
গৃহসজ্জায় নজর কাড়ছে কচুরিপানার তৈরি নানা জিনিস
পূর্ব বাংলার কথা। তখন ১৯০০ সাল। নতুন শতাব্দীর শুরুতে সেখানকার বিস্তীর্ণ জলাশয়ে এক উদ্ভিদের বিস্তার হয়। তার রঙিন ফুলের শোভা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনে হয় জলের ওপর বহুমূল্যের গালিচা। শোনা যায়, ১৮ শতকের শেষদিকে জর্জ মরগান নামে এক স্কটিশ ব্যবসায়ী ব্রাজিল থেকে একে বাংলায় নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু যত দিন গেল, সৌন্দর্যই হয়ে উঠলো ভয়ঙ্কর সমস্যা। ১৯১৪ সাল নাগাদ এই জলজ উদ্ভিদের লাগামহীন বিস্তারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন চেম্বার অফ কমার্স। খালবিলের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ আটকে দেওয়া, বাংলার ভাটি এলাকার আমন ধান চাষে ব্যাঘাত ঘটানো এমনকী গবাদি পশুদের খাদ্য হিসেবে ক্ষতিকর হয়ে উঠেছিল এই উদ্ভিদ। প্রকোপ পড়েছিল কৃষিখাতে, অর্থনীতিতে। নালিশ যায় ইংরেজ প্রশাসকদের কাছে। তাঁরা সমস্যা থেকে রেহাই পেতে অবশেষে গবেষকদের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এভাবেই এককালে বাংলার ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছিল কচুরিপানা, ‘দ্য বিউটিফুল ব্লু ডেভিল’।

যে কচুরিপানা বাংলায় এসছিল অভিশাপ হয়ে, তাই-ই আজ আশীর্বাদ; পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার জন্য। জৈবিক পদ্ধতির ব্যবহার আজও অজানা অনেকের কাছে। তবে বর্তমান জৈব প্রযুক্তির যুগে এই কচুরিপানা বাণিজ্যিকভাবে কার্যকরী হয়ে উঠছে শিল্পক্ষেত্রে।
সেদিন গিয়াছে। যে কচুরিপানা (Water hyacinth) বাংলায় এসছিল অভিশাপ হয়ে, তাই-ই আজ আশীর্বাদ; পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার জন্য। জৈবিক পদ্ধতির ব্যবহার আজও অজানা অনেকের কাছে। তবে বর্তমান জৈব প্রযুক্তির যুগে এই কচুরিপানা বাণিজ্যিকভাবে কার্যকরী হয়ে উঠছে শিল্পক্ষেত্রে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলার মাঠ-ঘাট, খাল-বিল, নদী-পুকুরে জন্মানো এই উদ্ভিদিটিকে ঠিকমতো ব্যবহার করলে এটি অর্থকরী হয়ে ওঠে। তার জন্য একে জল থেকে তুলে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। জলে থাকলেই এটি বিভিন্নভাবে জলদূষণ ঘটায়। জল থেকে তুলে কচুরিপানা থেকে তৈরি করা হচ্ছে একাধিক বাণিজ্যিক উপকরণ। মূলত কেঁচো সার বা জৈব সার তৈরির ক্ষেত্রে এর অন্যতম ভূমিকা দেখা দেয়। এর পাতা এবং কাণ্ড দিয়ে কেঁচো সার প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। মালদহের গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিটে কচুরিপানার ব্যবহার করে কেঁচো সার অর্থাৎ জৈব সার তৈরি করা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের অনেক পরিবেশবিদই ক্ষতিকর কচুরিপানাকে প্রাকৃতিক কাগজে রূপান্তরিত করে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের টেকসই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থানীয় সম্প্রদায়কে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি জলাশয় পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করছে। তন্তুজ শিল্পেও এই কচুরিপানার ব্যবহার দেখা দিচ্ছে। যেমন ফাইবারের ক্যারি ব্যাগ, কাপড় ইত্যাদি তৈরির ক্ষেত্রে এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বাংলার নানা জায়গায় তৈরি হচ্ছে কচুরিপানার সামগ্রী। জল থেকে কচুরিপানা তুলে তা শুকিয়ে বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াকরণ করে তাই দিয়ে ফুলদানি, ছোটো ঝুড়ি, ট্রে-কোস্টার, উপহার-বাক্স সহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরি করা হচ্ছে।

‘ইকো ওয়ার্ড ক্রাফট’-এর অন্যতম কর্ণধার প্রসেনজিৎ কর বলছিলেন, কার্বন ফুটপ্রিন্ট (Carbon footprint) কমাতে কচুরিপানার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, পাশাপাশি এর নিজস্ব রং-রূপ আছে, যার ফলে কচুরিপানা দিয়ে তৈরি সামগ্রীগুলো দেখতে বেশ আকর্ষনীয় হয়। এর ডাঁটা থেকে আঁশ সংগ্রহ করে তা দিয়ে পরিবেশবান্ধব কাগজ, প্যাকেট এবং ই-কমার্স প্যাকেজিং উপাদান তৈরি করা হচ্ছে। কচুরিপানার সেলুলোজ এবং স্টার্চের মিশ্রণে থার্মো-প্রেসিং (Hot compression) প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়োপ্লাস্টিক ও ডিসপোজেবল চামচ, বাটি, প্লেট সহ অন্যান্য জিনিস তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। সাধারণ প্লাস্টিকের মতো এটি পরিবেশের ক্ষতি করে না, বরং কয়েক মাসের মধ্যে মাটিতে সম্পূর্ণভাবে মিশে যায়। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার বাড়ানো যায় যাতে, সেই চেষ্টাই চলছে।
কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে কচুরিপানার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, পাশাপাশি এর নিজস্ব রং-রূপ আছে, যার ফলে কচুরিপানা দিয়ে তৈরি সামগ্রীগুলো দেখতে বেশ আকর্ষনীয় হয়।

পরিবেশবান্ধব দিকটি বিবেচনা করে, অনেক উদ্যোক্তা বা বিপণি কচুরিপানার নানা সামগ্রী ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। কলকাতার যোধপুর পার্কের ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ (ঠিকানা: ১২৭, গড়িয়াহাট রোড, যোধপুর পার্ক, কলকাতা ৭০০০৬৮ – প্রতিদিন ১১টা থেকে ৮টা) তেমনই একটি ঠিকানা। এখানে পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা-বিষয়ক ছ’টি কোস্টারের সেট। বিপণির এক কর্মীর কথায়, “কচুরিপানা নিয়ে এখন অনেক কাজ হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ীও। আমরা প্রাথমিকভাবে কচুরিপানার সঙ্গে কলকাতা থিম নিয়ে কাজ করেছি। শুরুতেই ভালো সাড়া পাওয়া গেছে তাই, কোস্টারের পাশাপাশি এবার কচুরিপানার অন্যান্য জিনিস তৈরির কথা ভাবছি।”
কচুরিপানা আশা দেখাচ্ছে। এর ব্যবহারের এমন বিকল্প পদ্ধতি আগামীতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আগ্রহ বাড়াবে বলে মনে করছেন উদ্ভিদবিদরা।
_______________
অনলাইনে সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন
