ডায়মন্ডহারবারের পাশাপাশি কোলাঘাট এবং বাগবাজার ঘাটের ইলিশেরও খুব সুনাম ছিল
২০১১ সালে জনৈক সংবাদপত্রে সুনীল গাঙ্গুলি লিখেছিলেন, ‘অনেকদিন বাজারে যাইনি, এ বছর শুনছি ইলিশের দাম নাকি ছ’শো, সাতশো টাকা। অবিশ্বাস্য মনে হয়। …আসল ইলিশের স্বাদ দেড় কিলো থেকে পৌনে দু’কিলোতে। আমরা বাল্যকাল থেকে ইলিশের সমঝদার। আমার মতন এমন মানুষ খুব কমই আছে, যে জ্যান্ত ইলিশকে লাফাতে দেখেছে। ছোটো ইলিশ কখনও খেতাম না, আর বরফের ইলিশ তো ছুঁয়ে দেখারও প্রশ্ন ছিল না।’
এক দশকেরও আগে, সুনীল যে সময়ে কথাগুলো বলেছেন, তখনও ‘বাজার’ কী জিনিস জানতাম না। এখন অল্পবিস্তর অভিজ্ঞতা হয়েছে। সুনীলের মতো জ্যান্ত ইলিশ লাফাতে না দেখলেও মনে পড়ে, নয়ের দশকে ইলিশ মাছের দাম কীরকম ছিল। ১৯৯১ সালে আমার জন্ম। বাড়ি ডায়মন্ডহারবার সংলগ্ন এলাকায় হওয়ার সুবাদে ছোটোবেলায় ওজনে ভারী অথচ খুব সস্তার (দু’শো থেকে বড়োজোর তিনশো টাকা কেজি) টাটকা ইলিশের স্বাদ আমার মেমোরিতে আজও অক্ষত ।
বাংলাদেশের ইলিশ ছোটোবেলায় খেয়েছি কি না মনে নেই, খোকা ইলিশ তখনও মার্কেট পায়নি। মনে আছে, বর্ষা ঢুকলেই বাড়ির ল্যান্ড ফোনে মুহুর্মুহু ফোন ঢুকতো। এদিক-ওদিক থেকে লাগাতার ফোন আসত আত্মীয়দের। কেউ আবদার করতো ইলিশ পাঠিয়ে দিতে হবে, কেউ আবার পরিষ্কার জানিয়ে দিত, আসছে রবিবার সবাই আসছি, বাবান ডিমওয়ালা ইলিশ কী ভালবাসে… একটু দেখেশুনে কেনা হয় যেন। এভাবে ফি বছর শুধু আমার বাড়িতে নয়, ইলিশ উৎসব হতে দেখতাম আশপাশের সব বাড়িতেই। সামর্থ্যের সঙ্গে ইলিশের তেমন সম্পর্ক ছিল না তখন।
আরও পড়ুন: বাঙালো, মাছ খাইল, ভাঁড় ভাঙিল, পয়সা দিল না…
বেশি সস্তায় ইলিশ পাওয়া যেত বিকেল বেলায়। সূর্য ডোবার কিছু আগে নদী থেকে টাটকা মাছ সরাসরি চলে আসত আড়তে, সেখান থেকে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাজারে। মাছের আড়তগুলোতে হাট-বাজারের থেকে সস্তায় ইলিশ পাওয়া যেত বলে, দূর দূর থেকে ক্রেতারা আসত। লাইন পড়ে যেত। যাদের পরিবার বড়ো বা আমাদের মতো আত্মীয়সেবার ব্যাপার থাকতো, তারা বিকেল হলেই সেই লাইনে সামিল হতো। সাইজ অনুয়ায়ী কিছু কিছু মাছ নিলামেও উঠতো। হৈ হৈ ব্যাপার।
শুধু ডায়মন্ডহারবার নয় এককালে কোলাঘাট, বাগবাজার ঘাটের ইলিশেরও খুব সুনাম ছিল। আজ যেমন ইলিশের এখন-তখন বিচার করতে বসেছি, বাড়ির বড়দেরও এক সময় তাই করতে দেখেছি। এভাবেই চলে আসছে। চলতে চলতে এখন এমন এক বাজারের মুখোমুখি হয়েছি আমরা যেখানে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদের কাছে আসল ইলিশ হল শুধুই স্মৃতিমেদুরতা। তাও যেটুকু নাগালে আসে, হয় ‘খোকা’ নয় তো মর্গে থাকা ইলিশ। পদ্মার ইলিশ ডুমুরের ফুল। টাটকা ইলিশ যে বাজারে পাওয়া যায় না এমনটা নয়, মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষায় তা হল ‘কাঁচা মাছ’ অর্থাৎ বরফ ছাড়া। যাঁরা বাজারে গিয়ে দামদর না করে থরে থরে নোট সাজানো মানিব্যাগ ফাঁক করে ঘোরাঘুরি করেন, বলাই বাহুল্য ‘কাঁচা মাছ’গুলো তাঁদের প্রতিই নিবেদিত।
সুনীলের লেখাতেই পড়েছিলাম, একটি বিস্মৃত কাহিনি অনেক কাল আগের, স্বাধীনতা ও দেশ ভাগের আগে, এক কলকাতার বাবু গিয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে বেড়াতে।
একটি গ্রাম্য কিশোরের সঙ্গে ভাব জমাবার উদ্দেশ্যে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, খোকা, আজ কী দিয়ে ভাত খেলি রে দুপুরে?
ছেলেটি বলল, কলমি শাক আর দুইখান মাছ ভাজা দিয়া দুগ্গা (কিছু) ভাত খাইলাম। তার পর মাছের ঝোল দিয়া ভাত খাইলাম। তার পর পুঁটিমাছ আর তেঁতুলের চুকা (টক) অম্বল।
ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, সে কী রে, তোরা ডাল খাসনি?
ছেলেটি ততোধিক অবাক হয়ে বলল, কত্তা, আমরা কি বড়লোক যে ডাইল খাব?
পাশা উল্টে গেছে। ভাবছি, ঝমঝমে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জেলেরা নদীর মাঝখানে কীভাবে টলটল করছে কিছু ইলিশের আশায়। আর ভাবছি, টিভির অতিসজ্জিত রান্নাঘরে প্রতিবছরের মতো এবারও নিশ্চয়ই আমরা দেখতে পাবো ইলিশের ঝাল-ঝোল-ভাপা-অম্বলের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া চমৎকার সব রেসিপি। সঞ্চালিকা নিজে অথবা কোনও অতিথি রাঁধুনি আসবেন, বানানো হবে নোলা ঝরানো অপূর্ব ইলিশের গালভরা পদ। তারপর…
আরও পড়ুন: “শনিবারের কড়চা : ইলিশ বিশেষ সংখ্যা”
তারপর সেই সময়টা আসবে যখন আমরা মুখে হাসি, মনে আশা নিয়ে বাজারে যাবো এবং ম্লান মুখ, মনে হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসব। এবং ফিরে এসে বুদ্ধদেব বসুর ‘ইলিশ’ কবিতাটি পড়বো অথবা পড়বো না-
আকাশে আষাঢ় এলো; বাংলাদেশ বর্ষায় বিহবল।
মেঘবর্ণ মেঘনার তীরে-তীরে নারিকেলসারি
বৃষ্টিতে ধূমল; পদ্মাপ্রান্তে শতাব্দীর রাজবাড়ি
বিলুপ্তির প্রত্যাশায় দৃশ্যপট-সম অচঞ্চল।
মধ্যরাত্রি; মেঘ-ঘন অন্ধকার; দুরন্ত উচ্ছল
আবর্তে কুটিল নদী; তীর-তীব্র বেগে দেয় পাড়ি
ছোটে নৌকাগুলি; প্রানপনে ফেলে জাল,টানে দড়ি
অর্ধনগ্ন যারা,তারা খাদ্যহীন,খাদ্যের সম্বল।
রাত্রি শেষে গোয়ালন্দে অন্ধ কালো মালগাড়ি ভরে
জলের উজ্জ্বল শষ্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব,
নদীর নিবিড়তম উল্লাসে মৃত্যুর পাহাড়।
তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে ঘরে
ইলিশ ভাজার গন্ধ; কেরানীর গিন্নির ভাঁড়ার
সরস সর্ষের ঝাঁজে।এলো বর্ষা,ইলিশ -উৎসব।