নিরাপদ নয় কাগজের ঠোঙা! অজান্তেই শরীরে ঢুকছে ক্যানসারের বিষ!

খবরের কাগজের ঠোঙা ছেড়ে আবার কি ফিরতে হবে শালপাতা বা মাটির পাত্রে?

জায়গায় জায়গায় প্লাস্টিক মুক্ত পরিবেশ গঠনের প্রচার বেড়েছে। ব্যবহার হচ্ছে কাগজের বিকল্প। খাবার পরিবেশন এবং বিক্রির ক্ষেত্রে পাতলা পলিথিনের বদলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পুরু প্লাস্টিকের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু কাগজের পণ্যই সবথেকে বেশি পরিবেশবান্ধবের জায়গা পেয়েছে। আর চিরকালই বাঙালির প্রিয় হয়ে থেকে গিয়েছে কাগজের ঠোঙা।

বর্তমানে কাগজের নানান ধরনের আধুনিক পণ্য তৈরি হচ্ছে। তবে খাবার মুড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কাগজের ঠোঙা এবং খবরের কাগজের ব্যবহারের ঊর্ধ্বে আর কিছু নেই। ঝালমুড়ি হোক, শুকনো মিষ্টি হোক, কিংবা মুদির দোকান থেকে কেনা রান্নার মশলা – বাড়ি নিয়ে আসার অন্যতম বাহক এই কাগজের ঠোঙা। যুগ যুগ ধরে ঠোঙার প্রচলন রয়েছে এ দেশে। সঙ্গে উভয় বাংলার প্রান্তিক এলাকাগুলিতে আয়ের অন্যতম উৎসও এই ঠোঙা শিল্প। বাড়ির গৃহিণীদের হাতে কিছু উপার্জনের মাধ্যমও এই শিল্প। কাঁচামাল বলতে রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ খবরের কাগজ এবং পুরোনো খাতা, আর সঙ্গে এক গামলা ময়দার আঠা বা লেই। হাতের নিপুণ কায়দায় দিনে কখনও ৫০ তো কখনও ১০০টি পর্যন্ত ঠোঙা বানানো হয়। তবে কাগজের ঠোঙা বা যেকোনো পেপার র‍্যাপার পরিবেশবান্ধব ঠিকই, কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য কি তা নিরাপদ? প্রশ্ন এখানেই।

ঝালমুড়ি হোক, শুকনো মিষ্টি হোক, কিংবা মুদির দোকান থেকে কেনা রান্নার মশলা – বাড়ি নিয়ে আসার অন্যতম বাহক এই কাগজের ঠোঙা। যুগ যুগ ধরে ঠোঙার প্রচলন রয়েছে এ দেশে। সঙ্গে উভয় বাংলার প্রান্তিক এলাকাগুলিতে আয়ের অন্যতম উৎসও এই ঠোঙা শিল্প।

সম্প্রতি ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI) খাবার দেওয়া-নেওয়ায় কাগজের ঠোঙা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর মূল কারণ হল খবরের কাগজে ব্যবহৃত প্রিন্টের কালির ক্ষতিকর পদার্থ। এই বিষাক্ত পদার্থ অজান্তেই খাবারে মিশছে। বিশেষ করে জল বা তেলের সংস্পর্শে এসে কাগজ যদি ভিজে যায়, সেক্ষেত্রে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলি সহজেই ভেতরে থাকা খাবারে মিশে যায়। ফলস্বরূপ, বিভিন্ন জটিল রোগ এবং ক্যানসারের মতো মারণ রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে গবেষণা বলছে, মূলত পেট্রোলিয়াম দ্বারা তৈরি কালি যার মধ্যে উদ্বায়ী জৈব যৌগের পরিমাণ অনেক বেশি, সেই সমস্ত কাগজগুলি সবথেকে বেশি ক্ষতিকারক। যদিও বর্তমানে অনেক মুদ্রণের ক্ষেত্রে সয়াবিন, জল এবং মোম থেকে তৈরি কালির ব্যবহার হচ্ছে যা তূলনামূলক কম ক্ষতিকারক।

শুধু প্রিন্টের কালিই নয়, খবরের কাগজ প্রেস থেকে প্রিন্ট হয়ে বহু হাত ঘুরে বাড়ি বাড়ি পৌঁছায়। এই যাত্রায় ধুলোবালি থেকে শুরু করে নানান অপরিচ্ছন্নতা থাকে। যার ফলে কাগজগুলি খালি চোখে পরিষ্কার মনে হলেও, আসলে বহন করে রোগবহনকারী জীবাণু। ঠোঙা তৈরির সময় এই একই খবরের কাগজ ব্যবহার হয়। এছাড়া বহু খবরের কাগজ তৈরিতে কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে পুনর্ব্যবহৃত (রিসাইকেলড্‌) উপাদান দিয়ে তৈরি কাগজ। এর মধ্যে ক্ষতিকারক ধাতু এবং খনিজ তেল বা মিনারেল অয়েলের উপস্থিতি স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শুধু খবরের কাগজই নয়, কাগজের তৈরি বিভিন্ন খাবার পরিবেশনে ব্যবহৃত পণ্যও নিরাপদ নয়। বিভিন্ন কাগজের মিশ্রণে তৈরি কাগজের থালা এবং বাটিতে পাওয়া গেছে পারফ্লুয়োকটেন সালফোনেট (PFOS)-এর মতো রাসায়নিক পদার্থ, যা মানুষের দ্বারা তৈরি। এই রাসায়নিক সহজে প্রকৃতির মধ্যে মিশে যেতে অক্ষম। পিএফওএস (PFOS) মূলত তৈলাক্তভাব নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। আর এই কারণেই এ ধরনের কাগজের প্যাকেট বা থালা জল বা তেলে সম্পূর্ণ ভিজে যায় না। নিম্নমানের কাগজের থালা অথবা প্যাকেটে থাকা এই পিএফওএস টেনে আনতে পারে নানান রোগব্যাধী।

কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইৎজারল্যান্ডের গবেষকরা মোট ৪২ ধরনের কাগজের ফুড প্যাকেজিং পরীক্ষা করে দেখেন। এর মধ্যে ৪৫% প্যাকেজিংয়ের পণ্যেই ফ্লুওরিন পাওয়া যায়। ফ্লুওরিনের উপস্থিতি পিএফএএস বা পিএফওএস-এর মতো ফ্লুওরিনযুক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। কারণ পিএফওএস-এর অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ফ্লুওরিন। পিএফএএস স্বাস্থ্যের যেমন ক্ষতি করে তেমনই পরিবেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এই রাসায়নিক যেহেতু সহজে প্রকৃতির মধ্যে বিলীন হতে পারে না, তাই এটি ধীরে ধীরে পরিবেশে জমতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে জলদূষণ, মৃত্তিকা দূষণ থেকে শুরু করে গোটা খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসা, প্রজননে অক্ষমতার মতো সমস্যা বাড়তে থাকে।

একই সঙ্গে জার্নাল এনভাইরোনমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি লেটার্স-এর একটি প্রকাশনায় দেখা যায়, সবথেকে বেশি মাত্রায় ফ্লুওরিন বা PFAS সেই সমস্ত কাগজের প্যাকেট বা পেপার ব্যাগগুলিতে রয়েছে যেগুলি মূলত তৈলাক্ত খাবার, যেমন বার্গার, পেস্ট্রি, ডোনাট, ইত্যাদি দিতে ব্যবহার করা হয়। এই রাসায়নিক খাবারে থাকা তৈলাক্তভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই ব্যবহার করা হয়।

এখন প্রশ্ন হল তাহলে উপায় কী? খবরের কাগজের ঠোঙা এবং কাগজে মুড়ে খাবার বিক্রির প্রচলন যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু বর্তমান গবেষণায় উঠে আসা ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে, পুরোনো যুগের নিরাপদ বিকল্পগুলি ফিরিয়ে আনাই এখন অন্যতম উপায়। উল্লেখ্য, কাগজের তৈরি আধুনিক পেপার ব্যাগ, র‍্যাপার, বা থালা-বাটি ব্যবহার করা যেতে পারে যদি তা খাদ্য-নিরাপত্তার মানযুক্ত (ফুড গ্রেড পেপার) হয়। নয়তো কলাপাতা, শালপাতা এবং মাটির ভাঁড় বা হাঁড়ি হতে পারে সেরা বিকল্প।

আজকের দিনে শালপাতার ব্যবহার খুব কম পরিমাণে দেখা গেলেও কলাপাতার ব্যবহার নেই বললেই চলে। কলাপাতা এবং শালপাতা সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক ফলে গরম বা তৈলাক্ত খাবারে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না এবং সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ঠোঙা বা খবরের কাগজের মোড়কের বদলে, এই দুই পাতাকে সহজেই ব্যবহার করা যেতে পারে খাবার বিশেষে। যেমন, শুকনো বা ভাজা খাবারের ক্ষেত্রে কলাপাতা খুব ভালো বিকল্প, অন্য দিকে অল্প ঝোলযুক্ত খাবারের জন্য শালপাতা উপযোগী। তবে কলাপাতা ব্যবহারের আগে তা পরিষ্কার জলে ধুয়ে মুছে নেওয়া আবশ্যক। এছাড়া, শালপাতার তৈরি থালা বা বাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক আঠা বা সুতো ব্যবহারে তৈরি পাতাই বেছে নিতে হবে। কারণ বহু ব্যবসায় শালপাতায় ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত আঠা ব্যবহার হয়ে থাকে।

শুধু খবরের কাগজই নয়, কাগজের তৈরি বিভিন্ন খাবার পরিবেশনে ব্যবহৃত পণ্যও নিরাপদ নয়। বিভিন্ন কাগজের মিশ্রণে তৈরি কাগজের থালা এবং বাটিতে পাওয়া গেছে পারফ্লুয়োকটেন সালফোনেট (PFOS)-এর মতো রাসায়নিক পদার্থ, যা মানুষের দ্বারা তৈরি।

একই সঙ্গে, মাটির হাঁড়ি বা ভাঁড় অত্যন্ত নিরাপদ একটি বিকল্প। ভারি খাবারের জন্য মাটির তৈরি পাত্র উপযোগী। এক্ষেত্রেও কুমোড়ের কাছ থেকে তৈরি হয়ে আসা ভালো মানের পাত্র ব্যবহার করাই শ্রেয়। পাশাপাশি, আবর্জনা থেকে রেহাই পেতে এবং পাত্র যাতে ফেটে না যায় তার জন্য ব্যবহারের আগে পাত্রগুলি দীর্ঘসময় জলে ডুবিয়ে হালকা আঁচে গরম করে নেওয়া আবশ্যক।

অন্যদিকে বলা যায়, কাগজ একটি মূল্যবান ও পরিবেশবান্ধব উপাদান। তাই এর ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার কথা নয়, বরং সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহার নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কাগজে খাদ্য-নিরাপত্তার মান (ফুড-গ্রেড) নিশ্চিত নয়, সেগুলো সরাসরি খাবার মোড়াতে ব্যবহার না করে বই, উপহার, গৃহস্থালির সামগ্রী, পোশাক, হস্তশিল্প বা অন্যান্য অখাদ্য পণ্য মোড়ানোর কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে যেমন মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, তেমনই কাগজনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা ও জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সচেতনতা ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব।

__________ 
তথ্যসূত্র: krishijagran.com এবং pfasproject.com 

Developed by DXDasia