শিবের গাজন গাই : পুরাণ ভেঙে ইতিহাস
সেদিন চৈত্র মাস। গোটা একটা মাসের বারোমাস্যা। গোটা একটা দিনের উপলক্ষ্যে। চৈত্র সেল নয়। কম সেলেবেল, বেশি ভায়াবেল। আমরা বলি ‘গাজন’। আমরা মানি ‘শিবের গাজন’। দেবাদিদেব শুরু থেকেই ব্রাত্যজনের সঙ্গ করেন। বরাবর করে আসছেন। ভূত-প্রেত বাদ দিয়েও। আমরা বলি ‘নিচুজাত’। আমরা জানি অবহেলিত, নিপীড়িত; কিন্তু পোড় খাওয়া। কর্মঠ। বছর ঘুরতে ভগবান সংসারী হন। আর বিয়েতে ভক্তরা বরযাত্রী যান। সন্ন্যাসী বেশে। ফীবৎসর। কাজের ফাঁকেই। এ লোকউৎসব না হয়ে যায় না। বরাবরই তাই ছিল। পরে ব্রাহ্মণের হাত পড়লো। শিব-শক্তির মিলনে হিন্দু দম্পতির মানত পড়লো। বংশরক্ষা, রোগমুক্তি, যার যত অভাব-অভিযোগ। বিয়ে করেও ঠাকুরের সোয়াস্তি নেই। গোটা একটা জনপদের আপদ-আবদার। গোটা একটা বঙ্গাব্দের স্মৃতি। শেষ হয় এই বিয়েতে। এই দিনে। এই চৈত্র সংক্রান্তিতে।
তখনও কলি আসেনি। আর্যাবর্তে অনার্যরা অসুরনাম্নী। দৈত্য-দানব, রাক্ষস-খোক্কস। বাকিরা তাই বলতো। ধরনে-গড়নে বিদঘুটে। বন্য। আলাদা। তবু তাদের রাজা ছিল। তবু তারা মানুষই ছিল। তাই অসুররাজ বাণরাজের কন্যাও প্রেমে পড়েন। জাগতিক নিয়মেই। কিন্তু প্রেমিক উচ্চবর্ণের। শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র। ঊষা-অনিরুদ্ধের প্রেম বাণরাজ জানতেন। মানতেন না। অগত্যা বন্দি হলেন অনিরুদ্ধ। খবর গেল কৃষ্ণের কানে। রেগে গিয়ে বাণগড় আক্রমণ করলেন শ্রীকৃষ্ণ। বেশ একচোট যুদ্ধ হল। এবং যা হয়ে থাকে। এবারেও তাই হল। পরাজিত বাণরাজ ক্ষতবিক্ষত, চলচ্ছক্তিহীন। মৃত্যু আসন্ন জেনে নিজেকে উৎসর্গ করলেন আরাধ্য ভগবান শিবশঙ্করের চরণে। বর চাইলেন শ্রীকৃষ্ণের কাছেও। তাঁর মৃত্যুদিনে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। উঁচু-নিচু থাকবে না। সবাই একাসনে বসবে। তথাস্তু। শ্রীকৃষ্ণ মঞ্জুর করলেন। কিন্তু একটা উপলক্ষ তো প্রয়োজন! নইলে সবাই একসঙ্গে বসতে যাবেনই বা কেন? উপায় সেই ভক্তিমার্গ। চিরমনোরম। হৃদয়গ্রাহী। মিলনান্তক। যদিও শিব শক্তিবিনে শব। শুরু থেকেই। এখন ভক্তের ইচ্ছায় সামাজিক বিয়েটাও সেরে ফেললেন। অসুরেরা সন্ন্যাসী হল। বরযাত্রী সন্ন্যাসী। সুরেরা তাদের প্রণাম করলো। ভক্তি ভরেই।
গাজন নামে ‘গাজন’ হল কেন? কে দিয়েছে এমন নাম? কে জেনেছে মর্ম? জনশ্রুতি জনগণেই। লোকে শুনেছে লোকের মুখেই। লোকেই পেলেছে লোকাচার। সন্ন্যাসীরা পেলেছেন ব্রহ্মচর্য। গোটা চৈত্র জুড়েই। সেই ব্রহ্মতেজেই প্রচণ্ড গর্জন করেছেন সংক্রান্তিতে। হর হর মহাদেব। গর্জনেরই অপভ্রংশ কি তবে ‘গাজন’? যেমন ‘চক্র’ থেকে চড়ক। বৃহৎ গাজনের ক্ষুদ্র লোকাচার। চড়কে অবশ্য ব্রাহ্মণ অনুপস্থিত। এখনও। বিশুদ্ধ লোকউৎসব। তবে হিন্দুধর্মের। বাংলায় লোকপ্রিয় হয় ইংরাজি ১৪৮৫ সালে। রাজার হাত ধরে। রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুর। এরপর থেকে পুজো প্রজারাই করলো। সন্ন্যাসী প্রজারাই হল। নিচুজাতের প্রজারা। আদব কায়দাও দেখবার মতো।
চড়কের একটা গাছ হয়। মাঝে মূলদণ্ড। তার উপর একটা আড়াআড়ি দণ্ড। একটু হালকা। মাঝখান থেকে নিচের দিকে বাঁকানো। সামান্যই। যাতে সহজে পাক খায়। আপনাআপনি হয় না। তৈরি করা হয়। মূল পুজোর আগের দিন চড়কগাছকে ধুয়ে মুছে সাফ করা হয়। আর ‘বুড়োশিব’ ঠাঁই পান একটা জলভরা পাত্রে। শিবলিঙ্গ রূপেই। এরপর কৃচ্ছসাধন। পুনর্জন্মবাদ আর মুক্তির আস্বাদ। তাই এই পথ। বাণরাজেরই দেখানো পথ। বোধকরি তার থেকেই বাণফোঁড়া নাম। আরও আছে। চড়কগাছে সন্ন্যাসী ঘোরেন। লোহার হুড়কো দিয়ে চাকার সঙ্গে বাঁধা তিনি। চাকার বেগটাও বেশি। স্পষ্ট চোখে তাঁর বাণশলাকাবিদ্ধ শরীর দেখা যায়। পায়ে, হাতে, পিঠে, জিভে। কেউ বা জ্বলন্ত শলাকা ফুঁরে দেয় তাঁর শরীরে। ঘোরানোর ফাঁকেই। এতো কষ্ট দেখা যায় না। উনিশ শতকে অভিযোগ আসে। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দেই ব্রিটিশ সরকার আইন আনে। বন্ধ হয় দৃষ্টিবিদারক আচার। কিন্তু খাতায় কলমে। হাজার বছরের পাশুপত বিশ্বাস দুম করে দমে যায় না। দিব্যি চলতে থাকে। চলতেই থাকে।
যস্মিন দেশে যদাচার। একই তিথি। এক নক্ষত্রস্থিতি। একই দিনে কত উৎসব! কত নিয়ম-কানুন! কতশত নাম, ধাম! কোথাও গাছে উঠে খেজুর বিলোচ্ছেন সন্ন্যাসীরা। সেই খেজুর খেয়েই উপবাস ভাঙছে ভক্তের। লোকে বলছে খেজুরভাঙ্গা। চড়কেরই অনুষঙ্গ। আবার কোথাও শাক কুড়োচ্ছে চাষিবাড়ির মেয়েরা। চাষের শাক নয়। অনাবাদী। পথের পাশে। জলার ধারে। আলের গায়ে। চোদ্দরকম শাক। সংক্রান্তির অঙ্গ। কেউ আবার মাথায় লাল পাগড়ি বেঁধেছে কষে। গলায় রুদ্রাক্ষ। হাতে ত্রিশূল। হর-পার্বতী নাচছেন। আর নীলকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছুটছে বালা। কারোর উঠোনের আল্পনাতেও নীল বসছে। সময় করে। সধবা করেছে নীলের উপবাস। পাটভাঙা কাপড়ের ঘোমটা উঠেছে। কপালে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়েছেন পুরোহিত। মন্দিরে সারাদিনের মঙ্গলকামনার পর ফল-পাকুড় মুখে তুলছে এখন। নীলষষ্ঠী। এই নীল কি নীলকণ্ঠ? আবার মালদহে জুটেছে ‘গম্ভীরা’ নাম। জলপাইগুড়িতে ‘গমিনা’। তারপর উপাচার শেষ। উৎসব ভেঙেছে। স্তবক জুটেছে সংক্রান্তির। বিদায়ী অলংকার।
“চিত্রা নক্ষত্র হইতে চৈত্র হইল নাম॥
বসন্ত বিদায় নিল, বর্ষশেষ যাম-
চড়কের উৎসব, গাজনের গান।
সেই সঙ্গে বর্ষ হইল অবসান॥”