সন্ধ্যা রায় পুতুল : লোকশিল্পে যেভাবে ঢুকে পড়ল বাংলা সিনেমা

বাংলার পুতুলশিল্পে বাবা তারকনাথ ছবির সন্ধ্যা রায়

টানা চোখ। গোলগাল মুখমণ্ডলে হাল্কা হাসি। কপালে টিপ। এলোকেশী নববধূ এগিয়ে চলেছে কাঁধে বাঁক নিয়ে, মহাদেবের উদ্দেশ্যে। হাতে পলা। লাল পেড়ে হলুদ শাড়ি পরে এগিয়ে চলেছে সে নারী নিজের স্বামীকে রক্ষা করার অঙ্গীকার নিয়ে। লাল, কমলা রঙের মিশ্রণে তৈরি মাটির গামছা কোমর বন্ধনী হয়ে রমনীর অভিব্যক্তিকে অঙ্গীকারে পরিণত করেছে। রমণীর বাম হাতটি বাঁকটিকে ধরে রেখেছে। কাঁধের মধ্যে থাকা বাঁকে রয়েছে দু’টি মাটির ঘট। তার ঠিক পাশেই এক চূড়া বিশিষ্ট চার চালার শিব মন্দির। মন্দিরের ভেতর থেকে শিবলিঙ্গ দেখা যাচ্ছে। রমণী ও শিব মন্দিরটি একটি মাটির ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাঁচা মাটির তৈরি এক খোল ছাঁচের এই পুতুলটি আজও বহন করে চলেছে বাংলা চলচ্চিত্রে স্বর্ণযুগের গৌরবজ্জ্বল অতীতকে। পুতুলটির নাম সন্ধ্যা রায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনা-র ডায়মন্ড হারবার থানার অন্তর্গত বড়িয়া গ্রামের চিত্রকর পাড়ায় পুতুলটি তৈরি করে থাকেন শিল্পী পঙ্কজ চিত্রকর।

ভাবতে অবাক লাগে যে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবির একটি চরিত্র কিভাবে আজও বাংলার পুতুলশিল্পে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। বাংলার পুতুলশিল্পে চলচ্চিত্রের প্রভাবের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সন্ধ্যা রায় পুতুল। অথচ সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায় নামাঙ্কিত কোনও পুতুলের খোঁজ এখনও মেলেনি। কিন্তু সন্ধ্যা রায় নামাঙ্কিত পুতুলটি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু কেন এই পুতুলটির জনপ্রিয়তা সর্বাধিক ছিল সেই বিষয়ে খোঁজ করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সাতের দশকে।

সেই সময় অর্থাৎ সাতের দশকে তারকেশ্বরে যাওয়ার সময় কাঁধের বাঁক কিভাবে শৈল্পিক নৈপূণ্যতায় তারকেশ্বর মন্দিরের ছোটো সংস্করণ সাজানো হতো, গ্রামীণ মেলার দৃশ্যাবলী যেখানে কাঠের নাগরদোলা, মাটির পুতুল সেটাও আমরা এই ছবিতে দেখতে পাই।

১৯৭৭ সালে অর্ধেন্দু চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত বাবা তারকনাথ ছবিটি মুক্তি পায়। মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সন্ধ্যা রায় এবং বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অনুপ কুমার, গীতা দে, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। সেটি পুরোদস্তুর রঙিন ছবি ছিল। শিল্প নির্দেশক সত্যেন রায়চৌধুরী ছায়াছবিটির সেট ডিজাইনে বাংলা লোকসংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। গ্রামের মাটির বাড়ির দেওয়ালে কুলঙ্গি ও তাকে ঘিরে আলপনা শৈলী থেকে শুরু করে ঘরের দেওয়ালে লক্ষ্মী সরা, উঠোনে মাটির তুলসী মঞ্চ। সবেতেই যত্নশীল ছিলেন তিনি। এছাড়াও সেই সময় অর্থাৎ সাতের দশকে তারকেশ্বরে যাওয়ার সময় কাঁধের বাঁক কিভাবে শৈল্পিক নৈপুণ্যতায় তারকেশ্বর মন্দিরের ছোটো সংস্করণ সাজানো হতো, গ্রামীণ মেলার দৃশ্যাবলী যেখানে কাঠের নাগরদোলা, মাটির পুতুল সেটাও আমরা এই ছবিতে দেখতে পাই। রঙিন ছবির সঠিক প্রায়োগ পরিচালক এই ছবিতে করেছিলেন। বাউল গান, বহুরূপীদের গান, ঘুমপাড়ানি গান, পায়ে হেঁটে তারকেশ্বর যাওয়ার দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে কলাকুশলীরা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। অন্যদিকে শৈব সাধনা ও অন্যান্য লৌকিক উপাদানগুলোকে গল্পের মধ্যে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল।

সুধা নামের চরিত্রে সন্ধ্যা রায়ের অসাধারণ অভিনয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বামীর প্রাণ রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে কাঁধে বাঁক নিয়ে পায়ে হেঁটে রোদ ঝড় জলকে উপেক্ষা করে তারকেশ্বরের উদ্দেশ্যে ছুটে চলার যে আকুতি নিজের শরীরী ভাষায় ও মুখের অভিব্যক্তিতে তিনি তুলে ধরেছিলেন তা আজও গ্রামবাংলায় স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। পরিচালক যেন তার মধ্যে দিয়েই বেহুলার মতো মরিয়া হয়ে ওঠার ভাবকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এছাড়া আঁকাবাঁকা মেঠো পথ দিয়ে এগিয়ে চলা গরুর গাড়ি। পুকুর পাড়ে বসে বাসন মাজা। সবেতেই নিখাদ বিশ্বাসযোগ্যভাবে দর্শকদের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল। বাবা তারকনাথ ছবিটির শুটিংয়ের লোকেশনের তালিকায় জনপ্রিয় তিনটি তীর্থক্ষেত্র কালীঘাট, তারকেশ্বর, দক্ষিণেশ্বর ছিল।

অন্যদিকে বাংলায় শৈব আরাধনার ঐতিহ্য রয়েছে। মনসামঙ্গল কাব্যের চাঁদ সওদাগরের শিবভক্তির কথা আমরা সকলেই জানি। ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা বাংলার ইতিহাস বইতে চন্দ্রকেতুগড়ের রাজার শিব পুজোর বিবরণ আমরা জানতে পারি। ফলে ইতিহাস, লোক ঐতিহ্য, চলচ্চিত্রে অভিনয় ক্ষমতার মিশেলে তৈরি হয় ছয় ইঞ্চি উচ্চতার সন্ধ্যা রায় পুতুল। পুতুলটির পাশে থাকা মন্দিরটির উচ্চতা সাড়ে তিন ইঞ্চি। উক্ত মন্দিরটি তারকেশ্বর মন্দিরের ছোটো সংস্করণ। ছবির মধ্যে বাঁকে করে জল নিয়ে যাওয়ার সময় সন্ধ্যা রায়ের মুখের পেশিতে যে উৎকণ্ঠা ছিল সেটা এই পুতুলের দেখা যায় না। শিশু মনে আনন্দ দান করার জন্য হয়তো শিল্পী পুতুলটির মুখের মধ্যে একটা হাল্কা হাসির রেখা দিয়েছেন। টানা চোখ পটচিত্র অঙ্কনশৈলীর পরিচয় বহন করে। পুতুলটির শাড়ির কুচির প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট ভাবে শিল্পী ফুটিয়ে তুলেছেন। পাশাপাশি মুখমণ্ডলের সঙ্গেও সন্ধ্যা রায়ের সাদৃশ্য রয়েছে। 

বড়িয়া চিত্রকর পাড়ায় আগে প্রতিটা ঘরেই চড়ক ও রথের মেলার প্রাক্কালে বিপুল পরিমাণে এই পুতুল তৈরি হতো। বর্তমানে কেবল পঙ্কজ চিত্রকর এই সন্ধ্যা রায় পুতুলের ধারাকে ধরে রেখেছে। এ বছরও চড়ক উপলক্ষ্যে সন্ধ্যা রায় পুতুল বানিয়েছিলেন শিল্পী। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এই পাড়ায় আগে চিত্রকর শিল্পীরা পটচিত্র আঁকতেন। সেই কারণেই হয়তো পুতুলের টানা চোখে পটচিত্রের ছোঁয়া রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কল্যাণপুরের চড়কের মেলায় শিল্পী পুতুলগুলো নিয়ে বসেছিলেন। আগে বছরে দুই বার পুতুল তৈরি করতেন তিনি। শিবরাত্রি উপলক্ষে বৈদ্যনাথের মেলায় শিল্পীর দেখা মিলত। কিন্তু এখন শুধু চড়কের মেলাতেই পুতুল নিয়ে বসেন। অভ্রের চড়া রঙের মিশ্রণে সন্ধ্যা রায় পুতুলের গা থেকে একটা উজ্জ্বলতা বেরিয়ে আসে। যা আজও শিশু মনকে আনন্দ দিয়ে চলে। 

পঙ্কজ চিত্রকরের তৈরি অন্যান্য পুতুলগুলো মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাঘ, সিংহ, হরিণ, পেখম তোলা ময়ূর, কোট প্যান্ট পরা ঘাড় নাড়া বুড়ো পুতুল, মাটির বাড়ি, ঝাঁকপাখি পুতুল। তার তৈরি রঙিন শিব প্রতিমার মধ্যে বাঙালি পিতৃত্বের নির্যাস রয়েছে। পঙ্কজ বাবু পিতা অধীর ও মা ভারতী চিত্রকরও সন্ধ্যা রায় পুতুল বানাতেন। বড়িয়া চিত্রকর পাড়ার আরো এক শিল্পী কমল চিত্রকর নাচুনী পুতুল বানিয়ে থাকেন। 

পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিদ্যাধর নগরের বাখরাহাটের বছর ৬৫-র শিল্পী বকুল পালের কথায় আজও রথের মেলায় সন্ধ্যা রায় পুতুলের চাহিদা রয়েছে। একটা সময় বিপুল পরিমাণে এই পুতুল বানাতেন তিনি। কিন্তু এখন বয়সজনিত কারণ ও চোখের সমস্যার জন্য পুতুল খুব একটা তৈরি করেন না। তবে শিল্পীর কথায় আজও গ্রামীণ শিশুদের মনে এই পুতুলের মাহাত্ম্য অপরিসীম। 

এদিকে উত্তর ২৪ পরগনা-র বেলঘরিয়ার নিমতার বর্ষীয়ান মৃৎশিল্পী আরতি পাল বাঁক কাঁধে তারকেশ্বরে জল নিয়ে যাওয়া মেয়ে পুতুল তৈরি করে থাকেন। পাশাপাশি শিবলিঙ্গের মাথায় বেলপাতা দিয়ে জল ঢালছে একজন নারী পুতুলও তৈরি করে তিনি। তার তৈরি এই দুইটি পুতুলের মধ্যে বাবা তারকনাথ ছায়াছবির কোনো মিল রয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করাতে তিনি জানিয়েছেন যে উক্ত ছবিটির প্রভাবেই বছরের পর বছর ধরে তিনি এই পুতুল বানিয়ে চলেছেন। তার এই দুইটি শৈলীর পুতুলে যে নারী চরিত্র রয়েছে সেটি আদতে বাবা তারকনাথের সন্ধ্যা রায়ের আদলেই করা। 

এদিকে কলকাতার ঐতিহ্যশালী পটুয়া পাড়া কালীঘাটের বিশিষ্ট পুতুল শিল্পী ডলি, শেফালী চিত্রকর সম্পর্কে পঙ্কজবাবুদের আত্মীয় হন। তাঁরাও বাঁকে জল নিয়ে তারকেশ্বরে যাওয়া মেয়ে পুতুল তৈরি করে থাকেন। বয়সে নবীনা দুই শিল্পীর মতে তারা জানান যে হতে পারে এই পুতুলটি সন্ধ্যা রায়ের আদলে তৈরি করা। 

তারকেশ্বর যে জেলায় অবস্থিত সেই হুগলি জেলার শ্রীরামপুর চাতরা কুমোর পাড়ার বিশিষ্ট মৃৎশিল্পী রবি পাল কাঁধে বাঁক নিয়ে যাওয়া মেয়ে ও ছেলে পুতুল তৈরি করে থাকেন। পাশাপাশি তিনি একচূড়া বিশিষ্ট ছোটো শৈব মন্দিরও বানিয়ে থাকেন। তার তৈরি এই পুতুলগুলোর মধ্যে বাবা তারকনাথ ছবির কোনও প্রভাব রয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করাতে তিনি জানিয়েছেন যে মূলত ওই ছবিটি দেখেই তিনি এই পুতুলগুলি নির্মাণে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে বাঁক কাঁধে করে তারকেশ্বরে জল নিয়ে যাওয়া পুতুল প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে হুগলির শ্রীরামপুর রাজ্যধরপুরের বরিষ্ঠ শিল্পী আরতি পালের কথায় পায়ে হেঁটে জল নিয়ে তারকেশ্বর যাওয়ার ঐতিহ্য শ্রীরামপুরে রয়েছে। ছেলে ও মেয়ে বাঁক কাঁধে জল নিয়ে যাচ্ছে সেটাই পুতুল নির্মাণে তুলে ধরেছেন তিনি। 

ভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে কিভাবে সমাজ চিন্তনের গভীরে প্রবেশ করা যায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সন্ধ্যা রায় পুতুল। বাবা তারকনাথের মতো বাণিজ্যিক ছবি আজও যে বাংলার লোকশিল্পকে প্রভাবিত করে চলেছে তা এক কথায় অনবদ্য।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি গবেষক সায়ন রায়ের মতে, “দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ডায়মন্ড হারবার থানার বড়িয়া গ্রামে কয়েকঘর চিত্রকর (পটুয়া)রা বংশ পারম্পরা মেনে মাটির পুতুল বানায়। তাঁদের পুতুলের মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ হল সন্ধ্যা রায় পুতুল। বাবা তারকনাথ সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্য বাঁক কাঁধে চল রে জয় বাবা বল রে (গানে) সন্ধ্যা রায় স্বামী বিশ্বজিৎ এর প্রাণ বাঁচাতে এই পন্থা বেছে নিয়েছিল। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই অভিনব ভাবনার প্রভাব পরে। আর সেই থেকেই এই সন্ধ্যা রায় পুতুলের জন্ম হয়। বড়িয়া গ্রামের অনেক পটুয়াই একসময় সন্ধ্যা রায় পুতুল বানাতেন আবার বাঁকরাহাট ব্লকের বিদ্যানগর পাল পাড়ার কুমোররা এই সন্ধ্যা রায় পুতুল বানাতেন। বর্তমানে চাহিদার অভাবে তা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।”

উল্লেখ্য আজ যখন টলিউড বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে সেই সময় দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা রায় পুতুল যেন সেই ফেলে আসা স্বর্ণযুগের ঐতিহ্যকে অনুপ্রেরণায় পরিণত করেছে। অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে কিভাবে সমাজ চিন্তনের গভীরে প্রবেশ করা যায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সন্ধ্যা রায় পুতুল। বাবা তারকনাথের মতো বাণিজ্যিক ছবি আজও যে বাংলার লোকশিল্পকে প্রভাবিত করে চলেছে তা এক কথায় অনবদ্য। সমাজের লোকজ উপাদানগুলিকে সঠিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রয়োগ করলে তার ফল যে সুদূরপ্রসারী হতে পারে সেটাই দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছে বাবা তারকনাথ। আজ যখন টলিউড দক্ষিণী ছবির নকল করে বাংলা সিনেমা বানাচ্ছে, যখন মৌলিক চিত্রনাট্যের অভাবে স্বকীয়তা ধুঁকছে। তখন তাদের অনুপ্রেরণা স্রোত হওয়া উচিত বাবা তারকনাথ। 

_____________
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: আকাশ বিশ্বাস

Developed by DXDasia