অন্দরসজ্জা-বৃত্তান্ত : নীড় ছোটো হলেও স্বপ্নের ঘর

প্যাশনের রঙে রঙিন এতটুকু বাসা

ছোট্ট একটা ব্যালকনি। জুঁই-বেলের গন্ধে ভরা। বাটি থেকে দানা খেয়ে যাচ্ছে বুলবুলি। টবের ঝুলন্ত লতায় দোল খাচ্ছে চড়াই। দূরে কৃষ্ণচূড়ার রং মিশেছে গোধূলির রঙে। এমন একটা বারান্দার স্বপ্নে কেটে যায় একটা জীবন। কিন্তু দুর্লভ নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় হোম ডেকরের রিল দেখতে দেখতে হুশ করে কেটে যায় ঘণ্টা-মিনিট। ৩০ সেকেন্ডের হোম ট্যুর দেখার পর মনে হয় ‘আমার ঘরটাও যদি এমন হত’!

আগে ছিল তিনমহলা গৃহস্থ বাড়ি। ছাদ, উঠোন, গাড়ি বারান্দা, বৈঠকখানা, অন্দর-বাহির মিলিয়ে ভরা সংসার। তারপর এলো ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’র 2BHK. আর এখন ‘সেলফ লাইফ’ স্টুডিয়ো অ্যাপার্টমেন্ট। লাল-নীল সংসারের ছোট্ট তরী।

নীড় ছোটো হলেও স্বপ্নের ঘর

রিলের মতো ৩০ সেকেন্ডে সাজানো সহজ নয়। আবার, আপনি যদি নিজের মন-মগজ আর দেখার উপর ভরসা করেন তাহলে কঠিনও নয়। আপনার ঘর আপনার রুচি, নান্দনিকতা, ব্যক্তিত্ব আর দিনযাপনের আয়না। অন্দরসজ্জার প্রতিটি অনুষঙ্গ নির্বাচনে প্রভাব ফেলে ব্যক্তিত্ব। ভারি আসবাব, চোখ ধাঁধানো রং আর বিলাসবহুল অন্দরসজ্জার দিন শেষ। ট্রেন্ড এখন ছিমছাম অন্দরমহলের। মূল নজর স্পেস ম্যানেজমেন্ট।

ঘরের রং

নিজের হোক বা ভাড়া, আজকাল বেশিরভাগ ফ্ল্যাটের দেওয়াল থাকে সাদা। শুধুই প্রাইমার কোট। আপনি রাঙিয়ে নিতে পারেন যেমন ইচ্ছে। সাদা, ধূসর, অলিভ, টিলের হালকা টোন চলছে। হালকা রঙের ব্যবহারে ঘরের আয়তন বড়ো লাগে। গাঢ় রং ঘরের আকার ছোটো করে দেয়। পাশাপাশি এখন ট্রেন্ডে ইন ওয়াল আর্ট। সাবেকি আল্পনা, মণ্ডল মোটিফ, ফিগার পেইন্টিং—দরজা থেকে দেওয়াল সর্বত্র পেশাদার শিল্পীর তুলির ছোঁয়া। 

দেওয়ালের রঙে চলছে থ্রি ডায়ামেনশন প্যাটার্ন। অনেকে প্রিন্টেড ওয়ালপেপার লাগান, সেক্ষেত্রে বড়ো প্রিন্ট হলে ঘর আরও ছোটো লাগবে। যেমন ফলস সিলিং ঘর আরও চেপে দেয়।

অন্দরসজ্জা মানেই যে তা ব্যয়বহুল এমন ধারণা আজ বদলেছে। অনলাইনের সুবিধা তো আছেই, পাশাপাশি নিজের বাসাটি মনের মতো সাজাতে এই শহর-ই আপনার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। পায়ে পায়ে ঘুরে দেখুন কলকাতা।

আসবাব

ছোটো ফ্ল্যাটে সবচেয়ে বড়ো মাথাব্যথার কারণ হয় স্টোরেজ। সেই সমস্যা মেটাতে সিলিং পর্যন্ত সেলফ আর ক্যাবিনেট বানিয়ে নেওয়া যায়। খাটের তলা থেকে টেবিলের তলা সবই হয়ে উঠতে পারে স্টোরেজ বক্স। পুরনো তোরঙ্গ থাকলে বাতিল করবেন না। আলপনায় সাজিয়ে নতুন করে ব্যবহার করুন। বেড সাইড টেবিল বা স্টোরেজ বক্স হিসাবে। গ্লাস টপ লাগিয়ে সেন্টার টেবিল হিসাবেও ব্যবহার করতে পারেন। পুরনো ফার্নিচার একেবারে বাতিল না করে রং আর ডিজাইন অদলবদল করে দেওয়া যায় নতুন চেহারা। তবে ফ্ল্যাট ঝরঝরে রাখতে বাড়তি জিনিস, অতিরিক্ত পুরনো জিনিস রাখার অভ্যাস ছাড়তে হবে। মানতে হবে ‘ডিক্লাটার রুল’।  

ছোটো ফ্ল্যাটের শেষ কথা হল ‘Less is More’। আসবাবের বিন্যাস এমনভাবে রাখতে হবে যাতে ঘরে হাঁটাচলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে। মেঝের অংশ যত দেখা যায় তত ঘর বড়ো লাগে। মাল্টি-টাক্সিং ফার্নিচার বেশ কাজের জিনিস। এখন বাঁশ, বেতের আসবারের চাহিদা বাড়ছে। টুল, চেয়ার, সোফা, ডিভান, ডাইনিং টেবিল ছাড়াও পার্টিশন, পর্দাও পাওয়া যায়। ব্যবহারে ঝক্কিও কম। 

ফ্ল্যাট সাজানোর ট্রেন্ডে এখন ‘Go Green’ থিম জনপ্রিয়। জানলা থেকে কিচেন, বাথরুম, ব্যালকানি, স্টাডি সব সবুজ। ফ্ল্যাটের বাসিন্দা কোন জীবনদর্শনে বিশ্বাসী সেটাই তাঁর আস্তানার থিম। নিজের প্যাশনের বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে আপনার অন্দরসজ্জার অঙ্গ। 

যেমন ধরুন, কেউ যদি বইপ্রেমী হন, তাহলে তাঁর বাসার প্রতিটা কোণ-ই হয়ে উঠতে পারে লাইব্রেরি। এমনকি কাপ, প্লেটের ডিজাইনেও বইয়ের পাতা। দেওয়ালের ফ্রেমে প্ৰিয় বইয়ের কভার। সিনেমাপ্রেমীর বাড়ির অন্দরমহল জুড়ে পছন্দের সিনেমার পোস্টার, ছবি, আর নানা ধরনের সিনেমার অনুসঙ্গ। শিল্পীর ফ্ল্যাটের জানলার প্রতিটা কাচ যেমন হয়ে উঠতে পারে ক্যানভাস। আর যে মানুষটি পাহাড় বা নদী ভালবাসে তাঁর বাড়ির অন্দরমহল হয়ে উঠতে পারে পাহাড়ি গ্রামের কোনও বাড়ি, ঘরদোর জুড়ে নদী-জীবনের চিহ্ন। 

রিলের মতো ৩০ সেকেন্ডে সাজানো সহজ নয়। আবার আপনি যদি নিজের মন-মগজ আর দেখার উপর ভরসা করেন, তাহলে কঠিনও নয়। আপনার ঘর আপনার রুচি, নান্দনিকতা, ব্যক্তিত্ব আর দিনযাপনের আয়না।

ছোটো স্পেসে চোখ আর মনের আরাম গ্রিন থেরাপি। সবুজের সতেজতায় ঘর যেমন বড়ো লাগে তেমন স্ট্রেস কমায়। জানলা, দরজা, বারান্দায় নানা রকম হ্যাঙ্গগিং মানি প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট, জেড, পর্তুলিকা ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। এছাড়াও আছে হাজার এক নাম। শহরে নার্সারির অভাব নেই। ভালো জাতের গাছ পেতে নার্সারি সেরা বিকল্প। অভিনবত্ব আনতে ঘরের একটা দেওয়াল রাঙাতে পারেন পছন্দের গাছের পাতার রঙে। পর্দা, কুশন, বেডশিট, ম্যাটের জন্য বেছে নিতে পারেন কটন মেটিরিয়ালে ফরেস্ট প্রিন্ট। জুটের ম্যাট্রেস, ইকো ফ্রেন্ডলি আসবাব ফ্ল্যাটের পুরো চেহারাই পাল্টে দেয়।

গাছের পাশাপাশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পাখি। বলতে পারেন ইন থিং। যত তাপপ্রবাহ বাড়ছে তত বাড়ছে পাখি মৃত্যু। গাছ কমছে তারাও ঘর হারিয়ে বাসা বাঁধছে আপনার আমার ফ্ল্যাটের কোণায়। একবাটি দানা আর আদরের জলে হয়ে উঠতে পারেন ওদের ভরসার মানুষ। রাখতে পারেন পাখির জন্য ছোট্ট ঘরের ব্যবস্থা। যেখানে মা-পাখি নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে। এই ব্যবস্থা জানলা বা ব্যালকনির আশেপাশে করাই সুবিধাজনক। যাতে ওরা স্বছন্দে উড়ে যেতে পারে। ওয়াল হ্যাঙ্গিং থেকে শুরু করে পাখি প্রিন্টের পর্দা, সেরামিক বা মাটির বার্ড ক্র্যাফট, পেইন্টিং -এ সাজাতে পারেন ঘর। পাখির দানার জন্য নানা ধরনের বার্ড ফিডার পাবেন অনলাইনে।

অন্দরসজ্জার কাহিনিতে এথেনিক স্টাইল কখনও পুরনো হয় না। দেশীয় ইতিহাস, আঞ্চলিক সংস্কৃতি চর্চার চিরন্তন ধারাটি তাতে যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনি শিল্প ও শিল্পী বাঁচে। পিতল, কাঁসার পুরনো বাসন, মূর্তি ব্যবহার করতে পারেন ফুলদানি, স্টোরেজ বক্স হিসাবে। মা-ঠাকুমার পুরনো বাতিল বেনারসি, সাউথ ইন্ডিয়ান বা ভারি জরুরি শাড়ি হতে পারে পর্দা। আবার শাড়ির আঁচল, নকশি কাঁথা, হাতে বোনা আসন-যা হয়ত আর ব্যবহার করা যাবে না, সেসব ফ্রেম করে বাঁধিয়ে নিতে পারেন। রয়ে যাবে হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি। 

ইকো ফ্রেন্ডলি হোম করতে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসাবে কাচ, সেরামিক, মাটি, বেত বা কাঠের জিনিস ব্যবহার করতে পারেন। দিনের আলো আসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখুন।

অন্দরসজ্জা মানেই যে তা ব্যয়বহুল এমন ধারণা আজ বদলেছে। অনলাইনের সুবিধা তো আছেই, পাশাপাশি নিজের বাসাটি মনের মতো সাজাতে এই শহর-ই আপনার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। পায়ে পায়ে ঘুরে দেখুন কলকাতা। উত্তর থেকে দক্ষিণে ছড়িয়ে আছে হরেক জিনিসের খোঁজ। রয়েছে একাধিক বিপণি। যা চান সব পাবেন। শুধু চিনে নিতে হবে তাকে।
_______________ 
গৃহসজ্জা ও ব্যবহৃত ছবি: আত্রেয়ী চক্রবর্তী

Developed by DXDasia