বাংলা ক্যালেন্ডারের স্মৃতি এখনও অমলিন বাঙালির অন্তরে
বঙ্গজীবনে নববর্ষের বাংলা ক্যালেন্ডারের (Bangla Calendar) সে যুগ আর নেই। বাঙালির নিজস্ব ক্যালেন্ডার চর্চাও আর নেই। বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশনের মতো অনুষ্ঠান এবং স্বল্প কিছু ব্যবসা-বাণিজ্যিক ক্ষেত্র ছাড়া বাংলা তারিখের প্রয়োজনও আজ ফুরিয়েছে। সে দিন গিয়েছে তবু, অন্দরে না হোক নববর্ষের সন্ধ্যেয় মিষ্টির প্যাকেটের সঙ্গে পাওয়া একখানি বাংলা ক্যালেন্ডারের স্মৃতি এখনও অমলিন বাঙালির (Bengali) অন্তরে।
এক দশক আগেও ব্রতচারী বাঙালির লাগতো সম্পূর্ণ নিজের মতো একটা দিনলিপি। বাঙালির ঘরে ঘরে তাই অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল বাংলা ক্যালেন্ডার। পোপ গ্রেগোরির দিনলিপি তার চলতো না। হুসেন শাহী জমানার আল্লাউদ্দিন হুসেন শাহীর আমলে মানে পনেরো শতকে বাঙালির নিজের ক্যালেন্ডার চর্চা শুরু হয়েছিল। ওই প্রথম ইসলামিক দিনলিপির চন্দ্র গণনার নিয়ম কানুনের সঙ্গে সংস্কৃত পণ্ডিতদের সূর্য গণনার নিয়ম-কানুন মিশিয়ে তৈরি হল বাঙালির নিজের মতো একটি ক্যালেন্ডার। তাতে একদিকে রইল চাঁদ দেখার হিসেব-নিকেশ আর একই সঙ্গে রইল সূর্যের গতি-গ্রহণের নানা হিসেব। মাটির বাড়ির দেওয়ালের গায়ে আঁচড় কেটে বাড়ির কর্তা অমন দিন-লিপি আঁকিয়ে রাখতেন বছরের প্রথম দিনে। তাতে লাল সিঁদুরের সূর্য হল পূর্ণ সূর্য, আর কাজল কালির সূর্য হল রাহু ঢাকা সূর্য। তখনই বাংলার লোককাব্যে যুক্ত হল একে চন্দ্র, দুয়ে পক্ষ, ছয়ে ঋতু, নয়ে নবগ্রহ শব্দগুলি। বলতে গেলে ছায়া দণ্ডে সূর্যের আলো আর ছায়ার বাড়া-কমা দেখে দিন হিসেবের জন্য বাঙালির হাতে এলো আঁকা লেখা যুক্ত দিনলিপি বা ক্যালেন্ডার।
আকবর বাদশার আমলে আরেকবার বাঙালি পেয়েছিল বাংলার উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বাদশাহি ক্যালেন্ডার। তার কারণ ছিল অবশ্য ভিন্ন।
আকবর বাদশার আমলে আরেকবার বাঙালি পেয়েছিল বাংলার উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বাদশাহি ক্যালেন্ডার। তার কারণ ছিল অবশ্য ভিন্ন। বাংলার জমি থেকে কর আদায়ের দিনক্ষণ ঠিক করার জন্যে এমন বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরির প্রকল্প নিয়েছিলেন আকবর। সেই ক্যালেন্ডারের নাম ছিল তারিখ-ই-ইলাহি। মাস, তারিখ, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদির নামে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার করার পাশাপাশি ইসলামি নামক্ষণও রাখা হয়েছিল সেখানে। আকবর বাদশার রাজকীয় গ্রহবিদ ফতুল্লাহ সিরাজি নির্মাণ করেছিলেন এমন বাংলা ক্যালেন্ডার।
স্বদেশি যুগে দেশি নেতাদের ও মনিষীদের নাম আর জন্মদিন দেওয়ার প্রথা চালু হয়। কলের ছাপা খানায় রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, নজরুল, রামকৃষ্ণ, স্বামীজির নাম ও ছবি যুক্ত হতে থাকে।
দেখতে দেখতে নতুন যুগ আসে। বাংলা ক্যালেন্ডারে আসে হরেক প্রকার রূপ বদল। আবার কিছু বিষয় অপরিবর্তিত থেকে যায়। যেমন ছ’টি ঋতু রইল দিনলিপিতে, প্রত্যেক ঋতুর জন্য ধার্য হল দু’টো করে মাস। আবার প্রত্যেক মাস নামাঙ্কিত হল একেকটি নক্ষত্রের নামে। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের নামে হল বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামে হল জ্যৈষ্ঠ, উত্তরআষাঢ় নক্ষত্র থেকে এলো আষাঢ়, শ্রবণা থেকে এলো শ্রাবণ ইত্যাদি। পাশাপাশি নবগ্রহ থেকে সাতজনকে বাছাই করে নেওয়া হল সাতটি দিনের জন্য। সব মিলিয়ে ফসল ফলানোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে ঋতু মাসের হিসেব ধার্য করা হল। ধরা যাক, সেকালের নিয়ম মেনে আজকের ১৪২৫ লিখতে হচ্ছে। তাহলে ব্যাপারটা হত ‘পঞ্চবাণ পক্ষ বেদ চন্দ্র বৎসর’। নিয়ম হল উল্টো দিক থেকে হিসেব করে নেওয়ার। উল্টো দিক থেকে পড়লে দাঁড়ায় একে চন্দ্র মানে ১, চারে বেদ মানে ৪, দুয়ে পক্ষ মানে ২, আবার পাঁচে পঞ্চবাণ মানে ৫। এই নিয়ম চলেছে দীর্ঘদিন।
স্বদেশি যুগে দেশি নেতাদের ও মনিষীদের নাম আর জন্মদিন দেওয়ার প্রথা চালু হয়। কলের ছাপা খানায় রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, নজরুল, রামকৃষ্ণ, স্বামীজির নাম ও ছবি যুক্ত হতে থাকে। রাহু-কেতু- গ্রহণ নির্ভর ক্যালেন্ডারে বাঙালি যুক্ত করল তাদের স্বদেশ নেতাদের প্রতি প্রণাম। পঞ্জিকার অফিস থেকেই প্রকাশ পেত এমন তারিখ যুক্ত ক্যালেন্ডার। এরসঙ্গে বারো মাসে তেরো পার্বণের নানা হিসেব। তার পর যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আসে রঙিন ছবি। হালখাতার দোকানদার নিজের নাম দিয়ে ক্যালেন্ডার প্রকাশ করতে থাকে। সেই চল আজও চলছে।
ক্যালেন্ডারের চাহিদা বহুদিনই হল তলানিতে এসে ঠেকেছে। একটি প্রথমসারির সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে রাজ্যজুড়ে ক্যালেন্ডারের ব্যাবসা প্রবল ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু, এ বছর সেই চিত্র বদলে গিয়েছে। নববর্ষে প্রচুর ক্যালেন্ডারের অর্ডার পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এমনকী কাগজ ও ক্যালেন্ডারের জোগান দিতে প্রায় হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। বাজার সামাল দিতে দাম বাড়ানো হয়েছে ক্যালেন্ডারের। এই অবস্থাই প্রমাণ করছে গ্রাম-শহরে নববর্ষের বাংলা ক্যালেন্ডারের চাহিদা বাড়ছে।
