বাবু কলকাতার শেষ উত্তরসূরি নাকি শাঁটুলবাবুই
যাঁকে বাবু কলকাতার শেষ উত্তরসূরি বলা হয়, তিনি হলেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত ওরফে ‘শাঁটুল বাবু’। ৪০-এর কলকাতায় তাঁর মতো ভার্সেটাইল বিদ্যের লোক নাকি খুঁজে পাওয়া যেত না। চমৎকার পড়ুয়া, লেখক এবং গবেষক। একে ওরকম পড়াশোনা করা তার উপর সত্যজিতের প্রাণের সখা, তাই একথা চাউর আছে যে, ফেলুদার সিধুজ্যাঠা লোকটি আসলে শাঁটুলবাবুর আদলেই তৈরি।
বিদ্যেবুদ্ধি সিরিয়াস গোছের হলেও মনেপ্রাণে নিতান্তই বখাটে গোছের ছিলেন শাঁটুলবাবু। খালি আড্ডা, আড্ডা আর আড্ডা। বই লিখেছিলেন তিনটে। এবং তিনটিই চটি। প্রথম দুটি রোগা কিন্তু লম্বা-চওড়া। অন্যটি ‘বটতলা স্টাইল’-এর। তাঁর শব্দচয়ন-লেখার ধরণ ছিল অনেকটা চার্লি চ্যাপলিনের মতন—হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলা অথবা কাঁদতে কাঁদতে হেসে ওঠা। একটি লেখায় ‘জুতিয়ে’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এইভাবে- “কমলাদা তাকে পিঠ চাপড়ে বললেন যে তিরিশে পাশ, সে জুতিয়ে পঞ্চাশ পাবেই পাবে।” আবার একটি লেখায় ট্যাঁক খালি অবস্থা বোঝাতে লিখছেন, “আমার তখন সব সময়ের মতো ‘টিকে ধরাতে জামিন চাই’ গোছের অবস্থা।”
নিজেকে ‘আড্ডাবাজ’ বলাতে তাঁর বিশেষ গর্ব ছিল। গর্ব তো করবেনই, কারণ চল্লিশের দশকের আড্ডার মানে ছিল অন্যরকম। কীরকম, তা নিয়ে বিশদ লিখে গিয়েছেন ‘আমাদের যুবাকালের আড্ডা : ঝাঁকিদর্শন’-এ।
কলকাতায় কফি-ক্যাফে কালচার জাঁকিয়ে বসার আগের কথা। সেসময় কলকাতায় চায়ের দোকানের আড্ডার তুলনায় যেকোনও জায়গার আড্ডাই ছিল নস্যি। তখন কফির গন্ধ নাকে এলে বহু মধ্যবিত্ত বাড়ির গিন্নিবান্নিরা বলে বসতেন, ‘ম্যাগো কফির গন্ধ শুকলেই মাথা ধরে’। ফ্রান্সের দিকে যেমন কাফে বলতে একদিকে কফি, রঙিন পানীয়, খাবারের দোকান আর প্রধানত আড্ডার ঘাঁটি বোঝায়, কলকাতায় কোনও দোকান কখনও হয়নি যার নাম ‘চা’। হাসি চেপে খাতায়-কলমে এই দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন শাঁটুলবাবু।
ছাত্রজীবনে শাঁটুলবাবুরা আড্ডা দিতে যেতেন সেনেট হলের উত্তর-পশ্চিম কোণে লম্বাটে ধরনের চায়ের দোকান, হ্যারিসন রোডের ‘জ্ঞানবাবুর চায়ের দোকান’ (যেটি একশো বছর চলার পর বন্ধ হয়ে যায়), বসন্ত কেবিন, কলেজ স্টিটের ওয়াই এম সি-এর রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি জায়গায়। চায়ের চুমুকে আড্ডার ঝড় তোলার জন্য আদর্শ ছিল এই জায়গাগুলোই। তবে, টানা রাশ-ছাড়া শাঁটুলবাবুর জীবনে খাঁটি আড্ডার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪১ সালে এম এ পরীক্ষা দেওয়ার পর। কালীঘাট ট্রাম ডিপোর উল্টো দিকে তখনকার দিনের কলকাতার নানান এলাকায় সুবিখ্যাত সাঙ্গুভ্যালি নামে অনেক চায়ের দোকানের একটা আড্ডাঘর হয়ে ওঠে। সেই দোকানের অতি সহৃদয় চাটগেঁয়ে (চট্টগ্রামের) যুবক মালিক (সম্ভবত এইচ পি বড়ুয়া) বেকার, ঘোর আড্ডাবাজ রেস্তোহীন ছোকরাদের সকাল ন’টা থেকে বারোটা-একটা আর সন্ধেয় সাতটা থেকে ন’টা অব্দি দুটো-তিনটে টেবিল জুড়ে নির্বিবাদে আড্ডা মারতে দিতেন। এমনকি ‘ধার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’ কুরুশ কাঠিতে এমব্রয়ডারি করা ‘মটো’-টি এড়িয়ে গিয়ে প্লেন চা, ডবল-হাফ চা (বেশি দুধ আর চিনি দেওয়া আধ কাপ চা), টোস্ট-মামলেট বকেয়ায় দিতেন।
এই সাঙ্গুভ্যালিতে যাঁরা নিয়মিত আড্ডা মারতে যেতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন সন্তোষ বোস (শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের অধ্যাপক), সৌম ঠাকুরের আরসিপিআই দলের মেম্বার আর ব্যাংকের কেরানি সুধাময় দাশগুপ্ত। যেতেন প্রভাত দাস, সুনীল গুহ, ত্রিদিব ঘোষ এবং আরও কয়েকজন। মাঝে মধ্যেই আসতেন লেখক অশোক গুহ, কবি দিনেশ দাস, সত্যেন মৈত্র আর দু-চারজন কলেজের মাস্টার। সবথেকে বেশি পড়ুয়া ছিলেন সন্তোষ বোস। তাঁকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এক রগুড়ে মুসলমান পুরোনো-বইওয়ালা ‘বইয়ের ঘুণ’ বলে ডাকতেন। শাঁটুলবাবু লিখেছেন, ‘আমরা তখন কাজে না হলেও চিন্তাভাবনায় ঘোর মার্কসিস্ট। ঠাট্টা করে বললে বলতে হয় চায়ের কাপে ইনকিলাব করার দল।’ সেই সন্তোষ বোসের কাছ থেকে আমদানি হত নানান বিলিতি মার্কিন কেতাব আর বিশেষ করে বামপন্থী বই-পত্তর। তাঁর কাছ থেকেই বাড শ্যুলবার্গের ‘হোয়াট মেকস স্যামি র্যান’ নামে একটি বই পেয়েছিলেন শাঁটুলবাবু এবং সেই বইয়েরই পেপারব্যাকের একটি কপি সত্যজিৎ রায়কে তিনি দিয়েছিলেন, যেটি পড়ে খুব তারিফও করেছিলেন রায়বাবু।
সেসময় হাজার রকম বই পড়া, ভারতীয় রাজনীতি, সোভিয়েত কমিউনিজম, স্প্যানিশ সিভিল ওয়ার আর অজস্র বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কি আর ‘বিপ্লব এলো এলো’ এই সব বিষয় নিয়েই সর্বক্ষণ মশগুল থাকতো একুশ-বাইশ বছর বয়সী শিক্ষিত-বিচক্ষণ যুবকরা। সাঙ্গুভ্যালিই হয়ে উঠেছিল তাদের আড্ডার আখড়া। বিভিন্ন ধরনের মানুষ আসতেন, বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটত। যেমন-
এই আড্ডার আখড়ায় আসতেন সত্যিকারের লেখাপড়া করা কমিউনিস্ট প্রভাত দাস। শোনা যায়, তাঁর আসল নাম ছিল ফনিভূষণ চোংদার। তারপর পালটে পালটে তাঁর নাম হয়েছিল যথাক্রমে প্রভাত দাস, স্টিফেন প্রভাত দাস আর সব শেষে পারভেজ রিয়াজ। তিনি আড্ডায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রায়ই বলতেনঃ ‘আরে মশাই আজকে এক্ষুনি যে একটা ব্যাপার ঘটে গেল তা ভাবতেই পারবেন না।’ তখন সবাই মিলে ‘কী ব্যাপার কী ব্যাপার, কী হয়েছিল মশাই’ বলে জানতে চাইলে তিনি ‘দাঁড়ান দাঁড়ান এক কাপ চা আর সিগারেটটা খেয়েনি’ বলতেন। তারপর যে গল্প তিনি শোনাতেন তার কোনও ‘ক্লাইম্যাক্স’ খুঁজে পাওয়া যেত না। সেরকমই একদিন ‘কী মজার ব্যাপার ভাবতেই পারবেন না’ বলে তিনি বলেছিলেন যে ভাওয়ালি মণ্ডল রোড দিয়ে আসতে আসতে দেখেন যে রাস্তায় কলের জল নিয়ে দু-চারজন হিন্দুস্তানি মেয়ে ঝগড়া করছে। তখন প্রভাত দাস নাকি তাদের বলেনঃ ‘আরে, কাহে কাজিয়া করতা হ্যায়, পানি লেকে আপনা আপনা ঘর যাও।’ তারপর আড্ডার সদস্যদের বলেনঃ ‘এই কথা বলায় কী হল জানেন মশাই, ভাবতেই পারবেন না। ওদের মধ্যে একজন মেয়ে একটা লাঠি দিয়ে আমার পেটে খোঁচা মেরে বললে, আরে ভালা আদমি আপনা রাস্তা দেখ…হো হো হো’।
১৯৪২-৪৩ সাল থেকে সাঙ্গুভ্যালি, ন্যাশানাল লজ ইত্যাদি ঘুরে আড্ডার নতুন ঠিকানা হয় কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস। কফি হাউসে আড্ডার নাটের গুরু ছিলেন কমলকুমার মজুমদার। তিনি কখনও সাঙ্গুভ্যালির আড্ডায় যাননি। ধুতি-পাঞ্জাবি ধরার আগে তাঁর 'স্টাইল-স্টেটমেন্ট' কেমন ছিল, সে বিষয়ে শাঁটুলবাবু লিখেছেন, ‘কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসের আড্ডাতেই তাঁর সঙ্গে আলাপ জমতে বুঝলাম ইনি কী চিজ। সে সময়ের কমলবাবু পোশাকে-আশাকে ছিলেন একেবারে ফরাসি ধাঁচের জাত সাহেব। পরনে থাকত ব্র্যান্ডেড দামী স্যুট, টাই, সিল্কের গেঞ্জি… রুমাল। পায়ে মিডলটন রোয়ের একটা ভীষণ এক্সক্লুসিভ ছোট্ট চীনে দোকানের জুতো। শোনা যায়, সেই দোকানে তাঁর পায়ের ছাঁচ নিয়ে তৈরি কাঠের লাস ছিল, দরকার মতো অর্ডার দিয়ে জুতো বানাতেন কমলবাবু। সেসময় তিনি কীসব কেমিক্যালের ব্যবসা করতেন বলতেন।’
এতক্ষণ আমি যা বললাম তা নিমিত্ত মাত্র; আড্ডা নিয়ে এই আলোচনার অন্ত নেই, এমনকি জব চার্ণকও নাকি বাংলায় এসে বঙ্গবাসীর অনুপ্রেরণায় বটগাছের নীচে বসে আড্ডা জমাতেন। ৪০-এর কলকাতাকে জানতে গেলে, বুঝতে গেলে এইসব আড্ডার কথা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বাঙালি ছেলেমেয়েরা এখন আইটি সেক্টরে কাজ করে, কর্পোরেট-হাওয়ায় তারাও ভেসেছে, সমাজের মন বদলেছে, বদলে গেছে পরিবেশ, কমেছে ফুরসৎ… তবে, যুক্তিতক্কের উর্ধ্বে—বাঙালির আবেগের কথা যদি বলি, এই আকালেও স্বপ্ন দেখি বাঙালি ‘আড্ডাবাজ’ ছিল, আছে এবং আগামীতেও তাই থাকবে।
সূত্রঃ
গুরুচণ্ডালি, টইপত্তর
‘আমাদের যুবাকালের আড্ডা : ঝাঁকিদর্শন’ ঃ রাধাপ্রসাদ গুপ্ত
ছবিঃ
সঞ্জীত চৌধুরী