নকুবাবু, সন্দীপ দত্ত – একা হাতেই ইতিহাস বাঁচিয়েছেন যাঁরা

‘ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম ডে’-তে রইল অসামান্য দুই ব্যক্তিত্বের কথা

ছোটোবেলায় আমাদের পাড়ায় এক ভবঘুরে বৃদ্ধাকে দেখতাম, এদিক-ওদিক থেকে রকমারি জিনিস কুড়িয়ে নিজের কোমরে পুঁটলি করে ঝুলিয়ে রাখতেন। পুঁটলিগুলো এমনভাবে কোমরে সাজানো থাকতো, মনে হত যেন প্রস্ফুটিত পদ্মফুল। আর সেকারণেই পাড়ার লোকের কাছে সেই বৃদ্ধা হয়ে উঠেছিলেন ‘পদ্ম’, আর ছো্টোদের ‘পদ্মদিদা’। সেই পদ্মদিদা এমনিতে তাঁর ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিতেন না কাউকে। তবে, মুড ভালো থাকলে তার পুঁটলি থেকে বেরিয়ে আসত আশ্চর্য সব জিনিস। জাপানি পেন, তামার কচ্ছপ, বিরল পকেট ঘড়ি…আরও কত কি! একমাত্র ছোটোদের ডেকে ডেকে দেখাতেন সেসব, আর কারো দেখার অনুমতি ছিল না। পদ্মদিদার পুঁটলি হয়ে উঠেছিল আমাদের কল্পজগতের আঁতুড়ঘর— শৈশবের রোমাঞ্চকর মিউজিয়াম।

ছোটোবেলার এই ঘটনাটি মনে পড়ল কারণ, ১৯৭৭ সাল থেকে ১৮ মে দিনটি পালিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম ডে’—আন্তর্জাতিক সংগ্রহশালা বা জাদুঘর দিবস হিসেবে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দিনটি নানাভাবে উদযাপিত হয় এবং সেই অর্থে দেখতে গেলে এই দিনটি বোধহয় প্রত্যেকেরই উদযাপন করার, কারণ আমাদের প্রত্যেকরই বাড়িতে অথবা মনে, ছোট ছোট জাদুঘর রয়েছে। জাদুঘর মানে শুধুই বড়ো বড়ো কাঁচের শোকেস-এ সাজানো গোছানো ফসিলস—মেমোরিয়া নয়, জাদুঘর হল মানুষের ভাবনা, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার অক্সিজেন।

কলকাতায় নিভৃতে সেই অক্সিজেনের জোগান দিয়ে গিয়েছেন সুশীলকুমার চট্টোপাধ্যায় ওরফে নকুবাবু এবং সন্দীপ দত্ত। প্রথম জন চলে গিয়েছেন এ বছরের শুরুতেই, দ্বিতীয় জন জীবিত এবং সংরক্ষণের লড়াই এখনও জারি রেখেছেন। তাঁরা দুজনেই প্রচারবিমুখ কণ্ঠস্বর। একাকী অসাধ্যসাধন করেছেন তাঁরা দুজনেই। কিছু জিনিসের কদর বুঝে ভালোবেসে দুহাতে আগলেছেন। তাই আন্তর্জাতিক সংরক্ষণশালা বা জাদুঘর দিবসে কথা বলব এই দুই ব্যক্তিত্বকে নিয়েই।

অভিজিৎ চক্রবর্তীর লেন্সে নকুবাবু

উত্তর কলকাতার (খান্নার কাছে) নলিনী সরকার স্ট্রিটের এক অখ্যাত গলিতে একটা বাড়ি। বাড়ির মালিক ছিলেন প্রয়াত সুশীলকুমার চট্টোপাধ্যায়। ‘নকুবাবু’ নামেই ছিল ওঁর পরিচিতি। ডিভিডি প্লেয়ারের সঙ্গে ১৯২৬–‌এর অ্যাম্পলিফায়ার জুড়ে গান শুনতেন নকুবাবু। হাইফাইডালিটি অ্যাম্পলিফায়ারের সুরের আমেজ ছড়িয়ে পড়ত সারা বাড়িতে। সারা জীবন ধরে তিনি সংগ্রহ করেছেন পুরনো সামগ্রী। নানা যুগের নানা মডেলের শব্দযন্ত্র, স্পিকার, রোদঘড়ি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আমলের দম দেওয়া মুভি ক্যামেরা, পোর্টেবল প্রজেক্টর, জমিদারবাড়ির বৈঠকখানার হ্যাজাক, বিউগল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বাতি, ১৮৭০ সালের রেলের গার্ডদের হ্যারিকেন, সবই ছিল ওঁর সংগ্রহে। আঠেরো ও উনিশ শতক যেন হাত ধরাধরি করে ওঁর সংগ্রহশালায় ঠাঁই পেয়েছিল। কোথায় কোন দুর্লভ জিনিস রাখা আছে সবই ছিল ওঁর নখদর্পণে। নিজেই রোজ পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করেন ওই বিপুল ভাণ্ডার। ১৮ বছর বয়স থেকে যে সংগ্রহ শুরু করেছিলেন নকুবাবু, সেই সংগ্রহের সুবিন্যাস একার পক্ষে কী করে সম্ভব? সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন তিনি। আঠেরো ও উনিশ শতকের যন্ত্রপাতি সবই রেখেছিলেন চালু অবস্থায়।

সাধের সম্পদ আগলে নকুবাবু

বিদ্যাসাগর কলেজের বিজ্ঞানের স্নাতক নকুবাবু ছিলেন কারিগরি বিদ্যায় স্বশিক্ষিত। যন্ত্রপাতির টুকিটাকি মেরামতি নিজেই করে নিতেন। বড়োরকম মেরামতির দরকার হলে কারিগররা ওঁর বাড়িতে ছুটে যেতেন। এভাবেই পরম মমতায় পুরাতনীকে আগলে রেখেছিলেন নকুবাবু। ওঁর দুর্লভ সংগ্রহের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন তিনি। বলতেন, ‘‌অন্তরের আকুতি না থাকলে পুরাতনকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায় না।’‌

অভিজিৎ চক্রবর্তীর লেন্সে নকুবাবু

যে আকুতির জোরে তিনি হেলায় ছেড়েছিলেন ১০টা–‌৫টার চাকরি, ছুটে বেড়াতেন দুর্লভ সংগ্রহের তাগিদে। দেশ–‌বিদেশের উৎসাহী গবেষকরা ভিড় জমাতো ওঁর কাছে। অনেকেই চড়া দামে কিনে নিতে চাইত নকুবাবুর বেশ কিছু সংগ্রহ। কিন্তু ইতিহাস যাঁকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ছিল, তিনি টাকার বিনিময়ে সেই সম্পদ হাতছাড়া করতে রাজি হননি কখনও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের প্রজেক্টর, লাউডস্পিকার দিয়ে গিয়েছেন ভারতীয় যাদুঘরে। শেষের দিনগুলোয় পুরাতনীর প্রতি অন্তরের আকুতি আছে এমন কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে খুঁজে বেড়াতেন নকুবাবু। তাঁর সেই সন্ধান সফল হয়নি। চলে গিয়েছেন নকুবাবু। বাবার প্রতি ভালোবাসায় নকুবাবুর বড়ো ছেলে উত্তরাধিকার সূত্রে এইসব ধনসম্পদ বাঁচিয়ে রাখবেন বলে কথা দিয়েছেন। তাই পরিবারের সদস্যের মতোই নকুবাবুর সাধের সম্পদ রয়ে গেছে তাঁর ভিটেতে।

সন্দীপ দত্ত

সন্দীপ দত্ত। কলকাতার একমাত্র ‘লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র’টি তাঁর হাতেই তৈরি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার একেবারে শুরুর দিকের অরিজিনাল সংকলন থেকে শুরু করে দেশলাই বাক্সের আদলের লিটল ম্যাগাজিন, কী নেই তাঁর সংগ্রহে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার শুরুর সংকলন

এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত যাবতীয় লিটল ম্যাগাজিনের সংকলন রয়েছে তাঁর পাঠাগারে। তাবড় তাবড় লেখক, গবেষকরা ছুটে যান সন্দীপ দত্তের এনসাইক্লোপিডিয়ার কাছে। যেকোনও বইমেলাতেই তাঁকে দেখা যায় লিটল ম্যাগাজিনের চারপাশে ঘুরছেন তিনি, পুরোনো-পরিচিত কাগজ সংগ্রহের পাশাপাশি খুঁজে নিচ্ছেন একেবারে আনকোরা, নতুন শব্দ-কাজ।  লাইব্রেরিটি শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন। এই শুরুর নেপথ্যে ছিল বিশেষ কিছু ঘটনা।

সন্দীপ দত্তের সঙ্গে কথোপকথনে আমি, ২০১৭ 

১৯৭২ সালে একদিন ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে গিয়ে তিনি দেখেন বহু পুরানো লিটল ম্যাগাজিন জোড়ো করা রয়েছে। দেখে উৎসাহিত হন কিন্তু, কর্তৃপক্ষ বলেন যে সেগুলো রাখা হবে না। তারপর, ১৯৭২-এ পার্ট টু পরীক্ষা দেওয়ার পর বাড়িতেই ৬৫০টি পত্রিকা নিয়ে একটি প্রদর্শনী করেন। সন্দীপবাবু নিজে একটি কাগজ শুরু করেন ১৯৭০ সালে। তাঁর কথায়, “সব লিটল ম্যাগাজিন সেই সময় আমি কিনতে পারতাম না। সেই সময় মানে, স্টুডেন্ট লাইফে পয়সা বাঁচিয়ে যতটুকু পারতাম কিনতাম। এইভাবে কিনতে কিনতেই একটা ভালোবাসা জন্মে যায়। ন্যাশনাল লাইব্রেরির ঐ ঘটনাটা আমায় আরও এগিয়ে দেয়। ভাবলাম যে ন্যাশনাল লাইব্রেরির যদি এমন অবস্থা হয়, তার একটা কাউন্টার এসট্যাব্লিশম্যান্ট (Counter Establishment)  আমি ছোট করে আমার বাড়িতেই করতে পারি! প্রদর্শনী করতে গিয়ে আমার কাছে কিছু পত্রিকা জমেছিল, এইভাবেই শুরু বলা যায়। এইসব চিন্তারই ফসল এই লাইব্রেরি।”

 

Developed by DXDasia