
মফস্সলের কাঁচাপাকা রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে খড় বোঝাই গরুর গাড়িটাড়ি পিছনে ফেলে হু হু করে ছুটছে একটা ভিন্টেজ গাড়ি (Vintage Car)। গাড়িটির বয়স- পঁচিশ, নং- WGJ923, ব্র্যান্ড- ক্রাইসলার, মালিক- নরসিং। নরসিং উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে বাংলায় আসে ব্যবসা করার অভিপ্রায়ে। আর ক্রাইসলার গাড়ি্টি সে আমদানি করেছিল আমেরিকা থেকে। অর্থাৎ, বাংলার মাটিতে দুজনেই বিদেশি। নরসিং-এর সেই গাড়ি নতুন ভারতীয় গাড়ির সঙ্গে ব্যবসায় এঁটে উঠতে পারে না। তাই শেষ পর্যন্ত শেঠ সুখনরামের সঙ্গে চোরাচালানের কাজে হাত মেলাতে হয় তাকে। পুরোনো ক্রাইসলার গাড়িটি মুনাফা দিতে না পারায় অধঃপতনের রাস্তায় পা বাড়াতে হয় নরসিংকে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৬২ সালে মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray’s) ‘অভিযান’ (Abhijan), যে ছবিটি দেখে ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak) মন্তব্য করেছিলেন ‘অযান্ত্রিকের হুবহু কপি!’। বলাই বাহুল্য সত্যজিৎ এবং ঋত্বিকের এই শিল্পীমনস্ক বন্ধুবৎসল সংঘর্ষ আজীবন জারি ছিল। সে যাই হোক, এই দুই মহারথীর মুখরোচক মনমালিন্য আমার লেখার বিষয় নয়; লিখছি, গোয়েন্দাগিরি বা সিনেমাতে সত্যজিৎ রায়ের ব্যবহৃত বিদেশি গাড়ির উৎস নিয়ে।
সত্যজিতের ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর (Upendrakishore Ray Chowdhury) আর বাবা সুকুমার (Sukumar Ray) কখনো মোটরগাড়ি কেনেননি। কিন্তু উপেন্দ্রকিশোরের ভগ্নীপতি হেমেন্দ্রমোহন বসুর (Hemendra Mohan Bose’s) গাড়ির শখ ছিল। তাঁর নিজের তো একটি গাড়ি ছিলই, উপরন্তু গাড়ির ব্যবসায় নামযশও হয়েছিল তাঁর। এই হেমেন্দ্রকুমার বসুর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়ির সঙ্গে, এবং তাঁর ছেলে নীতিন বসু, মুকুল বসু, কার্তিক বসু আর বাবু বসুর সঙ্গে সত্যজিৎ তথা রায় পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল পারিবারিক সম্পর্কের চেয়েও গভীর। গাড়ির ব্যবসায় বিখ্যাত হেমেন্দ্রমোহন ছিলেন ‘কুন্তলীন’, ‘দেলখোস’ ইত্যাদি সুগন্ধি দ্রব্যের প্রস্ততুকারক, ফোনোগ্রাফ সিলিন্ডার ও রেকর্ড নির্মাতা, রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের গানের প্রথম রেকর্ডিস্ট। শুধু তাই নয়, এইচ বোস ছিলেন বাঙালিদের মধ্যে সাইকেল ও মোটরগাড়ির ব্যবসায় পথিকৃৎ। ৪৪ নম্বর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে বিশাল শোরুম ছিল তাঁর গ্রেট ইস্টার্ন মোটর কোম্পানির। ১৯১১-১২ সালে তাঁদের আমদানি করা গাড়িগুলি হল – ডারকপ, ম্যাকসওয়েল, ক্যালথর্প, বেলসাইজ, অ্যারল জনসন, বারলিয়েট ইত্যাদি।
এই দোকান প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় যুগ পরে সত্যজিতের জন্ম। ছোটবেলায় দেখা কলকাতায় হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুর মধ্যে সত্যজিৎ রায় বিশেষ স্মৃতিচারণ করেছেন পুরোনো দিনের মোটরগাড়ির। ফোর্ড, শেভ্রোলে, হাম্বার, ভকসহল, উলস্লি, ডজ, ব্যুইক, অস্টিন, স্টুডিবেকার, মরিস, ওল্ডসমোবিল, ওপ্যাল, সিত্রোয়াঁ ইত্যাদি বিচিত্র সব চেহারার নামজাদা গাড়ি। সেসব দিনে ঘরে বসে হর্ণ শুনেই কোন গাড়ি বলে দিতে পারতেন সত্যজিৎ। নিজেই লিখেছেন, ‘সাপের মুখওয়ালা বোয়া হর্ন লাগানো বিশাল ল্যানসিয়া, লাসাল – এসব আমীরী গাড়ি তো মনে হয় স্বপ্নে দেখা।’
তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে বেশ কিছু গাড়ির কথাও উল্লেখ করেছেন সত্যজিৎ। তাঁর সোনামামা প্রশান্তকুমার দাশের ছিল আসকিন সিডান গাড়ি, বুলাকাকা প্রফুল্লচন্দ্র মহলানবিশের ছিল লাল রঙের টি-মডেল ফোর্ড গাড়ি, মেজো পিসেমশাই অরুণনাথ চক্রবর্তীর ছিল ‘তাগড়াই’ সবুজ রঙা ওভারল্যান্ড, অবিনাশ মেসোমশাইয়ের ছিল ল্যানসিয়া, সত্যজিতের কথায়, যার ‘বনেটের ডগায় দপ দপ করে গোলাপী আলো বেরোত একটা কাচের ফড়িং-এর গা থেকে।’ এইসব দেখে বড় হওয়ার সুবাদেই গাড়ির প্রতি একটা টান জন্মেছিল তাঁর এবং তার নানা দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে তাঁর নিজের গল্প-উপন্যাস-সিনেমায়।
ফেলুদা আধুনিক সময়ের গোয়েন্দা, কলকাতার ঝকঝকে তরুণ। ফেলুদার নানা অ্যাডভেঞ্চারেও ভিনটেজ মোটরগাড়ির নমুনা রয়েছে। তার অসমবয়সী বন্ধু জটায়ু অ্যাম্বাসাডর কিনলেও ফেলুদার দৃষ্টি আকর্ষণ করত না-দেখা সব গাড়িই। তবে, সেটা শুধু হংকং-এর রাস্তার নীল জার্মান ওপ্যাল, কাঠমাণ্ডুর জাপানি ডাটসুন বা টয়োটা ট্যাক্সির মতো আধুনিক হবে, এরকম কিছু ভাবত না ফেলুদা। তার এক মক্কেলের গাড়ি হলুদ রঙের হিসপানো সুইজা গম্ভীর শাঁখের মতো হর্ন বাজিয়ে পাড়া জাগিয়ে ফেলুদার বাড়িতে আসত। হাজারিবাগে পুরোনো হলুদ পনটিয়াক এবং লখনউ আর হরিদ্বারে একাধিকবার শেভ্রোলে-র সঙ্গে ফেলুদার দেখা হয়েছে।

হাপমোবিল
১৯৭৪ সালে পলাশীর কাছে অ্যাম্বাসাডরের চেয়েও লম্বা, রংচটা, তাপ্পিমারা একটি হাপমোবিল গাড়িও মনে ধরেছিল ফেলুদার। জটায়ুর অ্যাম্বাসাডরে কোলাঘাট পেরিয়ে যাওয়ার পথেই নবকুমার নিয়োগীর থার্টি সিক্স মডেলের আর্মস্ট্রং সিডলি-র সঙ্গে ফেলুদার সাক্ষাৎ হয়।

আর্মস্ট্রং সিডলি
নবকুমারের আরও দুটো পুরোনো গাড়ি ছিল এবং প্রতিবার তিনি কলকাতার ভিনটেজ কার র্যালিতে যোগ দিতেন। আসলে শেভ্রোলে, স্টুডিবেকার, পনটিয়াক, ক্রাইসলার, ডজ ইত্যাদি বেশ কিছু শক্তপোক্ত মডেল কলকাতার মালিকরা ত্যাগ করলেও, মফসসলে তার পরেও দীর্ঘকাল তাদের উপযোগীতা প্রমাণ করেছে এই সব গাড়ি। বিশেষত ট্যাক্সি হিসেবে। তাই মফসসলেই ফেলুদা বেশি ভিনটেজ গাড়ি দেখেছে। সেই যুক্তিতে ‘অভিযান’ মফসসলের ঘটনা বলেই ছবিতে ভিনটেজ গাড়ি দেখানো বাস্তবসম্মত হয়েছে।

‘অভিযান’-এর ক্রাইসলার
‘অভিযান’-এর জন্য ১৯৩১ মডেলের ক্রাইসলারটি কিনেছিলেন বিজয় চট্টোপাধ্যায়। সিনেমায় দেখানো ঘটনা অনুযায়ী গাড়িটির বয়স পঁচিশ, আসল বয়সের সঙ্গে মাত্র বছর পাঁচেকের তফাত। ক্রাইসলার না পেলে হয়তো ছবিতে একটা শেভ্রোলে আসত বা অন্য কোনও ‘পুরোনো’ গাড়ি, কিন্তু কখনোই হিসপানো সুইজা বা ল্যানসিয়ার মতো বিশাল গাড়ি আসত না।
_____________________
তথ্যঋণ: প্রবন্ধ সংগ্রহ/ সিদ্ধার্থ ঘোষ
