প্রতিবন্ধকতা কেবল শারীরিক নয়, সামাজিকও : চার দশকের লড়াইয়ে বার্তা শম্পা সেনগুপ্তের

ডিজ়েবিলিটি প্রাইড মান্থ-এর বিশেষ সাক্ষাৎকার

ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবন্ধী আন্দোলনে শম্পা সেনগুপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। আইন পরিবর্তন, আইন তৈরি থেকে শুরু করে সচেতনতা বৃদ্ধির যে কাজ তিনি চার দশক ধরে করে চলেছেন, বাঙালি হিসেবে আমরা সে-বিষয়ে গর্ববোধ করতে পারি। প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে তিনি লিঙ্গ ও যৌনতাকেও নিজের কাজের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। আমরা তাঁর কাছে কিছু প্রশ্ন নিয়ে হাজির হই:

প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের প্রথমেই ধরে নেওয়া হয় যে তাঁরা যৌনতা ও লিঙ্গচেতনাবিহীন মানুষ হবেন। কিন্তু আমরা এবং আরও অনেকেই, কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে একটা দিকে মানুষের প্রতিবন্ধকতা থাকলেও অন্যান্য দিকে যে তাঁদের কোনও অসুবিধা থাকবে এমন কোনও ব্যাপার নেই।

প্রশ্ন: জুলাই মাসকে বলা হয় প্রতিবন্ধী গর্ব মাস (Disability Pride Month)। প্রথমেই জানতে চাইব যে এই মাসের গুরুত্বটা কীভাবে তৈরি হল এবং কেন এই মাসকে এই নামে অভিহিত করা হয়? 

উত্তর: আসলে ব্যাপার হলো, ১৯৯০ সালে আমেরিকাতে জুলাই মাসেই প্রতিবন্ধী আইন প্রথম তৈরি হয়। সে-দেশে এরকম আইন তৈরি হওয়ার পর মোটামুটি সারা বিশ্বে সকলে ধারণা করে নিলেন যে, এই মাসকে ডিজ়েবিলিটি প্রাইড মাস হিসেবে আমরা উদযাপন করতে পারি। তবে আমি একটা কথা বলব। প্রতিবন্ধী দিবস হিসেবে ৩ ডিসেম্বর আমাদের দেশে পালন করা হয় এবং আমাদের পঁচানব্বই সালের যে প্রতিবন্ধী আইন, সেটা এসেছিল ডিসেম্বর মাসে। ২০১৬-তে নতুন আইন, সেটাও ডিসেম্বর মাসেই এসেছিল। তাহলে জুলাই মাসের থেকে- এটা একেবারেই আমার ব্যক্তিগত মত- ডিসেম্বরকে হয়তো উদযাপনের ক্ষেত্র হিসেবে পালনের গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে এখন মনে হয় যে, যদি একটা মাস বাড়তি পাওয়া যায় সম্মেলনের জন্য, সংগঠনের জন্য এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য, তবে ক্ষতি কী?

প্রশ্ন: প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক আন্দোলনের আপনি একজন বহু বছরের সক্রিয় কর্মী। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন থাকবে যে, এই পথে আপনি কীভাবে এবং কোন সময়ে এলেন?

উত্তর: আমার এই আন্দোলন, এই অ্যাক্টিভিজ়িমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়াটার কিন্তু কোনও প্রস্তুতি ছিল না। আমার নিজস্ব আন্দোলন এবং বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকাটা সময়ের ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে। একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো যে প্রতিবন্ধী আন্দোলনে, বিশেষত যাঁরা যোগদান করেন, নিজেদের তাগিদে করেন- হয় তাঁরা প্রতিবন্ধী, অথবা প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ তাঁদের বাড়িতে আছেন- সেই স্পৃহা থেকে তাঁরা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। আমার ক্ষেত্রে কিন্তু কোনওটাই ঘটেনি। তবে এখন যখন ব্যক্তিগত ইতিহাস ঘেঁটে দেখি এবং এত বছর ধরে আন্দোলনের সঙ্গে থাকতে থাকতে পিছন ফিরে তাকাই, তখন মনে হয় একটা বিশেষ ঘটনার কথা। আমার যখন এক-দেড় বছর বয়স, তখন আমাদের বাড়িতে অন্নপূর্ণা দাস বলে একজন কাজ করতে এসেছিলেন, মূলত আমাকেই দেখাশোনার কাজ। আমার মা স্কুলে চাকরি করতেন এবং অন্নমাসি বলে যাঁকে আমরা ডাকতাম, তিনি দেখাশোনা করতেন আমাকে। কিন্তু তিন-চার দিনের মাথায় বোঝা গেল যে তিনি কানে শুনতে পান না, ডাকলে সাড়া দেন না। এতে আমার মাকে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন- সকলেই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে অন্নমাসিকে ছাড়িয়ে দেওয়াই ভালো। কারণ, এত ছোটো শিশুকে যে দেখাশোনা করে, সে যদি কানে শুনতে না পায় এবং রেসপন্ড না করে, তাহলে তো ছোটো বাচ্চা দেখাশোনাটা কঠিনই হবে। কিন্তু আমার মা কারও কথা মানেননি। আমার মায়ের একটা পরিষ্কার বক্তব্য ছিল যে একজন মানুষ কানে শুনতে পান না বলে তাঁর কাজ চলে যাবে? এটা আমি শুনেছিলাম অনেক বছর পর বড়ো হয়ে এবং সেই মুহূর্তটা যে একটি মানুষের প্রতিবন্ধকতার জন্য তার কাজ চলে যেতে পারে না, যেটা আমার মা বলেছিলেন, সেটা আমার মনে দাগ কেটে গিয়েছিল।

প্রশ্ন: আপনার স্কুল এবং কলেজ শিক্ষা কোথায়? আপনি ঠিক কোন বয়সে এইভাবে এই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে জড়িয়ে পড়বেন বলে ঠিক করেছিলেন?

উত্তর: আমার স্কুল ছিল গোখেল মেমোরিয়াল স্কুল আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে মাস্টার্স করেছি। সেটা আশির দশক। সে-সময় এক সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর সেরিব্রাল পলসি (তারাতলা)-তে একটা টিচিং কোর্স করানো হবে বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের পড়ানোর বিষয়ে। আমি তাতে যোগ দিয়েছিলাম এবং আমার মনে আছে যে আমাদের তখন কলেজে অ্যাটেন্ডেন্সের খুব কড়াকড়ি ছিল না বলে আমি প্রায় একটা বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ক্লাস না করে ওই কোর্সটা সম্পূর্ণ করেছিলাম।

সরকারি চাকরি করতে গেলে যতই সংরক্ষণ থাকুক, চাকরির তো কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে, যেমন এইট পাশ হতে হবে বা মাধ্যমিক অথবা গ্র্যাজুয়েশন। প্রতিবন্ধী মানুষদের যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সেটাই তো অনেকটা দূর পর্যন্ত যেতে পারছে না। তার কারণ হচ্ছে, শিক্ষালয়গুলো একেবারেই প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়।

প্রশ্ন: তারপর আপনি কি বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের পড়াবার কাজ নিয়েছিলেন?

উত্তর: না, সেটা আমি করিনি। আমার মনে হয়েছিল ওদের পড়াবার বিষয়ে তখনও আমি ওয়েল-ইকুইপড নই। আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করি। তারপর বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের অভিভাবকদের একটা সংগঠন ছিল তাতে যোগ দিই। ওঁরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় একত্রিত হতেন। লোরেটো স্কুল আমাদের একটা ঘর দিয়েছিল। প্রস্তাবটা এমন ছিল যে মা-বাবারা এক জায়গায় বসে নিজেদের পারস্পরিক মত বিনিময় করবেন, আর বাচ্চারা আরেকদিকে খেলবে। তখন ফোন ছিল কিন্তু যোগাযোগের মাধ্যমটা আজকের মতো এত শক্তিশালী ছিল না। তাই হাতে করে চিঠি আমি সকলের বাড়িতে পৌঁছে দিতাম। চিঠি লিখতাম এবং সবাইকে আসবার জন্য অনুরোধ করতাম।

প্রশ্ন: সেটা কলকাতার কোথায় হত?

উত্তর: পরবর্তীকালে বেহালায় আমরা একটা বাড়ি কিনেছিলাম। কিন্তু তার আগে অবধি ওই লোরেটো স্কুলের কক্ষেই হত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমি প্রত্যেকটা বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধী শিশুদের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলতাম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্কুলে এলে যেটা হয়, তা হলো তারা আমাদের কাছে আসেন। কিন্তু এক্ষেত্রে, যখন আমরা তাদের বাড়িতে গেলাম, তখন একেকটা বাড়ির যে ডায়নামিক্স একেক রকম এবং প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তাদের বাঁচবার যে সুবিধে-অসুবিধে, সেগুলো স্বচক্ষে দেখার, বোঝার অভিজ্ঞতা হল। তখন বুঝিনি যে আমি আসলে একটা অর্গানাইজিঙের কাজ করছিলাম, মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষমতা আমার মধ্যে তৈরি হচ্ছিল। সত্যি কথা বলতে, হাতে কলমে কাজ করার যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, সেটা কিন্তু আমার সে-সময়ে হয়েছিল।

প্রশ্ন: সে-কাজটি কি খুব মসৃণ ছিল, নাকি বাধা বিপত্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল?

উত্তর: দেখুন, আমি যে-সময়টার কথা বলছি, সেটা পঁচানব্বই সালের আগে। অর্থাৎ, প্রতিবন্ধী আইন তখন দেশে তৈরি হয়নি এবং সচেতনতার লেভেলটা কোথায় ছিল, শুনুন- আমরা বেহালায় যে বাড়িটা নিয়েছিলাম, সেটা এই উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল যে সেখানে আমাদের বাচ্চারা গিয়ে একত্রিত হবে, খেলাধুলা করবে। সেই পাড়ার অনেকে দল বেঁধে বিরোধিতা করতে এসেছিলেন এই মর্মে যে তাঁদের পাড়ায় এসব স্কুল করা যাবে না। কারণ? এই সমস্ত বাচ্চাদের সঙ্গে মিশলে, তাদের দেখলে বা সংস্পর্শে এলে, তাদের বাড়ির শিশুরাও নাকি এইরকম হয়ে যাবে! সুতরাং, কোন জায়গা থেকে আমাদের কাজ শুরু করতে হয়েছিল, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন?

প্রশ্ন: এখানে কাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পর আপনি কি এই সংস্থাতে থেকে গিয়েছিলেন? নাকি পরিবর্তন এসেছিল কিছু?

উত্তর: এখানে আমি ছ’বছর কাজ করেছিলাম টানা এবং এই সংস্থার সমস্ত কিছুই আমার হাতে হয়েছিল বলা যেতে পারে। কিন্তু তারপর আমার পরিবারে একটা অবস্থা তৈরি হলো, যখন আমার মা অবসর নিলেন। বাবা তো বহুদিন আগে গত হয়েছিলেন। এরপর আমার একটা চাকরির প্রয়োজন পড়ল এবং একটি বেসরকারি সংস্থায় আমি তিন বছর চাকরি করবার পর ‘স্বয়ম’-এ জয়েন করলাম। ‘স্বয়ম’ থেকে অনুরাধা কাপুর আমায় ফোন করে বললেন যে আমি কোনও কাজ করতে চাই কিনা। তখন মায়ের পেনশন চালু হয়েছে এবং কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা। ওখানে জয়েন করতে আমার অসুবিধা ছিল না তাই।

প্রশ্ন: ‘স্বয়ম’ কি আপনার কর্মজীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল?

উত্তর: দুটো ঘটনা ঘটেছিল। একটি মূক ও বধির বিবাহিত মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার। ডিভোর্স মামলায় ফ্যামিলি কোর্টে তাকে নিজের কথা নিজেকে বলতে হবে। স্বাভাবিকভাবে জজ সাহেবকে তার বক্তব্য সে নিজের প্রতিবন্ধকতার জন্য জানাতে পারছিল না। মেয়েটি বারবার আমাদের কাছে এসে বলছিল যেহেতু সে কোনও কাজ করে না তাই তার সন্তানকে তার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল যেখানে একটি মূক ও বধির মেয়েকে রাস্তায় পাওয়া গিয়েছিল এবং পুলিশ তাকে হোমে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছিল। সেই পুলিশের গাড়িতেই তাকে ধর্ষণ করা হয় এবং সেটা নিয়ে আমরা অনেক প্রতিবাদ, আন্দোলন করেছিলাম। আমি তখন একটা জিনিস দেখলাম যে, প্রতিবন্ধী সংস্থাগুলি বলছে যে এটা ধর্ষণের ব্যাপার তাই ওরা অতটাও জড়াবে না। আবার নারীবাদী সংস্থাগুলো বলছে যে যেহেতু সেই মেয়েটির প্রতিবন্ধকতা আছে, সুতরাং সেক্ষেত্রে তাদের কাছেও ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছে না কীভাবে তারা তাকে সাহায্য করতে পারে। ঠিক এইখান থেকে আমার একটা ব্যক্তিগত আন্দোলনের পথ তৈরি হয়েছিল বলা যেতে পারে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারের সময়কার ঘটনা কিন্তু মেয়েটি বিচার পেয়েছিল সেই সরকার চলে যাবার পর। কিন্তু এই এতগুলো বছরে মেয়েটিকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার যে কাজ, তাকে সরকারি কম্পেনসেশন পাইয়ে দেওয়া, রিহ্যাবিলিটেট করা এগুলো আমরা করেছিলাম। মেয়েটির যে সন্তান হয়েছিল সরকার তার দায়িত্ব নিয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েটিকে চাকরির সংস্থান করে দেওয়ার কাজও আমরা করেছিলাম। আমাদের আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়েছিল এই ঘটনার প্রেক্ষিতে।

প্রশ্ন: আপনার যে কাজ, গবেষণা এবং আন্দোলন, তা প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে যেমন, তেমনই লিঙ্গযৌনতা বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ এতে আছে। প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের লিঙ্গযৌনতা বিষয় হিসেবে আপনার আন্দোলনে বা কাজে কবে থেকে এলো?

উত্তর: এটা তৈরি হলো কাজ করতে গিয়েই। তার কারণ, প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের প্রথমেই ধরে নেওয়া হয় যে তাঁরা যৌনতা ও লিঙ্গচেতনাবিহীন মানুষ হবেন। কিন্তু আমরা এবং আরও অনেকেই, কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে একটা দিকে মানুষের প্রতিবন্ধকতা থাকলেও অন্যান্য দিকে যে তাঁদের কোনও অসুবিধা থাকবে এমন কোনও ব্যাপার নেই। এটা আমরা একটা সামাজিক নির্মাণ করে ফেলেছি। একটা মিথ হয়ে উঠেছে। আবার এটাও ঠিক যে একজন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের লিঙ্গ চেতনা এবং যৌনতার যে পরিপূর্ণতা, সেটা আমাদের মতো সমাজে দাঁড়িয়ে, যে-সমাজ সক্ষম মানুষদের জন্যেই বেশি কাজ করে, তাতে উপলব্ধি করা এত সহজ নয়। এই দুটি দিককে চিহ্নিত করে নিজের কাজের পরিধি আমি আরও স্পষ্ট করি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মডেল থেকে প্রতিবন্ধকতা বিষয়টি উত্তীর্ণ হয়েছে সামাজিক মডেলে। আগে মনে করা হত যে প্রতিবন্ধকতা প্রতিবন্ধী মানুষটার সমস্যা। সমাজের কোনও দায় নেই। কিন্তু আজ আমরা বুঝি প্রতিবন্ধকতা যদি একটা সমস্যাই হয়, তবে সেটা সমষ্টির।

প্রশ্ন: প্রতিবন্ধকতা নিয়ে রাষ্ট্রের কর্তব্যের জায়গাগুলোতে আসি। সরকার প্রতিবন্ধী আইন করেছেন। সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী মানুষের সংরক্ষণ তৈরি হয়েছে। পরিবহনের বহু ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধী মানুষদের ভাড়া লাগে না, এবং সরকারের তরফ থেকে প্রতিবন্ধী মানুষরা ভাতা পান। এছাড়া সরকারের আর কোন কাজ আপনার মনে হয় যে প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে উপকারী হয়ে উঠবে?

উত্তর: আপনি যে সরকারের কাজগুলোর কথা উল্লেখ করলেন সেগুলো নিয়ে প্রথমে বলি। ১৯৯৫ সালের আইনে অনেক খুঁত ছিল। যেমন সেখানে কোনও শাস্তির কথা ছিল না। পেনাল্টির কথা ছিল না। যদি প্রতিবন্ধীদের কেউ অত্যাচার করে, সেই মানুষদের কোনও শাস্তি না হলে আর আইন করে কী হত? আমরা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীরা দিল্লিতে এক জায়গায় হয়ে তিন-চার দিন ধরে সেই আইন নিয়ে কাটাছেঁড়া করবার পর বুঝতে পারলাম যে আইনটার অ্যামেন্ডমেন্ট করতে হলে অন্তত চারশোটি জায়গা মেরামত করতে হবে। আমরা অতএব, নতুন আইন দাবী করলাম। মনমোহন সিং সরকারের কাছে আর্জি জানালাম। তারই ফলস্বরূপ বলা চলে ২০১৬ সালে নতুন করে প্রতিবন্ধী আইন এসেছিল। আরেকটা কথা যে বললেন তা হলো সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের ব্যাপারটা। সরকারি চাকরি করতে গেলে যতই সংরক্ষণ থাকুক, চাকরির তো কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে, যেমন এইট পাশ হতে হবে বা মাধ্যমিক অথবা গ্র্যাজুয়েশন। প্রতিবন্ধী মানুষদের যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সেটাই তো অনেকটা দূর পর্যন্ত যেতে পারছে না। তার কারণ হচ্ছে, শিক্ষালয়গুলো একেবারেই প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। আমরা ইনক্লুসিভ এডুকেশনের কথা বলছি কিন্তু আপনারাই বলুন না, কতগুলো সাধারণ স্কুলে প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে? এমন ব্যবস্থা কিছু জায়গায় চালু হওয়ার পরেও দেখেছি, বহু অভিভাবক অভিযোগ করেন যে তাঁদের ছেলেমেয়েদের কোনও মনোযোগ দেওয়া হয় না। এটা শিক্ষা মহলের কোনও দোষের কথা আমরা বলছি না। একটা বিষয় হল শিক্ষকদের জন্যও এই বিষয়গুলোর ওপর কোনও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেই। যদি শিক্ষাটাই তৈরি না হয়, তাহলে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষরা সরকারি কাজ অবধি যাবেন কী করে? তারপর ধরুন, পরিবহনে যে বসার জায়গার কথা বললেন, একজন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের পক্ষে বাস, ট্রাম, মেট্রো, অটো অবধি পৌঁছাতে গেলে যদি তাঁর জন্য বিশেষ বসার জায়গা থাকে, তাহলেও এই পথটুকু কেউ যদি হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হন কিংবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, তাহলে কী হবে? এবার ভাতার প্রসঙ্গে আসি। ভাতার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার একটা অর্থ দেয় যেমন ধরুন ৫০০ টাকা, তারপর একেকটা রাজ্য থেকে সেই অর্থের সঙ্গে খানিকটা জুড়ে একেক রকম ভাতা দেওয়া হয়। ভাতা এখনো অবধি দু-হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি মাত্র দু-একটি রাজ্যেই দেওয়া হয়। এবারে বলুন, আজকের দিনে একটি মানুষের দু-আড়াই হাজার টাকায় কোনও রকম সংস্থান কি হতে পারে? তার ওপর মানুষটা হলেন প্রতিবন্ধী! আমাদের দাবি সব সময় যে অন্তত পাঁচ হাজার টাকা যদি ভাতা না বাড়ে, তাহলে কোনও উপকারই নেই।

প্রশ্ন: আমার শেষ সে প্রশ্ন যে, এই আন্দোলনে নতুন যাঁরা আসতে চান, তাঁদের জন্য আপনার কী বার্তা থাকবে? 

উত্তর: নতুন যাঁরা আন্দোলনে আসবেন, তাঁদের জন্য আমি কী বলতে পারব, জানি না। তবে একটা কথা বলতে চাই যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের মডেল থেকে প্রতিবন্ধকতা বিষয়টি উত্তীর্ণ হয়েছে সামাজিক মডেলে। আগে মনে করা হত যে প্রতিবন্ধকতা প্রতিবন্ধী মানুষটার সমস্যা। সমাজের কোনও দায় নেই। কিন্তু আজ আমরা বুঝি প্রতিবন্ধকতা যদি একটা সমস্যাই হয়, তবে সেটা সমষ্টির। আমরা ফোকাস করি ব্যক্তির উপরে। কিন্তু ভুলে যাই যে, আমাদের সমাজ আমরা তৈরি করেছি সক্ষম মানুষদের কথা মাথায় রেখে। সেটাকে যদি বদলে নিতে পারি তবে ‘প্রতিবন্ধকতা’ শব্দটির আর কোনও গুরুত্ব থাকে না।

________ 
মতামত বক্তার নিজস্ব

Developed by DXDasia