
তোশিকোর সমাধির উপরেই রাসবিহারী বসুর সমাধি তৈরি হয়েছিল
বাবা আইজো সোমা, মা কোকো সোমা। আর তাঁদের বড়ো কন্যা সন্তানটির নাম তোশিকো। তৎকালীন জাপানের বিখ্যাত ‘নাকামুরায়া’ বেকারি স্টোরের মালিক। টোকিওর এলিট লোকজন এখানে ভিড় করেন প্রতিদিন। কিন্তু এ তো টোকিওর কথা। এর সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক তো থাকার কথা নয়। তাও আবার বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামীর সম্পর্ক! রূপকথার মতো শোনালেও সত্যি সব ঘটনা আমরা পেরিয়ে এসেছি। টোকিওর ওই তরুণী কন্যা তোশিকো খুব চিন্তিত। চারদিকে চাপা আতঙ্ক। বাবা-মা এমনকি দোকানের প্রতিটি কর্মচারী ভীত। কারণ? দেড় মাসের বেশি সময় ধরে এখানেই আত্মগোপন করে আছেন এক বাঙালি বিপ্লবী। পুলিশ ওৎ পেতে আছে। একবার ধরা পড়লেই খেল খতম। প্রাণ যেতে পারে জাপানি পরিবারেরও। রাজনীতির টানাপোড়েন আর বিপ্লবের টানে মিলিত হওয়া তরুণ বাঙালি বিপ্লবীর সঙ্গে মিলিত হওয়া সিঞ্জিকু শহরের কুড়ি বছর বয়সী তরুণীর ভাগ্য এভাবেই একদিন পাল্টে গেল।
আশ্রিত বিপ্লবীর নাম রাসবিহারী বসু। দুই চোখ ভীষণ দৃপ্ত, গভীর। মাঝেমাঝে চোখে চোখ পড়ে যায় তোশিকোর। শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে ওঠে। কারণ জাপানিরা স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ। রাসবিহারী তিন মাস জাহাজে ভেসে জাপান এসে পৌঁছেছেন ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়ে। স্বাধীনতার লড়াইয়ে জিততে চান। তাই তোশিকোর শ্রদ্ধা বাড়ছে দিনদিন।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রাসবিহারী বসু ও অন্যান্যরা
প্রচলিত আছে রাসবিহারী নাকি রবীন্দ্রনাথের আত্মীয় বলে নিজেকে গোপন করেছিলেন। ১৯১৫ সালে ‘প্রিয়নাথ ঠাকুর’ নামে পাসপোর্ট জোগাড় করে ছদ্মবেশে চলে গেলেন জাপান। হাতে টাকা নেই, চারপাশে বন্ধু নেই, পেটে প্রবল খিদে। যদিও টোকিওতে পরিচয় হল তরুণ চিনা বিপ্লবী সান ইয়াৎ সেনের সঙ্গে। কিন্তু ব্রিটিশরা খবর পেয়ে গেল। আশ্রয় দিতে রাজি হলেন বেকারি মালিক আইজো ও কোকো সোমা। অল্পদিনের মধ্যেই রাসবিহারী হয়ে উঠলেন তাঁদের ঘরের ছেলে। রাসবিহারী কি ওঁদের বাবা-মা বলেই ডাকতেন?
তোশিকোর মা কোকো সোমা লিখতে ভালোবাসতেন। নিজের আত্মজীবনীমূলক বইয়ে লিখেছেন, “মাস চারেক পর রাসবিহারীর উপর থেকে নির্বাসনদণ্ড উঠে গেল। ১৯১৬-র এপ্রিলের এক সকালে আমার ঘরে বিদায় জানাতে এলেন। তখন আমি শয্যাশায়ী। শরীর ও মনে ধ্বস্ত। রাসবিহারীকে লুকিয়ে রাখতে গিয়ে যে প্রবল মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছিল তাতে আমার বুকের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। দুধ না-পেয়ে মারা গিয়েছিল আমার সদ্যোজাত কন্যা। তবু ওই ভারতীয় যুবার প্রতি বিন্দুমাত্র বিতৃষ্ণা আসেনি। উল্টে জানালা দিয়ে তাঁর চলে যাওয়া দেখে কান্না সামলাতে পারিনি। সে দিনই পণ করি, ভারতের আত্মার সঙ্গে যুক্ত হলাম আমরা এবং ভারতের এই বিপ্লবীকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করব।”
আহা! এ তো একজন মায়ের কথাই। এরপর আরও নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে রাসবিহারীকে। চিন্তা এখনও যায়নি জাপানি দম্পতির ভিতর থেকে। সিদ্ধান্ত নিলেন বড়ো মেয়ে তোশিকোর সঙ্গে বিয়ে দেবেন। তাহলে জাপানের নাগরিকত্ব পাওয়াও সহজ হবে। কিন্তু তোশিকো কি এই বিয়েতে রাজি হবেন?
অনেকদিন ভেবে তোশিকো উত্তর দিলেন, ‘‘আমি মিস্টার বোসকে বিয়ে করতে চাই। তাঁকে রক্ষা করতে চাই। এই সিদ্ধান্ত বদলাবে না।’’ অন্যদিকে রাসবিহারী বললেন, ‘‘বিপ্লব আমার ধ্যানজ্ঞান। বিয়ের কথা কখনও ভাবিনি। আমার যা জীবন তাতে এ সব ভাবার কথাও না। তবে মিস্টার তোয়ামা যদি এটাই চান এবং মিস তোশিকো যদি রাজি থাকেন তা হলে আমি বিয়ে করব।’’
আজ থেকে ১০৩ বছর আগে ১৯১৮ সালে রাসবিহারী আর তোশিকোর বিয়ে হল গোপনে। এই তোশিকো সোমা পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন তোশিকো বসু, রাসবিহারী বসুর স্ত্রী। কিন্তু রাসবিহারীর অনুতাপের শেষ ছিল না।
রাসবিহারী তোশিকোকে ভালোবেসেছেন, কিন্তু গভীরতা বোঝেননি এখনও। তোশিকো হাসিমুখে সব কাজ করে দিচ্ছেন। কিন্তু রাসবিহারীকে কি ভালোবাসতে পেরেছেন? রাসবিহারী প্রশ্ন করেছেন, ‘‘তুমি আমাকে বিয়ে করেছ, কিন্তু আমায় ভালোবেসেছ কি? আমি সত্যিটা জানতে চাই।’’ পরবর্তীকালে আবার বলেছেন, ‘‘তোশিকো ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে এ জীবনে অসম্ভব। সেই আট বছরের নির্জন জীবনের মতো তোশিকো চিরকাল আমার কাছেই থাকবে। আমার আর কিছু চাই না।’’
শোনা যায় আট বছরে সতেরো বার বাড়ি বদলাতে হয়েছিল রাসবিহারী-তোশিকোকে। ছিল প্রবল ভয়, দুশ্চিন্তা, অর্থের সমস্যা। কিন্তু দাম্পত্য ছিল অটুট। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে রাসবিহারী লিখেছেন, “আওয়ার ম্যারেড লাইফ ওয়াজ ভেরি শর্ট বাট ইট ওয়াজ ব্লিস। আই হ্যাড আ ফিলিং দ্যাট আই এনজয়েড টোটাল হ্যাপিনেস ডিউরিং দোজ ফিউ ইয়ার্স।” ভালোবাসার প্রবহমানতা বজায় রাখতে স্ত্রী তোশিকোর সমাধির উপরেই রাসবিহারীর সমাধি তৈরি হয়েছিল।
এমন প্রেমকাহিনি বুঝি স্বপ্নের মতো আসে। সব লণ্ডভণ্ড করে চলে যায়। রাসবিহারীর জীবন ছিল অনিশ্চিত। প্রতিটা মুহূর্তে মারা যাওয়ার ভয়। তা সত্ত্বেও তোশিকো তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। ঝগড়া হলে কান্নায় মুখ ভেজাতেন। রাসবিহারী তাঁর চোখের জল মুছে দিতেন আলতোভাবে। একজন বিপ্লবীর ভালোবাসা যেন রূপকথার চেয়েও অদ্ভুত। আচ্ছা, কলকাতা থেকে জাপানের দূরত্ব কত?
তথ্যসূত্রঃ
কর্মবীর রাসবিহারী— বিজনবিহারী বসু
আনন্দবাজার পত্রিকা
