
রেখা তার বেঙ্গালুরুর এক কামরার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের গলির দিকে তাকিয়ে, শহর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। আজ ১০ অক্টোবর, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। কিন্তু আজকের দিনটাও আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই কাটবে তার, আজও সে রান্না করবে, ঘর পরিষ্কার করবে, দশ ঘণ্টা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে ঘরে ফিরে এসে আবার জমে থাকা বাকি কাজ শেষ করবে। মৃদুস্বরে সে বলে, “মাঝেমধ্যে রাতে এত কাঁদি যে সকালে উঠে নিজেকে ফাঁকা লাগে।” কিন্তু বাড়িতে জানালে তারা বলবে, “তুমি এত দুর্বল কেন?” অগত্যা চুপ করে থাকি। (বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস)
রেখার গল্পটি নৈঃশব্দের বিশাল সমুদ্রে একটি জলবিন্দু মাত্র। ভারতের নানা প্রান্তে নারীরা—বিশেষত দলিত, আদিবাসী, ক্যুইয়ার, প্রতিবন্ধী ও শ্রমজীবী নারীরা যাদের ক্রমাগত নানাবিধ সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য শুধু লিঙ্গ পরিচয় দিয়ে নয়, পাশাপাশি জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যৌনতাকেন্দ্রিক কলঙ্ক ও অঞ্চলভেদে অবহেলা প্রভৃতির মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রিত হয়। এগুলি বলা বিলাসিতা না, বরং বাস্তবতার শনাক্তকরণ। (বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস)
প্রায় ছয় থেকে সাত কোটি ভারতীয় মানসিক রোগে আক্রান্ত। নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাবিত, কিন্তু সকলের অভিজ্ঞতা একরকম নয়। প্রতিদিনের জাতিভিত্তিক অপমানের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকা এক দলিত নারীর বিষণ্ণতা, এক মধ্যবিত্ত নারীর প্রসব-পরবর্তী উদ্বেগের সমান নয়।
পরিসংখ্যানের পিছনে ইন্টারসেকশন
প্রায় ছয় থেকে সাত কোটি ভারতীয় মানসিক রোগে আক্রান্ত। নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাবিত, কিন্তু সকলের অভিজ্ঞতা একরকম নয়। প্রতিদিনের জাতিভিত্তিক অপমানের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকা এক দলিত নারীর বিষণ্ণতা, এক মধ্যবিত্ত নারীর প্রসব-পরবর্তী উদ্বেগের সমান নয়। খননকর্মী কোনো এক আদিবাসী রমণীকে কাজ থেকে উচ্ছেদ করলে সে যে মানসিক আঘাত পায় তা এক উচ্চবর্ণ শিক্ষিত নারীর শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা জনিত উৎকণ্ঠার সমান না। অথচ নীতিনির্ধারণের সময় এইসব পার্থক্যগুলো মুছে ফেলা হয়, “চিকিৎসায় ঘাটতি” নাম দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সমস্যাগুলি এক করে দেওয়া হয়।
দিল্লির ১৯ বছরের ছাত্রী আরতী জানায়, “একবার কাউন্সেলরের কাছে গিয়েছিলাম। কাকা জানতে পেরে বলেন, ‘এখন কেউ তোমাকে বিয়ে করবে না।’ ওই একটা বাক্যই যথেষ্ট। যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। তারপর থেকে আর এইসব কাউকে বলি না।”
ক্যুইয়ার নারী ও ট্রান্স মানুষদের ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধকতা আরও তীব্র। অনেক কাউন্সেলরেরই ক্যুইয়ার-সমর্থিত প্রশিক্ষণ নেই। এক ক্যুইয়ার কর্মী বলেন, “আমাদের বলা হয়েছে নিজেদের ‘ঠিক’ করে নিতে। অর্থাৎ মানসিক চিকিৎসাক্ষেত্রেও আমাদের অস্তিত্ব মুছে দেওয়া হচ্ছে।” মানসিক চিকিৎসাক্ষেত্রে সাধারণের প্রবেশাধিকার কতটা স্তরভেদে বৈষম্যযুক্ত এবং রাজনৈতিক, ইন্টারসেকশনালিটি তা বুঝতে সাহায্য করে।
জরুরি অবস্থায় নারী-সংকটের ভিন্নতা
এই বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের থিম— মানবিক সংকটে মানসিক স্বাস্থ্য। কিন্তু বহু ভারতীয় নারীর জন্য প্রাত্যহিক যাপনই সংকটে পূর্ণ। প্রাকৃতিক বিপর্যয় লিঙ্গনির্বিশেষে মানুষের ক্ষতি করলে এক্ষেত্রেও নারীরাই তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়— রেশন লাইনে দাঁড়ানো, ঘরবাড়ি গুছিয়ে তোলা, পরিবারকে খাওয়ানো— সবই তারা করে নিজস্ব মানসিক যন্ত্রণাকে চেপে রেখে। ওড়িশার এক মাছ ব্যবসায়ীর স্ত্রী কিরণ বলেন, “মাথার উপর নতুন ছাদ হল ঠিকই। কিন্তু আমাদের দুঃস্বপ্নের কথা কেউ জিজ্ঞাসা করে না। ঘুমের মধ্যে আমি যখন চিৎকার করেছি সবাই বলেছিল, ‘তুমি মা, তোমায় শক্ত হতে হবে।”
জাতিগত হিংসা দলিত নারীদের সংকটকে দ্বিগুণ করে তোলে। মুসলিম নারীদের সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের স্বীকার হতে হয়। পরিযায়ী নারীরা শহরে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অনিশ্চয়তায় ভোগে। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিসংখ্যানে এই ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের ভিন্ন ভিন্ন মানসিক চাপগুলি ধরা পড়ে না।
মুসলিম নারীদের সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের স্বীকার হতে হয়। পরিযায়ী নারীরা শহরে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অনিশ্চয়তায় ভোগে। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিসংখ্যানে এই ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের ভিন্ন ভিন্ন মানসিক চাপগুলি ধরা পড়ে না।
সামাজিক পরিত্যক্ততার ভূগোল
মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলো মূলত শহর ও স্বচ্ছল শ্রেণির মধ্যে কেন্দ্রীভূত। তবে সেখানেও শ্রেণি ও জাত বিভাজন তৈরি হয়। ওড়িশার এক আদিবাসী গ্রামে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী লতা বলেন, “প্রসবের পর কিছু মহিলা কাঁপতে থাকে বা স্তব্ধ হয়ে যায়। পরিবার বলে, ‘দুর্বলতা, ঠিক হয়ে যাবে’। হাসপাতালে শুধু ঘুমের ওষুধ দেয়, আর কিছু নয়।”
বেঙ্গালুরুর এক গৃহিণী জানান, “একটি ক্লিনিক ছিল, কিন্তু সেখানে সবাই ইংরেজিতে কথা বলল, অনেক টাকা নিল, এমন ভাবে আমায় দেখল যেন আমি ওদের থেকে আলাদা।”
এটাই শ্রেণি, জাত ও ভূগোলের সেই জটিল স্তর যেখানে পরিষেবা গ্রহণের সুযোগ থাকলেও উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে যাদের তা সবচেয়ে বেশি দরকার, তারাই তা গ্রহণ করতে পারে না।
ন্যায়বিহীন ওষুধ ও পরাধীন চিকিৎসা
ভারতের উদ্যোগগুলি—প্রসব-পরবর্তী কাউন্সেলিং, এনজিও পরিচালিত সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট, ডিজিটাল টুল—এগুলি সম্ভাবনাময়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলি নারীর বাস্তব জীবন কাঠামোকে উপেক্ষা করে। ওষুধ বা মাইন্ডফুলনেস ব্যায়াম কখনোই লিঙ্গবৈষম্য, জাতিবৈষম্য বা মজুরি শোষণের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষত সারাতে পারে না।
মুম্বাইয়ের এক দলিত নির্মাণকর্মী এক এনজিও কাউন্সেলরকে বলেছিলেন, “ওরা বলেছে, ভয় পেলে সংখ্যা গুনতে। কিন্তু কালই নীচু জাত বলে আমার কনট্রাক্টর যখন আমাকে ঠকাবে, অথচ আমি কিছুই করতে পারব না, তখন আমি কী করে শান্ত হবো?”
এখানেই বোঝা যায়— শুধু চিকিৎসা নয়, বিচার ছাড়া চিকিৎসা মানে বিচ্ছিন্নতাকে আরও গাঢ় করা।
নারীদের মানসিক যন্ত্রণা হল নৈতিক ব্যর্থতা, হয় তা উপেক্ষিত অথবা কলঙ্কিত। ক্যুইয়ারদের ক্ষেত্রে তাদের পরিচয়কেই মুছে দেওয়া হয়। জাতিভিত্তিক অন্যায় সম্পর্কে সকলে নীরব। দারিদ্র্যকে দেখা হয় শুধু দুর্ভাগ্যজনক ক্ষতি হিসেবে, কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে নয়।
নারীবাদী দৃষ্টিকোণে ইন্টারসেকশন
মানসিক স্বাস্থ্যনীতিতে খুব কম ক্ষেত্রেই ইন্টারসেকশনালিটির প্রতিফলন দেখা যায়। পুরুষদের আসক্তিকে রোগ হিসাবে চিহ্নিত করে তার জন্য তহবিল তৈরি হলেও নারীদের মানসিক যন্ত্রণা হল নৈতিক ব্যর্থতা, হয় তা উপেক্ষিত অথবা কলঙ্কিত। ক্যুইয়ারদের ক্ষেত্রে তাদের পরিচয়কেই মুছে দেওয়া হয়। জাতিভিত্তিক অন্যায় সম্পর্কে সকলে নীরব। দারিদ্র্যকে দেখা হয় শুধু দুর্ভাগ্যজনক ক্ষতি হিসেবে, কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে নয়।
তেলেঙ্গানার এক নার্স বলেন— “ডিপ্রেশনের প্রাথমিক পরীক্ষা করতে হয় আমাদের। কিন্তু দলিত বা খুব দরিদ্র পরিবারের নারীর ক্ষেত্রে দেখি তার পরিবার আরও বেশি আপত্তি করে। তারা ভয় পায় যে অন্যরা জেনে যাবে। প্রান্তিক মানুষেরা তাই এক্ষেত্রে সবথেকে বেশি নীরব।”
নারীবাদী দৃষ্টিতে তাই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কেবল পেশাদারিত্বের অভাব নয়, বরং প্রশ্ন হলো— কার যন্ত্রণা গণ্য হচ্ছে, আর কারটা মুছে যাচ্ছে।
প্রতিরোধের স্ফূলিঙ্গ
তবু নারীরা নীরব থাকছে না। ঝাড়খণ্ডের এক গৃহবধূ সুমন, স্ব-সহায়ক দলে যোগ দিয়ে বলেছে, “আমরা বলি মাথা ধরেছে, শরীরে ব্যথা। কিন্তু আসলে আমরা দুঃখের কথাই বলি। অন্তত এখানে কেউ আমাদের উপর হাসে না।”
উত্তরপ্রদেশের মহিলা দলিত সংগঠনগুলির কাছে শ্রেণিভিত্তিক অপমান হল ‘আঘাত’, কোনো ব্যক্তিবিশেষের দুর্বলতা না। ব্যাঙ্গালোরের ক্যুইয়ার গোষ্ঠীরা গড়ে তুলেছে নিরাপদ বলয়। দিল্লির পরিযায়ী মেয়েরা ছোটো ছোটো দলে জোট বেঁধে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে। এই কাজগুলি আপাতভাবে তুচ্ছ হলেও এগুলিই নারীদের উপর পিতৃতন্ত্র, জাতিবৈষম্যের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নৈঃশব্দের আবরণে ফাটল ধরিয়েছে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের অর্থ কী হওয়া উচিত
ভারতের ক্ষেত্রে এটিকে হতে হবে ইন্টারসেকশনাল। বাজেট হতে হবে লিঙ্গ-সংবেদনশীল, জাত-সচেতন ও ক্যুইয়ার-সমর্থিত। মাতৃস্বাস্থ্য, গৃহহিংসা প্রতিরোধ ও বিদ্যালয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ‘সাইকোসোশ্যাল কেয়ার’ ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। জেলাস্তরে শুধু পরিষেবার ঘাটতি নয়, পাশাপাশি ভাষা-জাত-শ্রেণি বা যৌনতার কারণে কারা বাদ পড়লো—তাও নিরীক্ষণ করতে হবে।
মনোরোগ চিকিৎসক ভরৎ বাটওয়ানি একবার বলেছিলেন, “আমরা প্রত্যেকে কখনও না কখনও অন্ধকারে ডুবে যাই… আমরা সবাই এক নৌকার যাত্রী।”
কিন্তু নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে সত্য আরও কঠিন—কেউ কেউ সেই নৌকাতেও উঠতে পারেন না। তাদের বলা হয় নীরবে সাঁতার কাটতে, পিতৃতন্ত্র-জাত ও শ্রেণিস্রোতের বিপরীতে।
এই ১০ অক্টোবর, আমাদের সামনে দুটি পথ রয়েছে: হয় পুরোনো স্লোগান পুনরাবৃত্তি করা; অথবা মানসিক স্বাস্থ্যকাঠামোর অভ্যন্তরে যে অবিচার স্তরীভূত রয়েছে তা সনাক্তকরা। তবেই রেখা, আরতী, লতা, সুমন এবং তাদের মতো লক্ষ লক্ষ নারী তাদের নিজস্ব ভার মর্যাদার সঙ্গে বহন করতে পারবে— নীরবে নয়, একতার শক্তিতে।
_______________
রেখাচিত্র স্বরূপেন্দ্রনাথ রায় | মতামত লেখকের নিজস্ব | অনুলিখন সহায়তা সম্পূর্ণা ব্যানার্জী, সুমন সাধু

