
আচ্ছা, ফ্রেঞ্চ লিকার চকলেট কি ১৮১৮ সালে আবিষ্কৃত জলভরা সন্দেশ দ্বারা অনুপ্রাণিত? এমন এক অনুমানের কথা লিখেছেন অনুথি বিশাল, ইন্ডিয়া ন্যারেটিভে ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে। এটা ধারণা করা যেতেই পারে যে ফরাসিরা চন্দননগরে জলভরা সন্দেশের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। লিকার চকলেটের আবির্ভাব কিন্তু জলভরা সন্দেশ আবিষ্কারের বেশ কয়েক বছর পর! ভাবতে অবাক লাগে যে আজ থেকে দুশো বছর আগে সন্দেশের মোটা আস্তরণের ভেতর গোলাপ জল ধরে রাখার অসামান্য কারিগরির জন্ম হয়েছিল সূর্য কুমার মোদক নামে এক বাঙালির মাথা থেকেই। তাহলে একটু ইতিহাসের পাতায় ঘুরে আসা যাক।
শোনা যায়, সেই তালশাঁস আকৃতির ছাঁচ কিন্তু কোনো কাঠের মিস্ত্রি তৈরি করেননি, তৈরি করেছিলেন মোদক পরিবারের একজন সদস্য যিনি ছিলেন একজন সুক্ষ কারিগর। তারপর এই সন্দেশের মধ্যে সূর্য কুমার মোদক সুকৌশলে ভরে দিয়েছিলেন সুগন্ধি গোলাপ জল মেশানো দোলোর রস।
জলভরার জন্ম ১৮১৮ সালে। এর আগের সময়টায় আজকের মতো এত রকম মিষ্টিরও চল ছিল না। মিষ্টি বলতে মণ্ডা, মিঠাই, বরফি, মোরব্বা ইত্যাদি কিনতে পাওয়া যেত। সেই সময় ফরাসডাঙায় দোলো নামক এক প্রকার গুড়ের ব্যবসা প্রচলিত ছিল। দোলো হল আখের রস থেকে দেশীয় পদ্ধতিতে চিনি তৈরি করার মধ্যবর্তী একটি স্তরে উৎপন্ন অপরিশুদ্ধ দানাযুক্ত গুড়, যা জ্বাল দিতে দিতে পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে চিনি তৈরি হয়। শোনা যায় ‘ছানা’ একসময় বাঙালি সমাজে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পর্তুগিজদের সঙ্গে যেসব রাঁধুনি এসেছিলেন তাঁদের কাছ থেকেই বাঙালিরা ছানার ব্যবহার শিখেছিল। মিষ্টির দোকানে ছাঁচের প্রচলন শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। সূর্য কুমার মোদকের হাত দিয়ে জলভরা সন্দেশের আবির্ভাব তার কিছুটা সময় পর। সূর্য কুমার মোদকের মধ্যে শিল্পবোধের সহজাত প্রতিভা ছিল। তাঁর লেখা পুঁথি এখনও সযত্নে রাখা আছে চন্দননগর মিউজিয়ামে। এবার তাঁর অসামান্য আবিষ্কারের গপ্পে আসি। এই গপ্পো যদিও অনেকেরই জানা।
ফ্রেঞ্চ লিকার চকলেট
১৮১৮ সালের কথা। ভদ্রেশ্বর তেলিনীপাড়ার বিখ্যাত জমিদার ব্যানার্জি বাড়িতে জামাই আসবে। সেই সময় নানান উপায়ে জামাইকে ঠকানোর রেওয়াজ ছিল বাঙালি পরিবারের মহিলা মহলে। ব্যানার্জি বাড়ির জমিদার গিন্নির শখ হয়েছে নতুন কোনো মিষ্টান্ন দিয়ে জামাইকে আপ্যায়ন করবেন। কিন্তু, সেই মিষ্টি এমন হতে হবে যে তার মাধ্যমে জামাইকে ঠকানো যায়! এইটাই ছিল সূর্য কুমার মোদকের কাছে প্রজেক্টের ‘ব্রিফিং’! তিনি এক বিশেষ ধরনের সন্দেশ বানিয়ে জমিদারবাড়িতে পৌঁছে দেন। সেই সন্দেশ ছিল তালশাঁস আকৃতির। শোনা যায়, সেই তালশাঁস আকৃতির ছাঁচ কিন্তু কোনো কাঠের মিস্ত্রি তৈরি করেননি, তৈরি করেছিলেন মোদক পরিবারের একজন সদস্য যিনি ছিলেন একজন সুক্ষ কারিগর। তারপর এই সন্দেশের মধ্যে সূর্য কুমার মোদক সুকৌশলে ভরে দিয়েছিলেন সুগন্ধি গোলাপ জল মেশানো দোলোর রস। তারপর সেই সন্দেশে জামাই কামড় দিতেই ছ্যার ছ্যার করে রস বাইরে এসে তাঁর পাঞ্জাবি ভিজিয়ে দেয়। জামাইকে বেশ ভালো মতোই ঠকানো গেলো তাহলে! গপ্পো এখানেই শেষ।
এই গপ্পের সবচেয়ে থ্রিলিং অংশ হল, আজ থেকে দুশো বছর আগে এক বাঙালির অসামান্য বুদ্ধি, যিনি সন্দেশের ভেতরে রস ভরে রাখার কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন। আমরা জানি জামাই ষষ্ঠী সাধারণত গরমকালে হয়। সেই সময় আম, জাম, লিচু, তালশাঁস ইত্যাদি ফল বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। এইসব ফলের মধ্যে একমাত্র তালশাঁস তার মধ্যে রস লুকিয়ে রাখে। এই লুকিয়ে রাখার মধ্যে একটা চমক আছে। তাই, এটা অনুমান করতে অসুবিধা নেই যে জলভরা সন্দেশের আইডিয়া এসেছে তালশাঁস থেকেই। এখানে একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে। সূর্য কুমার মোদক কি জমিদার গিন্নির বলার আগেই এই ধরনের সন্দেশ বানাবার চিন্তা করেছিলেন? তাঁর মাথায় হয়তো ভাবনা আগে থেকেই ছিল যা পূর্ণতা পায় জমিদারগিন্নির আদেশ আসার পর। এগুলি অনুমানমাত্র। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভাবনা আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক অনেক। সন্দেশের ভেতরে রস লুকিয়ে রাখার কারিগরি আজ থেকে দুশো বছর আগে অবশ্যই সহজ ছিল না। আমার ধারণা, যেভাবে মাটির পাত্রে জল থাকে সেই থিওরি এখানে প্রয়োগ করা হয়েছে। সন্দেশকে কোনো বিশেষ পাকের মাধ্যমে মসৃণ করে ঠিক সেই পরিমাণ কাঠিন্য দেওয়া হয়েছে যা রসকে ধরে রাখবে আবার একই সঙ্গে যে খাবে তাঁর কাছে খুব খটখটে শক্তও মনে হবে না। ম্যাজিকটা এখানেই। অবশ্যই যা ট্রেড সিক্রেট! শুধু সন্দেশ নয়, যে বিশেষ রস সন্দেশের ভেতরে দেওয়া হয় সেখানেও কোনো সিক্রেট আছে। তবে এই সিক্রেট আসলে কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকেই নেওয়া।
সূর্য মোদকের জলভরা, বঙ্গদর্শনের রিপোর্টিং
জলভরার বিশেষত্ব হল ইনি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, শুয়ে থাকেন না। বেশ কয়েকদিন এর ভেতরের রসটি একদম বহাল তবিয়তে থাকে, সন্দেশ শুষে নেয় না। তবে মনে রাখবেন, জলভরা কিন্তু খুব হিংসুটে সন্দেশ। এঁকে ভাগ করে খেতে যাবেন না। সন্দেশের ভাগ হবে, রসের ভাগ হবে না। জলভরা বিমানে চেপে দিব্যি বিদেশে পৌঁছে যায়। এই অভিনব মিষ্টির ক্যারিশ্মা দুশো বছরে একটুও ম্লান হয়নি। কান পাতলে জলভরার প্রসঙ্গে বহু বিখ্যাত ব্যক্তির গপ্পো শোনা যায়। যেমন এক পৃথিবী বিখ্যাত বাঙালি চিত্র-পরিচালক একবার বোলপুর যাচ্ছিলেন শ্যুটিং করতে। পথে সূর্য মোদকের দোকানে কিছু টাকা আগাম দিয়ে গেলেন। ফেরার পথে মিষ্টি নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু, সেই মিষ্টি তিনি আর নিতে পারেননি। সেই টাকা নাকি এখনও তাঁর নামে জমা আছে! বহু বিখ্যাত বাঙালি নেতা-মন্ত্রী দিল্লিতে নিয়ে গেছেন জলভরা। এই প্রসঙ্গে আর একটা গপ্পো বলা যেতে পারে। দিল্লির এক বিখ্যাত বাঙালি মন্ত্রী মনস্থির করেছেন দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে জলভরা সন্দেশ খাওয়াবেন। ব্যারাকপুর সেনা ছাউনি থেকে ফোনে অর্ডার আসে দোকানে। প্রথমে সেই মিষ্টির স্যাম্পেল টেস্ট হয়। সেই টেস্টে উত্তীর্ণ হবার পর বেশ বড়ো একটা অর্ডার আসে দিল্লি থেকে। দোকানের মালিক জানতে চান, এতো মিষ্টি কীভাবে দিল্লিতে যাবে? উত্তর আসে, দিল্লি থেকে একটা আস্ত বিমান এসেছে এই মিষ্টি নিয়ে যেতে!

