
রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরাম তাঁর নাম দিয়েছিলেন, ‘কালো পাখি’। সেই থেকে শান্তিনিকেতনের বাড়িটির নামও রাখলেন ‘কালো পাখি’। কে না আসতেন এই বাড়িতে! এককালে সমস্ত রথী-মহারথীদের গানে-আড্ডায় সরগরম ছিল বাড়িটি। শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্রদের কণ্ঠে মুখর হয়ে উঠত, শান্তিনিকেতনে কালো পাখি-র আকাশ-বাতাস। আসতেন-গৌরকিশোর ঘোষ, সমরেশ বসু, সাগরময় ঘোষ-এর মতো গুণীজনেরাও। এই কালো পাখিটির নাম, বিবি রায় (Bibi Roy); বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি জগতের বিস্মৃত এক অধ্যায়।
একটা দীর্ঘ সময় বাঙালি বাড়ির অন্দরমহল থেকে পোশাক-পরিধানের অনেকটাই নির্মিত হয়েছিল বিবি রায়ের পরিকল্পনায়, তাঁর রুচির প্রতিফলনে। ’৭০-এর দশকে ‘দেশ’ পত্রিকায় সাগরময় ঘোষ-এর সম্পাদনায় ধারাবাহিক ভাবে লিখতেন, গৃহসজ্জা সংক্রান্ত নানা টুকিটাকি কলাম। পরবর্তীকালে, তৎকালীন বাঙালির একমাত্র ফ্যাশন পত্রিকা ‘সানন্দা’-র শিল্প নির্দেশক ছিলেন! কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে সম্পাদক অপর্ণা সেনের সঙ্গে পত্রিকার দায়িত্ব সামলেছেন।
বিবি রায়ের এস্থেটিক সেন্সে মুগ্ধ এহেন উত্তমকুমারই একদিন অফার দিলেন বাংলা সিনেমার অন্দরসজ্জা ও পোশাক পরিকল্পনা করতে আসার। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিবি রায়ই সম্ভবত প্রথম বাঙালি মহিলা অন্দরশিল্পী। তাঁর প্রথম কাজ উত্তমকুমার, বাসবী নন্দী অভিনীত ‘রোদন ভরা বসন্ত’ ছবির পোশাক পরিকল্পনা।
একটু আগের কথায় ফেরা যাক, বিবি রায়ের ভালো নাম অশোকা রায়, জন্ম ১৯৩৭, ১৭ সেপ্টেম্বর, ৫ আলিপুর এভিনিউ-এর একটি বাড়িতে। তাঁর বাবা অমিয়নাথ সেন ছিলেন বিদেশি একটি কোম্পানির সলিসিটর। সে-সময় হাতে গোনা কয়েকজনের বাঙালি বাড়ি ছিল আলিপুর অঞ্চলে। তাঁরাও আবার মেজাজ, চালচলনে সাহেবি; (মজার ব্যাপার, ১৯৯২-তে এই বাড়িটিরই উল্টোদিকের একটি বাড়িতে হয়েছিল, ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘উনিশে এপ্রিল’-এর শ্যুটিং), মা তরলিকা সেন, কংগ্রেসের বিখ্যাত নেতা, পেশায় কেমিস্ট –সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তর মেয়ে। এই সতীশচন্দ্রই কিন্তু আবার বিখ্যাত ‘সুলেখা কালি’ নির্মাণের অন্যতম হোতা। পাশাপাশি তরলিকা সেন ছিলেন, গান্ধীজির বাংলাবাসের দীর্ঘ সময়ের সঙ্গী, তাঁকে গান্ধী, ‘দিদিমণি’ বলে ডাকতেন। ছোটো থেকেই মহাত্মা গান্ধী এবং কংগ্রেসের বিখ্যাত কয়েকজন মানুষের সংস্পর্শে বেড়ে উঠেছেন বিবি রায়।

গান্ধীজির সঙ্গে বিবি রায়, একদম ডানদিকে মা তরলিকা সেন/ ছবি: অর্পণ
বিবি রায় বেশ কয়েকবছর আগে ঋতুপর্ণ ঘোষকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যেহেতু তাঁরা তখন খুবই ছোটো, রাজনৈতিক কোনো গোপন কথা বুঝতেন না, খুব বুদ্ধি করে তাঁদের দুই বোনকেই (তিন বোন ছিলেন তাঁরা, তিনি সবার ছোটো) গান্ধীজির দুই পাশে হাঁটতে দেওয়া হত। তিনিও তাঁদের সঙ্গে গল্প, খুনসুটি করতেন অনায়াসে, আরও কত স্মৃতি… গান্ধীজি বাংলায় এলেই, তাঁরা সকলে মিলে চলে যেতেন, সোদপুরের আশ্রমে, সেখানেই গান্ধীজির সঙ্গে হেঁটে যাওয়ার এক মুহূর্তের ছবি ‘কালো পাখি’-র একটি ঘরের দেওয়ালে আজও রয়েছে সময়ের সাক্ষী হিসেবে ফ্রেমবন্দি হয়ে।
কীভাবে এলেন বিবি রায় অন্দরসজ্জা, পোশাক পরিকল্পনার শিল্প জগতে? ছোটো থেকেই খুব খেলাধুলো ভালোবাসতেন বিবি। বিশেষ করে হাইজাম্প; গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলের ছাত্রী তখন, এমনই একদিন স্কুলে হাইজাম্প দিতে গিয়ে ভীষণরকম চোট পান। প্রথমে খুব বেশি গুরুত্ব না দিলেও পরে সমস্যা বাড়ে। বোন টিবি-তে আক্রান্ত হয়ে প্রায় বছর তিনেক তাঁকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়, শরীরের ৭০% প্লাস্টার নিয়ে। ছাড়তে হয় এখানকার স্কুল। কিন্তু মূলত মায়ের কারণেই নতুন ভাবে বেঁচে উঠলেন বিবি। যেহেতু সেই অর্থে খেলাধুলো, চলাফেরা সব বন্ধ, মানসিক ভাবে যাতে তিনি সুস্থ থাকেন, এনে দেওয়া হল নানা আঁকার সরঞ্জাম, গানের রেকর্ডস, তাঁর বিছানাটিও এমন ভাবে তৈরি করা হল যাতে হাত দুটো কোনোভাবে আঁকার জন্য সচল রাখতে পারেন। পাশাপাশি ডাক্তারের নির্দেশে হাওয়া বদলের জন্য তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল দিল্লিতে; সেখানেই একে একে মিরান্দা হাউস, ললিত কলা আকাদেমি থেকে পড়াশোনা, শিল্পচৰ্চা প্রথাগত ভাবে শিখলেন বিবি রায়। বড়ো পরীক্ষাগুলিও দিয়েছিলেন সিক বেডে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় তাঁকে শুয়ে কাটাতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি সচল ছিলেন শিল্প সম্পর্কিত নানা অ্যাকটিভিটির মধ্যে। প্রকারান্তরে বলা যেতে পারে, তাঁর শিল্পী জীবনের হাতেখড়ি মা তরলিকা সেনের হাতেই।

দুইবার রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন বিবি রায়/ ছবি: অর্পণ
যেহেতু বেড়ে ওঠার বয়সে এই দুর্ঘটনা, সেরেও উঠেছিলেন দ্রুত। সেরে ওঠার পর নতুন করে হাঁটাও শিখতে হয়েছিল তাঁকে, এ হয়তো তাঁর শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেও হাঁটার সূচনা। ৬০-এর দশকের শেষে নিবেদিত প্রাণ শিল্পচর্চার জন্যই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেন-এর কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। শেষমেষ আঁকা, হাতের কাজ, গৃহসজ্জাকে ভালোবেসে, এই জগতেই রয়ে গেলেন বিবি রায়। দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরে আসার পর ২১/২২ বছর বয়সে ইঞ্জিনিয়ার সনৎ কুমার রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় বিবি রায়ের। সনৎ রায়ও সে সময় একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার, প্রায়দিনই বাড়িতে বড়ো-বড়ো অতিথিদের আনাগোনা লেগে থাকত। বাড়িতে যথেষ্ট পরিচারক থাকলেও গৃহসজ্জা থেকে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব সবই সামলাতেন বিবি রায়। তাঁর শিল্প চৰ্চায় হাত পাকানো সম্ভবত এখান থেকেই। এ-সময় থেকেই আরও বেশি করে তিনি বাটিকের কাজ করা শুরু করেন, পাশাপাশি ফুল দিয়ে ঘর সাজানোর জাপানি শিক্ষার কোর্সের মতোএমন অনেক সৃষ্টিশীল চর্চায় যুক্ত হন। কখনও বসে থাকেননি বিবি রায়, পেশাগত জীবনে প্রবেশের আগে তাঁর গৃহবধূর জীবনও ছিল সৃষ্টিশীল ভাবে কর্মময়। সত্যেন বিশির কাছে বাটিকের কাজ শিখেছিলেন বিবি রায়, সেই সময় বাটিকের কাজ করার জন্য বাড়ির গ্যারেজেই বানিয়ে ফেলেছিলেন একটি ছোটোখাটো আস্ত কারখানা। কাপড়ের পাশাপাশি লেদারের উপরও শুরু করেন বাটিকের কাজ। যেখানে যার বাড়িতেই পার্টি বা নেমন্তন্ন থাকুক না কেন, বিবি রায় নিয়ে যেতেন নিজের হাতে গড়া জিনিস।
বিয়ের পর বিবি রায় জানতে পেরেছিলেন, উত্তমকুমার স্বামী সনৎ রায়ের বাল্যবন্ধু। কিন্তু উত্তমকুমারের অভিনেতা হিসেবে প্রসারের পর মাঝে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। এমনই একদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-এর কাছে শ্যুটিং হচ্ছে উত্তমকুমারের একটি সিনেমার, তাঁরাও এসেছিলেন অন্য একটি কাজে! দুজনেই ঠিক করলেন দেখা করে আসা যাক… সেই শুরু বিবি রায়ের সঙ্গে উত্তমকুমারের যোগ। বিবির হাতের কাজে মুগ্ধ ছিলেন উত্তম! এমনকী বিবি রায়ের আর্ট-এর প্রদর্শনী থেকে ছবি কিনে সাজিয়ে রেখেছিলেন নিজের ড্রয়িং রুমে। বিবি রায়ের এস্থেটিক সেন্সে মুগ্ধ এহেন উত্তমকুমারই একদিন অফার দিলেন বাংলা সিনেমার অন্দরসজ্জা ও পোশাক পরিকল্পনা করতে আসার। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিবি রায়ই সম্ভবত প্রথম বাঙালি মহিলা অন্দরশিল্পী। তাঁর প্রথম কাজ উত্তমকুমার, বাসবী নন্দী অভিনীত ‘রোদন ভরা বসন্ত’ ছবির পোশাক পরিকল্পনা। এরপর একে-একে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘সব্যসাচী’-র মতো প্রচুর ছবিতে কাজ করেছেন বিবি রায়। এ-সময়তেই তাঁর অপর্ণা সেনের সঙ্গে আলাপ হয়, গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক। তাঁর সঙ্গে ‘পরমা’, ‘সতী’, ‘পারমিতার একদিন’, ‘ফিফটিন পার্ক অ্যাভিনিউ’ এমন প্রচুর ছবিতে কাজ করেছেন।

পারমিতার একদিন-এর অন্দরসজ্জা করেছিলেন বিবি রায়

চোখের বালি-র পোশাক পরিকল্পনায় ছিলেন বিবি রায়
চোখের বালির শ্যুটিং, ঐশ্বর্য রাই এসেছেন, তাঁকে বিধবার বেশ পরাতে হবে। যে সময়ের গল্প, বিধবাদের অন্তর্বাস পরার চল ছিল না। ঐশ্বর্যকেও তাই করতে হবে। কিন্তু উপায় কী! বিবি রায় পরিধেয় শাড়িটিকে চায়ে ডুবিয়ে রঙের ঘনত্ব বাড়ালেন, ব্যাস মুশকিল আসান!
পরবর্তীকালে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক যাঁদের মধ্যে অন্যতম ঋতুপর্ণ ঘোষ-এর ছবিতে তিনি কাজ করেন। উল্লেখযোগ্য, ‘চোখের বালি’-তে পোশাক ও অন্দর পরিকল্পনার জন্য শিল্পী সুশান্ত পালের সঙ্গে যৌথ ভাবে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার (জাতীয় পুরস্কার) পান তিনি! ঋতুপর্ণর অন্যান্য ছবিতেও কাজ করেন বিবি রায়। ‘উনিশে এপ্রিল’, ‘শুভ মহরৎ’-এর অন্দরসজ্জা, ‘রেনকোট’-এর সেট ডেকোরেটের মতো কাজগুলি উল্লেখযোগ্য।
সত্তরের দশকের শুরুতে উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ শুরু হওয়ার কিছু পরে, সনৎ রায়ের বদলির কারণে বিবি রায় সপরিবারে বম্বেতে চলে যান। বম্বেতে বিবি রায়ের উল্লেখযোগ্য কাজ, হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘কোতোয়াল সাব’ ছবিটির পোশাক পরিকল্পনা।

বিবি রায়কে দেওয়া অপর্ণা সেন ও ঋতুপর্ণ ঘোষের চিত্রনাট্য/ ছবি সৌজন্যে: সুমিত রায়
আলপনা দিতেও বিবি রায়ের জুড়ি মেলা ভার! সে-সময় প্ৰখ্যাত পরিচালক বিমল রায় (দো বিঘা জমিন খ্যাত) তাঁদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন, বম্বেতে তাঁর মেয়ের বিয়েতে সামগ্রিক আলপনা দিয়েছিলেন বিবি রায়। বম্বের শিল্পী মহলে প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল খড়ি মাটি ও চালের গুড়ি দিয়ে আঁকা বিবি রায়ের আল্পনা।
বম্বের পাট চুকিয়ে আবার যখন তাঁরা কলকাতায় ফিরে আসেন, তার কিছু পরে এক বছরের মাথায় সনৎ রায়ের জীবনাবসান হয়, বিবি রায়ের পরিবারে নেমে আসে অর্থনৈতিক দুর্যোগ! কিন্তু ঐ যে, তিনি বিবি রায়! একা হাতে হাল ধরলেন সংসারের। যে শিল্পী জীবন ছিল ছিল প্যাশনের অঙ্গ, তাই-ই বদলে গেল পেশায়। বাটিকের কাজ বিক্রি থেকে শুরু করে থেকে বিভিন্ন বড়ো বড়ো অফিসের অন্দর সজ্জা করা শুরু করলেন। তৈরি করলেন নিজের একটি টিম ও কোম্পানি। কোম্পানির নাম, ‘উইদিন-উইদাউট’। সে সময় ‘এয়ার ইন্ডিয়া’, ‘ক্লাসেন’ এমন বিভিন্ন কোম্পানির অফিসের অন্দর সেজে উঠেছিল বিবি রায়ের স্বতন্ত্র পরিকল্পনায়। এরপর অফিসের পরিধি ছাড়িয়ে বিভিন্ন মানুষের বাড়িতেও পরিচিত হতে শুরু করল বিবি রায়ের অন্দরসজ্জার ছোঁয়া। পাশাপাশি সিনেমার কাজ চলছিলই, সিনেমা জগতে অপর্ণা সেনের ছবিতেই সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন বিবি রায়।

বিবি রায়ের শান্তিনিকেতনের গৃহকোণ/ ছবি: অর্পণ
প্রসঙ্গত, বিবি রায়ের কোম্পানি উইদিন-উইদাউট-এর উদ্দেশ্য ছিল অল্প খরচে, সকলের নাগালের মধ্যে সুন্দর গৃহসজ্জা। এটিই বিবি রায়ের শিল্পী জীবনের মূল দর্শন। একটি আলোচনায় বিবি বলছিলেন, আসলে অনেকেই ভাবেন, সুন্দরভাবে ঘর সাজাতে গেলে বুঝি প্রচুর টাকা লাগে কিন্তু আদপে তা ঠিক নয়। ঘর সুন্দর করে সাজাতে গেলে রুচির পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক রং এবং স্পেসের ব্যবহার। সুমিত রায়ের থেকে জানা গেল, মাত্র কয়েকটি ইট এবং প্লাই দিয়ে বানিয়ে দিয়েছিলেন সুদৃশ্য বুক শেলফ, পুরোনো ভাঙা আলমারিকে শীতলপাটি জড়িয়ে করে দিয়েছিলেন একদম নতুনের মতো, একটি বাড়িতে দামি আসবাব কেনার অবকাশ নেই কিন্তু ঘরটা সুদৃশ্য করে তুলতে হবে, বিবি রায় নিজে কালীঘাটের বাজার থেকে দেড়শো টাকা দামের প্লাই কিনে এনে সেটাকেই মডারেট করে বানিয়ে দিলেন বৈঠকখানার ডিভান। এমনই অভিনব ছিল বিবি রায় পরিকল্পিত সামর্থ্যের মধ্যে ঘর সাজানোর বাস্তব রূপ।
আসা যাক পোশাক পরিকল্পনায় বিবি রায়-এর অভিনবত্বের কথায়। চোখের বালির শ্যুটিং, ঐশ্বর্য রাই এসেছেন, তাঁকে বিধবার বেশ পরাতে হবে। যে সময়ের গল্প, বিধবাদের অন্তর্বাস পরার চল ছিল না। ঐশ্বর্যকেও তাই করতে হবে। কিন্তু উপায় কী! বিবি রায় পরিধেয় শাড়িটিকে চায়ে ডুবিয়ে রঙের ঘনত্ব বাড়ালেন, ব্যাস মুশকিল আসান! স্কিন টোনের সঙ্গেও মানিয়ে গেল সেই রং। খুব ছোটো-ছো্টো ডিটেলস-এ নজর দিতেন তিনি, যেমন বিনোদিনী বেনারসে আসার সময় ঋতুপর্ণকে বলেছিলেন, কয়েকটি চুল পাকা করে দিতে যাতে করে সময়ের সামান্য ট্রানজিশনটা আরও স্পষ্ট হয়।এমনই অনেক কিছু…
সিনেমায় পোশাক পরিকল্পক হিসেবে বিবি রায়ের শেষ কাজ জয়ব্রত চ্যাটার্জি পরিচালিত, ‘Lovesongs: Yesterday, Today & Tomorrow’। যদিও শিল্পী জীবনে শেষ কাজ বলে কিছু হয় না, ‘…it’s an ongoing process…’

বিবি রায় এখন/ ছবি: অর্পণ
২০০৫ থেকে কলকাতার পাট চুকিয়ে পাকাপাকি ভাবে শান্তিনিকেতনের বাড়িতে বাস শুরু করেন তিনি, আজও সেখানেই রয়েছেন; দু’বছর আগেও পরিচিত-অপরিচিত মানুষ এলে এত সহজে আপন করে নিতেন… বিবি রায়ের মতো মানুষকে ভালো না বেসে পারা যায় না, প্রসঙ্গত ওঁর সঙ্গে যে পরিচারকরা ছিলেন এবং এখনও আছেন তাঁরা ওঁকে ডাকেন ‘মা’ বলে…
একজন মানুষ হিসেবে বিবি রায়ের জুড়ি মেলা ভার, বিগত দুই বছর ধরে ওঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে, স্মৃতিও দুর্বল হয়েছে, শয্যাশায়ী প্রায়, কিন্তু আজও কালো-পাখির লোহার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলে মানুষটার আপ্যায়ণের ছোঁয়া পাওয়া যায়। ঋতুপর্ণ ঘোষকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেই বিবি রায় বলেছিলেন, তাঁর কোনো অনুতাপ নেই, জীবন থেকে অনেক কিছু পেয়েছেন। যা-যা দুর্ঘটনা বা অপ্রাপ্তি তা তো সময়ের মার! এ নিয়ে ভেঙে পড়া বা হতাশার কিছু নেই, জীবনে এগিয়ে যেতে হবে, একজন শিল্পীর জীবনের তো এইটেই ধ্রুব সত্য!
__________________
*বিবি রায় ও তাঁর ছেলে সুমিত রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত

