শিক্ষাক্ষেত্রে এআই কি চিন্তাভাবনায় অলস আর পরাধীন ছাত্রছাত্রী তৈরি করছে?

মস্তিষ্ক চ্যালেঞ্জ না পেলে আবিষ্কার করবে কী করে?

০০১ সালে অভিনয়ে অস্কার পাবার দুবছর পর জুলিয়া রবার্টসের একটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল ‘মোনালিসা স্মাইল’। ছবিটি ছিল একজন শিক্ষিকার শিক্ষণ পদ্ধতি বিষয়ক। সে-ছবির গল্প ছিল এমন যে ১৯৫৩ সালে তিরিশ বছর বয়সী ক্যাথরিন অ্যান ওয়াটসন ওয়েলেসলি কলেজে শিল্প-ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক হয়ে আসেন। অধ্যাপনা শুরু করবার কিছুদিনের মধ্যে ক্যাথরিন টের পান তাঁর ছাত্রীরা সিলেবাস আর বই সম্পূর্ণ গলাধঃকরণ করে নিয়েছে। শিল্প-ইতিহাস সম্পর্কে তাদের অন্তত নতুন করে কিছু শেখানোর নেই। ক্যাথরিন যে মনে করেছিলেন তিনি পড়াবেন, বোঝাবেন, জানাবেন কিন্তু কোথায় কী? তাঁর ছাত্রীরা আগে থেকে সব ‘পড়ে’ বসে আছে! ক্যাথরিন তখন নিজে যেভাবে পড়ানো শিখেছিলেন সেসব ভুলে পড়ানোর নতুন পদ্ধতি নিয়ে ভাবনা করতে শুরু করলেন। (শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই)

আগে অনেক বাড়িতে মা-বাবারা আজকের মতো ‘শিক্ষিত’ ছিলেন না হয়তো, কিন্তু বাড়ির ছেলেমেয়েরা পড়তে বসলে তাঁরা বলতেন, “জোরে জোরে পড়, আমি শুনছি!” আর তখন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছিলেন জ্ঞানের উৎস। তাঁরা কেবল বই পড়িয়ে, বুঝিয়ে দিতেন তা নয়, কীভাবে প্রশ্নোত্তর লিখতে হয় তাও শেখাতেন।

শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে মাইক নিউয়েল পরিচালিত ‘মোনালিসা স্মাইল’ (২০০৩) ছবিটি আজও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ছোটোবেলায় স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবশ্য ক্যাথরিনের মতো অসুবিধায় পড়তে হত না। কারণ, আমরা তাঁদের পড়ানোর আগে কিছু পড়ে আসতাম না! অনেকে আবার পড়ানো হয়ে গেলেও পরীক্ষার আগে বই খুলত না। কিন্তু অনেক ছেলেমেয়ে ছিল যাদের অবশ্য পড়াশোনায় মনোযোগ ছিল অনেক বেশি। আমাদের ছোটোবেলায় পড়াশোনার এক সংস্কৃতি ছিল বাড়িতে বাড়িতে। সেটা যেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বই থেকে সোজা উঠে এসেছিল। তাঁর বর্ণপরিচয়-এ সুবোধ বালক গোপাল যেমন ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসত, পণ্ডিত মশাইয়ের দেওয়া পড়া মুখস্ত করত, লিখত; আমরাও তেমনই সকাল-সন্ধ্যা বাড়িতে পড়াশোনা নিয়ে বসতাম। অনেক বাড়িতে মা-বাবারা আজকের মতো ‘শিক্ষিত’ ছিলেন না হয়তো, কিন্তু বাড়ির ছেলেমেয়েরা পড়তে বসলে তাঁরা বলতেন, “জোরে জোরে পড়, আমি শুনছি!” আর তখন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছিলেন জ্ঞানের উৎস। তাঁরা কেবল বই পড়িয়ে, বুঝিয়ে দিতেন তা নয়, কীভাবে প্রশ্নোত্তর লিখতে হয় তাও শেখাতেন। আমাদের কলেজ জীবনও এমনকি এর থেকে খুব একটা আলাদা ছিল না। অধ্যাপকরা ছিলেন আমাদের মেন্টর। তাঁদের তদারকিতে আমাদের লেখাপড়া চলত। তবে বইয়ের সংখ্যা স্কুলের তুলনায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল অনেক বেশি। পার্থক্য এটুকুই। (শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই)

কিন্তু আমরা যখন পড়াতে এলাম, গুগুল প্রতিষ্ঠার তখন দশ বছর কেটে গিয়েছে, সে-সময় আমাদের চোখের সামনে জ্ঞানের উৎস ধীরে ধীরে বই আর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হাত থেকে কম্পিউটার আর মোবাইলের দিকে চলে যেতে শুরু করল। বই কীভাবে পড়তে হবে আর প্রশ্নোত্তর কীভাবে লিখতে হবে- তার থেকেও ছাত্রছাত্রীদের কাছে জরুরি হয়ে উঠল যে তারা যদি কম্পিউটার আর মোবাইলেই নোটস পেয়ে যায় তবে কেন অকারণে বই কিনবে? আর কেনই-বা শিক্ষক-শিক্ষিকারা হবেন ভীষণ রকম শ্রদ্ধার পাত্র? এমন নয় যে কোনও শিক্ষক-শিক্ষিকারই শিক্ষণ পদ্ধতি প্রশ্নাতীত হওয়া উচিত, কিন্তু তাঁদের অবদান তো অস্বীকার করা চলে না। আবার শিক্ষক-শিক্ষিকারাও তাঁদের পড়ানোর ক্ষেত্রে নানা সার্চ ইঞ্জিনের প্রভূত সাহায্য নিয়ে থাকেন। আজ লেখাপড়া আর পড়ানোর মধ্যে এই সার্চ ইঞ্জিনেরা ঢুকে পড়ে তারাই সব নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। তবে এ-ও ঠিক স্কুল-কলেজের লেখাপড়ার ঠিক সরাসরি শত্রু সার্চ ইঞ্জিন প্রথম থেকে ছিল না। তার থেকেও বড়ো শত্রু ছিল কোচিং সেন্টারগুলো। সকাল-সন্ধ্যায় বাড়িতে বই নিয়ে বসার রীতি ক্রমশ অবলুপ্ত হয়ে কোচিং সেন্টার গমনে পর্যবসিত হয়েছিল। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করা গিয়েছিল যে আমাদের অভিভাবকেরা অনেক কম পড়াশোনা জানা সত্ত্বেও আমাদের পড়াতেন। আমাদের লেখাপড়ায় যোগদান করতেন। এখন অভিভাবকেরা ভালো রকম শিক্ষিত হয়েও নার্সারি থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য প্রাইভেট টিউটর খোঁজেন! (শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই)

আর এখন পুরো শিক্ষণ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এসেছে এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স)-এর হাত ধরে। সার্চ ইঞ্জিন খানিকটা বইপত্রের মতো কাজ করত। শিক্ষক-শিক্ষিকা আর তাঁদের ছাত্রছাত্রীরা সার্চ ইঞ্জিনের সাহায্য নিত ঠিকই কিন্তু লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তাদের স্বকীয়তা বজায় থাকত। আর এখন চোখের নিমেষে প্রশ্নোত্তর এমন তৈরি হয়ে যাচ্ছে যে সেগুলো কীভাবে লিখতে হয় সেটাই আর ছাত্রছাত্রীদের জানা হচ্ছে না। ছাত্রছাত্রীদের কাছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের গুরুত্ব ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। আর দশ-পনেরোটা বছর পর স্কুল-কলেজ যাবার প্রয়োজন পড়বে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকছে। এমনিতে কোভিড অতিমারী বহু ক্ষেত্রে অনলাইন লেখাপড়ার এক বিচ্ছিরি পথ দেখিয়েছে, তার ওপর এআই সবকিছু হাজির করে ছাত্রছাত্রীদের শিখতে পারার জায়গাটা বাধাপ্রাপ্ত করছে। মুশকিল হল, যাদের এক সময় লেখাপড়া করতে হত, প্রশ্নোত্তর কীভাবে তৈরি করতে হয় শিখতে হত তারা আজ এআই-এর এই নিমেষে সব তৈরি করে দেবার ক্ষমতা দেখে অবাক হয় এবং মনে করে লেখাপড়াকে এআই সহজ করছে। কিন্তু এমন একটা প্রজন্ম যখন তৈরি হবে যারা স্বকীয়তা কী জানবে না, যারা লেখাপড়ার পদ্ধতি বুঝবে না কিংবা নিজেরা কীভাবে প্রশ্নোত্তর লিখতে হয় শিখবে না, কারণ তারা সবটাতে এআই-এর সাহায্য নিয়েছে, তখন চিন্তাভাবনায় একেবারে অলস আর পরাধীন একটি শ্রেণি তৈরি হবে-না কি? (শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই)

এমন একটা প্রজন্ম যখন তৈরি হবে যারা স্বকীয়তা কী জানবে না, যারা লেখাপড়ার পদ্ধতি বুঝবে না কিংবা নিজেরা কীভাবে প্রশ্নোত্তর লিখতে হয় শিখবে না, কারণ তারা সবটাতে এআই-এর সাহায্য নিয়েছে, তখন চিন্তাভাবনায় একেবারে অলস আর পরাধীন একটি শ্রেণি তৈরি হবে-না কি?

শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে তো মানুষকে শিক্ষিত করে, স্বাধীন ভাবনাচিন্তা যাতে তাদের তৈরি হয় সেই অনুশীলনে সাহায্য করে। কিন্তু প্রযুক্তি যদি সবকিছু সহজ করে দেবার টোপ দেখিয়ে কিছু শিখতেই না দেয়, মস্তিষ্ক কোনও চ্যালেঞ্জ না পায় তাহলে সমাজে নতুন নতুন উদ্ভাবন আর আবিষ্কার হবে কী করে? এআই এখনও অবধি মৌলিক লেখা লিখতে পারছে না। বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন ঘুরে সে নিজের মতো একটা মাঝামাঝি কিছু তৈরি করছে এবং সঠিক ‘ইনপুট’-এর অপেক্ষা করছে। দিনের শেষে দেখা যাচ্ছে সেই মানুষকেই জানাতে হচ্ছে আসলে কী চাই। ঠিক এই সময়েই আমাদের দরকার বর্ণনামূলক লেখাপড়া। প্রযুক্তি আমাদের কাছে যত সহজ হয়েছে আমরা শিক্ষণ পদ্ধতি তত তরল করেছি। প্রযুক্তি আর শিক্ষণ পদ্ধতি যদি সমধর্মী হয় তখনই তো আর বিদ্যালয়ের প্রয়োজন থাকে না, প্রযুক্তির সাহায্যে অনেকটা হয়ে যায়। কিন্তু শিক্ষণ পদ্ধতি যদি প্রযুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানায় তাহলে লেখাপড়ার যে সংস্কৃতি তার একটা ভারসাম্য বজায় থাকে। যে প্রশ্নোত্তর এআইকে দিলেই হয়ে যায় তা যদি পরীক্ষায় আসে তাহলে তো সারা বছর শিক্ষকের দরকার হয় না। যেসব প্রশ্নোত্তর লিখতে শেখার প্রয়োজন হয়, শিক্ষক-শিক্ষিকার সাহায্য লাগে সেগুলো নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠলে শিক্ষার মান মর্যাদাপূর্ণ থাকে। প্রযুক্তি তো মানুষেরই নির্মাণ আসলে!

ঠিক এই কাজটা ক্যাথরিন করেছিলেন ‘মোনালিসা স্মাইল’ ছবিতে। তিনি যখন দেখলেন তাঁর ছাত্রীরা সিলেবাসের সব জানে তখন তিনি ওরা যা জানে না অথচ ওদের জানা প্রয়োজন, তা নিয়ে নিজের কোর্স তৈরি করলেন। আর তাতে বাগে এল ছাত্রীরা। ছাত্রীদের মধ্যে নতুন চিন্তার আগল খুলে দিলেন ক্যাথরিন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “শিক্ষাকে আমরা বহন করিলাম, বাহন করিতে পারিলাম না।” অর্থাৎ শিক্ষার মধ্যে দিয়ে স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা গড়ে ওঠার যে উদ্দেশ্য তা যেন কখনও ভ্রষ্ঠ না হয়। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে কোনও বাধা নেই, কিন্তু প্রযুক্তির দাস হয়ে পড়লে তো সভ্যতার চলবে না। আর তার জন্য চাই শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরই। আজ শিক্ষক দিবস। প্রকৃত শিক্ষক ছাড়া যে-কোনও ব্যবস্থাই যে অচল, তা যেন আমরা না ভুলি।
 

Developed by DXDasia