বিশ্বমঞ্চে বাংলার সাবেকি স্বাদ : জিআই ট্যাগের মুকুটে জলভরা, মেচা ও মনোহরা

বাংলার তিনটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি

বাংলার সামাজিক উৎসব হোক কিংবা কোনও কাজের শুভ সূচনা বা সমাপ্তি। অন্নপ্রাশন – বিয়ের ভোজ থেকে শুরু করে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ, এসবেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মিষ্টি। বাঙালির মিষ্টিমুখ পর্বে আজকাল রসগোল্লা, কালাকাঁদ, মিষ্টি দইয়ের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে গুলাব জামুন, কাজুবরফি থেকে শুরু করে আইসক্রিম রোল, দুবাই চকোলেট পর্যন্ত। তবে, সকলপ্রকার আধুনিক ‘ডেজার্ট’-এর মধ্যেও আমাদের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিগুলির জুড়ি মেলা ভার। রাজধানী শহর ও শহরতলি, বাংলার বিভিন্ন জেলার একাধিক মিষ্টি নিঃশব্দে বহন করে নিয়ে চলেছে বাংলার ঐতিহ্যকে। ২০২৬ সালে ভারতের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই)-এর তালিকভুক্ত হল তেমনই আরও তিনটি মিষ্টি। কোনও অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প কিংবা স্থানীয় ফসলের মতো কোনও রন্ধনপ্রণালী জিআই ট্যাগ পেলে বৃহত্তর সমাজে তার পরিচিতি বাড়ে অনেকটাই। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। খাবারটির চাহিদা বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে রপ্তানি। সর্বোপরি, স্থানীয় কারিগরদের জীবিকা সুরক্ষিত হয়। সেই সূত্রেই বলা যায়, জিআই ট্যাগ পেয়ে বাংলার সুস্বাদু এই তিনটি আঞ্চলিক মিষ্টির সাংস্কৃতিক লেগেসি সুরক্ষিত হল।

এবারের জিআই ট্যাগের তালিকায় থাকা এই মিষ্টিটির সঙ্গে আমরা ভালভাবেই পরিচিত। মৌখিক পরম্পরায় প্রচলিত গল্পটি অনুযায়ী জামাইষষ্ঠীতে ‘জামাই ঠকানো’-র জন্য এই মিষ্টির উদ্ভাবন। অসাবধান হয়ে এই মিষ্টিতে কামড় বসালেই মিষ্টির মধ্যে ভরা ‘জল’ ভিজিয়ে দিতে পারে পোশাক। অনেকে মনে করেন, ভদ্রেশ্বরের এক জমিদার গৃহিণীর অনুরোধে চন্দননগরনিবাসী সূর্য কুমার মোদক তৈরি করেন জলভরা সন্দেশ। অন্যান্য সন্দেশের তুলনায় সামান্য শক্ত এই সন্দেশের মধ্যে গোলাপজল মিশ্রিত দোলোর রস ভরে দেওয়া হয়। সন্দেশগুলির আকৃতি হয় গ্রীষ্মের আরেকটি জনপ্রিয় খাদ্য তালশাঁসের মতো। সেই সূত্রেই এই মিষ্টির আরেক নাম তালশাঁস। বহুদিন যাবৎ জনপ্রিয় এই মিষ্টির জনপ্রিয়তার কারণে সমগ্র বাংলাতেই এই মিষ্টি এখন সহজলভ্য। জিআই ট্যাগ পাওয়ার ফলে মিষ্টিটির উৎসস্থল সম্পর্কে আরও বহুমানুষ অবগত হবেন। আন্তর্জাতিক স্তরে মিষ্টিটির রপ্তানিও বাড়বে। তবে, ভিনরাজ্যে কিংবা বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি অসুবিধা এখনও রয়ে গিয়েছে। মিষ্টিটি সৰ্বাধিক পাঁচ – ছয়দিন তাজা থাকে। আশা করা যাচ্ছে, কোনও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন দ্বারা সমস্যাটির দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে।

|| জলভরার স্বাদ পেতে চাইলে যেতেই হবে চন্দননগর। ট্রেনপথে যেতে হলে, হাওড়া থেকে মেইন লাইনে বর্ধমানগামী যেকোনো ট্রেনে মানকুণ্ডু কিংবা চন্দননগর স্টেশন। একটি রিক্সা নিয়ে সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন জিটি রোডের উপর অবস্থিত সূর্য কুমার মোদক এন্ড গ্র্যান্ড সন্স-এর সব থেকে পুরোনো দোকানটিতে। শিয়ালদহ থেকে গেলে, জগদ্দল স্টেশনে নেমে রিক্সা নিয়ে ফেরিঘাট পৌঁছে চন্দননগর স্ট্র্যান্ডে উঠতে পারেন। ||

মৌখিক পরম্পরায় প্রচলিত গল্পটি অনুযায়ী জামাইষষ্ঠীতে ‘জামাই ঠকানো’-র জন্য এই মিষ্টির উদ্ভাবন। অসাবধান হয়ে এই মিষ্টিতে কামড় বসালেই মিষ্টির মধ্যে ভরা ‘জল’ ভিজিয়ে দিতে পারে পোশাক। অনেকে মনে করেন, ভদ্রেশ্বরের এক জমিদার গৃহিণীর অনুরোধে চন্দননগরনিবাসী সূর্য কুমার মোদক তৈরি করেন জলভরা সন্দেশ।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অধুনা বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামে মেচা সন্দেশের উৎপত্তি। সেই সময়ে রাঢ় বাংলায় দুধ উৎপাদনে ঘাটতি হয়। ফলে, বেসন এই মিষ্টির প্রধান উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমানকালেও বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ বাঁকুড়ায় সমানভাবে প্রসিদ্ধ। বেসনের গাঠিয়া (স্থানীয় ভাষায় ‘চোনা’) গুঁড়ো করে তার সঙ্গে ক্ষীর, চিনি, এলাচ ও ঘি মিশিয়ে মণ্ড প্রস্তুত করা হয়। তারপর সেই মণ্ডকে ছোট বলের আকৃতি দিয়ে চিনির ঘন রসে ডোবানো হয়। চিনির আবরণ শক্ত হয়ে গেলে তা মিষ্টিটির সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে। সাধারণ তাপমাত্রাতেই মেচা সন্দেশ প্রায় দুই সপ্তাহ ভাল থাকে। আশা করা যায়, জাতীয় – আন্তর্জাতিক স্তরে এই সুস্বাদু মিষ্টির পরিচিতি বাড়লে বেলিয়াতোড়ের মিষ্টি নির্মাতারা আরও সমৃদ্ধ হবেন।

|| মেচা সন্দেশ উপভোগ করতে হলে বেলিয়াতোড়ের উদ্দেশ্যে কোনও এক সপ্তাহান্তে বেরিয়ে পড়তে পারেন। ট্রেনপথে কলকাতা থেকে সরাসরি পৌঁছানো যায়, তবে ট্রেন সংখ্যা সীমিত। বাঁকুড়া কিংবা দুর্গাপুর স্টেশনে পৌঁছে বাস অথবা অটোতে চেপে বেলিয়াতোড় পৌঁছানো যায়। সুস্বাদু মেচা সন্দেশ পাবেন শ্রীদাম মোদক প্রতিষ্ঠিত মেচা মহল, লালুর চায়ের দোকানে। ||

হুগলি জেলার জনাই-এর মনোহরাও বহুকাল যাবৎ প্রসিদ্ধ। সাধারণ জনগণ তথা বিভিন্ন বিখ্যাত বাঙালির মন হরণ করেছে এই মিষ্টি। শোনা যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের খুবই পছন্দের মিষ্টি ছিল মনোহরা। বাঁকুড়ার মেচা সন্দেশের মতো মনোহরার বাইরেও থাকে চিনির রসের একটি আবরণ। ভেতরে থাকে নরম সন্দেশ। মনে করা হয়, শেল্ফ লাইফ বাড়ানোর জন্যই মনোহরার উপর চিনির আস্তরণ দেওয়ার রীতি প্রচলিত হয়েছিল। জনপ্রিয় মিষ্টিটির রপ্তানি বহুদিন ধরেই হয়ে আসছে। শীতকাল এলে মনোহরা হয়ে ওঠে আরও সুস্বাদু। চিনির জায়গা দখল করে নেয় গুড়। মনোহরার সন্দেশ তৈরির কৌশল অন্যান্য সন্দেশ বানানোর মতোই। চিনি ও ছানার নরম মিশ্রণকে ছোট ছোট বলের মতো আকৃতি দিয়ে গরম চিনি অথবা গুড়ের রসে ডোবানো হয়। রসের আবরণ শক্ত হলেই মনোহরা প্রস্তুত। তবে এর মৌলিক স্বাদের রহস্য জনাই-এর ময়রা পরিবারগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

|| হাওড়া থেকে কর্ড লাইনে বর্ধমানগামী যেকোনো লোকাল ট্রেনে চেপে সরাসরি জনাই স্টেশনে নামতে পারেন। মন্দিরতলা ক্রসিংয়ে অবস্থিত পাঁচ প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কমলা সুইটস। জনাই-এর সব থেকে পুরোনো এই দোকানটিতে বহুদূর থেকে মানুষ আসেন মনোহরার সন্ধানে। ||

অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে এডওয়ার্ড বাবুরসা নামে এক ইংরেজের নামে মিষ্টিটির নামকরণ। আমেরিকার ওয়েস্টার্ন গল্পের কোনও একলা নায়কের মতো তিনি ক্ষীরাই অঞ্চলের মানুষদের বর্গি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেন।

তিনটি মিষ্টি ছাড়াও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ক্ষীরাই-এর একটি মিষ্টি জিআই ট্যাগ পাওয়ার অপেক্ষায় আছে আপাতত। ময়দা ও ঘি সহযোগে তৈরি ব্যাটার বিশেষ উপায়ে ছাঁকা তেলে ভাজা হয় এবং তারপর সেটি চিনির রসে ডোবানো হয়। রাজস্থান কিংবা গুজরাটের ঘেওয়ার-এর সমগোত্রীয় এই মিষ্টির নাম বাবুরসা। অনেকের মতে, প্রথম মোগল সম্রাট বাবরের নামে এর নামকরণ। অন্যদিকে, আরেকটি জনশ্রুতিও বেশ প্রচলিত। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে এডওয়ার্ড বাবুরসা নামে এক ইংরেজের নামে মিষ্টিটির নামকরণ।  আমেরিকার ওয়েস্টার্ন গল্পের কোনও একলা নায়কের মতো তিনি ক্ষীরাই অঞ্চলের মানুষদের বর্গি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেন। কেউ বলেন, তিনি সঙ্গে করে এই মিষ্টি এনেছিলেন। আবার অনেকের ধারণা, স্থানীয় কোনও ময়রা তাঁর জন্য এই মিষ্টি তৈরি করেন।

|| শীতকালে কোনও একদিন ক্ষীরাই ঘুরে আসতেই পারেন। এই মিষ্টি ছাড়াও ক্ষীরাই-এর অন্যতম আকর্ষণ ফুলচাষ। দিগন্ত বিস্তৃত ফুলের ক্ষেত দেখে ফিরতি পথে চেখে দেখতে পারেন বাবুরসা। হাওড়া থেকে খড়গপুরগামী যেকোনো লোকাল ট্রেনে উঠে ক্ষীরাই স্টেশনে নামতে পারেন। ||

একদিন হঠাৎ ‘উঠলো বাই তো মিষ্টি খেতে যাই’ বলে বেরিয়ে পড়ুন! মিষ্টির উৎস সন্ধানে চলে যান উল্লিখিত যেকোনও গন্তব্যে। কারণ মনোহরা, মেচা, বাবুরসা কিংবা জলভরার স্বাদ আদতে আমাদেরই সাংস্কৃতিক লেগ্যাসির স্বাদ। ভৌগোলিক স্বীকৃতি সেই ঐতিহ্যকে, একাধিক প্রজন্ম ধরে চলে আসা কারিগরিকে আইনি পুরস্কার দিয়েছে মাত্র। আশা করা যায়, সেই স্বীকৃতির দ্বারা বিশ্বমঞ্চে আমাদের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিগুলির স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
 

Developed by DXDasia