‘খোকা’ তখন এবং এখন – কলকাতার কুখ্যাত ‘পাগলা মার্ডার কেস’

“মালিককে গিয়ে বল খোকা এসেছে”

“মালিককে গিয়ে বল খোকা এসেছে”, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘দ্বিতীয় পুরুষ’ মুক্তি পাওয়ার পর জনপ্রিয় সংলাপ হিসেবে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে পাকাপাকি জায়গা করে নেয় এই লাইনটি। খোকা একজন কুখ্যাত বিকারগ্রস্ত খুনি, যার নাম শুনে মানুষ আতঙ্কে কাঁপে। ‘দ্বিতীয় পুরুষ’-এর একেবারে শুরু থেকেই দেখানো হয় শহরে একের পর এক নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে চলেছে। খুনের চরিত্র বিচার করে পুলিশ অনুমান করে, সবগুলো খুনের নেপথ্যে রয়েছে খোকা। কিন্তু শেষে দর্শকদের কাছে পরিষ্কার হয়, পুরো বিষয়টার পিছনে রয়েছে একটি রহস্যময় প্রেমের গল্প। যাকে খোকা ভাবা হয়েছিল, সে আসলে অন্য কেউ। খোকার নাম ভাঙিয়ে, খোকার কায়দায় খুন করছিল সে, এবং ‘আসল’ খোকার হাতেই খুন হতে হয় তাকে।

অনেককাল আগে থেকেই ‘খোকা’ ডাকনামটির প্রচলন রয়েছে বাংলায়। বোঝাই যাচ্ছে, এই খোকা আর সিনেমার খোকা এক নয়, তবে সিনেমার সেই ‘সাইকিক খুনি’ খোকা কিন্তু বাস্তবেও ছিল। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নির্দয়ভাবে খুন করে সেও। ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে যায়। সুগন্ধির প্রতি বিশেষ টান ছিল তার। তবে বাস্তবের এই খোকা ধরা পড়েছিল পুলিশের হাতে। শুধু তাই নয়, তার ধুরন্ধর কর্মকাণ্ড ছিল সিনেমার থ্রিলারকে লজ্জায় ফেলার মতোই।

এই চরিত্রটির খোঁজ পাওয়া যায় তিরিশের দশকের কলকাতায়। প্রথমে চোর, তারপর ডাকাত, এবং শেষে বিকৃতমনস্ক খুনি হয়ে ওঠে সে। তবে ‘খোকা’ নয়, ‘খ্যাঁদা’ (পুলিশের রেকর্ডে এই নামই রয়েছে) নামেই এলাকার ত্রাস হয়ে উঠেছিল সে। পুলিশের কাছে খ্যাঁদা ছিল ‘বহিষ্কৃত গুন্ডা’, অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য কলকাতায় যার বিরুদ্ধে আইনত ফতোয়া জারি হয়েছিল। শহরের ত্রিসীমানায় সে আর সক্রিয় নয়, অন্তত পুলিশ তাই ভেবেছিল।

আর এইসবেরই প্রতিফলন ‘পাগলা মার্ডার কেস’। এই খুনের মামলাটির বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যেতে পারে ‘কলকাতা পুলিশ জার্নাল’ (১৯৩৯)-এর প্রথম খণ্ডের প্রথম এডিশনে। লিখেছিলেন এই মামলার অন্যতম তদন্তকারী কর্মকর্তা পি এন ঘোষাল। খোকাকে দেওঘর থেকে কীভাবে গ্রেফতার করেছিল কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ, তার দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর বর্ণনা পাওয়া যায় পি এন ঘোষাল লিখিত এই কাহিনিতে। প্রথম অনুচ্ছেদেই বেশ গর্বের সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, “মাননীয় বিচারক খোন্দকর মামলাটি পর্যবেক্ষণ করে সন্তুষ্ট হয়েছেন – ‘এটা পুলিশি তদন্তের জয়’।” 

১৯৩৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রকাশ্যে আসে পাগলা খুনের মামলা, যখন কলকাতা কর্পোরেশনের এক তত্ত্বাবধায়ক শ্যামপুকুর থানায় এসে বলেন যে, তাঁর একজন কর্মী শোভাবাজার হাটখোলার বলরাম মজুমদার স্ট্রিটের পাশের একটি নালায় একটি মাথাকাটা লাশ খুঁজে পেয়েছে। ইন্সপেক্টর এস কে রায়কে নিয়ে ঘোষাল ছোটেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে। এবং সেখানে গিয়ে যা দেখেন, তাতে রীতিমত ধাক্কা খান এই দুই দুঁদে পুলিশ আধিকারিকও। মুণ্ডহীন একটি মৃতদেহ, যার তলপেটে ছুরির দুটি গভীর ক্ষত, এবং দু’পায়ের বেশ কিছু শিরা কাটা।

মৃতদেহের মাথাটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি, যদিও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণী অনুযায়ী পুলিশ বিশ্বাস করে নেয় যে সেটি হুগলি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, মৃতদেহে বিভিন্ন চিহ্ন থেকে শনাক্ত করা গিয়েছিল যে মৃতের নাম অতুল ওরফে ‘পাগলা’। অদ্ভুতভাবে, সনাক্তকারীদের অন্যতম ছিলেন মলিনা নাম্নি এক অখ্যাত অভিনেত্রী, হত্যার প্রায় একবছর আগে থেকে যিনি খোকার উপপত্নী ছিলেন। মলিনা খুব কাছ থেকেই চিনতেন পাগলাকে। মলিনা আর পাগলার মধ্যে কোনো রোম্যান্টিক সম্পর্ক ছিল কিনা সে বিষয়টা পরিষ্কার ছিল না, কিন্তু তাদের দুজনকে যে সন্দেহ করত খোকা, এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

খোকার মানসিক উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পাগলাকে ছুরি দিয়ে কোপানোর পর ঘটনাস্থল থেকে সে চলে গিয়ে ফের আধঘন্টা পর ফিরে আসে তার দেহ থেকে মাথা কেটে ফেলার জন্য। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল, শিরচ্ছেদ করার সময় পর্যন্তও জীবিত ছিল পাগলা। এবং আরও ভয়াবহ ঘটনা হল, খোকা দাবি করে যে পাগলার ধড় থেকে মাথা আলাদা করে নদীতে ফেলে দেওয়ার আগে, সেই কাটা মাথা নিয়ে সে মলিনার বাড়ি যায় এটা দেখাতে যে, তার সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা করবে তার পরিণাম কী হতে পারে। এইসব কারণেই ‘খোকা গুন্ডা’র বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার লোক খুঁজে পেতে তদন্তকারীদের নাজেহাল হতে হয়।খোকাকে গ্রেফতারের পিছনে পুলিশের কঠিন পরিশ্রমের কাহিনির ভিতরে না ঢুকলেও এটুকু বলা উচিত যে ঘোষালের মতে খোকা ছিল ‘সহজাত অপরাধী’। পাগলা খুনের মামলা মানুষের স্মৃতিতে বহুদিন তাজা ছিল, এবং এই শহরের, বিশেষত উত্তর কলকাতার, সবচেয়ে আলোচিত খুনের ঘটনা হয়ে ওঠে। ঘোষালের বর্ণনা থেকে এটাও স্পষ্ট যে, মহিলাদের, বিশেষত যৌনকর্মী এবং প্রান্তিক গোষ্ঠী, যারা পুলিশের হাতে প্রতিনিয়ত নিপীড়িত, তাদের প্রতি সহমর্মিতা ছিল খোকার। মলিনার প্রতি খোকার ভালোবাসা এমন ছিল যে, পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানোর সময়ও মলিনার সঙ্গে দেখা করতে যায় সে। ওদিকে খোকার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়া সত্ত্বেও তার প্রতি মলিনার মনের টান কমেনি।

খোকার জীবনের শেষ দিন ছিল ১৯৩৭ সালের ৩১ জুলাই। সেদিন সকালে ফাঁসিতে ঝোলার আগে তার শেষ ইচ্ছে হিসেবে একটি সুগন্ধির শিশি আর পছন্দের ফুল আনায় সে এবং সেগুলো নিয়েই হাসতে হাসতে অপেক্ষারত ফাঁসুড়ের কাছে যায়। ঘোষাল লিখেছিলেন, “এইভাবে উত্তর কলকাতার নাগরিকরা একটি জীবন্ত সন্ত্রাসের হাত থেকে মুক্তি পান।”

ঘোষাল এবং কলকাতার তৎকালীন সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধীর একটি কথোপকথন দিয়ে এই লেখা শেষ করব। ঘোষাল তাকে জিজ্ঞেস করেন, “ঈশ্বরকে ভয় পাও না তুমি?” “আপনি যখন একটা ইঁদুর মারেন তখন কি ঈশ্বরের কথা চিন্তা করেন?” পাল্টা জবাব দিয়েছিল খোকা। পরিশেষে, যখন ঘোষাল চলে যাচ্ছেন, খোকা তাঁকে উদ্দেশ করে বলে, “একটা চোর নিজেকে হারিয়ে ফেলে যখন সে কোনও মেয়ের প্রেমে পড়ে, আর একটা মেয়েও নিজেকে হারিয়ে ফেলে যখন সে বিশ্বাস করে ফেলে একটা চোরকে।”

Developed by DXDasia