বরিশালে নাকি বাংলাদেশের মধ্যে সবথেকে বেশি ইলিশ মাছ পাওয়া যেত
অনেক বছর আগে, এক সংবাদপত্রে সুনীল গাঙ্গুলি লিখেছিলেন, “অনেকদিন বাজারে যাইনি, এ বছর শুনছি ইলিশের দাম নাকি ছ’শো, সাতশো টাকা। অবিশ্বাস্য মনে হয়। …আসল ইলিশের স্বাদ দেড় কিলো থেকে পৌনে দু’কিলোতে। আমরা বাল্যকাল থেকে ইলিশের সমঝদার। আমার মতন এমন মানুষ খুব কমই আছে, যে জ্যান্ত ইলিশকে লাফাতে দেখেছে। ছোটো ইলিশ কখনও খেতাম না, আর বরফের ইলিশ তো ছুঁয়ে দেখারও প্রশ্ন ছিল না।”
সুনীলবাবু যে সময়ে কথাগুলো লিখেছেন, তখনও ‘খোকা ইলিশ’ তখনও মার্কেট পায়নি। ওজনে ভারী অথচ খুব সস্তার (দু’শো থেকে বড়োজোর তিনশো টাকা কেজি) টাটকা ইলিশের স্বাদ অনেকেই আজ মনে করতে পারেন না। একসময় বাড়িতে বাড়িতে ইলিশ উৎসব’ হতো। সামর্থ্যের সঙ্গে ইলিশের তেমন কোনও সম্পর্ক ছিল না তখন!
আরও পড়ুন: বর্ষার ভ্রমণে সঙ্গী হোক ইলিশ মাছের স্বাদ

শুধু ডায়মন্ড হারবার নয় ইলিশ-ঘাঁটি হিসেবে এককালে কোলাঘাট, বাগবাজার ঘাটের ইলিশেরও খুব সুনাম ছিল। সেসব এখন অতীত। আজ আমি যেমন ইলিশের এখন-তখন বিচার করতে বসেছি, বাড়ির বড়োদেরও এক সময় তাই করতে দেখেছি। এভাবেই চলে আসছে। চলতে চলতে এখন এমন এক বাজারের মুখোমুখি হয়েছি আমরা যেখানে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদের কাছে আসল ইলিশ হল শুধুই স্মৃতিমেদুরতা। তাও যেটুকু নাগালে আসে, হয় খোকা নয় তো মর্গ, থুড়ি ‘কোল্ড-স্টোরেজ’-এ থাকা বাংলাদেশি ইলিশ—পদ্মার ইলিশ। তবে টাটকা ইলিশ যে একেবারেই বাজারে পাওয়া যায় না এমনটা নয়, মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষায় তা হল ‘কাঁচা মাছ’ অর্থাৎ বরফ ছাড়া। যাঁরা বাজারে গিয়ে দামদর না করে থরে থরে নোট সাজানো মানিব্যাগ ফাঁক করে ঘোরাঘুরি করেন, বলাই বাহুল্য ‘কাঁচা মাছ’গুলো তাঁদের প্রতিই নিবেদিত।
সুনীলের ওই লেখাতেই পড়েছিলাম, একটি বিস্মৃত কাহিনি অনেক কাল আগের, স্বাধীনতা ও দেশভাগের আগে, এক কলকাতার বাবু গিয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে বেড়াতে।
একটি গ্রাম্য কিশোরের সঙ্গে ভাব জমাবার উদ্দেশ্যে তিনি জিজ্ঞেস করলেন—
খোকা, আজ কী দিয়ে ভাত খেলি রে দুপুরে?
ছেলেটি বলল, কলমি শাক আর দুইখান মাছ ভাজা দিয়া দুগ্গা (কিছু) ভাত খাইলাম। তার পর মাছের ঝোল দিয়া ভাত খাইলাম। তার পর পুঁটিমাছ আর তেঁতুলের চুকা (টক) অম্বল।
ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, সে কী রে, তোরা ডাল খাসনি?
ছেলেটি ততোধিক অবাক হয়ে বলল, কত্তা, আমরা কি বড়লোক যে ডাইল খাব?
পাশা উল্টে গেছে। টিভির অতিসজ্জিত রান্নাঘরে প্রতিবছরের মতো এবারও নিশ্চয়ই আমরা দেখতে পাবো ইলিশের ঝাল-ঝোল-ভাপা-অম্বলের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া চমৎকার সব রেসিপি। সঞ্চালিকা নিজে অথবা কোনও অতিথি রাঁধুনি আসবেন, বানানো হবে নোলা ঝরানো অপূর্ব ইলিশের গালভরা পদ। তারপর… সেই সময়টা আসবে যখন আমরা মুখে হাসি, মনে আশা নিয়ে বাজারে যাবো এবং ম্লান মুখ, মনে হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসব। এবং ফিরে এসে বুদ্ধদেব বসুর ‘ইলিশ’ কবিতাটি পড়বো অথবা পড়বো না-
আকাশে আষাঢ় এলো; বাংলাদেশ বর্ষায় বিহবল।
মেঘবর্ণ মেঘনার তীরে-তীরে নারিকেলসারি
বৃষ্টিতে ধূমল; পদ্মাপ্রান্তে শতাব্দীর রাজবাড়ি
বিলুপ্তির প্রত্যাশায় দৃশ্যপট-সম অচঞ্চল।
মধ্যরাত্রি; মেঘ-ঘন অন্ধকার; দুরন্ত উচ্ছল
আবর্তে কুটিল নদী; তীর-তীব্র বেগে দেয় পাড়ি
ছোটে নৌকাগুলি; প্রানপনে ফেলে জাল,টানে দড়ি
অর্ধনগ্ন যারা,তারা খাদ্যহীন,খাদ্যের সম্বল।
রাত্রি শেষে গোয়ালন্দে অন্ধ কালো মালগাড়ি ভরে
জলের উজ্জ্বল শষ্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব,
নদীর নিবিড়তম উল্লাসে মৃত্যুর পাহাড়।
তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে ঘরে
ইলিশ ভাজার গন্ধ; কেরানীর গিন্নির ভাঁড়ার
সরস সর্ষের ঝাঁজে। এলো বর্ষা, ইলিশ -উৎসব।
উৎসব দূরে থাক জলের রুপোলি শস্যটির অকৃত্রিম স্বাদ আর কখনো জিভে জুটবে কিনা জানা নেই। নতুন করে কী আর বলি…সামান্য নুন হলুদ ছুঁইয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে, সেই তেল সহযোগে মুচমুচে-রসালো ইলিশ দিয়ে গরম ভাত একাই একশো। তবে, পরিশেষে ভাগ করে নেব আমার ছোটোবেলার স্মৃতিবিজড়িত একটি ইলিশ-রেসিপি।
উৎসব দূরে থাক জলের রুপোলি শস্যটির অকৃত্রিম স্বাদ আর কখনো জিভে জুটবে কিনা জানা নেই। কারণ, খোকা ইলিশ বা বরফের ইলিশ তো আছেই তার ওপর বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখন নাকি নদীর জলেও ভেজাল! নতুন করে কী আর বলি…সামান্য নুন হলুদ ছুঁইয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে, সেই তেল সহযোগে মুচমুচে-রসালো ইলিশ দিয়ে গরম ভাত একাই একশো। বাংলাদেশের মধ্যে সবথেকে বেশি ইলিশ নাকি পাওয়া যেত বরিশালে। আমার মায়ের মা ছিলেন বরিশালের কন্যে। ভাগাভাগির পর সপরিবারে এপার বাংলায় চলে আসা। বরিশালের বিভিন্ন রান্নার খ্যাতি তো সর্বজন বিদিত। সেখানকার ‘বরিশালি ইলিশ’ একসময় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল কলকাতার অভিজাত রেস্তরাঁয়। অনেকে আবার ‘ইলিশ বরিশালি’ও বলেন। আমাদের বাড়িতে এই পদটি এককালে চুটিয়ে খেয়েছি। পরিশেষে ভাগ করে নেব আমার ছোটোবেলার স্মৃতিবিজড়িত সেই অতুলনীয় স্বাদের ইলিশ-রেসিপি।
উপকরণ
ইলিশ মাছ ৬টি
কালো সর্ষে এক টেবিল চামচ
হলুদ সর্ষে এক টেবিল চামচ
নারকেল বাটা ৪ টেবিল চামচ
দই ১০০ গ্রাম
কালোজিরে হাফ চা চামচ
কাঁচা লঙ্কা ৫টি
নুন স্বাদ মতো
হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ
লাল লঙ্কা গুঁড়ো হাফ চা চামচ
সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ

প্রণালী: মাছগুলিকে হাফ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো ও হাফ চা চামচ নুন দিয়ে মাখিয়ে নিতে হবে। গরম জলে ১৫ মিনিট সর্ষের দানা ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর অল্প নুন দিয়ে (হাফ চা চামচ) সর্ষে বেটে নিতে হবে। এরপর হাফ কাপ জল মিশিয়ে খোসাগুলি সরিয়ে ফেলতে হবে। দই ভাল করে ফেটিয়ে নিতে হবে। এরপর সর্ষে বাটা, নারকেল বাটা ও দইটা ভাল করে মিশিয়ে নিতে হবে একটি পাত্রে নিয়ে। নুন, লাল লঙ্কার গুঁড়ো, হাফ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো, কাঁচা লঙ্কা কুচি দিতে হবে। একটা পাত্র গরম করে তাতে ২ টেবিল চামচ তেল দিতে হবে। কালো জিরে ফোড়ন দিতে হবে তেলে। একটু নেড়েচেড়ে নিতে হবে। এর মধ্যে এবার ওই বাটাগুলো মিশিয়ে নাড়তে হবে। যাতে পাত্রের তলায় ধরে না যায়, দিতে হবে হাফ কাপ জলও। ওই মিশ্রণটা ফুটতে শুরু করলে নুন হলুদ মাখানো মাছগুলি এর মধ্যে দিয়ে দিতে হবে। প্রায় ১০ মিনিট রান্না করতে হবে মাঝারি আঁচে ঢাকা দিয়ে। মাঝে একবার মাছগুলিকে উল্টে দিতে হবে, যাতে দু’দিকই সেদ্ধ হয়। এরপর দই-সর্ষের মিশ্রণে ঝোলটা ঘন হয়ে এলে এর মধ্যএ এক টেবিল চামচ সর্ষের তেল দিয়ে আবার পাত্রটা ঢাকা দিয়ে দিন। মিনিট তিনেক মতো রান্না করুন। এর পর গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন বরিশালি ইলিশ।