বাঙালির চিরন্তন ইলিশ-পুরাণ

কালোজিরে-বেগুনের পাতলা ঝোল থেকে খাঁটি সর্ষে ভাপা— ইলিশের এলাহি কাণ্ড

লের রাজা যদি আম হয়, তাহলে মাছের রানি হল ইলিশ (Hilsa)। ইলিশ মাছকে অসম্ভব সুন্দর দেখতে, সূচাগ্রমুখ, সুতনুকা, মেদুলা, অপরূপা দেহ কান্তি, রূপোর তবকে মোড়া – তাই তো একে সোহাগে আদরে ‘রূপোলি শস্য’ বলা হয়। ইলিশ, মাছ হয়েও মাছ নয়, মাছেদের দল থেকে আলাদা, মনে হয় সে স্বর্গের শাপগ্রস্থা কোনো রূপসী দেবী, যে একাধারে মনমোহিনী কিন্তু ভীষণ লাজুক, অসূর্যমস্পর্শা। জল থেকে জেলের জালে বন্দি হয়ে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জীবনবায়ু ত্যাগ করে। (ইলিশ-পুরাণ)

ডিম ভরা ইলিশ ভাজা

কমলকুমার মজুমদারের মতে, গঙ্গার ইলিশ ২০০ বছর ধরে গঙ্গার দু-ধারের চটকলগুলোর উদ্বৃত্ত তেল খাওয়ার জন্য এত সুস্বাদু। কমলকুমার মজুমদার এবং রাধাপ্রসাদ গুপ্ত দুজনেরই মতে, গঙ্গার ইলিশ স্বাদে-আস্বাদে পদ্মার ইলিশের চেয়ে এগিয়ে।

ইলিশ সামুদ্রিক হলেও বর্ষার সময়, আষাঢ় শ্রাবণ মাসে মিষ্টি জলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। এই সময় উপকূলবর্তী নদীতে তারা ঢুকে সেখানেই ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার পর সদলবলে, মিষ্টি জল ছেড়ে, সমুদ্রে পাড়ি দেয়। ইলিশ যেহেতু সমুদ্রের নোনা জল এবং নদীর মিষ্টি জল দুই জায়গাতেই তার জীবন চক্রের অংশবিশেষ অতিবাহিত করে তাই একে এনাড্রোমোয়াস বলা হয়। ইলিশ মূলত ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান-মায়ানমার-ইরাকের নদীর মোহনা ও অববাহিকা অঞ্চলে পাওয়া যায়। গোটা পৃথিবীর আশি শতাংশ ইলিশ বাংলাদেশে সংগৃহীত হয়। ইলিশকে নানা নামে আমরা ডাকি – ইলিশ, এলিশ, জাটকা, পালো মাছি, পুলাসা ইত্যাদি। (ইলিশ-পুরাণ)

ভারতে পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা ও রূপনারায়ণ অববাহিকায়, অন্ধ্রপ্রদেশে গোদাবরী অববাহিকায়, মহারাষ্ট্রে নর্মদা অববাহিকায় ইলিশ পাওয়া যায়। পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের সিন্ধু অববাহিকায়, দক্ষিণ ইরাকের টাইগ্রিস নদীর অববাহিকায়, মায়ানমারের ইরাবতী নদীর অববাহিকায় এবং বাংলাদেশের পদ্মা ও যমুনা নদীর অববাহিকায় ইলিশ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতির মোট জিডিপির ১৫ শতাংশ ইলিশের দখলে, ফলে তাদের অহংকার এই ইলিশ মাছ। (ইলিশ-পুরাণ)

যদিও, আমার মতে পদ্মার ইলিশ আকারে বড়ো, অতিরিক্ত তৈলাক্ত এবং ডিমে ভরা হলেও, গঙ্গার ইলিশ দেখতে সুন্দর, ছোটখাটো আঁটোসাঁটো গরন, কম তৈলাক্ত, বেশিরভাগই ডিম ছাড়া, স্বাদে অপূর্ব ঠিক যেন স্বর্গীয় পারিজাত। ইলিশ মাছের ডিম আমার ইলিশ মাছের চেয়েও বেশি প্রিয়। তবে ইলিশ মাছের ডিম হয়ে গেলে তার স্বাদ কমে যায়, এটা ছোটোবেলা থেকেই জেনে এসেছি। কমলকুমার মজুমদারের মতে, গঙ্গার ইলিশ ২০০ বছর ধরে গঙ্গার দু-ধারের চটকলগুলোর উদ্বৃত্ত তেল খাওয়ার জন্য এত সুস্বাদু। কমলকুমার মজুমদার এবং রাধাপ্রসাদ গুপ্ত দুজনেরই মতে, গঙ্গার ইলিশ স্বাদে-আস্বাদে পদ্মার ইলিশের চেয়ে এগিয়ে। (ইলিশ-পুরাণ)

ইলিশ ভাপা সহযোগে গরম ভাত

গঙ্গার ইলিশের স্বাদ আবার সব জায়গায় এক নয়। ‘থোড় বড়ি খাড়া’ বইতে কল্যাণী দত্ত লিখেছেন, “এই খাস কলকাতায় আমাদের পাড়াতেই এক সেন পরিবার থাকতেন। কলকাতায় সেন কায়েত খুব কম, বাসুকি নয়, ধন্বন্তরি গোত্রের দু-চার ঘর আছেন। যা হোক আমাদের একবার সাহস হয়েছিল এঁদের বাড়িতে টাটকা গঙ্গা ঈলিশ উপহার দেবার। তা দেওয়া মাত্রই বললেন, “ইলিশ মাছ কোন ঘাটের লা?” আমি বাড়ি থেকে জেনে এসে বললুম– “তক্তাঘাটের, মা পাঠিয়ে দিলেন, বাবার বন্ধুরা সবাই মিলে অনেক ইলিশ এনেচেন কিনা।” উত্তর পেলুম – “মাগো তক্তাঘাট চিবুতে চিবুতে যে চোয়াল ব্যথা ধরে যাবে। আমরা খেতুম কুমোরটুলি নইলে বাগবাজার ঘাটের মাছ। তা সেগুলো মা সিদ্ধেশ্বরীর পা- ধোয়ানী জল খেয়ে খেয়ে কেমন গোলাপী বন্ন যে হত, তোকে আর কি বলব? ঘাটে ঘাটে যে ‘তার’ বদলায় তা তো জানিসনি।”

ইলিশ মাছ বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে বিশেষ করে বাঙাল পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সরস্বতী পুজোর দিন জোড়া ইলিশ পান সুপারি সিঁদুরসহ বিয়ে দেওয়া হয়। সেই রাতে ওই জোড়া ইলিশ নানান সুস্বাদু পদ করে খাওয়া হয় আর ইলিশের আঁশগুলো বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে চার কোণে গর্ত করে পুঁতে রাখা হয়। কারণ হিসেবে জানা যায়, ইলিশ মাছ মঙ্গলের লক্ষণ এবং এর আঁশ বাড়ির চারপাশে পুঁতে রাখলে বাড়িতে বিপদ হয় না। বিজয়া দশমীর দিনও আবার জোড়া ইলিশ এনে রান্না করা হয়। সরস্বতী পুজোয় যে ইলিশ মাছের খাওয়া শুরু, বিজয়া দশমীর দিন এই ইলিশ মাছের খাওয়া – এ বছরের মতো বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ইলিশ-বেগুন ঝোল

ইলিশ মাছ এমনই একটা মাছ, যে মাছের কোনো কিছুই ফেলা যায় না। মাছ তো আছেই! মাছের ডিম তাও বাদ দিলাম! মাছের তেল! মাছের মুড়ো তা দিয়ে কচুশাক আহা! সবকিছুই যেন উচ্চ সুরে বাঁধা। ইলিশ মাছ যেদিন হয় সেদিন শুধু সাদা ভাতই যথেষ্ট। একটু নুন একটু কাঁচা লঙ্কা। ব্যাস! আর কিছু না। খাওয়া-দাওয়ার পরে আর হাত ধুতে ইচ্ছে করে না! যেমন বিভিন্ন নদী অববাহিকার বিভিন্ন ঘাটের ইলিশ মাছের স্বাদ বিভিন্ন রকম, সেই বিভিন্ন পদের ইলিশ মাছের রন্ধন প্রণালীর স্বাদও বিভিন্ন রকম।

আমার দিদা ডুমো ডুমো কুমড়ো আর লম্বা লম্বা আলু-জিড়ে ফোড়ন দিয়ে ধনে জিরে গুঁড়ো লঙ্কা-সহ ইলিশ ভাজার একটা ঝোল করতেন যা খেতে অপূর্ব হতো। মামাবাড়ির আরেক জায়গায় লম্বা লম্বা ফালি বেগুন, লম্বা লম্বা আলু, কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে, কাঁচা লঙ্কা, হলুদ আর কাঁচা ইলিশ মাছের একটা ঝোল করতেন যেটা আমি আর কোথাও খাইনি, আর কোনোদিন রাঁধতেও পারিনি। অরন্ধনের দিন আমাদের বাড়িতে চলতো ইলিশ উৎসব। অরন্ধনের দিন, তার আগের দিন এবং পরের দিন এই তিন দিন ধরে দুপুরে ও রাত্রে গরম ভাত ইলিশ মাছের তেল, ডিম ভাজা , ইলিশ মাছ ভাজা, ইলিশ মাছের ঝাল। অবশ্য ইলিশ মাছটা সামান্য ভেজে, ঠাকুরমা সর্ষের ঝাল করতেন। ঠাকুরমাকে কোনোদিন সরষে ভাপা ইলিশ করতে দেখিনি। ওই তিন দিনে সারা বছরের ইলিশ খাওয়া হতো আমাদের।

মাছ তো আছেই! মাছের ডিম তাও বাদ দিলাম! মাছের তেল! মাছের মুড়ো তা দিয়ে কচুশাক আহা! সবকিছুই যেন উচ্চ সুরে বাঁধা। ইলিশ মাছ যেদিন হয় সেদিন শুধু সাদা ভাতই যথেষ্ট। একটু নুন একটু কাঁচা লঙ্কা। ব্যাস!

ইলিশের তেল ঝোল

বিশ্বকর্মা পুজোর দিন মামাবাড়িতে ইলিশ ভাপা খাওয়া হত। সেই ইলিশের স্বাদ আর রান্না মুখে লেগে আছে। সব দিদারা মিলেই রান্নার তোড়জোড় করতেন। কিন্তু রাঁধতেন মূলত আমার দিদা আর মেজো দিদা। সন্ধেবেলায় কলাপাতায় ধোঁয়া ওঠা ভাত, ইলিশ মাছের তেল আর ডিম তাতে নুন আর লঙ্কার সংযোগ, আহা কোনো কথা হবে না, শুধু মুখ চলবে খাওয়ার। শাশুড়িকে দেখতাম কাঁচা ইলিশ মাছের টুকরোগুলোকে নিয়ে সরষে বাটা, সর্ষের তেল আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মাখতেন বেশ কিছুক্ষণ। মাখার পর উনি ওটাকে ছেড়ে দিতেন। যাকে, ইংরেজিতে বলে সেটিং পিরিয়ড। এরপর কড়াতে সরষের তেল দিয়ে, তেল গরম হলে তাতে ওই ইলিশ মাছ- সরষে বাটা মাখাটা দিয়ে উনি উনুনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মাঝেমধ্যে কড়াটাকে নাড়াতেন আর অদ্ভুত জাদুকরী অধ্যাবসায়ে মাছগুলোকে ওলোট-পালোট করে নিতেন। কোনোরকম খুন্তি ব্যবহার না করেই। শুধু এই রন্ধন প্রক্রিয়া দেখার জন্যই বছর ভরের প্রতীক্ষা করা যায়। কোনোরকম খুন্তি-সাঁড়াশির ব্যবহার ছাড়াই যে ইলিশ ভাপে রান্না করা যায় তা আমি জানতাম না, শাশুড়ি ছাড়া আর কাউকে করতেও দেখিনি।

ইলিশ মাছ আবহাওয়া পরিবর্তন, দূষণ ও অতিরিক্ত মুনাফা লাভের লোভের কারণে আজ দুর্মূল্য হয়ে উঠেছে। তেলেগু ভাষায় একটা প্রবাদ চালু হয়েছে, পুলাসার (তেলেগু ভাষায় ইলিশ মাছ) জন্য মঙ্গলসূত্র বিক্রি করতে রাজি। তবে যতই দুর্মূল্য হোক, এই আকড়ার বাজারে যতই অভাব থাকুক, বাঙালির রসনা ইলিশ মাছ ছাড়া অসম্পূর্ণ।
 

Developed by DXDasia