বিনায়ক রুকু অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে থাকা এক তরুণ
“রুকুর বাগানবিলাস কখন মুখ হয়ে যায়। যখন বৃষ্টি পড়ে। লোহার থামের উপর মাধবীলতা আর বাগানবিলাস। রুকু মাথা তুলে দেখতে পায়। রোদ উঠলে গোল গোল ছায়া।” – বিনায়ক রুকু
সাদা পাতায় ঝরে পড়েছে আবির রঙের অজস্ৰ কাগজ ফুল। তার ভিতরে হলুদ, নীল, সবুজের ঢেউ। দেখে মনে হয় মেঘলা আকাশে ভেসে থাকা ফুলের স্রোত। বাগানবিলাস, মাধবীলতার ফাঁকে ফাঁকে যেন অমলতাস আর অপরাজিতার মুখ। এ ছবি বিনায়ক রুকুর। ছবির সঙ্গে লিখেছেনও তিনি। পুরো নাম বিনায়ক রুকু ভট্টাচার্য। বয়স ২৩। বিনায়ক ওরফে রুকু অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে থাকা কলকাতাবাসী এক তরুণ।
রুকু লেখেন, আঁকেন, চাকরি করেন। এক বিদেশি সংস্থায় অনলাইন নির্ভর তাঁর কাজ। রুকুর ডায়েরিতে ধরা থাকে তাঁর দিন-প্রতিদিনের গল্প। ক্যানভাসে রঙের ঝড়। নীল, লাল, হলুদের বুকে কলকাতা শহরের মুখ। ছবির বিষয় মানুষ, প্রকৃতি আর তাঁর অনুভবের সূক্ষ দুনিয়া।
রুকু লেখেন, আঁকেন, চাকরি করেন। এক বিদেশি সংস্থায় অনলাইন নির্ভর তাঁর কাজ। রুকুর ডায়েরিতে ধরা থাকে তাঁর দিন-প্রতিদিনের গল্প। ক্যানভাসে রঙের ঝড়। নীল, লাল, হলুদের বুকে কলকাতা শহরের মুখ।
রুকুর আঁকা
ছোট ছোট বাক্য। গদ্য কবিতার মতো। বিনায়ক রুকু লেখায় নিজেই নিজের নাম ধরে ডাকেন। এই ডায়েরি আসলে তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সমাজ তাঁকে, তাঁদের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের কী চোখে দেখে, সেসব লেখেন। এ তাঁর ছোটোবেলার অভ্যাস। শৈশব, কৈশোর, মানুষের আঁচড়, আঘাত সব তিনি আখরে ধরে রাখেন। বিনায়ক রুকুর ডায়েরি দেখেই তাঁর মনের তল খুঁজে পান বাবা-মা। প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করেন সন্তানকে।
রুকুকে ডায়েরির অভ্যাস করিয়েছিলেন তাঁর বাবা। পেশায় অঙ্কের অধ্যাপক রণেন ভট্টাচার্য। পুত্রকে মনের ভাব প্রকাশ করাতে তাঁর এই ভাবনা। মা সুমন গঙ্গোপাধ্যায় ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “তখন স্কুলে বা কোথাও রুকুর কোনও বন্ধু নেই। কাউকেই সেভাবে কিছু বলতে পারে না। কথা কিছুটা এলোমেলো, তোতাপাখির মতো। রুকুকে প্র্যাক্টিক্যাল খাতা কিনে দেওয়া হয়। যার এক দিকটায় আঁকবে আর একদিকে যা ইচ্ছে লিখবে।”
রুকুর নৈসর্গিক চিত্র
হুগলির রিষড়ায় বিনায়ক রুকুর জন্ম। ছেলের আড়াই বছর বয়সে তাঁরা জানতে পারেন তার অটিজম রয়েছে। তখন ইন্টারনেট দূরস্ত। অটিজম সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানার সুযোগও কম। তাই নিজেরাই এই ডিজঅর্ডার সম্পর্কে পড়াশোনা করতে শুরু করেন। বিদেশের পরিচিত, প্রবাসী বন্ধুদের থেকেও সাহায্য পান। পুত্র রুকুর চলার পথের জন্য নিত্য নতুন পন্থা উদ্ভাবন করতেন। এই লড়াইটা একেবারেই তাঁদের তিনজনের লড়াই। রুকুর জন্য স্পেশাল এডুকেশন, ট্রেনিং বা থেরাপিস্টের সাহায্য তাঁরা নেননি। বিনায়ক রুকুর মা বিশ্বাস করেন, একজন মায়ের থেকে বড়ো থেরাপিস্ট আর কেউ হয় না। ছেলেকে বটগাছের মতো আগলে রাখেন তাঁরা। রুকু ‘পাপা’ অন্তপ্রাণ। ডায়েরির পাতায় ছেলের ব্যথায় কাঁদেন মা। কিন্তু জানেন এই জার্নি তাঁদের কাছে যুদ্ধের মতো।
ছেলেকে অক্ষরের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন মা। রোমানে লিখত ছোট্ট রুকু। একদিন বিয়ে বাড়ির নিমন্ত্রণ থেকে ফিরে এসে তার দু-তিন লাইনের ভাঙা-ভাঙা লেখা দেখে তাঁরা বুঝতে পারলেন ছেলে কথার থেকে লেখায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। সেদিনের ছোট্ট রুকু আজ বিনায়ক রুকু। তেইশের ঝকঝকে তরুণ। তাঁর দুনিয়া এক আশ্চর্য দুনিয়া। সাধারণ মানুষের পৃথিবীর চেয়ে ঢের বেশি সংবেদনশীল। সেখানে চেনা গ্যালাক্সিটা হয়ে ওঠে ঠিক ছানার পায়েসের মতো। দোলের রং ভরা বেলুনগুলো তীক্ষ্ণ, মানুষের কথার মতো। কথার জবাব কথা দিয়ে দিতে পারেন না রুকু, যন্ত্রণাবোধ কম। কিন্তু লেখায় ফিরে আসে ছোটোবেলায় স্কুলে বুলি হওয়ার স্মৃতি, খারাপ কথার ব্যথা।
রুকু লেখেন,
“সবাই পেন আর পেনের ঢাকনা।
রুকু একা পেনসিল।
পাপা পেনসিল রেস্ট করার জায়গা।
এমন একটা রুকু, যে রুকু অন্যদের মতো নয়।”
অক্ষর থেকে শব্দ, শব্দ থেকে বাক্য শেখা – সবই বিনায়ক রুকুর জন্য কঠিন লড়াই। লেখা শিখতে অনেক সময় লেগেছে। আঁকা শেখার পর্বটাও অন্যরকম এক কাহিনি। রেডিয়োর অডিয়ো স্টোরি শুনতে গিয়ে শিখেছেন পড়া। বেজায় ভালোবাসেন গল্প। ভীষণ প্ৰিয় রাস্কিন বন্ড আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ইন্টারনেট সর্বক্ষণের সঙ্গী। যেমন প্ৰিয় রিদম, জিনাত আমন আর হেলেন। রুকুর জিনাতের কোনওদিন বয়স বাড়ে না।
অক্ষর থেকে শব্দ, শব্দ থেকে বাক্য শেখা – সবই বিনায়ক রুকুর জন্য কঠিন লড়াই। লেখা শিখতে অনেক সময় লেগেছে। আঁকা শেখার পর্বটাও অন্যরকম এক কাহিনি। রেডিয়োর অডিয়ো স্টোরি শুনতে গিয়ে শিখেছেন পড়া। বেজায় ভালোবাসেন গল্প। ভীষণ প্ৰিয় রাস্কিন বন্ড আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
বাবা-মায়ের সঙ্গে রুকু
দৈনন্দিন কাজ, নিজের কাজ, বাড়ির বাইরে যাওয়া যত্ন করে ছেলেকে শেখাচ্ছেন মা। সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁরা অতন্দ্র প্রহরী। তার জন্য কম রক্তাক্ত হন না তাঁরা। কেমন রক্তপাত? উদাহরণ হিসাবে একটা ঘটনার কথা বলা যাক: রুকুর তখন বছর বারো বয়স। ওঁরা তখনও রিষড়ায়। একদিন বিকেলে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে একটু দূরেই চলে গিয়েছিল। এদিকে সন্ধে পেরিয়ে গিয়েছে। তবুও ছেলে ঘরে ফেরেনি, মায়ের পাগল পাগল অবস্থা। এমনকি পাড়ার লোকজনও খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে। আসছে থানা-পুলিশের চিন্তা! এমন সময় দেখা গেল কোনওরকমে সাইকেল টেনে ঘরে ফিরছে রুকু। সুমন দেখেন, সাইকেলের সামনের ঝুড়িতে খান ১২ ইট, দুটো চাকাতেই হাওয়া নেই। রাস্তার কিছু মানুষের কীর্তি! চাকার হাওয়া বের করে সাইকেলে ইট চাপিয়ে তারা বলেছিল- যাকে তেরি মাম্মিকো দেনা।
অটিজম স্পেকট্রামের শিশুর মাকে দেওয়া সমাজের উপহার গ্রহণ করেছিলেন তিনি। সাজিয়ে রেখেছিলেন বাড়ির উঠোনে। ‘রুকুর মা’ এই পরিচয় হৃদয়ের ওম দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রাখেন সুমন। আর তাঁর সব যুদ্ধের নেপথ্য শক্তি বিনায়ক রুকুর ‘পাপা’। তিনি লেখেন, “একদিন হয়তো সমাজ বুঝবে কেন আমার ছেলেটা বড়ো রাস্তায় ভেবলে যায়… কেন আমার ছেলেটা একটু অন্যরকম…”। রুকুর মা সুমন গঙ্গোপাধ্যায় ভট্টাচার্য তাঁদের অটিজম জার্নির দিনলিপি, যাপনের গল্প, রুকুর কথা নিয়মিত লেখেন সামাজিক মাধ্যমে। উদ্দেশ্য এই মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জীবন থেকে ঠেকে শেখার পাঠ যাতে আরও বহু মানুষের কাজে লাগে। একে অপরের অভিজ্ঞতার আদানপ্রদানের মাধ্যমে গড়ে ওঠে বৃহত্তর পরিসর। লেখাতে তাঁর অনুপ্রেরণা পুত্র রুকু।
রুকুর বই প্রকাশ অনুষ্ঠান
রিষড়ার জীবন থেকে কলকাতায় এসে রুকু দ্রুত মানিয়ে নিয়েছিলেন শহরের সঙ্গে। লেখা আঁকার দুনিয়ায় তিনি এখন পরিচিত মুখ। বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। তিন-তিনটে বই লিখেছেন। ২০২৬ বইমেলায় বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ডায়েরি ‘রুকুর মেজ বয়স’। তাঁর কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিবেলার কথা।
বইয়ের প্রচ্ছদ বিনায়ক রুকু আঁকেন নিজেই। নানা রঙের কিউব জুড়ে জুড়ে এঁকেছেন আত্মপ্রতিকৃতি। রুকুর আনন্দ, বেদনা, রাগ, অসহায়তা জুড়ে জুড়ে ভানহীন, সরল কিন্তু শক্তিশালী এক মানুষ। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষ্যে দুবাই আর্ট এক্সিবিশনে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। কলকাতাতেও একাধিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তিনি।
উজালা নীল, বেগুনি তাঁর প্ৰিয় রং। রং নিয়ে খেলতে খেলতেই ছোটোবেলায় অশান্ত রিকু এক সময় শান্ত হয়েছিলেন। আজও রুকুর ছবিতে এই দুই রঙের ব্যবহার বহুল। নীল রং অটিজমের রং। এপ্রিল মাস অটিজম সচেতনতার মাস।
রুকুর চোখে ভ্যান গঘ
উজালা নীল, বেগুনি তাঁর প্ৰিয় রং। রং নিয়ে খেলতে খেলতেই ছোটোবেলায় অশান্ত রিকু এক সময় শান্ত হয়েছিলেন। আজও রুকুর ছবিতে এই দুই রঙের ব্যবহার বহুল। নীল রং অটিজমের রং। এপ্রিল মাস অটিজম সচেতনতার মাস। ২ এপ্রিল অটিজম সচেতনতা দিবস। এই দিনটি থেকেই পালিত হয় অটিজম সচেতনতা মাস। নীল পোশাক, নীল আলো, নীল রঙে চলে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা।
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার-এএসডি কোনও রোগ বা অক্ষমতা নয়। এটি এক বিশেষ পরিস্থিতি। অটিজম স্পেকট্রামের মানুষরা পৃথিবী দেখেন অন্যভাবে। পরিবেশগত বা জিনঘটিত কারণে হয়ে থাকে। এই অবস্থার কোনও ওষুধ নেই। বিভিন্ন ধরনের থেরাপি, কাউন্সেলিং, ট্রেনিং দেওয়া হয় অটিস্টিক শিশুকে। ডাঃ গৌরব রায়ের মতে অতিমারীর পর অটিজম স্পেকট্রামে থাকা মানুষদের সমস্যা আগের থেকে বেড়েছে। অটিজম সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে বড়ো অংশের মানুষকে প্রাথমিক চিহ্নিতকরণের পরিসরে আনা যাচ্ছে না। সামাজিক সচেতনতা, চিকিৎসা পরিকাঠামোর অভাব- বহু ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ছবিটা আরও মলিন। অটিজমের প্রভাব এক একজনের ক্ষেত্রে এক এক রকম হতে পারে। এদেশে ২-৯ বছর বয়সী শিশুদের প্রতি ৬৮ জন শিশুর ১ জন এএসডি আক্রান্ত। অনেক ক্ষেত্রে অটিজম থাকলেও সামাজিক বর্জনের কারণে পরিবার, অভিভাবকরা তা প্রকাশ করতে ভয় পান।
রুকুর আঁকা প্যাস্টেল
ভারতে ২০১৬ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার (আরপিডব্লিউডি) আইন অনুযায়ী অটিজমকে প্রতিবন্ধকতা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রতিবন্ধী শংসাপত্রের মাধ্যমে সরকারি সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর সুযোগ মেলা সহজ নয়। এঁদের জন্য নির্ধারিত ভাতার অঙ্কও নগণ্য। তাই অভিভাবকদের বড়ো দুশ্চিন্তার কারণ এই শিশুদের ভবিষ্যৎ। অন্যান্য দেশে কমিউনিটি লিভিং বিকল্প ব্যবস্থা হলেও এদেশে তার পরিকাঠামো দুর্বল। রুকুর মা তাই বলেন, “একবার অনুভব করুন আমাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে…”।
রুকুর স্কেচবুকের পাতা ভরে ওঠে ভ্যান গঘের স্টারি নাইটে। তবে সে আকাশের নীল তাঁর নিজস্ব। দাদুর কাছে ছোটোবেলায় শিখেছিলেন মাঠের কাজ। নিজের মতো করে চিনেছেন প্রকৃতির ভাষা। বিনায়ক রুকুর প্রেরণা কচুবনের ঝিঁঝিঁ পোকা, সাইকেল, ব্রাজিলের ফ্যান। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক্তার হতে চান, যাতে ঝিঁঝিঁ পোকারা আরও ভালো থাকে।