বিজ্ঞানী সূর্যদেব চক্রবর্তীর ‘আকাশ’ ছোঁয়ার গল্প

বাঙালির মেধা ও অধ্যাবসায়ের দৃষ্টান্ত

ছোটোবেলা থেকেই আকাশ তাঁকে অদ্ভুতভাবে টানত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতেন —ওই অসীম মহাকাশে কী আছে! আগ্রহ আরও গভীর হয় যখন কল্পনা চাওলার জীবনের গল্প জানতে পারেন। তাঁর মতো একদিন মহাকাশ-গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হবই — এই একটা স্বপ্নই তখন থেকে মনে গেঁথে যায় বিজ্ঞানী, ড: সূর্যদেব চক্রবর্তীর।

সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামীণ স্কুলে গিয়ে টেলিস্কোপ দিয়ে ছোটো ছোটো ছাত্রছাত্রীদের রাতের আকাশ দেখিয়ে, তাদের মধ্যে মহাকাশ নিয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছেন।

আজ নিজের স্বপ্ন স্পর্শ করলেও, বিজ্ঞানী হওয়ার পিছনে রয়েছে তাঁর কোটি অধ্যাবসায়, প্রবল ইচ্ছে, মনের জোর, এক অদম্য জেদ আর মহাকাশকে জানার খিদে। তাঁর মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়ার পিছনে বড়ো প্রেরণা ছিলেন তাঁর স্কুলেরই ফিজিক্স-এর শিক্ষক শ্রী মিলনচন্দ্র গায়েন। প্রসঙ্গত, সূর্যদেববাবু যাদবপুর গড়ফা বয়েজ হাই স্কুল-এর ছাত্র ছিলেন, এই বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পাশ করেন, যা নিয়ে তিনি গর্বিত।

সূর্যদেববাবু এবং তাঁর মতো অন্যান্য ছাত্রদের আকাশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ ও কৌতূহল দেখে মিলন স্যারেরই উদ্যোগে স্কুলে টেলিস্কোপ আসে। আর তা দিয়ে আকাশ দেখার যে অভিজ্ঞতা, সেটাই কিন্তু তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেদিনই দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন — মহাকাশ নিয়েই কাজ করতেই হবে।

বাঙালি তার মেধা ও অধ্যাবসায় দিয়ে বিশ্ব জয় করেছে বারবার, বিজ্ঞানী সূর্যদেব চক্রবর্তী অন্যতম। বহু কৃতি বাঙালির মতো তিনি এটাও প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করেই আকাশ ছুঁয়ে ফেলা যায়।

ভূগোল নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (M.Sc.) সম্পন্ন করার পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Remote Sensing-এ ডিপ্লোমা করেন তিনি। এরপর জীবনের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জগুলোর একটি আসে—Indian Institute of Remote Sensing-এর M.Tech প্রবেশিকা পরীক্ষা, যা Indian Space Research Organization দ্বারা পরিচালিত। হাজার হাজার আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ৫টি সিট—সেই পাঁচজনের একজন হয়ে, অসম্ভব কঠিন প্রতিযোগিতায় সফল হওয়াই তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়। M.Tech শেষ করার পর —জার্মানির Karlsruhe Institute of Technology থেকে Young Scientist Award পেয়ে ৩ মাসের গবেষণার সুযোগ ও অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুন আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।

দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন —চাকরির পাশাপাশি পিএইচডি শেষ করতেই হবে। এরপর National Remote Sensing Centre-এর অধীনে কাজ করতে করতেই তাঁর পিএইচডি সম্পন্ন হয়। তাঁর কর্মজীবন শুরু কিন্তু একটি স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে। এরপর GIS পেশায় প্রবেশ করে Indian Institute of Science, NRSC, Mahalanobis National Crop Forecast Centre, ICRISAT এবং Esri India-এ কাজ করার সুযোগ আসে। Esri India-তে কাজ করার সময় IIT, IISc, ISRO এবং DRDO-এর মতো প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ আসে তাঁর জীবনে, যা তাঁর সাফল্য ও আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ISRO-এ Project Scientist হিসেবে কাজ করার সময় মূলত স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে কৃষি পর্যবেক্ষণ, ফসলের পূর্বাভাস (crop forecasting), ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন (LULC), এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করছেন। বিশেষ করে NRSC ও MNCFC-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে মাল্টি-টেম্পোরাল স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশের কৃষি পরিকল্পনায় অবদান রাখার সুযোগ পাওয়া তাঁর জীবনের এক বড়ো সৌভাগ্য।

এখন দুবাই এর Mohammed Bin Rashid Space Centre- এর ল্যাবে (University of Dubai) একজন বিজ্ঞানী হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। এখানে SAR, Hyperspectral data analysis, AI-based geospatial modeling, disaster monitoring (যেমন flood mapping, oil spill detection), জলবায়ু সংক্রান্ত বিশ্লেষণ তাঁর কাজ এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

তাঁর জীবনের অন্যতম আরেকটি স্বপ্ন—মহাকাশ নিয়ে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা। আজও তিনি স্কুল জীবনের স্মৃতি মনে করেন —যেখানে তাঁর মিলন স্যার একদিন আকাশ চিনিয়েছিলেন। এখন তিনিও চেষ্টা করেন সেই পথে হাঁটার। দেশে এলে সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামীণ স্কুলে গিয়ে টেলিস্কোপ দিয়ে ছোটো ছোটো ছাত্রছাত্রীদের রাতের আকাশ দেখিয়ে, তাদের মধ্যে মহাকাশ নিয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছেন। যদি সেইসব কচিকাঁচাদের মধ্যে কোন একজনও মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে তাহলে বিজ্ঞানী সূর্যদেব চক্রবর্তীর স্বপ্ন আবার সফল হবে। কারণ তিনিও তো তাঁর স্যারের ছোট্ট উদ্যোগ থেকেই মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন।

বাঙালি তার মেধা ও অধ্যাবসায় দিয়ে বিশ্ব জয় করেছে বারবার, বিজ্ঞানী সূর্যদেব চক্রবর্তী অন্যতম। বহু কৃতি বাঙালির মতো তিনি এটাও প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করেই আকাশ ছুঁয়ে ফেলা যায়।

_____________
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ডক্টর সূর্যদেব চক্রবর্তী

 

Developed by DXDasia