নোনা ইলিশ : বাঙালি বাড়িতে ইলিশ-সংরক্ষণের পুরোনো পদ্ধতিটির চল আজও কি আছে?

নোনা ইলিশের চল কি উঠে যাচ্ছে?

৮৯৭ সনে লেখা রামলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কষ্টিপাথর নাটকে নবীন বলে একজন ‘উন্নতিশীল বাবু’ এক টাকায় এক জোড়া ইলিশ কিনে এনে লোকদের বলছেন : ‘রাজপুত্তুর মশাই রাজপুত্তুর! কি যে গড়ন যেন ননীন চাপ থেকে কেটে তুলেছে। দিব্বি দোহারা, একটু পাশ থেকে গোলাপী আভা মাচ্চে।’ সত্যিই তো স্বাদে-রূপে-গুণে সে একাই একশো! ইলিশ বাঙালির বোধহয় সবচেয়ে প্রিয় আর সবচেয়ে গর্বের মাছ। গঙ্গা বা পদ্মার আশপাশের গ্রাম-গঞ্জ, মফস্সলের সঙ্গে একসময় শহরের অলি গলিও ইলিশের গন্ধ ম-ম করতো। ফিরিওয়ালা হাঁক দিয়ে যেত ‘ইলিশ চাই—গঙ্গার ইলিশ’। বাজার ফেরত গৃহস্থ রান্নাঘরের দিকে থলে বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন—‘আজও ইলিশ’।

আজকাল মূল্যবৃদ্ধি জনিত কারণে বা সময়ের অভাবে বাঙালি-বাড়িতে এই নোনা ইলিশের চল প্রায় নেই-ই। তবে, এপার বাংলায় না থাকলেও বাংলাদেশে এখনও আছে। এমনকি বাংলাদেশে নোনা ইলিশের জন্য আলাদা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে।

ভাবছি, আজ কার কত বুকের পাটা যে বাজার থেকে ফিরে এসে পরিবারকে বলতে পারে ‘আজও ইলিশ’! সে দিন গিয়াছে। কিন্তু যখন এর দিন ছিল, যখন সস্তায় কিলো কিলো ইলিশ ঘরে তোলা যেত, এককালে ডালের থেকেও বাঙালি ঘরে সহজলভ্য ছিল ইলিশ! সেসব দিনে বাড়ি বাড়ি রেফ্রিজারেটর ছিল না। ফলত, নিজে খেয়ে অপরকে খাইয়েও যখন দেখা যেত বেশ কিছু কাঁচা ইলিশ রয়ে গেছে, বাঙালি গৃহে পরম যত্নে সেগুলো সংরক্ষণ করা হতো। এই যে সংরক্ষণ পদ্ধতি, বঙ্গদেশে তার চল বহুদিনের; এর নাম, নোনা ইলিশ। নুন দিয়ে ইলিশ সংরক্ষণ করা হয় বলেই এমন নাম, এটি স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি। এতে করে মাছ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। নোনা ইলিশ দিয়ে নানারকম পদ রান্না করা যায়। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরায় সেসব রান্নার চল ছিল।

আজকাল মূল্যবৃদ্ধি জনিত কারণে বা সময়ের অভাবে বাঙালি-বাড়িতে এই নোনা ইলিশের চল প্রায় নেই-ই। তবে, এপার বাংলায় না থাকলেও বাংলাদেশে এখনও আছে। এমনকি বাংলাদেশে নোনা ইলিশের জন্য আলাদা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। নদীতে যখন ইলিশ থাকে না তখন বাজারে বিক্রি করা হয় নোনা ইলিশ। দেশের উত্তরবঙ্গ সহ বিভিন্ন জায়গায় এর চাহিদা থাকায় ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন, করছেন কোটি টাকার বাণিজ্য। 

বানিজ্য ক্ষেত্রে কয়েকটি ধাপে নুন দিয়ে ইলিশ সংরক্ষণ করছেন নোনা ইলিশের ব্যবসায়ীরা। প্রথমেই ইলিশের পেট থেকে তারা ডিম আলাদা করে ফেলছেন। এরপর আস্ত ইলিশ মাছটি ফালি ফালি করে কেটে পরবর্তীতে ভালোভাবে নুন দিচ্ছেন। নুন দেয়া অবস্থায় স্তূপাকারে এসব মাছ ৬-৭ দিন রাখার পর পরবর্তীসময়ে তা নুনমিশ্রিত জলে ডুবিয়ে সংরক্ষণ করছেন। এভাবে নুন দিয়ে প্রক্রিয়াজাকৃত ইলিশ এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায় বলে জানা যায়।

 

ইলিশের মৌসুমে মাছঘাটে প্রতি দিন হাজার হাজার মণ ইলিশ আমদানি হয়। এ সময় অনেক মাছ বিভিন্ন কারণে নরম হয়ে যায়। যা এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা নুন দিয়ে সংরক্ষণ করে থাকেন। শীতের সময় চাঁদপুর, ঢাকা, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, পাবনা, কিশোরগঞ্জসহ দেশের উত্তরবঙ্গে এই নোনা ইলিশের ব্যাপক চাহিদা থাকে। তখন নোনা ইলিশ কেজিপ্রতি প্রকারভেদে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। চাহিদা ভালো থাকায় বাংলাদেশের চাঁদপুরে নোনা ইলিশের শিল্প গড়ে উঠছে।

নোনা ইলিশ তৈরির পদ্ধতি :
তাজা ইলিশ ১টি (১ কেজি), নুন ১ কাপ, হলুদ ১ চা-চামচ, মাটির মালশা ১টি। চাইলে একাধিক ইলিশ মাছ এভাবে সংরক্ষণ করতে পারবেন। 

প্রণালি: 
প্রথমে ইলিশ মাছ পরিষ্কার করে নিতে হবে ভালো করে। মাথার ভেতরের ফুলকো ও পেটের নাড়িভুঁড়ি ভালো করে ফেলে দিতে হবে। এমনকি মাছের ভেতরের ডিমও সরিয়ে ফেলতে হবে। ধোয়া হলে জল ঝরিয়ে টিস্যু বা শুকনো কাপড় দিয়ে চেপে চেপে জল মুছে ফেলুন। এরপর ধারালো ছুরি দিয়ে পিঠের দিকে লম্বালম্বি করে কাটুন। লেজ আর মাথা আস্ত রেখে দিন। দেখতে যেন ডিঙিনৌকার মতো মনে হয়। এরপর নুন, হলুদের মিশ্রণ পিঠের কাটা অংশে, মাথার ভেতর, পেটের ভেতর, ওপর-নিচে ভালোভাবে চেপে চেপে দিতে হবে। কোথাও যেন খালি না থাকে। মাটির মালশা ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। মাটি শুকিয়ে গেলে তলায় আরেকটু নুন দিয়ে দিন। এবার আগে থেকে নুন মাখানো মাছ রেখে দিন। এরপর ওপরে পলিথিন দিন। এর ওপর ঢাকনা দিয়ে মুখ বন্ধ করার সময় সুতো বা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিন মালশার মুখ। যেন কোনোভাবেই হাওয়া না ঢোকে, এভাবে বন্ধ অবস্থায় ২০-২৫ দিন রেখে দিন। মাটির মালশা না থাকলে ভালো মানের প্লাস্টিকের বায়ুনিরোধক বাটিতেও এভাবে মুখ বন্ধ করে রাখা যায়। খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই হাওয়া না ঢুকতে পারে।

তথ্যঋণ :
মাছ-আর-বাঙালী : রাধাপ্রসাদ গুপ্ত
প্রথম আলো

Developed by DXDasia