‘কলকাতা’ নামের আড়ালে রয়েছে বাঙালির কালী সাধনার ইতিহাস

কালীঘাট মন্দিরের পুনর্নির্মাণের কাহিনিতে রয়েছে কালীনামের প্রাককথন

কালীক্ষেত্র কলকাতা। কত প্রাচীন মা কালীর নামাঙ্কিত এই জনপদ? নথিবদ্ধ উল্লেখ এবং পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে দুই হাজার বছরেরও বেশি। কলকাতার প্রাচীনতম নগর সভ্যতার চিহ্ন সম্ভবত নাগেরবাজার এর কাছে ক্লাইভ হাউজ। গঙ্গারিডাই যুগে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে চন্দ্রকেতুগড়ে (এই নামটা অবশ্য সেনযুগের; গঙ্গারিডি যুগে নামটা ছিল গঙ্গে) রাজধানী ছিল আর আজকের কলকাতার এই অঞ্চলে ছিল স্যাটেলাইট টাউন। বেথুন কলেজে খননকার্যে ১৯৯৭-৯৮ সাল নাগাদ একাধিক প্রত্নদ্রব্য পাওয়া যায়, গুপ্তযুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত একটানা নগরসভ্যতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। অষ্টম শতকে অর্থাৎ পালযুগে এই বেথুন কলেজ অঞ্চলে নাগরিক সভ্যতা ছিল।

এই কালীক্ষেত্র আইন ই আকবরীর সময়ে কালীকোটা; যা থেকে আজকের কলকাতা। ক্ষেত্র থেকে কোটা হতে পারে; কোট বা দুর্গ থেকেও হতে পারে।

কিন্তু কী নাম ছিল সেদিনের কলকাতার? যখন দুই হাজার বাইশশো বছর আগে সরস্বতী ও আদিগঙ্গায় হাঁসের ডানার মতো শ্বেতশুভ্র পাল তুলে ময়ূরপঙ্খী সপ্তডিঙা নিয়ে বাঙালি বণিকরা যেতেন সিংহল, যবদ্বীপ, মালদ্বীপ, সুবর্ণদ্বীপ, ক্রীট,গ্রীস, রোম, মিশরে বাণিজ্য করতে; গ্রীক রোমান বণিক ও পর্যটকরা গঙ্গে বন্দরে নোঙর ফেলা ভুলে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকতেন সেদিনের গঙ্গে নগরের সিংহদ্বারের সোনার পাত আর হাতির দাঁতের কাজের ওপর রোদের ঝিলমিলের দিকে; সেদিন এই শহরতলির জনপদটি কী নামে পরিচিত ছিল? সে উত্তর আছে টলেমির বিবরণে। সেখানে এই জনপদটির নাম Colygrammam; বাংলা করলে হয় কালীগ্রাম। গঙ্গা সেদিন পাঁচটি ধারায় বিভক্ত হয়ে মোহনায় পড়ত। আজকের মজে যাওয়া আদিগঙ্গা ছিল তাদের একটি। কালীগ্রাম ছিল তার তীরে; বাঙালির উপাস্য মাতৃকার নামের গৌরব বুকে ধরে। 

এই নামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজ থেকে দুই হাজার বছর আগেও আমাদের জাতীয় জীবনে কালীনাম এতটাই প্রাসঙ্গিক ছিল যে রাজধানীর ঠিক পাশেই এক জনপদ ছিল কালীর নামে। কালীঘাটের মায়ের শিলাময়ী মুখাবয়বটি আজও তাম্রাশ্মযুগের শিল্পরীতির নিদর্শন বহন করে। মূর্তির হস্ত সেযুগে পূর্ণাঙ্গ হত না, স্কন্ধ থেকে দুদিকে সামান্য প্রসারিত, অর্থাৎ যাকে বলে schematic হত। সুগোল মুখমণ্ডলের দুদিকে চক্ষুদ্বয় সুবিশাল হত। কলেবর প্রায়ই কোমরে শেষ। যারাই হরপ্পা সভ্যতার টেরাকোটা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, সবাই বুঝতে পারবেন যে আজকের পুরীধামের জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা মূর্তিকল্পনার সঙ্গে আশ্চর্য মিল আছে। স্মর্তব্য, ওই একই রকম টেরাকোটা মূর্তি পাণ্ডু রাজার ঢিবি থেকেও পরেশ দাশগুপ্তের প্রত্নখননে পাওয়া গেছিল। এবং কালীঘাটের কালীর বিগ্রহও এই শৈলীতেই নির্মিত। 

পালযুগে এই স্থান সম্রাট দেবপালের পুত্র যোগীপাল চৌরঙ্গীনাথের সাধনভূমি। কালীঘাট যাওয়ার পথটি আজও তাঁর সমাধির পাশ দিয়েই চৌরঙ্গী রোড নামে এগিয়ে গেছে। সেনযুগে ঢাকেশ্বরী এবং কল্যাণেশ্বরীর মতো কালীঘাটের নবনির্মাণের সাথেও বল্লালসেনের নাম জড়িয়ে আছে। "নৃপতিবর্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠ" বল্লাল তান্ত্রিক ছিলেন; সম্ভবত সহজযানের কুলাচার সাধনা করতেন পদ্মিনীর সাথে। যে কারণে তাঁকে সমকালীন ব্রাহ্মণদের একাংশ প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ বলেছেন। নবদ্বীপের বল্লাল ঢিবি কালীযন্ত্রের আকারে নির্মিত। রামকেলিতে সেযুগের গৌড়েশ্বরী বিগ্রহ মা উগ্রতারার মূর্তি। অন্যদিকে সেনযুগের অনেকগুলি তাম্রশাসন মিলেছে দক্ষিণবঙ্গে; এই অঞ্চল প্রশাসনিক বাণিজ্যিক ও আধ্যাত্মিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কালীক্ষেত্রের বল্লাল সংযোগ তাই একান্তভাবেই স্বাভাবিক। 

এই কালীক্ষেত্র আইন ই আকবরীর সময়ে কালীকোটা; যা থেকে আজকের কলকাতা। ক্ষেত্র থেকে কোটা হতে পারে; কোট বা দুর্গ থেকেও হতে পারে। বঙ্গভূমির বারো ভুঁইয়াদের শিরোমণি মহারাজা প্রতাপাদিত্যের একাধিক দুর্গ ছিল কলকাতায়; শ্যামনগরে, বাগবাজারে। তিনি ছিলেন মা যশোরেশ্বরী কালীর সাধক। তাঁর "যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী"। তাই কালীর নামাঙ্কিত কোট থাকতেই পারে এখানে; বিশেষ করে যখন কালীঘাট মন্দিরের পুনর্নির্মাণের কাহিনীতে তাঁর এবং তাঁর কাকা বসন্ত রায়ের নাম জড়িয়ে আছে। 

বড়ো মধুর এবং বড়ো মন খারাপের গন্ধ মাখানো বাঙালির এই ইতিহাসের সরণী। এখানে গঙ্গারিডির গৌরব আছে; আছে যোগীপালের শেষ শয্যা। বল্লালসেনের নিষ্ঠা আছে; প্রতাপের পরাক্রম আছে। আর আছে কালরূপা মাতৃকার চরণধূলির চিরকালীন সৌরভ। 

 

তথ্য কৃতজ্ঞতা  – গবেষক তমাল দাশগুপ্ত।

Post Tags
Developed by DXDasia