শোভা মজুমদার : অকেজো দুই হাতকে হার মানিয়ে দুই পায়েই ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো

উত্তর দিনাজপুরের রাঙাপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা

গ্রামটার নাম রাঙাপুকুর। জেলা উত্তর দিনাজপুর। ছোট্ট সবুজমাখা গ্রাম। রাঙাপুকুর না হয়ে জায়গাটার নাম সবুজপুকুর রাখা যেত দিব্যি। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। স্কুলের পথে এগিয়ে যেতে যেতে চট করে চোখে পড়ে না স্কুলটা। গ্রামের অনেক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করে চলা একটা স্কুল। অজস্র না পাওয়ার ভেতর আলো ছড়িয়ে দিয়ে স্কুলটা টিকে আছে। তিনতলা বাড়ির মতো দেখতে। সামনে বাগান। প্রাথমিক বিদ্যালয়। অনেকটা দূর থেকেও ছাত্র-ছাত্রীদের হৈ-হৈ শোনা যায়। ঠিক কোলাহল নয়, মিঠে কলতান এর মত সুর। যিনি পড়াচ্ছেন তাঁর মুখেও এক গাল হাসি। বোর্ডে লিখছেন। বসে বসে। তবে ঠিক লিখছেন না, যেন কিছু আঁকছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে পশুপাখি, গাছের নাম চেনাচ্ছেন এক দিদিমণি। ছাত্র-ছাত্রীদের মনোযোগ একটুও সরেনি। গ্রামের স্কুলের এই পরিচিত দৃশ্যটি একটু আলাদা। ঠিক কোথায় আলাদা? সেই শিক্ষিকা ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোর জন্য হাতের বদলে পা ব্যবহার করছেন। কারণ জন্ম থেকেই তাঁর দু’টি হাত অকেজো।

শোভা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন পা দিয়ে। রায়গঞ্জ কলেজ থেকে স্নাতক হয়েছেন। লিখিত পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ পাশ করে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। শোভা মজুমদারের মা শান্তি মজুমদার শুধু দিশা দেখাননি মেয়েকে বরং বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

ছোটোবেলা থেকেই হাত দিয়ে কোনও কাজ করতে পারেন না শোভা মজুমদার। রাঙাপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষিকা দুই পায়ের ভরসাতেই ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা শেখান। শুধু পড়াশোনাই নয়, জীবনের পাঠ শেখান। এই শারীরিক বাধা তাঁর সঙ্গী ছোটোবেলা থেকেই। তাও থেমে যাননি। জন্মের পর প্রথমবার শোভার মা লক্ষ্য করেছিলেন ছোট্ট মেয়েটার দু’টো হাতে একেবারে জোর নেই। এমনকী চেষ্টা করালেও হাত দিয়ে মেয়ে কোনও কাজ করতে পারছে না। কিন্তু তার পায়ের জোর প্রবল। তার থেকেও বেশি ছিল মনের জোর। এই মনের জোর চিনে নিয়েছিলেন শোভার মা। মনের জোরেই  মন্ত্রের মত করে দীক্ষিত করেছেন মেয়েকে। ছোটো থেকেই তিনি মেয়ের পাশে থেকেছেন। শরীরের কোনও অঙ্গ অকেজো হওয়া বা না থাকা, একজন মানুষের সার্বিক দুর্বলতার কারণ নয়। মায়ের শেখানো এই কথাটি আজও মন্ত্রের মতো মনে রাখেন শোভা।

উত্তর দিনাজপুর, রাঙাপুকুরের মেয়ে শোভা মজুমদার। রাঙাপুকুরের যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি পড়াশোনা করেছেন, বর্তমানে সেখানেই শিক্ষকতা করছেন। এই স্কুল শোভার কাছে মন্দিরের মতো। প্রথমদিকে শুধুমাত্র পায়ের ভরসায় পড়া-লেখা ও পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট কুণ্ঠা ছিল শোভার। আত্মবিশ্বাসের অভাবও অনুভব করেছেন কখনো কখনো। কিন্তু এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শোভার অন্তরের ভিত গড়ে দেয়। শিক্ষক-শিক্ষিকারা সন্তানের মত আগলে রাখতেন। এখানে পায়ের সাহায্যেই পরীক্ষা দেওয়া শুরু করেন। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অপার স্নেহ তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল। শোভা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন পা দিয়ে। রায়গঞ্জ কলেজ থেকে স্নাতক হয়েছেন। লিখিত পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ পাশ করে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। শোভা মজুমদারের মা শান্তি মজুমদার শুধু দিশা দেখাননি মেয়েকে বরং বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করেছেন। পাশে থেকেছেন। 

শোভা যখন চাকরি পেয়েছিলেন তাঁর বয়স ছিল ২৮ বছর, পনেরো বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। চাকরি পাওয়ার দিন প্রথম বাবা-মায়ের চোখে জল দেখেছিলেন শোভা। বাবা মলিন মজুমদার শোভাকে দায়িত্ববান হতে শিখিয়েছেন। তাঁর মতে শরীরের কোন অঙ্গের দুর্বলতা স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করতে পারে না। বরং একটা নতুন স্বাভাবিক তৈরি করে দিতে পারে। শোভার আরো এক বোন এবং দুই ভাই আছেন। দিদির পাশে থাকেন তাঁরাও। 

নিজের জীবন-পথের কথা বলতে গিয়ে তাই বাবা-মা আর পরিবারের বাকি সদস্যদের কথা বার বার উঠে আসে শোভা মজুমদারের মুখে, আলো ছড়িয়ে থাকে তাঁর কথাবার্তায়। “দুটো হাত অকেজো তাই আমি আলাদা, এমনটা কখনো মনে হয়নি।” পড়াতে পড়াতে নিজের সহজাত ছন্দেই কথা বলছিলেন। দুই ভাই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। শোভা যথাসাধ্য পরিবারের পাশে দাঁড়ান। পরিবারের তরফে কখনোই বৈষম্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়নি শোভা মজুমদারকে। যা  তাঁকে শক্তিশালী করে তুলেছে। 

সাহসী, আত্মবিশ্বাসী শোভা মজুমদার শুধুমাত্র নিজের জীবনকেই আলোকিত করেননি। “যাঁরা আপনার মতই বিশেষ ভাবে সক্ষম বা কোন প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁদের জন্য কিছু বলতে চান?” প্রশ্নের উত্তরে নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে নেন শোভা। রীতিমতো গল্প শোনাতে শুরু করেন। যখন প্রথম টিউশন পড়ানো শুরু করেছিলেন, সপ্তম শ্রেণীতে পড়তেন তিনি। প্রথমদিকে ছাত্র-ছাত্রী তেমন আসতো না। খেলার ছলে, মজা করে পড়াতেন। তবে যে কয়েকজন প্রথমবার তাঁকে ভরসা করা শুরু করেছিল, তাদের প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন, তিনি যে বিশেষভাবে সক্ষম এ কথা মনে রেখে কেউ যেন পড়তে না আসে। ছাত্র-ছাত্রীরাও শোভা দিদিমনির সঙ্গে খুব সহজেই বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলে। নিজের জন্য পথ তৈরি করেই থেমে থাকেননি শোভা। বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য কাজ করে এমন একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন। সকলের জন্য নানা কাজ করা শুরু করেন। রাঙাপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানোর পাশাপাশি এই সংস্থাটিতেও পড়ান তিনি। আঁকাও শেখান এখানে আসা ছেলে-মেয়েদের। 

শোভা যথাসাধ্য পরিবারের পাশে দাঁড়ান। পরিবারের তরফে কখনোই বৈষম্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়নি শোভা মজুমদারকে। যা তাঁকে শক্তিশালী করে তুলেছে।

“আপনি কি অন্যদের জন্য উৎসাহিত করতে চান?” বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন শোভা। তারপর হাসি ফোটে মুখে। স্মৃতি প্রতারণা করে না এক্ষেত্রে। নিজের মানসিক লড়াইয়ের কথা অকপটে বলে চলেন। পরিবার পাশে থাকলেও, সকলে সাহস যোগালেও নিজের ভেতর মানসিক লড়াই ছিল, এ কথা স্বীকার করেন শোভা। “মনটাকে জয় করতে পারলে অর্ধেক জেতা হয়ে যায়।” তাঁর চোখে-মুখে জিতে যাওয়ার আলো। কথা বলতে বলতে পেছন দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেসে ওঠেন। ছাত্রছাত্রীরা ডাকছে। প্রিয় দিদিমনির সঙ্গে গল্পে মাতবে। রাঙাপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এটা টিফিনের সময়। প্রত্যেকটা দিন এভাবেই রাঙা আলোয় ঢেকে যায় ওখানে। শোভা দিদিমণি ওদের ছড়া শোনান। স্কুলে আনন্দের মিঠে সুর বেজে ওঠে।

___________ 
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত

Developed by DXDasia