চিৎপুরের ‘সুশীলা সুন্দরী’ অথবা হেমেন্দ্রনাথের ‘সিক্তবসনা সুন্দরী’ – কলকাতার নিজস্ব ভেনাস

বনেদি বাড়ির অন্তঃপুরবাসিনীরা চুপিচুপি কথা বলত আভরণহীন ভেনাসের সঙ্গে

সাইপ্রাস সমুদ্রে যার জন্ম, যার সঙ্গে মিলে গেছে গ্রিক পুরাণের আফ্রোদিতির রূপকল্পনা, সেই ভেনাসের অজস্র মূর্তি ইউরোপ থেকে জাহাজে চেপে পাড়ি দিয়েছিল কলকাতায়। নেমেছিল খিদিরপুর ডকে। এমনকী, কস দ্বীপের জন্য যে স্নাইডিয়ান ভেনাস তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অশ্লীলতার দায়ে যাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়, সেই স্নাইডিয়ান ভেনাসের মূর্তিও নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছিল কলকাতায়। কলকাতা তখন পাশ্চাত্যের হাওয়ায় দুলছে।

পশ্চিমী ধাঁচে বাঙালি বনেদি বাড়িগুলোর ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে বদল এসেছিল আমূল। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরকৃত ‘ট্যাগোর ক্যাসেল’; যা বানানো হয়েছিল বিলেতের হাইল্যান্ড ক্যাসেলের ধাঁচে। তারপর পাথুরিয়াঘাটার মল্লিক পরিবার, জোড়াসাঁকোর রায়-পরিবারের মতো বনেদি বাড়িগুলি রীতিমত ক্যাটালগ দেখে ইউরোপের ভাস্করদের কাছে পাঠাতেন অর্ডার। ভাস্কররাও তাঁদের চাহিদামতো মূর্তি তৈরি করে পাঠিয়ে দিতেন কলকাতায়। একের পর এক সংগৃহীত হত অমূল্য সব মূর্তি। আর এভাবেই কলকাতার মিশ্র স্থাপত্যের অনেকখানি জায়গা করে নেয় ইউরোপীয় ভাস্কর্য। এখনও শহর পথে হাঁটতে হাঁটতে কোনও বনেদি বাড়ির জং ধরা গেটের ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, আগাছাময় বাগানের মাঝখানে আবক্ষ উন্মুক্ত শ্বেতপাথরের নারী মূর্তি—ভেনাসকে।

অনেক বনেদি বাড়িতেই ভেনাস-মূর্তি রাখা হত বাইরের মহলের ঘরে। বনেদি বাড়ির অন্দরমহলের মেয়েরা সেই ঘরগুলিকে বলতেন, ‘সোনা রুপোর ঘর’। শুধু যে ভেনাসের নগ্ন বা অর্ধনগ্ন মূর্তি থাকত সে ঘরে, তা নয়। সোনার ‘গিল্টি’ করা, অলংকৃত বড়ো বড়ো ফ্রেমের ছবি সেই ঘরের দেওয়াল আলো করে থাকত। থাকত অ্যাপেলো, কিউপিড, ভাইকিং ও আরও নানা ধরনের মূর্তি। বোহেমিয়ান কাট গ্লাস বা ত্রিশিরা কাচের ঘাড়লণ্ঠন ও টেবিল ল্যাম্পও আসত ইউরোপ থেকে। এলাহি ব্যাপার যাকে বলে। রক্ষণশীল বাড়ির অন্দরমহল থেকে বাহিরমহলে আসার অনুমতি পেতেন না মেয়েরা। দাস-দাসীর মুখে তাঁরা সোনা-রুপোর ঘরের খবর পেতেন। কখনও আবার স্বামীকে জিজ্ঞেস করতেন। ভেনাসের ঘরে প্রবেশের অনুমতি ছিল না বলেই হয়তো সে ঘরের প্রতি তাঁদের কৌতুহল ছিল অসীম। আর সেকারণেই স্বামী বা গৃহকর্তার অগোচরে নিঃশব্দে একসময় সোনা-রুপোর ঘরে ঢুকে পড়তেন তাঁরা। ভেনাসের কাছে গিয়ে কী দেখতেন তাঁরা?

শুধু কালীঘাটের পট নয়, ভেনাস প্রসঙ্গে অনীবার্যভাবে মনে পড়ে চিৎপুরের রঙিন লিথোগ্রাফ ‘সুশীলা সুন্দরী’ বা শিল্পী হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের ‘সিক্তবসনা সুন্দরী’র কথা। তারাও হয়তো এরকমই এক ভেনাস।

তাঁরা কী দেখতেন বা ভাবতেন তা স্পষ্ট করে বলা না গেলেও, অনুমান করাই যায়, হয়তো তাঁরা পাশ্চাত্যের উন্মুক্ত চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্বমূলক শিল্পকর্ম দেখে মুগ্ধ হতেন, অথবা তাঁর অবচেতন মনে সেভাবেই কল্পনা করতেন নিজেদের। হয়তো সংস্কারের খোলস ছেড়ে নিজের পূর্ণ সত্তা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার, অথবা মুক্তির তাগিদ অনুভব করতেন তাঁরা। হতেও পারে বনেদি বাড়ির অন্তঃপুরবাসিনীদের জন্য ভেনাস হয়তো এই কাজটিই করে গেছে চুপিচুপি!

তবে, কলকাতার শিল্পীদেরও ছিল নিজস্ব ভেনাস। না, ভেনাস মূর্তির সঙ্গে সরাসরি কোনও মিল ছিল না সেসব শিল্পকর্মের। অষ্টাদশ শতকের কালীঘাটের পটের সঙ্গে উনিশ শতকের কালীঘাটের পটের বিষয়বস্তুর অনেক পার্থক্য ছিল। উনিশ শতকে পৌঁছে কালীঘাটের কিছু পটেও যে সনাতন দেবদেবী থেকে শুরু করে চিংড়ি মাছ বা পূর্বপ্রচলিত নকশা ছাড়াও তৎকালীন কলকাতার ওপরতলার সমাজের ছবিটি প্রাধান্য পাচ্ছিল, স্বল্পবসনা রমণীদের দেখা যাচ্ছিল নানা ভঙ্গিতে, তার পিছনে কলকাতায় আগত ইউরোপীয়দের পরোক্ষ প্রভাব থাকলেও থাকতে পারে। স্ত্রৈণ স্বামী, গোলাপসুন্দরী, কেশপ্রসাধনরতা রমণী, পতিতার পদতলে বাঙালি বাবু এবং এ ধরনের আরও নানা পটের অনুপ্রেরণা কালীঘাটের পটুয়ারা কোথা থেকে পেয়েছিলেন বুঝতে অসুবিধা হয় না।

জল রঙে ওয়াশ পদ্ধতি যে কালীঘাটের পটুয়ারা সাহেবদের থেকেই শিখেছিলেন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত নেই। কিন্তু কলকাতার ধনীদের বাড়িগুলিতে যে পাশ্চাত্য সভ্যতার হাওয়া বইছিল সেটাই পটুয়াদের অনুপ্রাণিত করেছিল স্বল্পবসনা রমণীদের পট আঁকার ক্ষেত্রে। গরিব, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে বড়োলোকদের জীবনযাত্রার কোনও মিল ছিল না। প্রগতীশীল, পাশ্চাত্যভাবাপন্ন বড়োলোকের বাড়ির সোনা-রুপোর ঘরের কিংবা বাগানের ভেনাসই অন্য চেহারা নিয়ে দেখা দিয়েছিল কালীঘাটের পটে। কালীঘাটের পটের বিবিরা যদিও স্বাস্থ্যবতী ছিল, ভেনাসের রূপ ও ভঙ্গির সঙ্গে তাদের মিল খোঁজার চেষ্টা নিরর্থক। কিন্তু দেশজ এমন এক আবহাওয়ায় পটুয়ারা ওই পটগুলি এঁকেছিলেন যেখানে ভেনাস নিজস্ব অধিকারে স্থায়ী একটা জায়গা করে নিয়েছিল ধনীদের জীবনে। সাধারণ মানুষ যে কলকাতার ধনীদের জীবনযাত্রাকে তির্যক দৃষ্টিতে দেখতেন তার একটা বড় প্রমাণ জেলেপাড়ার সঙের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন ও শ্রদ্ধানিবেদন করতে গিয়ে বাংলা ১৩৩১ সালের চৈত্র সংক্রান্তির দিন যে সঙ রচনা করা হয় তাতে ছিল এই ব্যঙ্গ:

এখন বাংলা চষেন/ বাবু বিবি তোষেণ,/ নারীর লজ্জা নাশেন,/ সুইডেনের ইবসেন/ কুলের কথা ছাপিয়ে।/ পশ্চিমের আর্ট এলো পুবে,/ (গেল) বুদ্ধির ডোবায় শুদ্ধি ডুবে,/ নিষ্ঠার তেষ্টা গেল উবে,/ ডুবে জল-খাওয়া আর্ট/ উঠলো হার্ট ছাপিয়ে।…

কালীঘাটের পটের বিবিরা যদিও স্বাস্থ্যবতী ছিল, ভেনাসের রূপ ও ভঙ্গির সঙ্গে তাদের মিল খোঁজার চেষ্টা নিরর্থক। কিন্তু দেশজ এমন এক আবহাওয়ায় পটুয়ারা ওই পটগুলি এঁকেছিলেন যেখানে ভেনাস নিজস্ব অধিকারে স্থায়ী একটা জায়গা করে নিয়েছিল ধনীদের জীবনে।

এরকম ঠাট্টা-তামাশা তো হামেশাই চলে, এ নিয়ে আর কথা বাড়াবো না। যা বলছিলাম… শুধু কালীঘাটের পট নয়, ভেনাস প্রসঙ্গে অনীবার্যভাবে মনে পড়ে চিৎপুরের রঙিন লিথোগ্রাফ ‘সুশীলা সুন্দরী’ বা শিল্পী হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের ‘সিক্তবসনা সুন্দরী’র কথা। তারাও হয়তো এরকমই এক ভেনাস। সারা দেশ জুড়ে যখন দেশীয় রীতি ও উপকরণে ছবি আঁকার আন্দোলন দানা বাঁধছে, চলছে স্বদেশিকতার পালা, তখন হেমেন্দ্রনাথ ইউরোপীয় পদ্ধতিতে এঁকেছেন একের পর এক সুন্দরীদের ছবি। ১৯৩০ সালেই তাঁর সদ্যস্নাতা রমণীর একটি ছবি দু’ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল। শ্রদ্ধাভরে সেই ছবি কিনেছিলেন বিকানিরের রাজা গঙ্গা সিংহ। ভারতীয় চিত্র শিরোনামের নিবন্ধে হেমেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “প্রাচীন চিত্র বা মূর্তি দেখিলে তাহাতে ‘ভারতীয় পদ্ধতি’ বলিয়া সনাতন কোনো লক্ষণ বা প্রকাশভঙ্গি ছিল না…।” এরপর ভারতীয় কলা নিবন্ধে লিখেছেন, “সর্বাপেক্ষা মিথ্যা ও হাস্যকর ব্যাপার—এই ‘ভারতীয় পদ্ধতি’ শব্দটি। যিনি সর্বপ্রথম এই শব্দটি উচ্চারণ করিয়াছিলেন, তাঁহার মধ্যে সৎবুদ্ধির একান্ত অভাব ছিল। আরো আশ্চর্যের বিষয় এমন অসার কথা দেশের গাত্রে বিলক্ষণ দাগ কাটিয়াছে।”

এখানে এখন বর্ষা… হেমেনবাবুর ‘সিক্তবসনা’দের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যখন, উল্লেখ করবো তাঁর ‘বর্ষা’ ছবিটির কথা। মিয়াঁ-কি-মালহার শুনে বৃষ্টি না নামলেও যেমন তার আমেজ পাওয়া যায়, ‘বর্ষা’ ছবিটি দেখলেও তা-ই হয়।  

বর্ষা, হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার। অ্যান ইলাস্ট্রেটেড জার্নাল অফ ফাইন আর্টস, ১৯২৯

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর ছবির স্ত্রী-দেহের ভেজা কাপড়ের পরতে পরতে যে লাবণ্য ফুটে ওঠে তার আকর রয়েছে বাংলার পল্লিযাপনে। হেমেনের ছবিতে ঠাঁই পেয়েছে মূলত পূর্ণবয়স্ক মহিলারাই। এসব ছবির জন্য ‘মডেল’ নিতেন না তিনি খুব একটা। অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করতেন ফটোগ্রাফ। বেশিরভাগ সময়ই মডেল হয়েছেন তাঁর স্ত্রী সুধারাণী। হেমেনবাবুর আঁকা ‘পরিণতি’, ‘উর্বশী’ কিংবা ‘পরিত্যক্তা’ ছবিতে নারীর যে রূপ ও সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছে, তার সঙ্গে ভেনাসের তুলনা করা যেতেই পারে। তারা কেউ গাঁয়ের বধু, কেউ বঙ্কিমচন্দ্রের রোহিণী, কেউ বর্ষাকালে পুকুরঘাটে স্নানরতা, কেউ আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপে মগ্ন। হেমেন্দ্রনাথ তাঁর ভেনাসকে আবিষ্কার করেছিলেন বাংলার নারীদের মধ্যে।

________________

তথ্যসূত্র: বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি, প্রকাশনা আনন্দ এবং বঙ্গদর্শন.কম আর্কাইভ

Developed by DXDasia