
বঙ্গের ভেনঘরের ময়রারা এক একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর চেয়ে কম নন। সংস্কৃত শব্দ ‘বিন্দুক’ থেকে উদ্ভূত বোঁদে বলতেই ভেসে ওঠে লাল-হলুদ মিঠাইয়ের ছবি। বাঙালি ময়রারা তাকে এক্কেবারে বেরঙিন করে ছাড়লো! আর ছাড়বি তো ছাড় তাতেও দেদার স্বাদ! সেই বেরঙিন সাদা বোঁদে সদ্য জিআই স্বীকৃতি (GI Tag) পেয়েছে। হুগলির কামারপুকুর, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কারণে কামারপুকুরের নাম সর্বজনবিদিত। এই কামারপুকুরের বিখ্যাত মিষ্টি হল সাদা বোঁদে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, রামকৃষ্ণ নিজেও তা ভালোবাসতেন। অধুনা কামারপুকুরের প্রায় সব মিষ্টির দোকান সাদা বোঁদে বানায়। সাদা বোঁদের দাম ১৪০ টাকা প্রতি কেজি।
কামারপুকুরের বেশ কয়েকজন বোঁদে কারিগরের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, সাদা বোঁদের উপাদান আতপ চালের গুঁড়ো আর রমা কলাই বা রম্ভা কলাই। এই রমা কলাই হল বরবটির বীজ। কারিগরেরা অনুপাতটাও বলেছেন। চাল গুঁড়ো আর রমা কলাই ২:১ অনুপাতে মিশিয়ে বোঁদের মিশ্রণ বানানো হয়। তারপর একেবারে সোজা পদ্ধতি, ছাঁনচা দিয়ে ভেজে রসে স্নান করিয়ে তুলে ফেললেই তৈরি। সাদা বোঁদে শুকনো, রস ঝরিয়ে তুলে রাখা হয় বলে এটি বেশ কিছুদিন টেকে। চিনির আস্তরণে ঢাকা মিষ্টির এই এক সুবিধা, তা বেশ কিছুদিন টিকে যায়।
সাদা বোঁদের উপাদান আতপ চালের গুঁড়ো আর রমা কলাই বা রম্ভা কলাই। এই রমা কলাই হল বরবটির বীজ। কারিগরেরা অনুপাতটাও বলেছেন। চাল গুঁড়ো আর রমা কলাই ২:১ অনুপাতে মিশিয়ে বোঁদের মিশ্রণ বানানো হয়। তারপর একেবারে সোজা পদ্ধতি, ছাঁনচা দিয়ে ভেজে রসে স্নান করিয়ে তুলে ফেললেই তৈরি।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, শ্রীরামকৃষ্ণ সাদা বোঁদে খেতে ভালোবাসতেন। আজও মন্দিরে তাঁর মূর্তির সামনে তা নিবেদন করা হয়। কামারপুকুরে সাদা বোঁদে প্রসাদ হিসাবেও বিতরণ করা হয়। কিন্তু লিখিত কোনও টেক্সট পাওয়া যায়নি যে তাঁর প্রিয় মিষ্টি ছিল সাদা বোঁদে। ঠাকুরের জিলিপি প্রেম নিয়ে তাও নানান ঘটনা রয়েছে লিখিত আকারে।
রামকৃষ্ণের জন্মভিটে অর্থাৎ আজকের রামকৃষ্ণ মঠকে ঘিরে থাকা মিষ্টির দোকানগুলোতে সাদা বোঁদের দেখা মেলে। ১৯৪৭ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঠাকুরের জন্মভিটে অধিগ্রহণ করে গড়ে তোলে তীর্থক্ষেত্র। তারপর থেকে কামারপুকুরের সাদা বোঁদের জয়যাত্রা আরম্ভ হয়। লোককাহিনি থেকে জানা যায়, রামকৃষ্ণের প্রতিবেশি ছিলেন সত্যকিঙ্কর মোদক। তাদের বাড়িতে গেলে গদাইয়ের সামনে হাজির করা হত জিলিপি আর সাদা বোঁদে। তিনি খেতেন। ফলে সাদা বোঁদের বয়স অন্ততপক্ষে দুশো-আড়াইশো বছর হবেই। কারণ জনশ্রুতি অনুযায়ী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মের আগে থেকে তা তৈরি হচ্ছে। এই সত্যকিঙ্কর মোদক সত্য ময়রা নামে পরিচিত ছিলেন। কামারপুকুরের আদি মিষ্টির দোকানটি ছিল সত্য ময়রার। ঠাকুরের ভিটের কাছেই ছিল সেই দোকান। এখন তার বংশধরেরা বেশ কয়েকটি মিষ্টির দোকান চালান। কামারপুকুরের বহু মিষ্টির দোকানেরই নাম ঠাকুর বা মায়ের নামে। ব্যবসায়িক কৌশল হতে পারে আবার যাঁর জন্য কামারপুকুরের রুজি-রুটি চলছে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেও হতে পারে।
আর একটি কাহিনিও শোনা যায়। বন্ধু দুর্গাদাস মোদকের বাড়িতে গদাই প্রথম সাদা বোঁদে খান। দুর্গাদাস মোদকের বাবা ছিলেন মধুসূদন মোদক, তারও মিষ্টির দোকান ছিল। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে, যে তথ্য মিলেছে তাতে দাঁড়ায়… দুশো থেকে সোয়া দুশো বছর আগে সাদা বোঁদের জন্ম। ওই অঞ্চলে বরবটির চাষ হত। বেশ ভালো পরিমাণেই ফলন হত। স্থানীয় কৃষিকাজের উপরে এলাকার খাদ্যাভাস নির্ভর করে। মনে করা হয়, স্থানীয় উৎপাদিত ফসল বরবটির সদ্ব্যবহার করতে এলাকার ময়রারা সাদা বোঁদের সৃষ্টি করেন। এ হল বাঙালির উদ্ভাবনী মনের ফসল।

কামারপুকুরের সাদা বোঁদের জিআই প্রাপ্তির জন্য নিরলসভাবে পরিশ্রম করে গিয়েছেন শুভজিৎ লাহা ও বীরেশ্বর মোদক। দুজনেরই মিষ্টির দোকান রয়েছে। শুভজিৎ, শ্রীমা মিষ্টান ভাণ্ডারের কর্ণধার। দোকানের বয়স পঞ্চাশ বছর।
প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি পুরোনো, কামারপুকুরের শ্যামাময়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার-এর অন্যতম কর্ণধার ষষ্ঠী রক্ষিতের পুত্র শিবাশিস রক্ষিতের সঙ্গে সাদা বোঁদের বিষয়ে কথা বলেছিল বঙ্গদর্শন.কম। তিনি জানিয়েছেন, দিনে গড়ে প্রায় দুই কুইন্টাল বোঁদে বিক্রি হয় তাঁদের দোকানে। শীতের মরশুমে সাদা বোঁদের বিক্রি বেড়ে যায় অনেকখানি। পর্যটকেরা আসেন, কিনে নিয়ে যান। এই সময়টায় দিনে দশ কুইন্টালও ছাড়িয়ে যায় বোঁদের বিক্রি।

কামারপুকুরের সাদা বোঁদের জিআই প্রাপ্তির জন্য নিরলসভাবে পরিশ্রম করে গিয়েছেন শুভজিৎ লাহা ও বীরেশ্বর মোদক। দুজনেরই মিষ্টির দোকান রয়েছে। শুভজিৎ, শ্রীমা মিষ্টান ভাণ্ডারের কর্ণধার। দোকানের বয়স পঞ্চাশ বছর। শুভজিৎ বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, “আমি আর বীরেশ্বর মোদক, আমরা দুজনে প্রথম থেকে চেষ্টা করে জিআই ট্যাগ এনেছি। জিআই পাওয়ার পর সবাই এটা নিয়ে আনন্দিত, খুশি কিন্তু আমরা কাউকে পাশে পাইনি। প্রথমে যখন আমরা বলেছিলাম আমাদের কেউ পাত্তাই দেয়নি। সহযোগিতা পাইনি। স্যাম্পেল পাঠানো, টেস্টিং এই সময়গুলোয় কাউকে পাওয়া যায়নি। এটাই আক্ষেপের জায়গা।”

আরও বলেন, “আমাদের সঙ্গে অনেক কিছু ছিল, বারুইপুরের পেয়ারা, সূর্যমোদকের জলভরা, বাঁকুড়ার মেচা, বিষ্ণুপুরের মতিচুর, মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া। সবাই পায়নি। আঠারো-কুড়িটা আইটেম ছিল। আমরা জিআই পেলাম। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য দপ্তর থেকে মিষ্টি হাবে কাউন্টার দিতে চেয়েছিল। আমার দুটো দোকান আছে। সব সামলে পেরে উঠব না বলে, আপাতত না করে দিয়েছি। কামারপুকুর তো ট্যুরিস্ট স্পট। শীতকালে প্রচুর লোক আসে, সাদা বোঁদে বিক্রি বেশি হয়। অন্য সময় স্থানীয় ক্রেতাদের উপরেই ব্যবসা চলে। ধারে-কাছের গ্রাহকেরা কেনেন সারা বছর। জিআই পাওয়ার পর এলাকার লোকেরাও খুব খুশি।” শুভজিতের আশা, আসন্ন শীতকালে পর্যটক-ক্রেতাদের মধ্যে সাদা বোঁদের জিআই স্বীকৃতি পাওয়া নিয়ে আগ্রহ উদ্দীপনা দেখা যাবে।
কামারপুকুরের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, মা সারদার প্রতি তাঁদের অসংখ্য ভক্তদের ভক্তি। প্রত্যন্ত এক গ্রাম হয়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র। সে গ্রামের স্থানীয় এক খাবার, রমা কলাইয়ের বোঁদে কেবল ‘ঠাকুর আর মা’র জোরেই এতদিন সমাদৃত হচ্ছিল। বলাবাহুল্য, এবার ভৌগলিক স্বত্ব মেলায় বিশ্ব আঙিনায় তার কদর বাড়বে।
