October 16, 2025 | 11:22 AM

চাহিদা তলানিতে, তবুও ভাদু গড়ে বাঁকুড়ার পাঁচমুড়া ও বিবড়দা

পাঁচমুড়ার ভাদু পুতুল

ভাদ্রের বৃষ্টি শেষের অপরাহ্নে নতুন করে উদিত হওয়া সূর্যের রক্তিম আলোয় ভালো লাগা মাখা স্নিগ্ধতা বাঁকুড়ার ঐতিহ্যশালী পাঁচমুড়ার কুম্ভকার পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। গলা উঁচু ঘোড়া, বোঙা হাতি দলমাদল কামান, মনসার ঘট, ষষ্ঠী পুতুলেরা মাটির দাওয়ায় ধৈর্য সহকারে ঠিক তাদেরই পাশে রঙিন কাঁচা মাটির ভাদু মুখে হাসি নিয়ে বসে রয়েছে। কিন্তু তাকে যে শিল্পীরা তৈরি করেছে তাদের মুখ চিন্তায় ম্লান হয়ে রয়েছে। গত বছর আশানুরূপ বিক্রি হয়নি ভাদু প্রতিমার। সভ্যতার চাকা যত এগিয়ে চলেছে ভাদুর মতো লোক উৎসবের আনন্দ তত কমে গিয়েছে। আর তাই চাহিদায় কোপ পড়েছে ভাদু প্রতিমার। (পাঁচমুড়ার ভাদু পুতুল)

আগে পাঁচমুড়ার বহু শিল্পী ভাদু প্রতিমা তৈরি করতেন। কিন্তু আধুনিকতার চাকা যত এগিয়েছে অল্পবয়সীরা তত বেশি ভাদুর থেকে সরে গিয়েছে। তাই এখনমাত্র তিন-চারটি পরিবারই পাঁচমুড়ার কুম্ভকার পাড়ায় ভাদু প্রতিমার শিল্পশৈলীকে জীবিত রেখেছে।

মাটির ঘরের ভেতর থেকে একটার পর একটা গত বছর বিক্রি না হওয়া ভাদু প্রতিমা বের করে দাওয়ায় রাখছিলেন শিল্পী ছবি কুম্ভকার। তাঁর কথায় প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ভাদু প্রতিমা নির্মাণ করে চলেছেন তিনি। আগে যে পরিমাণ চাহিদা ছিল আজ তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এ বছর যে কটি নতুন ভাদু প্রতিমা তৈরি হয়েছে তা পুরোপুরি বিক্রি হবে কিনা সে নিয়ে সন্ধিহান তিনি। একই উদ্বেগ প্রতিধ্বনিত হল আরেক বরিষ্ঠ শিল্পী জয়দেব কুম্ভকারের কণ্ঠে। তাঁর কথায় গত বছরের একাধিক ভাদু প্রতিমা অবিক্রিত অবস্থায় রয়ে গিয়েছে। কিন্তু এ বছর সেই একই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় দেড়শোটির মতো প্রতিমা নির্মাণ করেছেন তিনি। (পাঁচমুড়ার ভাদু পুতুল)

সহধর্মিনী মমতা কুম্ভকারের সহযোগিতায় ভাদু প্রতিমা নির্মাণ করে থাকেন বরিষ্ঠ এই শিল্পী। জয়দেববাবুর কথায় শ্রাবণ মাসের শুরুর দিক থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। প্রতিমা নির্মাণের ক্ষেত্রে এঁটেল মাটি ও গুঁড়ো রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আগে পাঁচমুড়ার বহু শিল্পী ভাদু প্রতিমা তৈরি করতেন। কিন্তু আধুনিকতার চাকা যত এগিয়েছে অল্পবয়সীরা তত বেশি ভাদুর থেকে সরে গিয়েছে। তাই এখনমাত্র তিন-চারটি পরিবারই পাঁচমুড়ার কুম্ভকার পাড়ায় ভাদু প্রতিমার শিল্পশৈলীকে জীবিত রেখেছে। জয়দেব কুম্ভকারের পাশাপাশি মৃৎশিল্পী শান্তি কুম্ভকারও ভাদু তৈরি করে থাকেন। (পাঁচমুড়ার ভাদু পুতুল)

শান্তি কুম্ভকারের ভাদু পুতুল

মৃৎশিল্পী জয়দেব কুম্ভকারের তৈরি ভাদু প্রতিমার সর্বোচ্চ উচ্চতা আঠারো ইঞ্চি। সর্বনিম্ন উচ্চতা সাড়ে ছয় ইঞ্চি। চাকে ঘোরানো চোঙা উপর বসে থাকে ভাদু। উল্লেখিত চোঙাটিও কাঁচা মাটির তৈরি। ভাদুর দুই হাত প্রসারিত। রঙিন শাড়ি, কানে দুল, সিঁথিতে সিঁদুর, গলায় মালা, মাথায় মুকুট। আর সেই মুকুটে একাধিক চূড়া। গায়ের রং গোলাপি। প্রতিমার গোটা শরীরটাই হাতে টিপে তৈরি করা। শুধু মুখমণ্ডল ছাঁচের। ব্যতিক্রমী কয়েকটি প্রতিমা পুরোটাই ছাঁচে তৈরি করা। ভাদুর মধ্যে অনেকে সমৃদ্ধির প্রতীককে লক্ষ্য করে, তাই তার কাখে মা লক্ষ্মীর মতন ঝাঁপি।

মৃৎশিল্পী জয়দেব কুম্ভকারের তৈরি সাড়ে ছয় ইঞ্চির ভাদু এক প্যাচ দিয়ে শাড়ি পরেছে। সিঁথিতে সিঁদুর। হাতের কব্জির গড়ন বিমূর্ত। কাঁখে কলসি। সরু তুলি দিয়ে বড়ো টানা চোখ আঁকা হয়েছে। যদিও এই ছোট্ট ভাদুটির মধ্যে প্রতিমার গাম্ভীর্যতার তুলনায় গ্রাম্য পুতুলের সরলতা খেলা করে যায়। শিল্পীর তৈরি আঠারো ইঞ্চি ভাদু প্রতিমার কোলের মধ্যে বিরাজিত গোপাল। সম্ভবত সন্তান কামনায় ভাদুর এই মাতৃত্বের রূপ তৈরি করা হয়েছে। এই প্রতিমার মধ্যেও দেবত্বের ছাপ স্পষ্টভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রতিমার ডান হাতটি অভয় মুদ্রায় আশ্বাস দিয়ে চলেছে। সারা শরীরে মাটির সোনালি অলংকার তার বিভাকে বৃদ্ধি করে চলেছে। যদিও মুখের অভিব্যক্তিতে চিন্তান্বিত ভাব স্পষ্টভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে।

ভাদুর পরনে কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত থাকে ঘাগড়া। শরীরের ওপরের অংশটা ফতুয়ার মতন বস্ত্র দিয়ে মোড়া।গোটা কাপড়টাই মাটি দিয়ে তৈরি করা। আর তার মধ্যে তুলির সরলরেখায় নকশা করা হয়েছে। প্রথম দেখাতে মনে হবে বিদেশি গাউন পরে রয়েছে গ্রাম বাংলার ভাদু।

অন্যদিকে শান্তি কুম্ভকারের ভাদুর মুকুটে একাধিক চূড়া নেই। কোলে গোপাল বিরাজ করছে। টানা চোখ, সিঁথিতে সিঁদুর, মুখে সমাহিত ভাব নিয়ে মাটির দাওয়ায় রয়েছে শান্তি কুম্ভকারের ভাদু। পাশাপাশি ছবি কুম্ভকার ভাদুর মাটির শরীরে তুলির টানে অনবদ্য অভিব্যক্তি রচনা করেছে। যা সরল ও সুন্দর। শিল্পীর কথায় এই প্রতিমাগুলি পোড়ানো হয় না। আর সেই কারণে রং করতে দেরি হয়। বৃষ্টির ফলে রোদে শুকোনোর পর্যাপ্ত সময় পায় না এই প্রতিমাগুলো। রোদবৃষ্টির মধ্যেই বহু প্রতিকূলতাকে পেরিয়ে এই প্রতিমাগুলো শুকনো হয়। তারপর খড়িমাটির প্রলেপ দিয়ে শেষে রঙের কাজ শুরু করা হয়। চোঙার ওপর বসে থাকা ছাড়াও ছাঁচের ভাদু প্রতিমা কয়েকটি তৈরি করে রাখা হয়।

পাঁচমুড়ার পাশাপাশি বাঁকুড়ার বিবড়দাতেও ভাদু প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। যদিও স্থানীয় গ্রামবাসীদের কথায় প্রতিমার নান্দনিকতার দিক দিয়ে বিবড়দার তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল পাঁচমুড়া। বিবড়দার ভাদু প্রতিমার পেছনের দিকে মাটির চালি দেওয়া হয়। চোঙার মাথায় বসার একটি পাটাতন তৈরি করে তার ওপরে ভাদুকে বসানো হয়। এরপর সেই পাটাতনের কোনগুলির ওপর অর্ধবৃত্তাকার চালি বসানো হয়। সেই চালির মাথায় একাধিক চূড়া দিয়ে সাজানো হয়। শিল্পীর কথায় এই প্রক্রিয়া গোটাটাই হাতে তৈরি করা হয়। চালি ও পাটাতনের ওপর গ্রাম্য শৈলীর আলপনা আঁকা হয়। ভাদুর পরনে কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত থাকে ঘাগড়া। শরীরের ওপরের অংশটা ফতুয়ার মতন বস্ত্র দিয়ে মোড়া।গোটা কাপড়টাই মাটি দিয়ে তৈরি করা। আর তার মধ্যে তুলির সরলরেখায় নকশা করা হয়েছে। প্রথম দেখাতে মনে হবে বিদেশি গাউন পরে রয়েছে গ্রাম বাংলার ভাদু। পাঁচমুড়ার ভাদু প্রতিমা যেরকম পুরোটাই সধবা এখানে তেমনটা নয়। এখানে আইবুড়ো ভাদুও রয়েছে। আর সেই সকল ভাদুর মাথায় একাধিক চূড়া দেওয়া রয়েছে।

এখানকার উল্লেখযোগ্য শিল্পী হলেন শঙ্কর কুম্ভকার, সুচাঁদ কুম্ভকার, জয়দেব কুম্ভকার, বৈদ্যনাথ কুম্ভকার প্রমুখ। ভাদুর কোলে শ্রীকৃষ্ণের বাল্য রূপের দেখা মেলে এখানে। পাশাপাশি সধবা এক প্যাঁচ দিয়ে শাড়ি পরিহিতা ছোটো বউ ভাদুও তৈরি করে থাকেন এখানকার শিল্পীরা। এরও উচ্চতা প্রায় ছয় ইঞ্চি।

উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী পুরুলিয়ার কাশীপুরের রাজা নীলমণি সিংয়ের কন্যা হচ্ছে ভাদু। আবার আরেক কিংবদন্তি বলে নীলমণি সিংয়ের কয়েক পুরুষ আগে ভরতশেখর নামে এক ব্যক্তি ছিল। তার কন্যা নাম ছিল পঞ্চমকুমারী। আদতে ভাদু হচ্ছে সেই পঞ্চমকুমারী। যদিও কাশীপুর রাজবংশের বংশ তালিকায় ভদ্রেশ্বরী বা ভদ্রাবতী বা ভাদুর কোনও উল্লেখ নেই। আবার এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির অবদান। আউশ ধান বা ভাদোই ধানের ব্যাপক চাষ হয় রাঢ়বঙ্গে। আর এই ধান পাকে ভাদ্র মাসে সেখানেই জড়িয়ে রয়েছে ভাদু পরবের উৎস। যদিও কোনও কিংবদন্তি ও লোকশ্রুতি প্রমাণিত নয়।

জয়দেব কুম্ভকারের বউ ভাদু

প্রান্তিক শ্রেণির মানুষেরও আনন্দ উদযাপন করার অধিকার রয়েছে। তাদেরও রয়েছে ফুর্তি হুল্লোড়ের অধিকার। সেই আনন্দ আয়োজনের প্রতীক হচ্ছে ভাদু।

ভাদুর মৃত্যু নিয়েও অনেক রহস্য রয়ে গিয়েছে। জনপ্রিয় জনশ্রুতি হচ্ছে যে পাত্রের সঙ্গে ভাদুর বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার অকালমৃত্যু হয়। শোকগ্রস্ত ভাদু আত্মঘাতী হয়। আবার আরেক জনশ্রুতি থেকে জানা যায় ভাদু অন্ত্যজ শ্রেণির এক যুবককে ভালোবেসে ছিল। রহস্যজনক অবস্থায় সেই যুবকের মৃত্যু হয়। শোকে বিহ্বল ভাদু নিজের জীবন প্রদীপ নিজের হাতেই নিভিয়ে দেয়। আবার কেউ বলে ভাদুর বিয়ে হয়েছিল। তার অতি কৃষ্ণভক্তি সমাজ মেনে নিতে পারেনি। স্বামীর ঘর না করে সে মন্দিরে পড়ে থাকতো। সামাজিক গঞ্জনা সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হয় ভাদু। ভাদুর প্রতিমা নির্মাণে এই সকল জনশ্রুতির উপাদান রয়ে গিয়েছে। সেই কারণেই ভাদু কখনও সধবা আবার কখনও আইবুড়ো। ভাদুর হাতে কৃষ্ণ তার দেবভক্তির প্রতীক। ভাদুর হাতে মা লক্ষ্মীর মতন ঝাঁপি আদতে কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির উপাদান। ভাদুর সিংহাসনে বসে থাকা তার রাজরক্তের সঙ্গে যোগের পরিচয় বহন করে। এত কিংবদন্তি ও জনশ্রুতির মাঝেও ভাদু হয়ে ওঠে সর্বহারা মানুষের মুক্তির সূর্য।

ভাদুর পুজোয় কোনো বৈদিক মন্ত্রের দরকার হয় না। সেখানে থাকে শ্রমজীবী মানুষের ভাব ভালোবাসা ও অন্তরের আনন্দ। ভাদু গ্রামবাংলার ঘরের মেয়ে। স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে আসা দেবতার জ্যোতি তার মধ্যে নেই। কিন্তু তার মধ্যে বিরাজ করছে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের এবং বিশেষ করে নারী জীবনের মুক্তির আস্বাদ। ভাদু পুজোয় কোনও মন্ত্র নেই, রয়েছে গান। সেখানে ফেলে আসা অতীত যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।ঠিক তেমন ভাবে নারী জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও জীবনবোধও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রান্তিক শ্রেণির মানুষেরও আনন্দ উদযাপন করার অধিকার রয়েছে। তাদেরও রয়েছে ফুর্তি হুল্লোড়ের অধিকার। সেই আনন্দ আয়োজনের প্রতীক হচ্ছে ভাদু। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তি তিথিতে ভাদু মূর্তির পুজো বর্তমানে করা হয়ে থাকে। সেই উপলক্ষে ভাদ্র সংক্রান্তির ২-৩ দিন আগে থেকে এই প্রতিমা কিনতে মানুষ কুমোরপাড়াগুলোতে যায়। চাহিদা কম থাকায় শিল্পীরা শেষ মুহূর্তে রঙের কাজটি সম্পন্ন করেন। কথিত আছে মূর্তির প্রচলন পরে এসেছে। আগে ঘরের কোণে নতুন সরায় গোবরের ওপর ভাদই ধান ছড়িয়ে ভাদুর রূপদান করা হত। কিন্তু মানুষ তার শিল্পচেতনা দিয়ে ভাদু প্রতিমাকে আজও অক্ষত করে রেখেছে।

_____________________
গ্রন্থঋণ: ভাদু, লেখক সুব্রত চক্রবর্তী | জেলা লোকসংস্কৃতি পরিচয় গ্রন্থ বাঁকুড়া, প্রকাশক পশ্চিমবঙ্গ সরকার
বিশেষ ধন্যবাদ: দেবলীনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিবু নাগ

Written by