ফাটাকেষ্টর জন্য পাড়ার গরিব দোকানিদের ভোগ করতে হত না চাঁদার জুলুম
প্ৰিয় পাঠক, আজ আপনাদের নিয়ে যাবো একটি বিশেষ জায়গায়। হাওড়া থেকে বা শিয়ালদা থেকে বাসে উঠে নেমে পড়ুন কলেজ স্ট্রিট মোড়ে, অথবা মেট্রো ধরেও চলে আসতে পারেন। এবার বর্ণপরিচয় মার্কেটকে বাঁ হাতে রেখে এগিয়ে যান ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির দিকে। তবে না, অতদূর এগোতে হবে না, কিছুদূর গিয়েই দেখবেন ডানদিকে একটি চওড়া রাস্তা চলে গেছে ‘বাটা’-র জুতোর দোকানের পাশ দিয়ে, কেশব চন্দ্র সেন স্ট্রিট, ঢুকে পড়ুন। আরও কিছুদূর এগিয়েই আবার ডানদিকে একটি গলি পাবেন, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট। গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সরু কিন্তু লম্বা একটা প্যান্ডেল দেখতে পাচ্ছেন? বেশ, ওয়েলকাম টু নবযুবক সংঘ, আমাদের সকলের পরিচিত ফাটাকেষ্টর কালীপুজো-র মণ্ডপে আপনাদের স্বাগত।

ফাটাকেষ্ট ওরফে কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত
ফাটাকেষ্ট ছিলেন কংগ্রেস ঘনিষ্ট। সত্তরের দশকে নকশালদের সঙ্গে সরাসরি বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়েন ফাটাকেষ্ট। ‘ফাটাকেষ্টর মুণ্ডু চাই’ পোস্টারও দেওয়া হয় নকশালদের পক্ষ থেকে। কুমোরটুলিতে নকশালদের দ্বারা আটকে রাখা হয় কালীপ্রতিমা।
এখন কলকাতার পুজো কালচার ব্র্যান্ডিং-এর উপর নির্ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে। লেবুতলায় অমুক দাদা থেকে গড়িয়াহাটে তমুক দিদি, চেতলায় অমুক মন্ত্রী থেকে নিউ আলিপুরে তমুক নেতা, এইভাবেই এগিয়ে চলেছে নয়া কর্পোরেট কায়দায় ব্র্যান্ডেড পুজো। তবে এই ব্র্যান্ডিং কলকাতা শহরে শুরু হয় কার হাত ধরে? উত্তর খুব সহজ, এই ট্রাডিশন শুরু হয় ফাটাকেষ্টর হাত ধরেই। কলকাতা পায় ‘ব্র্যান্ড ফাটাকেষ্ট’-কে। তবে কে এই ফাটাকেষ্ট? যাঁর নাম আজও মধ্য কলকাতায় প্রবাদের মতো প্রচারিত, এমনকি মিঠুন চক্রবর্তীর বিখ্যাত সিনেমা যাঁর নাম থেকে অনুপ্রাণিত। আজ একটু খুঁজে দেখা যাক কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্ট-র গল্প।

ফাটাকেষ্টর কালীপুজোয় উত্তমকুমার ও সুপ্রিয়া দেবী
কৃষ্ণচন্দ্র দত্তের ছিল পারিবারিক পানের ব্যবসা। সেইসময় কলেজ স্ট্রিট এলাকায় তিনজন কেষ্ট ছিলেন, ড্রাইভার কেষ্ট, বিড়ি কেষ্ট এবং ফাটাকেষ্ট। বরানগরের জনৈক আততায়ী নীলুর দলবলের দ্বারা অতর্কিত আক্রমণ ও ছুরিকাঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কৃষ্ণচন্দ্রের দেহ, তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর কৃষ্ণচন্দ্রের নাম হয়ে যায় ‘ফাটাকেষ্ট’। অন্য মত যদিও বলে, গালে প্রচুর বসন্তের দাগ থাকার জন্য তাঁকে বন্ধুবান্ধবরা ‘ফাটাকেষ্ট’ বলে ডাকতো, সেখান থেকে এই নাম বিখ্যাত হয়। ফাটাকেষ্টকে বলা যায় এক জনপ্রিয় গুন্ডা, গরিবের রবিনহুড। রাজনৈতিকভাবে বা ভোটের ময়দানে তিনি যাই করুণ, পাড়ার মা-বোনেদের কাছে তিনি যেন এক ‘মাসিহা’। তাঁর দৌলতেই মেয়েরা নিশ্চিন্তে নাইট শো-তে সিনেমা দেখতে যেতে পারতেন, পাড়ার গরিব দোকানিদের ভোগ করতে হত না চাঁদার জুলুম। ফাটাকেষ্ট ছিলেন কংগ্রেস ঘনিষ্ট। সত্তরের দশকে নকশালদের সঙ্গে সরাসরি বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়েন ফাটাকেষ্ট। ‘ফাটাকেষ্টর মুণ্ডু চাই’ পোস্টারও দেওয়া হয় নকশালদের পক্ষ থেকে। কুমোরটুলিতে নকশালদের দ্বারা আটকে রাখা হয় কালীপ্রতিমা। তবে এই লড়াইতেও জেতেন সেই ফাটাকেষ্টই। তিনি ছিলেন এক সত্যিকারের পুজো অন্ত প্রাণ।
প্রথম যুগে সাততারা সংঘের সঙ্গে যৌথভাবে পুজো শুরু করে নবযুবক সংঘ, তবে পরবর্তীতে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে এককভাবে রাস্তা আটকে পুজো শুরু করে নবযুবক সংঘ। আজও পুজোর প্যাটার্ন একই রয়ে গেছে, তবে পুজো হয় ৮ ফুট উচ্চতায়, প্রতিমার নীচ দিয়ে মানুষ চলাচল করেন। ফাটাকেষ্ট নিজের হাতে তিলতিল করে গড়ে তুলেছেন এই কালীপুজো। নিজের বাড়ির গয়না বন্দক রেখে একসময় ফাটাকেষ্ট নিজের কালীপুজোর বিশাল প্রসেশনের আয়োজন করেন। ১৯৭২ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের হাত ধরে আবার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই উত্থান হয় ফাটাকেষ্টর কালীপুজোর, আজ ২০২৪ সালে সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে।

ফাটাকেষ্টর কালীপুজোয় প্রণব মুখোপাধ্যায়
কলকাতা শহরকে প্রথম চন্দননগরের শ্রীধর ইলেকট্রিকের আলো উপহার দেন এই পূজাকমিটিই। তবে ফাটাকেষ্টর পুজোর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সেলিব্রিটি। ধর্মগুরু সীতারামদাস ওমকারনাথ একবছর ফাটাকেষ্টর কাঁধে চড়ে মণ্ডপে মাতৃদর্শনে এসেছিলেন, আবার হাল আমলে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসাবে পূজার উদ্বোধনে আসেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
যারা কুমোরটুলির সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন, কুমিরটুলির প্রায় শেষ প্রান্তে এক বিশাল ষ্টুডিওতে তৈরি হয় ফাটাকেষ্টর কালী প্রতিমা। প্রথম যুগে ভাস্কর কালীপদ পাল এই প্রতিমার রূপদান করতেন, তাঁর মৃত্যুর পর এখনও পর্যন্ত ভাস্কর মাধব পাল এই প্রতিমার রূপদান করেন। এখন কুমোরটুলিতে একটি অঘোষিত রীতি তৈরি হয়ে গেছে, কুমোরটুলি থেকে ফাটাকেষ্টর প্রতিমা না বের হলে, অন্য কোনো কালী প্রতিমা কুমোরটুলি থেকে বের হবে না। এখনও তিথি মেনে বিশাল শোভাযাত্রা করে, রাস্তা ধুইয়ে, ফুলের কার্পেট বিছিয়ে মাতৃপ্রতিমা মণ্ডপে আনা হয় এবং প্রায় পাহাড়প্রমাণ ফুলের মালা পরে প্রতিমা পূজার শেষে নিরঞ্জনের পথে যাত্রা করেন। একসময় নিরঞ্জনের জন্যও বিখ্যাত ছিল নবযুবক সংঘ। এই পুজোর ২৫ বছর পূর্তিতে যে নিরঞ্জন শোভাযাত্রা হয়, তাতে ৬২ দল বাদ্যযন্ত্র ছিল। সেবছর না কি প্রসেশনের প্রথম গেট কেশব সেন স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিট হয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট হয়ে আবার কেশব সেন স্ট্রিটে ফিরে আসার পরেও দেখা যায় প্রসেশনের শেষ এখন বের হয়নি, মায়ের গাড়ি এখনও বেরোনো বাকি। যদিও এখন পুলিশের তরফে বিসর্জনের শেষ তারিখ সংক্রান্ত কারণে এই বিশাল প্রসেশন করা আর সম্ভব হয় না।
কলকাতা শহরকে প্রথম চন্দননগরের শ্রীধর ইলেকট্রিকের আলো উপহার দেন এই পূজাকমিটিই। তবে ফাটাকেষ্টর পুজোর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সেলিব্রিটি। ধর্মগুরু সীতারামদাস ওমকারনাথ একবছর ফাটাকেষ্টর কাঁধে চড়ে মণ্ডপে মাতৃদর্শনে এসেছিলেন, আবার হাল আমলে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসাবে পূজার উদ্বোধনে আসেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। মুম্বাই ও বাংলার এমন কোনো সেলিব্রিটি খুঁজে পাওয়া দায় যিনি এই পুজোয় আসেননি। অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্না, আশা ভোঁসলে, রাহুল দেব বর্মন, বাপ্পি লাহিড়ী, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, রানি মুখার্জি, মুনমুন সেন-রা বারবার এসেছেন মাতৃদর্শনে। মহানায়ক উত্তমকুমার মৃত্যুর আগের বছর পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছর এসেছেন প্রতিমা দর্শন করতে। তবে এই সবই কি কালীর টানে? নাকি এর পিছনেও ছিল ফাটাকেষ্টর পাহাড়প্রমাণ প্রতিপত্তি? এর উত্তর একমাত্র মা কালীই জানেন।

ফাটাকেষ্টর প্রতিমা শিল্পী
মুম্বাই কেন্দ্রিক হিন্দি সিনেমায় আন্ডারওয়ার্ল্ড দেখাতে গেলেই আপনাআপনি চলে আসে কোনো ‘ডন’-এর গণেশ পুজোর প্রসঙ্গ। সেটি তাদের সমাজ বাস্তবতা। বাংলার সত্তরের দশকের সমাজ বাস্তবতার নিরিখে ঠিক একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ কালীপুজো, মূলত ফাটাকেষ্টর কালীপুজো। নকশাল আন্দোলন, কংগ্রেস সরকারের উত্থান, মুম্বাইয়ের আর্টিস্ট, পাশের পাড়ার সোমেন মিত্রর কালীপুজোর সঙ্গে রেষারেষি, সবটা নিয়ে এক সময়ের দলিল এই পুজো। কালীক্ষেত্র কলকাতার এক অস্থায়ী শক্তিপীঠ যেন এই সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, যা শক্তিপূজার ক্ষেত্রেও যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ‘পেশী’শক্তি পূজার ক্ষেত্রেও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র : https://youtu.be/h9t0pYNI9Ys?si=HU739lnGJY-_4-3Y