
সস্তা কাগজ, সস্তা দর আর সস্তা ছাপার কালচার যেন লন্ডনের স্ট্রিট লিটারেচারের দোসর হয়ে উঠল
উনিশ শতকের অন্দর মহল্লায় তখন নতুন চর্চা। চর্চার নাম ‘ছেলে হওয়া’। না কোনও পোয়াতির প্রসব বাক্যের গল্প নয়। এ হল মেয়েদের ‘ছেলে’ হয়ে ওঠার গল্প। এ দিকে আড়পুলি লেনের চ্যাটার্জি বাড়ির মেয়েটা নাকি আবার একটা ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে। দারোয়ানের চোখে ন্যাবা। বুঝতেই পারলে না মালতীলতা ছেলে সেজেই পাইলে গেলো। দেখাদেখি শুরু হল নয়া চল। ‘ছোরা সেজে চলে গেল ছোরা সঙ্গে নিয়ে’- বটতলার কবিরা গান বাঁধলে। বাপ মায়ের চোখের ঘুম গেল উবে। এমন দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটল কীভাবে। কথায় কথায় জানা গেল এমন বুদ্ধির আমদানি হয়েছে লন্ডন থেকে। সেখানের সব রোমহর্ষক কাহিনির সস্তা চালের ভাবানুবাদে ছেয়ে গিয়েছে কলকাতার চার সীমানা নগরতলী। ধর্মপুস্তক, ইতিহাস, জীবনী, নাটক, প্রহসনের সঙ্গে বটতলা বাজারে নতুন আমদানি রহস্য রোমাঞ্চ আর আদি-রসাত্মক কাহিনি। যার ইংরেজি কেতাবে পরিচয় হল ‘সেক্স স্ক্যান্ডাল’। অন্যদিকে রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনির ছত্রে ছত্রে খুনোখুনি, পরকীয়া আর জীবন উপভোগের হাতছানি দেওয়া সব দিক নির্দেশ। এসব যখন ভদ্দর বাড়ির অন্দরে ঢুকছে, তখন মেয়েলি অন্দরে ঝড় তুফান। বঙ্কিম চাটুজ্জের দিশি উপন্যাস দেবী চৌধুরানী এই আগুনে চর্চায় ঘি ঢেলে দিল।
শহর কলকাতার কালো পাড়ার বটতলা তখন নয়া লন্ডন। সস্তা কাগজ, সস্তা দর আর সস্তা ছাপার কালচার যেন লন্ডনের স্ট্রিট লিটারেচারের দোসর হয়ে উঠল। লন্ডনের ফিরিওয়ালারা যেমন স্ট্রিট লিটারেচারের বিক্রেতা এ বঙ্গেও তাই। লন্ডনের ‘Running Stationers’ বা ‘Running Patters’ রাই এ বঙ্গে ফিরিওয়ালার তকমাধারি। যারা জাদুকরের মতো বলে যায় বইয়ের গল্পের আড়ালে থাকা রসালো ও রোমাঞ্চকর অংশগুলিকে। মাথায় ঝুড়ি নিয়ে হাটে বই বেচে খায় এরা। উসখুসে ছোটো গিন্নি, বাড়ির ন-বউদিরা আঁচলের খুঁট থেকে পয়সা বার করে দেয় বাড়ির চাকরের হাতে। গোপন রাস্তায় বটতলার বীজ ঢোকে ‘ভদ্রলোক’ বাড়ির অন্দরে। শুরু হয় নারী মুক্তির নতুন যুগ। ভালো না খারাপ সে তর্ক বহুদূর। আপাতত ‘ড্রাগন’ সিরিজের, সচিত্র রতিশাস্ত্রের, সেনাপতির বা হরিদাসের গুপ্তকথায় অন্দরবাসিনী মশগুল হল। আর ভেঁপু বাজির ফিরিওয়ালার বিক্রি বেড়ে চলল রম রম করে। আজও সেই বটতলা আছে। আছে চিৎপুর।
সে সব ছাপাখানা লাটে উঠেছে কবেই। লেটার প্রেসের ‘ক্লিক্যাটি ক্ল্যাক’ শব্দটি আজ আর কানে আসার জো নেই। তবু তারই মাঝে সে সব দিনের এক চিলতে সাক্ষী বহন করে চিৎপুরের ট্রামলাইনের ওপর ‘ডায়মন্ড লাইব্রেরি’। যদিও আজ সে ইতিহাস।
বঙ্গাব্দের ১২৮৪ সনে স্থাপিত দোকানের সবক’টি শো কেসে এ দিকে সে দিকে উঁকি দিত গৃহস্থ গ্রন্থাবলী-র কিছু কাঠ খোদাই সংখ্যা। কানাইলাল শীলের সে সব গো-পালন বিষয়ক বইও আজ দুর্লভ। এই বইগুলি মনে করায় যে কলকাতার অনেকটাই তখনও গ্রামীণ চেহারা চরিত্র নিয়েই থমকে আছে। একই কথা মনে করায় লক্ষ্মী সরস্বতীর দ্বন্দ্ব নামের বইগুলিও। তাছাড়া যাত্রাপালার বই তো আছেই।
অন্যদিকে ফিরিঙ্গি বণিক দেশের রাজা। তাই দোকানের নাম ডায়মন্ড লাইব্রেরি দেখেই বোঝা যায় ইংরেজি চর্চার প্রলেপ। আজ যখন ‘বটতলা’ একটি আন্তর্জাতিক বিষয় হয়ে উঠেছে তখন কিন্তু তার এক টুকরো ‘ডায়মন্ড’ আজও ঝিলিক দেয় চিৎপুরের রাস্তায়। বলে রাখি এরাই ড্রাগন সিরিজের প্রবক্তা। আজও স্মৃতি কথার ঝুলি নিয়ে বসে আছেন রমেশ চন্দ্র শীল ও বৈদ্যনাথ শীল। আক্ষেপের বিষয়, ওদের পর আর কেউ এল না এই বাণিজ্যে।
