারিবদ্ধ বিশালাকায় গাছগুলো ক্রমাগত হাওয়ার তালে দুলে চলেছে। পাতার ফাঁকে ঝিকমিক করছে সূর্য। পিচঢালা পথ একেবেঁকে গেছে। সেই পথের ধারে পুরনো দেবালয় ফেলে আসা স্মৃতিগুলোকে আগলে রেখেছে। এখনো গাছের তলায় গোল হয়ে বসে গ্রামীণ জীবনের গল্প করার রীতি সজীব হয়ে রয়েছে। টোটোয় বসে সেইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। হঠাৎ চালক বলে উঠলেন, পালপাড়া এসে গেছে। সম্বিত ফেরে। বাংলার মাটির পুতুলের ঐতিহ্যকে যে সকল পটুয়া পাড়া আজও টিকিয়ে রেখেছে, তার মধ্যে অন্যতম, পূর্ব বর্ধমান পূর্বস্থলীর চুপি পালপাড়া। এখানকার মৃৎশিল্পীরা আজও চড়ক এবং রথযাত্রার সময় মাটির পুতুল তৈরি করে থাকেন। মূলত মেলা উপলক্ষেই এই পুতুলগুলি তৈরি করা হয়। এখনও পূর্বস্থলী ও সংলগ্ন অঞ্চলের শৈশবের ভালো লাগা মিশে আছে চুপির পালপাড়ায় তৈরি মাটির পুতুলে। পূর্বস্থলীতে একাধিক পালপাড়া বা পটুয়াপাড়া থাকলেও বর্তমানে এই চুপির পালপাড়াতেই মাটির পুতুল ও মাটির খেলনাবাটি তৈরির রীতি আজও বজায় রেখেছেন এখানকার অন্তঃপুরের মৃৎশিল্পীরা।

‘অন্তঃপুর’ বলার কারণ, এখানকার বেশিরভাগ মৃৎশিল্পীই নারী। পাঁচিলে ঘেরা বাড়ির বারান্দায় বসে তাঁরা নীরবে শিল্পের সাধনা করে চলেন। বাড়ির বারান্দা, সিঁড়িরতলা, খাটেরতলা অথবা ঘরের মেঝের উপর সুসজ্জিতভাবে রাখা থাকে মাটির পুতুলগুলি। তার ওপর তুলির টান দিয়ে চলেন সেইসব অন্তঃপুরের মৃৎশিল্পীরা। চুপির পালপাড়ায় রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটলে বোঝাই যাবে না যে বাড়ির ভেতর এক বিশাল শিল্পের কর্মযজ্ঞ চলছে। কিন্তু মৃৎশিল্পীদের বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। সেখানে আজও বেঁচে রয়েছে বাঙালির অতি চেনা, ঐতিহ্যবাহী মাটির পুতুল।

‘অন্তঃপুর’ বলার কারণ, এখানকার বেশিরভাগ মৃৎশিল্পীই নারী। পাঁচিলে ঘেরা বাড়ির বারান্দায় বসে তাঁরা নীরবে শিল্পের সাধনা করে চলেন। বাড়ির বারান্দা, সিঁড়িরতলা, খাটেরতলা অথবা ঘরের মেঝের উপর সুসজ্জিতভাবে রাখা থাকে মাটির পুতুলগুলি।

চুপির পালপাড়ায় আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল, মৃৎশিল্পী প্রবীর পালের সহধর্মিনী পূর্ণিমা পাল। প্রবীরবাবু কাঠামোর প্রতিমা তৈরি করতে বছরের বেশিরভাগ সময়টাই থাকেন কলকাতার কুমোরটুলিতে। কখনো রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিমা তৈরির কাজেও তাঁকে ছুটে যেতে হয়। অন্যদিকে তাঁর সহধর্মিনী এই নিঃসঙ্গতার মাঝে আপন মনে তৈরি করে চলেন মাটির পুতুল। মাটির পুতুল নির্মাণের মধ্যে দিয়ে নিজের স্বাক্ষর রেখে চলেন মৃৎশিল্পী পূর্ণিমা পাল। শিল্পীর কথায় মাটির পুতুল তৈরির ঐতিহ্য তাঁর পরিবারের মধ্যে রয়েছে। সেই ধারাই তিনি এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। কিন্তু মাঝের আটটা বছর অসুস্থতার জন্য পুতুল তৈরি থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন।

২০২৩ সাল থেকে আবার পুতুল তৈরির কাজ শুরু। আটবছর কাজ বন্ধ থাকার ফলে ছাঁচগুলো নষ্ট হয়ে যায়। সব ছাঁচ নতুন করে তৈরি করতে হয়। তাঁর তৈরি করা সবকটি পুতুলই পোড়ামাটির। মূলত চড়ক এবং রথযাত্রা উপলক্ষে পুতুলগুলি তৈরি করা হয়। চড়কের তুলনায় রথের সময় বিপুল সংখ্যক পুতুল তৈরি হয়। পূর্বস্থলীর রথতলা হাটে যে রথের মেলা বসে সেখানেই পুত্রবধূকে নিয়ে পুতুল বিক্রি করতে আসেন পূর্ণিমা পাল। নারীজীবনের চিরাচরিত ধারা প্রস্ফুটিত হয়েছে তাঁর পুতুলে। কিন্তু এর মধ্যে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের ছাপ রেখেছেন শিল্পী। তাঁর তৈরি পুতুলগুলো মাথা উঁচু করে চোখে চোখ রেখে সমাজের দিকে সদর্পে ও সগর্বে তাকিয়ে থাকে। শিল্পীর তৈরি পুতুলগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো কলসি কাঁখে এগিয়ে চলা বউ পুতুল। উদ্যত স্তন যুগল। সুস্পষ্ট বিভাজীকা। লম্বাটে গলা। চওড়া কটিদেশ ও নিতম্ব। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে রয়েছে পুতুলটি। গোলাকার মুখমণ্ডলের মধ্যে লাবণ্য মাখা হাসি প্রস্ফুটিত হয়েছে। সোনালীরঙা কলসিকে আলতো স্পর্শ করে রয়েছে। ঘোমটার ফাঁক থেকে চুলের রেখা দেখা যায়। হাত এবং গলায় সোনালি রঙের মালা এবং বালা। মাথায় ঘোমটা থাকলেও তা পুতুলটির ব্যক্তিত্বকে খাটো করতে পারেনি। সে যেন সদর্পে মাথা উঁচু করে লাস্যময়ী ভাব নিয়ে বেঁচে থাকার অঙ্গীকারে এগিয়ে চলেছে। যেন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিস্পর্ধি হয়ে নিজেকে মেলে ধরেছে। একই সঙ্গে পুতুলে ফুটে উঠেছে লালিত্যমাখা ভাব।

পুতুলটির শাড়ির রং কখনো লাল তো কখনো কমলা। শিল্পীর তৈরি আর একটি পুতুল হচ্ছে সখি পুতুল। এই সখি পুতুলের মধ্যে নারীর দেবীত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেখতে অনেকটা ছোট ছাঁচের লক্ষ্মী প্রতিমা। সিংহাসন বা কেদারায় বসা ভঙ্গিমায় পুতুলটির বিন্যাস ঘটানো হয়েছে। লাল রঙের শাড়ি। মাথায় মুকুট। পুতুলটির মধ্যে লাবণ্যময়ী কর্তব্যভাব দেখা যায়। উল্লেখ করা যেতে পারে এই সব পুতুলগুলি পোড়ামাটির দুই খোল ছাঁচের তৈরি। এছাড়া বরবউ পুতুলের মধ্যেও লিঙ্গসমতার ভাবনাকে লক্ষ্য করা যায়। হবু বরের পাশে মাথায় মুকুট পরে বসে রয়েছেন এলোকেশী সহধর্মিনী। পুরুষতন্ত্র নববধূর ওপর লাজুক অভিব্যক্তির ভার যে ভাবে চাপিয়ে দেয় তার থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এই বরবউ পুতুলের বউ পুতুলটি। ভরাট মুখমণ্ডলে দেখা যায় ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিভা। এছাড়াও শিল্পীর উল্লেখযোগ্য পুতুলগুলি হল ফ্রক পরে, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়া মেয়ে পুতুল, ঘাড়নাড়া বুড়ো দাদু, জোকার, ঝাঁকপাখি, বাঘ, প্রজাপতি, সিংহ, হাঁস, মকর, খরগোশ পুতুল। এখানে শিল্পীর তৈরি আরো একটি পুতুল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনাবৃত উর্ধাঙ্গ, কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, মেদবহুল স্থূল শরীর, টেরিকাটা চুল, লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে চলা এই পুতুলে অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীর ছাপ লক্ষ্য করা যায়। পুতুলটির শরীরের গঠন দেখে মনে হয় শিল্পী যেন পুরুষতন্ত্রকে ব্যঙ্গ করেছেন।

পূর্ণিমা পালের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রূপকথার পরীদের খোঁজে অ্যালুমিনিয়ামের দরজা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম মৃৎশিল্পী গোপাল পালের বাড়িতে। বছরের বাকি সময়টা পরিযায়ী মৃৎশিল্পী হিসেবে রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাঠামোর প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত থাকলেও চড়ক এবং রথযাত্রার সময় তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। সহধর্মিনী, পুত্র, কন্যা এবং নাতির সহযোগিতায় তৈরি করেন বিভিন্ন শৈলী ও আঙ্গিকের মাটির পুতুল। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল পরী পুতুল। মাথায় লালটুপি। পরনে ফ্রক। হাত দুটো নমস্কারের মুদ্রায় ব্যক্ত হয়েছে। পিঠের দিকে দুটি সাদারঙের ডানা সেই কিশোরীকে পরীতে রূপান্তর করেছে। শিল্পীর তৈরি পুতুলের মধ্যে বউ, ঝাঁকপাখি, গাছের ডালে বসে থাকা পাখি, ধানের গোলার উপরে বসে থাকা পাখি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শিল্পীর তৈরি মাটির বাড়িতে খুব সুন্দর করে নান্দনিক আলপনা দেওয়া। এছাড়াও রয়েছে পোড়ামাটির রান্নাবাটি, জাঁতাপেশাই, মাটির তৈরি ট্রাক গাড়ি। প্রসঙ্গত, এই মাটির তৈরি ট্রাকগাড়ি আগে কখনো দেখিনি। উত্তর ২৪ পরগনার নজর নগরে যে ধরনের গাড়ি দেখতে পাওয়া যায় তার থেকে এটি আলাদা। নজরনগরের গাড়িগুলোতে চাকা আলাদা করে লাগানো। এক্ষেত্রে ট্রাকটির চাকা মূল ছাঁচের সঙ্গেই রয়েছে। শিল্পীর বাড়ির উঠোনে দেখতে পেলাম তাঁর নাতি ও কন্যা তুলি দিয়ে পুতুলগুলির ওপর রঙের প্রথম আস্তরণ দিচ্ছে।

ছোট্ট একটি মাটির কলসির গায়ে লোকজ আঙ্গিকের তুলির টান মনকে মুগ্ধ করে দেয়। রথ উপলক্ষে তিনি তৈরি করেন জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলভদ্র এবং হামাগোপাল। ছলনের ঘোড়াও দেখতে পাওয়া যায় তাঁর তৈরি সৃষ্টিতে।

সংসার সীমান্তে দাঁড়িয়ে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিবারকে একাই টেনে নিয়ে চলেছেন মৃৎশিল্পী কাকলি পাল। তাঁর পুতুলের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হাতিপুতুল। হাতির পিঠে এবং শুঁড়ে অনিন্দ্য সুন্দর আলপনার শৈলীর রেখাঙ্কন শিশুমনকে মুগ্ধ করে দেয়। এছাড়াও কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে পড়তে যাওয়া মেয়ে পুতুল, বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি পুতুল তিনি তৈরি করে থাকেন। পুতুলের গায়ে শিল্পী চড়া রং দিতে বেশি পছন্দ করেন। বাচ্চাদের খেলার রান্নাবাটিতেও শিল্পী তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ছোট্ট একটি মাটির কলসির গায়ে লোকজ আঙ্গিকের তুলির টান মনকে মুগ্ধ করে দেয়। রথ উপলক্ষে তিনি তৈরি করেন জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলভদ্র এবং হামাগোপাল। ছলনের ঘোড়াও দেখতে পাওয়া যায় তাঁর তৈরি সৃষ্টিতে।

কাকলি পালের ঠিক পাশের বাড়িতেই থাকেন মৃৎশিল্পী অনিতা পাল। তাঁর বাড়ির লাল রঙের বারান্দায় সারিবদ্ধভাবে বসে আছে পুতুলগুলো। নারীজীবনের আখ্যান ও শকুন্তলা পুতুলের পাশাপাশি আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছে ‘বডি বিল্ডার’ পুতুল। শিল্পীর তৈরি বরবউ পুতুলের মধ্যে বিশেষ একটি অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়। বিয়ের মুহূর্তে বরের কাঁধে মাথা দিয়ে রয়েছে বউ। সোহাগে ভালোবাসায় এক মিষ্টতার ভাব এক্ষেত্রে প্রস্ফুটিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চুপির পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা ঝুলন এবং জন্মাষ্টমীর সময় আলাদা করে শ্রীকৃষ্ণের লীলামাহাত্ম্য তৈরি করেন না। মূলত তাঁরা চড়ক এবং রথযাত্রার সময় শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধিকা, হামাগোপালের তৈরি করে থাকেন। অনিতা পালের কাছে ছোটো ছাঁচের লোকনাথ বাবারও দেখা মিললো।

অনিতা পালের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন পূর্বস্থলী স্টেশন ফিরে যাব বলে স্থির করলাম, তখনই একটি বাড়ির বারান্দা থেকে কয়েকটি পুতুল উঁকি দিচ্ছিল। তার মধ্যে যে রকম শকুন্তলা পুতুল ছিল ঠিক তেমনি ছিল লোকজ আঙ্গিকে তৈরি বরবউ পুতুল। এক মহিলা মৃৎশিল্পী ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলে। জানালেন, তিনিই এই পুতুলগুলি তৈরি করেছেন। একাধিক বার জানতে চাইলেও, অন্তঃপুরবাসিনী মৃৎশিল্পীটি একবারও নিজের নামটি বললেন না। শুধু বললেন তাঁর স্বামীর নাম মৃৎশিল্পী প্রদীপ পাল। তিনি স্বামীর পরিচয়ে পরিচিতি পেতে চান। এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে এই সকল শিল্পীরা মানুষের অন্তরকে নিজেদের শিল্পসত্তা দিয়ে স্পর্শ করে যান, কিন্তু নিজেদের পরিচয়, নিজেদের ব্যক্তিত্বকে অন্তঃপুরেই আড়াল করে রাখেন। সেই আড়াল থেকেই উৎসারিত বোধ বাংলার লোকশিল্পভাবনাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।

কৃতজ্ঞতা: আকাশ বিশ্বাস

Written by
Developed by DXDasia