
আজ স্বামী বিবেকানন্দের ১৫৯তম জন্মবার্ষিকী
কোভিডের সঙ্গে লড়াই করে ২০২০-২১ সাল পেরিয়ে এলাম সবাই। দেখলাম মৃত্যুমিছিল, সর্বক্ষণ এক অজানা আশঙ্কা আর মৃত্যুভয়। স্মরণাতীতকালে সারা বিশ্বজুড়ে একই সময় এমন অদ্ভুত সংকট বড়ো একটা আসেনি। কোভিডের দাপট রয়েছে এখনও। ইতিহাস জড়ো করে আমরা বুঝে নিতে চাইছি সর্বংসহা এই পৃথিবী এর আগে ঠিক কতবার তার ওপর হওয়া লাগামছাড়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে এমন মরণ কামড় ফিরিয়ে দিয়েছে মানুষকে। আশার কথা একটাই, অনেক হারিয়েও শেষপর্যন্ত এই সব কটা লড়াইয়ে বিশ্বাস জিতে গেছে, মানুষ জিতে গেছে। নতুন করে সে তার ভুল ত্রুটি সমবেতভাবে শুধরে বেঁচে উঠেছে। এই বিপর্যস্ত সময়ে আমাদের শহর কলকাতার তেমনই এক জিতে ফিরে আসা সময়ের কথা আজ মনে করব। মনে করব কলকাতার সেই জেতার অক্লান্ত কারিগর কিছু প্রত্যয়ী মানুষের কথা।
সাল ১৮৯৬। কলকাতা তখন কলিকাতা। মানুষ শুনল বোম্বে শহরে এক ভয়ানক রোগ দেখা দিয়েছে, তার নাম প্লেগ, মৃত্যু তার নিশ্বাসে প্রশ্বাসে। প্রায় দুবছর ধরে মুম্বই থেকে ধীরে ধীরে গুজরাট, কচ্ছ, সিন্ধু ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ এবং মাদ্রাজ পেরিয়ে সে রোগ কলকাতায় থাবা বসিয়েছিল ১৮৯৮-এর গোড়ার দিকে। ততদিনে কলকাতার মানুষ জেনে গেছে এর আগে দুবার পৃথিবীতে মহামারীর থাবা বসানো এই প্লেগ ৫৪২ খ্রিস্টাব্দে জাস্টিনীয় প্লেগ নামে রোমে এক কোটি মানুষের এবং ১৩৪৬ সালে ইউরোপ মহাদেশের আড়াই লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। এবার সে তার করাল গ্রাসে ছিন্নভিন্ন করতে এসেছে ঔপনিবেশিক কলকাতাকে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ইঁদুরের উৎপাত এবং সেই ইঁদুরের গায়ে বসা এক মাছি খুব দ্রুত প্লেগের সংক্রমণ ঘটিয়েছিল মানুষের মধ্যে। প্রতিষেধক হিসেবে ছিল রোগ ছড়ানোর অন্তত এক সপ্তাহ আগে বাধ্যতামূলক টিকাকরণ এবং বাড়িঘর যথাসম্ভব পরিষ্কার রাখা। নচেৎ সংক্রমণ ও মৃত্যু নিশ্চিত। সব জেনেও করোনা-কবলিত অনেক মানুষই যেমন আজও প্রয়োজনীয় সতর্কতা অমান্য করছেন, একশ কুড়ি বছর আগের অনেক বাঙালিও তেমনটাই করেছিলেন। এর সঙ্গে ছিল ইংরেজের হাতে টিকা নিলে রোগ আরও ছড়াবে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে এমন সব অযৌক্তিক ভয়। ফলে সীমাহীন বিপর্যয় নেমে এসেছিল বাঙালির জীবনে। কলকাতায় গলির পর গলি উজাড় হয়ে গিয়েছিল প্লেগের রুগীতে।
ডায়াবেটিক পেশেন্ট স্বামী বিবেকানন্দ তখন ডাক্তারের পরামর্শে দার্জিলিংয়ে। স্বামীজী প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যক্রম তখন চলছে বেলুড়ে নীলাম্বরবাবুর বাড়িতে। একই সঙ্গে চলছে বেলুড়ের মূল ভূমিখণ্ডে মঠ স্থানান্তরের কাজ। কলকাতায় প্লেগ মহামারির আকার নিচ্ছে এই নিদারুণ সংবাদে অস্থির হয়ে উঠলেন অসুস্থ বিবেকানন্দ। গুরুভাইদের সঙ্গত বারণ সত্ত্বেও ৩ মে কলকাতায় ফিরলেন তিনি, কারণ এই মানুষটিই ২৯ এপ্রিল বন্ধু ম্যাকলাউডকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমি যে শহরে জন্মেছি, সেখানে যদি প্লেগ এসে পড়ে, তবে আমি তার প্রতিকারকল্পে আত্মোৎসর্গ করব বলেই স্থির করেছি।” কলকাতায় তখন এমনই আতঙ্ক যে হিন্দু-মুসলমান একযোগে কাজ ছেড়ে বাড়িতে বসে গেছেন। ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ, গাড়ি ঘোড়া স্তব্ধ করে সে যেন স্বতঃস্ফূর্ত এক লক ডাউন। এরকম অবস্থায় বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভাইদের জানালেন, মরণভয় তুচ্ছ করে প্লেগরোগীদের সেবা করতে, সচেতন করতে, সরকার নির্দেশিত ওষুধ সরবরাহ করতে। এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহে যদি নতুন মঠের জমি বিক্রিও করতে হয় তার জন্য সবাই যেন প্রস্তুত থাকে। প্লেগ হাসপাতাল তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। কলকাতায় তখন প্লেগের তাণ্ডবলীলার আশ্রয়স্থল। তাই মানুষ পালাতে শুরু করেছিল কলকাতা ছেড়ে। স্বামী বিবেকানন্দ এইসব মানুষগুলোকে সচেতন করতে চেয়েছিলেন, কারণ এরাই রোগ জীবাণু বহন করে গ্রামবাংলার অন্যত্র প্লেগ ছড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে বসেছিল অজান্তে। ঠিক যেন কয়েক মাস আগের কলকাতার ছবি, ইটালির ছবি, বা সারা বিশ্বের ছবি। গভর্মেন্টের কাজে সাহায্য করার জন্য কমিটি গড়া হল রামকৃষ্ণ মিশনের তরফে। সিস্টার নিবেদিতা হলেন তার সম্পাদিকা, স্বামী সদানন্দ প্রধান কার্যাধ্যক্ষ, স্বামী শিবানন্দ, নিত্যানন্দ, আত্মানন্দ ছিলেন অনান্য কর্মী। নিজেদের হাতে এঁরা কলকাতার রাজপথ থেকে বস্তি পরিষ্কার করেছিলেন। ইংরেজি খবরের কাগজে নিবেদিতা অর্থ সংগ্রহের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন এবং ২১ এপ্রিল ক্লাসিক থিয়েটারে মিশনের ডাকা সভায় স্বামীজীর উপস্থিতিতে ‘প্লেগ ও ছাত্রগণের কর্তব্য’ এই শিরোনামে একটি বক্তৃতা করেছিলেন। এর ফলে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছিল অনেক ছাত্ররা। প্রতি রবিবার সন্ধেবেলা ৫৭ নং রামকান্ত স্ট্রিটে জড়ো হয়ে নিবেদিতা নির্দেশ দিতেন ছাত্রদের, ঠিক করে দিতেন এলাকা ভিত্তিক কর্মসূচি। টিকাকরণ যে কত জরুরি, সরকারি নির্দেশ মেনে চলাই যে রোগ নিরাময়ের একমাত্র পথ তা জনে জনে বুঝিয়ে এসেছেন এরা। কাজ করেছেন প্রত্যক্ষ। আর এ কাজে পাশে পেয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কিংবা জগদীশচন্দ্র বসুর মতো মানুষকে।
আরও পড়ুন: বিবেকানন্দ নামের এক বটগাছের কথা
নিজে ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নামা, প্লেগ রুগীকে সন্তানসম ভালোবাসায় সেবা করে চলা, এমনকি তাদের মৃত্যুতে স্বজন হরানোর যন্ত্রণায় ভেঙে পড়া এই নিবেদিতা কিংবা স্বামীজি বা তাঁর গুরুভাইদের কাছে কৃতজ্ঞ সে সময়ের কলকাতা। আবার এই মানুষগুলোর কপালেই জুটেছে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, টিটকিরি, নিন্দার বাণ। বিদেশি বলে যে কলকাতা নিবেদিতার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলত সেই কলকাতাই নির্লজ্জ সেবা নিয়েছে সিস্টারের হাতে। প্লেগ নিরাময়ে সরকারি নির্দেশ উল্লেখ করে বিবেকানন্দ রচিত লিফলেট বিলিতে স্বামীজীর গুরুভাই অখণ্ডানন্দকে মারতে গিয়েছিল জনতা। কারণ তাদের সন্দেহ হয়েছিল রামকৃষ্ণ মিশন ইংরেজের হয়ে প্রচার করছে, সাধুর ছদ্মবেশে এরা গভর্নমেন্টের চর। বিবেকানন্দ যেদিন দার্জিলিং থেকে আসেন তাঁর সঙ্গের গাঁটরি দেখেও তাঁর দিকে তেড়ে গিয়েছিল মানুষ, ভাবখানা এই যে সে গাঁটরিতে আছে প্লেগের টিকা, যা দিলে মৃত্যু অনিবার্য। অতএব মারো সাধুকে। মানুষের এই আত্মঘাতী অজ্ঞতাও যেন চিরকালীন, যার জন্য আজও সব কটা হাসপাতাল খোলা রেখে, সবরকম সেবাকাজ চালিয়ে যাওয়া বেলুড় মঠ করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নোটিশ অনুযায়ী যেকোনো জমায়েত এড়ানোর নির্দেশ মেনে যখন বিজ্ঞপ্তি জারি করে, কিছু নির্বোধ উক্তি তখন বাতাসে ওড়ে। প্লেগ জনিত কলকাতার সে মহামারী কেটে গেলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল। মৃত্যুর অসহায়তা কাটিয়ে জীবন কথা বলেছিল। আট লক্ষ কলকাতা বাসীকে জিতিয়ে দিয়ে জিতে গিয়েছিল কিছু মানুষ।
তাই, আমাদের ভরসা রাখতে হবে জীবনের উপর। এই চরম দুঃসময়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং সরকারি নির্দেশ মেনে নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে এক সুন্দর সকালের জন্য। এই মুহূর্তের আবশ্যিক স্বাস্থ্যবিধি ভবিষ্যতে ঘরের বাইরে আমাদের নিরাপদ পা ফেলার একমাত্র উপায়। আমাদের সদিচ্ছাই এই উপায়ের সহায় হোক।
