
প্রকৃতির রক্ষাকর্ত্রী অদিতি গাইন
উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুর। মফঃস্বল এলাকা। এককালে বয়ে যেত সুবর্ণবতী নদী। দত্তপুকুর বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল এই নদীকে। সময়ের সঙ্গে বদলায় পরিবেশ, প্রকৃতি। নদী পরিণত হল খালে। এ পরিবর্তন প্রভাবিত করেছিল দত্তপুকুরেরই এক ছোট্ট মেয়েকে। প্রকৃতি আর মানুষের সহাবস্থান এখানেও অন্যান্য অঞ্চলের মতোই জটিল এবং দ্বন্দ্বময়। দত্তপুকুর-এর জলাভূমি বহু সাপ এবং পাখির বাসস্থান। কিন্তু সুবর্ণবতী নদীর শুকিয়ে যাওয়া প্রভাবিত করছিল তাদের বেঁচে থাকাকে। বহু পশু-পাখি নিজের আশ্রয় হারিয়ে ঢুকে পড়ত লোকালয়ে। প্রকৃতি আর মানুষের এই সংঘাত অচেনা নয়। পরিবেশের বদলও সয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃতির কোলজুড়ে চলতে থাকা এই অনাচার দত্তপুকুরের সেই মেয়েটাকে কষ্ট দিত। প্রকৃতির প্রতি মানুষের অবিচার তার নজরে আসে। প্রকৃতিকে গভীরভাবে অনুভব করার ইচ্ছে নিয়েই মূলত এগিয়ে আসেন দত্তপুকুরের প্রকৃতি কন্যা অদিতি গাইন (Aditi Gain)।

দত্তপুকুরে জন্ম অদিতির। ছোটোবেলা কেটেছে প্রকৃতির মাঝে। এই প্রকৃতির বদলে যাওয়া তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। যে নদীর তীর একসময় তার খেলার সঙ্গী ছিল, মরে গিয়ে সেই নদীর সুটি খালে পরিণত হওয়া প্রভাবিত করেছিল অদিতির মনকে।
দত্তপুকুরে জন্ম অদিতির। ছোটোবেলা কেটেছে প্রকৃতির মাঝে। এই প্রকৃতির বদলে যাওয়া তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। যে নদীর তীর একসময় তার খেলার সঙ্গী ছিল, মরে গিয়ে সেই নদীর সুটি খালে পরিণত হওয়া প্রভাবিত করেছিল অদিতির মনকে। সুবর্ণবতী নদীর জলের প্রবাহ-শব্দে ছোট্ট অদিতি খুঁজে পেত শান্তি। প্রকৃতি ও পরিবেশ বদলে যাওয়া তাকে আপনজন হারানোর মতোই বেদনা দিয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের করার কিছু থাকে না। অদিতির জীবনও চলছিল গতানুগতিক খাতে। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে অদিতি প্রাণীবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার জন্য কলেজে ভর্তি হন। এতদিন যে প্রকৃতিকে শুধু চোখে দেখার মাধ্যমে অনুভব করেছেন, তার সৃষ্টিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সরাসরি। প্রাণীবিদ্যা পড়তে গিয়ে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মমতার সম্পর্ক তৈরি হয়। অদিতি গাইন বেছে নেন এক অন্যরকম পথ।
কী সেই পথ! শুরুটা হয়েছিল নিজের বাড়ি থেকেই। ২০২০ সাল। অদিতির বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল একটা সাপ। ঘরচিতি সাপটা আক্রমণের চেষ্টা করেনি। বরং অচেনা পরিবেশে ঘাবড়ে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিল। নিরীহ প্রাণীটার দিকে নরম, সহৃদয় হাত এগিয়ে আসে। অদিতি নিজের হাতে উদ্ধার করেন সাপটিকে। ঝুঁকি না নিয়ে বারাসাতে বনদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাপটিকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দেন। ততদিনে পশু-পাখি উদ্ধার করার যাবতীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেলেছেন অদিতি। বন্যপ্রাণীর উদ্ধারকার্যের ক্ষেত্রে সেই হাতে খড়ি। পরিবেশ বদলের যে কষ্ট অদিতির অন্তর বয়ে বেড়াচ্ছিল তা বদলে যায় প্রশান্তিতে। বন্যপ্রাণীদের উদ্ধার করার কাজে নেমে পড়েন অদিতি। অদিতি গাইন থেকে হয়ে ওঠেন প্রকৃতি-কন্যা।

বনদপ্তরের নির্ভরতা অদিতির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। অন্যান্য অঞ্চলেও পশু-পাখিদের উদ্ধার করতে যেতে শুরু করেন। এখন রেসকিউ কল এলে মেয়েকে সঙ্গ দেন বাবা।
এ তো গেল শুরুর কথা। কিন্তু পথচলা মোটেই সহজ ছিল না। বন্যপ্রাণীদের উদ্ধারকাজ ছিল যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবারের তরফ থেকে সমর্থন ছাড়া অদিতির পক্ষে এই কাজ করা অসম্ভব ছিল। প্রথমদিকে মেয়েকে কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কাজে সহযোগিতা করতে পারেননি অদিতির মা। তবে মেয়ে নাছোড়বান্দা। একাই পশুপাখি উদ্ধার করতে বেরিয়ে যেতেন। মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও বেশ কয়েকবার একা একা বন্যপ্রাণ উদ্ধার করেছেন। মেয়ের সাহস দেখে মা ভয় পেয়েছেন। তবে শুরুর এই পারিবারিক বাধা কেটে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই। কারণ, অদিতির পাশে থেকেছেন তার বাবা। মেয়েকে একা না ছেড়ে বাবা যেতেন অদিতির সঙ্গে। প্রথমদিকে শুধুমাত্র দত্তপুকুর অঞ্চলেই পশুপাখি উদ্ধার করতেন অদিতি। পরে অদিতি বুঝতে পারেন উদ্ধার করা প্রাণীদের আবার জঙ্গলে ছেড়ে দিলে তাদের বিপদ বাড়বে। বনদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তখন। এখন উদ্ধার করা সব প্রাণীদের পৌঁছে দেন বনবিভাগের কাছে। পরিবারের চিন্তাভাবনাতেও বদল আসে। মেয়ের প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা বদলে দেয় অদিতির মাকে। এখন আর ভয় পান না মা। অরণ্যকন্যার সঙ্গে বন্যপ্রাণের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সমাজমাধ্যম থেকে অদিতির কাজের কথা জানতে পারেন অনেকেই। বনদপ্তরের নির্ভরতা অদিতির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। অন্যান্য অঞ্চলেও পশু-পাখিদের উদ্ধার করতে যেতে শুরু করেন। এখন রেসকিউ কল এলে মেয়েকে সঙ্গ দেন বাবা। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দায়িত্ব সহকারেই কাজ করেন।
২০২০ সাল থেকে শুরু করে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অদিতি গাইন। প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০টি প্রজাতির সাপ, পাখি, গোসাপ, কচ্ছপ, ভামবেড়াল উদ্ধার করেছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এইসব প্রাণীরা লোকালয়ে ঢুকে পড়লে অদিতির ডাক পড়ে। তারপর বনদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে অদিতি এইসব পশু-পাখিদের উদ্ধার করে পৌঁছে দেন সেখানে। পশু-পাখিদের ব্যবহার এবং তাদের প্রকৃতি বুঝেই এই কাজ করেন অদিতি। অনেক সময় হিংস্র প্রাণীরা ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। ভয় করে না? উত্তরে নিজের কথায় আলো ছড়িয়ে দেন তিনি। বন্যপ্রাণীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে চর্চা করেন অদিতি। তাঁর মতে, "আমরা বন্য প্রাণীদের ভালোবাসলেও ওরা আমাদের ভয়ের চোখেই দেখে। আত্মরক্ষার তাগিদে তারা আমাদের আক্রমণ করতে পারে। একটু ভুল হলেই কামড়, আঁচড়, স্ট্রেস, এতে আমার ও প্রাণীর দু পক্ষেরই ক্ষতি হতে পারে। ঝুঁকি থাকলেও ভুল করার জায়গা নেই। সবই সতর্ক থেকে করতে হয়।"

অ্যাডভেঞ্চারের মোহ নয়, সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ারও বাসনা নেই অদিতির। প্রকৃতির প্রতি অপার মুগ্ধতা আছে কেবল। এটুকুর জন্যেই আগলে রাখতে চান বন্যপ্রাণীদের। এমন অন্যরকম কাজ করার সাহস, ইচ্ছে কোথা থেকে পেয়েছেন?
অ্যাডভেঞ্চারের মোহ নয়, সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ারও বাসনা নেই অদিতির। প্রকৃতির প্রতি অপার মুগ্ধতা আছে কেবল। এটুকুর জন্যেই আগলে রাখতে চান বন্যপ্রাণীদের। এমন অন্যরকম কাজ করার সাহস, ইচ্ছে কোথা থেকে পেয়েছেন? এই প্রশ্ন প্রায় রোজ আসে অদিতির কাছে, উত্তরে নিজের সহজাত আবেগ সামলে বলেন, "মানুষ শুধু মানুষকেই দেখে, আর আমি তাকিয়ে দেখি গাছপালা, ঝোপঝাড়, পাখি, সাপ আর চারপেয়ে প্রাণীদের। এই দেখাটাই আমায় অন্যরকম করে দিয়েছে।" তবে এই অন্যরকম পথে একা হাঁটতে চান না অদিতি। প্রাণী, ইকোসিস্টেম, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে সকলকে পাশে পেতে চান। প্রাণীদের শুধু উদ্ধার করেন না, উদ্ধারকার্যে গিয়ে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ভয় পেয়ে বন্যপ্রাণীদের ক্ষতি করা আখেরে মানুষেরই ক্ষতি করছে, তা বোঝান।
অজ্ঞতা, কুসংস্কার আর ভয়ের কঠিন পথ পেরিয়ে প্রতিটি মানুষ পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণকে জীবনপথের সহযাত্রী হিসেবে দেখবেন, এমনটাই চান অদিতি। প্রকৃতির সন্তানদের প্রকৃতিকন্যা হয়ে আগলে রাখতে চান। নিরাপদ পৃথিবীর ওপর অধিকার সকলের, বন্যপ্রাণীরাও তার ব্যতিক্রম নয়। সুস্থভাবে, কারোর ক্ষতি না করে প্রকৃতির সমস্ত সৃষ্টিকে সেই অধিকার পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন অদিতি গাইন।
__________________
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত