
কালীঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা তীর্থযাত্রীদের আশ্রয়স্থল ছিল এটিই
পালবংশের এক বিখ্যাত যুবরাজের সমাধি। এইটুকু বলে যদি অনুমান করতে দেওয়া হয় সমাধিস্থলটা কোথায় তাহলে শতকরা নিরানব্বই জন বলবেন উত্তরবঙ্গ (North Bengal), বাংলাদেশ (Bangladesh), নিদেনপক্ষে মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) বা হুগলির (Hooghly) নাম। তারপর একটু তথ্য যোগ দিয়ে যদি বলি সেই যুবরাজ চৌরঙ্গীনাথ (Chouranginath) নামে পরিচিত ছিলেন তখন অনেকেরই কপাল কুঁচকে যাবে। কারণ চৌরঙ্গী (Chowringhee) নামটা যে মহানগরীর কেন্দ্রস্থলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সাহিত্যরসিক মাত্রেই শংকরের কালজয়ী উপন্যাসটির কথাও স্মরণ করবেন। কিন্তু তবুও মহানগরীর মধ্যে এরকম কোনো ঐতিহাসিক স্থান সত্যিই আছে কিনা অনেকেই বলতে পারবেন না। অথচ ঐ জায়গাটার চারপাশে অনবরত আবর্তিত হচ্ছে আধুনিক এলিট সংস্কৃতির তরঙ্গমালা। তবুও বড়ো আশ্চর্যজনকভাবে এখানেই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে ঘুমিয়ে আছে প্রাচীন বাঙালির ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়।

রাখাল গোরুদের রক্ষক বলে গোরক্ষনাথ এবং চার অঙ্গ কাটা যায় বলে পালযুবরাজ চৌরঙ্গীনাথ নামে পরিচিত হন।
এবার তাহলে বলে দেওয়া যাক। পাল যুবরাজ চৌরঙ্গীনাথের সমাধি আছে ময়দান (Maidan) থানার ঠিক পিছনে; এক্সাইড মোড়ের (Exide More) একদম কাছে; নন্দনের (Nandan) পাশেই। কিন্তু নাথ শব্দটি তো সন্ন্যাসীদের নামে দেখা যেত। যুবরাজের এমন নাম কেন? এ কথার উত্তর আছে চুরাশি সিদ্ধের কাহিনিতে। গুপ্তোত্তরযুগ থেকে সেনযুগ পর্যন্ত বাংলায় সহজযানের যে ধারা বিদ্যমান ছিল তার প্রধান কর্ণধার ছিলেন চুরাশিজন সহজযানী মহাসিদ্ধ। মহীপালের সময় সিদ্ধাচার্য নারোপা ও নিগুডাকিনীর মাধ্যমে সহজ আন্দোলন গৌরবের চরম শিখরে পৌঁছালেও এই ধারাটি পালযুগের প্রথমার্ধেও বিদ্যমান ছিল। সেই ধারাতেই আছেন চৌরঙ্গীনাথ। ইতিহাস জানায় দেবপালের এই পুত্র প্রাসাদের রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন। তাঁর চার হাত-পা কাটা গিয়েছিল রাজরোষে। মৃতপ্রায় অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করেন সহজযানী যোগী অচিন্ত্য। তাঁর আরেক শিষ্য এক রাখালের সহায়তায় চার অঙ্গ কাটা যুবরাজকে তিনি বাঁচিয়ে তোলেন এবং সহজ সাধনায় দীক্ষিত করেন। সেই রাখাল গোরুদের রক্ষক বলে গোরক্ষনাথ এবং চার অঙ্গ কাটা যায় বলে পালযুবরাজ চৌরঙ্গীনাথ নামে পরিচিত হন। চৌরঙ্গ দ্রুত সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। কাহিনি অনুযায়ী তাঁর দেহও আগের মতো পূর্ণতা পায়। নাথপন্থার কিছু গ্রন্থ দেখলে বোঝা যায় এই সময় নাথদের একাংশ মাতৃকা উপাসনার বিরোধ করেছিল। দেবপালের সময় চৌরঙ্গ এবং ঘন্টাপার কাহিনিতে সম্ভবত তারই আভাস মেলে।
যদিও চৌরঙ্গ এরপর মাতৃপূজক সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। পালযুগের শেষার্ধ থেকে সেনযুগ ও মধ্যযুগে (Medieval) নাথ সাধকরা তন্ত্রের কৌল পরম্পরার প্রধান ধারক হয়ে ওঠেন। মাতৃসাধনার সঙ্গে নাথযোগীদের এই সংযুক্তির যে গৌরবময় পরম্পরা শুরু হয়েছিল; মীননাথ, হরিনাথ, কূর্ম্মনাথের মতো চৌরঙ্গীনাথকেও তার আদি পূর্বসূরিদের মধ্যে গণ্য করা চলে।

তিনি রাজসুখ ছেড়ে যোগী হয়েছিলেন বলে লোকমুখে যোগীপাল নামে পরিচিত ছিলেন। বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতে বলা আছে:
“যোগীপাল ভোগীপাল মহীপালের গীত
ইহা শুনিবারে সর্বলোক আনন্দিত”
অর্থাৎ পালযুগের সুদীর্ঘ ছয়শো বছর পরে ষোড়শ শতকেও যোগীপালের জনপ্রিয়তা কিংবদন্তি পর্যায়ের ছিল। গোয়ার কোঙ্কন উপকূলে যখন পালযুগের বাঙালিদের একাংশ জনৈক পরশুরাম নামক যোদ্ধার নেতৃত্বে পরিযান করেছিল; তখন যোগীপালের স্মৃতিও বয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আজও গোয়ার কোঙ্কনীদের অষ্টভুজা মহিষমর্দিনী, শান্তদুর্গা শান্তেরি দেবীর পাশাপাশি চৌরঙ্গীনাথের প্রাচীন মন্দির তার প্রমাণ দিচ্ছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সহজিয়া ও নাথযোগীদের মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন বাংলার এই রাজপুত্র।

কালীঘাট পীঠের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। কালীক্ষেত্রে আসার সুপ্রাচীন পথটির ধারেই ছিল তাঁর সাধনক্ষেত্র; আজকের চৌরঙ্গী। শোনা যায় কালীঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা তীর্থযাত্রীদের তিনি আশ্রয় দিতেন এখানে। এখানেই মৃত্যুর পর তাঁর সমাধির উপর একটি শিবমন্দির নির্মিত হয়েছে।
গতানুগতিক মহানাগরিক জীবনের মাঝে বাঙালির সুপ্রাচীন অতীতকে ছুঁতে যদি সাধ জাগে; তবে নন্দনের পথেই এই মন্দির দেখে আসতে পারেন যেকোনো দিন। যদিও মন্দিরটিতে বর্তমানে অবাঙালি প্রভাব স্পষ্ট। কারণ শিকড়বিচ্ছিন্নতার কারণে ইতিহাসবিস্মৃত বাঙালি দীর্ঘদিন মনোযোগ দেয়নি এই ঐতিহ্যের প্রতি। সামনের রাস্তাটার চৌরঙ্গী রোড নামটাও পর্যন্ত হারাতে বসেছি আমরা। তবু এখনও সময় আছে। চাইলেই ঘর থেকে দুই পা ফেলে গৌরবোজ্জ্বল পালযুগের একটা অলিন্দ দিয়ে উঁকি মারা যায় এখনও।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
এই মন্দিরের অবস্থান এবং চৌরঙ্গীনাথ বিষয়ক যাবতীয় তথ্যের জন্য গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়, ভ্রাতৃপ্রতীম আকাশ নীল বিশ্বাস এবং বাঙালির ইতিহাস ফেসবুক গ্রুপের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। তথ্য পেয়েছি গবেষক অলকা চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদিত “চুরাশি সিদ্ধের কাহিনি” বইটি থেকেও।
ছবি – প্রতিবেদক
